• " />

     

    'ফাইট টেইলর ফাইট'!

    'হোয়েন দ্য সান রাইজেস, আই ওয়েক আপ অ্যান্ড চেজ মাই ড্রিমস....'

    মানুষ স্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়। অহর্নিশ। সবকিছুর পরও একটা কিছু থাকে, মানুষকে বেঁচে থাকার তাড়না যোগায় যা! ‘দেখিস, একদিন!’ স্বপ্নগুলোর ডালপালা গজায়। পেখম মেলে।

    সেই স্বপ্নটাই যদি হুট করে একদিন নিঃশেষ হয়ে যায়! স্বপ্নভঙ্গের বেদনার হাহাকারের জবাবটা কী দিয়ে দেয়া যায়? জীবনদর্শন?

    ক্রিকেট চেষ্টা করে দেখবেন নাকি? এই তো শেষ হলো টি-টোয়েন্টির বিশ্বকাপ! বেন স্টোকস স্বপ্ন দেখেছিলেন নিশ্চয়ই, ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার! এক ওভার ধূলিসাৎ করে দিল যে সব! অথবা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বা মুশফিকুর রহিম! দুই রান, আহা দুইটি মাত্র রান! এই হাহাকারের শেষ নেই। স্বপ্নভঙ্গের বেদনারও তো তুলনা নেই!

    আচ্ছা, ক্রিকেটের স্বপ্নভঙ্গ দিয়ে নাহয় জীবনের স্বপ্নভঙ্গকে উপমিত করা গেল। ক্রিকেটটাই যদি কারও জীবনের স্বপ্ন হয়? সেই স্বপ্নটা যদি ভেঙ্গে যায়! বড্ড তাড়াতাড়ি! স্বপ্নপাখিটা ডানা মেলেও যদি নেমে আসতে বাধ্য হয়! তার তুলনা কী দিয়ে দিবেন? সেই হাহাকারকে প্রশমিত করবেন কিভাবে! আপনি আমি সেই প্রশ্নের উত্তর জানি কি? জেমস টেইলর কিন্তু জানেন!

     

    হতে পারতেন ইংল্যান্ডের ভবিষ্যত অধিনায়ক।

    এউইন মরগানের পর কে হবেন ইংল্যান্ডের সীমিত ওভারের অধিনায়ক? জো রুটকে খুব বেশী দায়িত্ব দেয়া হবে না, ব্যাটিংটা যে বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাঁর! জেমস টেইলর কিন্তু তালিকায় ছিলেন। নটিংহ্যাম্পশায়ারকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত বছর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া একটা ওয়ানডেতে ছিলেন ইংল্যান্ডেরও অধিনায়ক!  

    সেই টেইলর আজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। ক্রিকেটের ক্যারিয়ারটা শেষ হয়ে গেছে তাঁর! ইংল্যান্ডের ছোট্ট সেই খেলোয়াড়টা, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ওয়ানডেতে ওল্ড ট্রাফোর্ডে একটা অসাধারণ সেঞ্চুরি করেছিলেন যিনি। যিনি প্রথম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরিটা পেতে পারতেন গত বিশ্বকাপেই, পাওয়া হয়নি আম্পায়ারদের ভুলে! শর্ট লেগের অসাধারণ এক ফিল্ডার। ইংল্যান্ডের গত দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দুইটি ক্যাচ নিয়েছিলেন একই ম্যাচে। হাশিম আমলা আর ডেন ভিলাসের। ধারাভাষ্যে গ্রায়েম স্মিথ বলছিলেন, ক্রিকেট মাঠে দেখা সেরা ক্যাচগুলোর তালিকায় নিঃসন্দেহে থাকবে এই দুইটি ক্যাচ! ভিলাসের ক্যাচটা নেয়ার পর কী উচ্ছ্বাস ছিল টেইলরের! উদ্বাহু হয়ে ছুটছিলেন দিগ্বিদিক! যেন বিশ্বজয় করলেন মাত্র! টেইলরের তো আসলেই ক্ষমতা ছিল, বিশ্বজয়ের! হলো কই!

     

     

    টেইলরের একটা স্বপ্নপূরণ হয়েছিল ২০১১ সালে। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যখন ওয়ানডে অভিষেক হলো। এক বছর পর ডাক পেলেন টেস্টে। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে লিডস-এ হলো অভিষেক। পরের টেস্টটাও খেললেন, লর্ডস-এ। এরপরই স্বপ্ন যেন কিছুটা হোঁচট খেলো! বাদ পড়লেন দল থেকে। ২০১৩ সালে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে আবার এক ওয়ানডের জন্য দলে ফেরা, আবার বাদ পড়া। বছরখানেক পর সেই একটা ফোনকল পেলেন টেইলর, তাঁর যন্ত্রনার উপশমকারী এক ফোনকল! শ্রীলঙ্কা সফরে ডাক পেলেন, আদতে যা ছিল বিশ্বকাপেরই প্রস্তুতি! বিশ্বকাপে খেললেন। নিয়মিত হলেন ইংল্যান্ড দলে।

    দক্ষিণ আফ্রিকায় পেলেন প্রথম পূর্ণাংগ সফরের স্বাদ। খেললেন চার টেস্টেই। ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে নিশ্চয়ই বেশ ভাল বিবেচনাতেই ছিলেন টেইলর! এ বছর বার্বাডোজে গেলেন নটিংহ্যামশায়ারের প্রাক-মৌসুম সফরে। ফিরে এসে কাউন্টির নিয়ম মেনে চ্যাম্পিয়নশীপের আগে বিশ্ববিদ্যালয় দলগুলোর সঙ্গে ম্যাচ। এমনই একটা ম্যাচ ছিল ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। টেইলর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ভেবেছিলেন ক্যারিবীয়তে দলের অনেককেই যে ভাইরাস ধরেছিল, এটা বোধহয় তারই লক্ষণ।

    তারপর হাসপাতাল। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়লো, এআরভিসি(অ্যারিথমোজেনিক রাইট ভেন্ট্রিকুলার কার্ডিমায়োপ্যাথি), হৃদপিন্ডের এক জটিল রোগ! নামটা কটমটে, অসুখটাও অমনই! জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হবে টেইলরকে। তবে ব্যাট হাতে নামার স্বপ্নটা আর দেখতে পারবেন না! সাঁতার কাটতে পারবেন, সাইক্লিং করতে পারবেন। ক্রিকেটটা খেলা হবে না তাঁর! আজীবন ফিটনেসের দিকে চরম মনোযোগী এক ক্রিকেটারের ফিটনেসটা কী নিদারুণভাবে ‘ভেঙ্গে’ পড়লো! তবে হ্যাঁ, ফিটনেস অনেক ভাল বলেই টেইলর তাঁর ‘আরও খারাপ ভাগ্যকে’ পেছনে ফেলতে পেরেছেন বলে বিশেষজ্ঞদের মত!

    তবে ক্রিকেটের সঙ্গে চাইলে থাকতে পারেন, কোচিং বা এইরকম অন্যকিছুর মাধ্যমে। তবে সবার আগে অস্ত্রোপাচারটা ঠিকঠাকমতো হতে হবে তাঁর। সেই অস্ত্রোপাচার বা ভবিষ্যত জীবনের জন্য অসংখ্য শুভকামনা পাচ্ছেন টেইলর। গোটা ক্রিকেটবিশ্ব আবার এক হয়েছে, টেইলরের স্বপ্নভঙ্গটা যেন আরও অনেক ক্রিকেটারকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, স্বপ্নের ক্রিকেটটা খেলে যেতে পারছেন বলে তাঁরা কতোটা ভাগ্যবান!

     

     

    ৯ তারিখে একটা টুইট করেছিলেন টেইলর। একটা ছবি। লেখা ছিল, ‘হোয়াট ডাজনট কিল ইউ, মেকস ইউ স্ট্রংগার’! ১০ তারিখে সতীর্থ স্টিভেন মুলানেকে সেঞ্চুরির জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। সাবেক ক্লাব লিস্টারশায়ারের ম্যাচও ফলো করছিলেন, জেমি ভার্ডি যে চরম এক সময় কাটাচ্ছেন, জানিয়েছিলেন তা। তবে ১২ এপ্রিলের টুইটটা ছিল ক্রিকেটবিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়া একটা বার্তা, ‘সহজেই বলা যায়, এই সপ্তাহটা আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন। আমার পৃথিবীটা ওলট পালট হয়ে গেছে। তবে আমি থাকার জন্যই এসেছি আর জোর লড়াইও করছি! জীবন বড়ই ছোট!’

    হ্যাঁ, জীবন ছোট।

    স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বড় অনেক!

    প্রতিদিন সূর্য উঠবে, জেমস টেইলর শুধু তাঁর স্বপ্নটা তাড়া করে বেড়াবেন না! নাহয় একটা নতুন স্বপ্ন দেখবেন তিনি! তাড়া করবেন সেটা! আজ যেমন টুইট করেছেন, হুইলচেয়ারে বসেও দুই হাতে ‘ওকে’ চিহ্ন দেখিয়ে, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে প্রথম বাইরের তাজা বাতাস! আমি এটাকেই ভবিতব্য মেনেছি! জীবন বড়ই ছোট!’

    ভবিষ্যতে আবার টুইট করবেন, ‘যা তোমাকে মেরে ফেলে না, তাই তোমাকে শক্তিশালী বানায়!’

    সেই শক্তির পথে যাত্রায় অজস্র শুভকামনা আপনাকে, জেমস টেইলর! লড়াইটা আপনাকে চালিয়ে যেতেই হবে!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন