• " />

     

    অল্প গল্পে অলিম্পিক-৩: হিটলার, জয় ও ভয়

    প্রথম পর্বঃ অল্প গল্পে অলিম্পিক-১: হারকিউলেসের হাত ধরে

    দ্বিতীয় পর্বঃ অল্প গল্পে অলিম্পিক-২: সিনেমা যেখানে হার মানে


     

    ‘নেভার গিভ আপ’

    সিরিজটার প্রথম পর্বে বলেছিলাম- অলিম্পিকের সূত্রপাতের সাথে হারকিউলেসের নিবিড় সম্পর্ক আছে। প্রাচীন পৃথিবীর সে ঘটনাগুলোর কতটুকু সত্য আর কতটুকুই বা মিথ তা তো আর এ যুগে জানার উপায় নেই। আধুনিক পৃথিবীর মানুষ তবুও উদ্বেল হয়- রোমাঞ্চিত হয় হারকিউলেসের শহরে হারকিউলেসের গেমস ফিরে আসার জন্যে। ১৯৯২ বার্সেলোনা অলিম্পিক তাই এক অর্থে মেলবন্ধন – অলিম্পিক আর বার্সেলোনা দুটোর জন্ম যে একই হারকিউলেসের হাত ধরে।

    মিথলজি আর বাস্তবতার ফারাক আকাশ সমান- তবে অলিম্পিকের কিছু বাস্তব ঘটনা কখনো কখনো মিথকেও হার মানায়! ওই গেমসটা অনেক দিক থেকেই খেলোয়াড়ি চেতনার দুর্দান্ত উদাহরণ হয়ে আছে। বর্ণপ্রথার ঘৃণ্য চর্চায় ৩২ বছরের নিষেধাজ্ঞার পর ওই বছরেই দক্ষিণ আফ্রিকার অলিম্পিকে প্রত্যাবর্তন। ১০০০০ মিটার প্রমীলা দৌড়ে সোনাজয়ী ‘সাদা’ দক্ষিণ আফ্রিকান এলেনা মেয়ার আর রূপাজয়ী ‘কালো’ ডেরার্তু তুলুর হাতে হাত মিলিয়ে ‘ভিক্টরি ল্যাপ’ দেয়ার দৃশ্য অলিম্পিকের ফ্রেমে নিশ্চিতভাবেই চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। ৫৬ বছর পর অলিম্পিক আবার দেখল ‘এক’ জার্মানির অংশগ্রহণ - জার্মানির প্রতিটা সোনাজয়ের পর জার্মানদের উল্লাস আর জাতীয় সংগীত বাজার সময় আবেগের তোড় ছিল স্বাভাবিকভাবেই চোখে পড়ার মতো! আরেক ভাবেও অলিম্পিকের ঐ আসরটা ‘স্পেশাল’- ২২ বছরের মধ্যে সেটাই ছিল কোন দেশ কর্তৃক বয়কটহীন প্রথম অলিম্পিক!

    তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে বার্সেলোনা অলিম্পিক মনে থাকবে একজন টেকো মাথার বৃটিশ এথলেটের জন্য। তিনি অলিম্পিকে এসেছিলেন চ্যাম্পিয়ন হয়ে, এথলেটিক্সের আগের দুটি বিশ্ব আসরের ৪×১০০ রিলেতে দলগতভাবে সোনা জিতে। অলিম্পিকে তাঁর প্রথম সোনাজয়টা কেবল সময়ের ব্যাপার বলেই তখন মনে হচ্ছিল।

    রিলের আগে সেটা ছিল ব্যক্তিগত ইভেন্ট- ৪০০ মিটার দৌড়ের সেমিফাইনাল। তিনি দৌড় শুরু করলেন, প্রথম ১০০ মিটার এগিয়ে থাকলেন বাকি সবার চাইতে পরিষ্কার ব্যবধানে। অঘটনটা ঘটল তখনি- হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন, শুরু করলেন খোঁড়াতে। মুখের অভিব্যক্তিতেই বুঝা যাচ্ছিল প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগছিলেন তখন। হ্যামস্ট্রিং এর চোটের চাইতেও বেশি কষ্টের ছিল জিততে না পারার ব্যর্থতা। তিনি কাঁদলেন, এরপর ঐ খোঁড়াতে খোঁড়াতেই এগুতে লাগলেন ল্যাপ শেষ করতে। দর্শক সারি থেকে দৌড়ে এলেন একজন, নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে বাগবিতণ্ডা এড়িয়ে এগিয়ে দিলেন সহযোগিতার হাত। দর্শকের কাঁধে ভর দিয়ে আর চোখ মুছতে মুছতে দৌড় শেষ করলেন ঐ টেকো দৌড়বিদ।

    বৃটিশ এথলেট ডেরেক রেডমন্ড সোনা জিতেননি, কিন্তু জিতেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়। আর যে দর্শক দৌড়ে এসে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন রেডমন্ডেরই বাবা। প্রথমবার রেডমন্ড কেবল হ্যামস্ট্রিংয়ে টান খেয়েছিলেন, কিন্তু খুঁড়িয়ে দৌড় শেষ করার জন্যে তাঁর হ্যামস্ট্রিং একেবারেই ছিঁড়ে যায়! কেবল জয়ী হওয়াটাই যে বীরত্ব নয়, হাজার ব্যর্থতায় মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলার সাহসিকতাটাই যে মুখ্য- রেডমন্ড এই বার্তাই নতুন করে বার্সেলোনা অলিম্পিকে দিয়েছিলেন।

     

     

    অদ্ভুত ভয়

    ক্যাসিয়াস ক্লে-কে চিনেন? মাথা চুলকোচ্ছেন? মোহাম্মাদ আলী কে চিনেন? এবারও না চিনলে অবশ্য বলতে হবে আপনি বক্সিং দুনিয়ার কিছুই জানেন না। ধর্মান্তরিত হবার আগে মোহাম্মাদ আলীই ছিলেন ক্যাসিয়াস ক্লে!

    বক্সিং রিংয়ে প্রতিপক্ষকে ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলা ক্যাসিয়াসও কিন্তু প্রবল ভয় পেতেন। ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর এতটাই ভয় ছিল যে, ১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকেই তিনি অংশ নিতে চান নি! এর আগে জন্মস্থান কেন্টাকি ছেড়ে তিনি যত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন তার সবকটিতেই গিয়েছিলেন সড়কপথে; এমনকি কানাডা যেতেও তিনি বিমানের টিকেট কাটেননি। বিমানের বদ্ধ পরিবেশ নিয়ে তাঁর মধ্যে ছিল ব্যাপক আতঙ্ক!

    ১৯৬০ সালের অলিম্পিকগামী দলে তাঁর নাম যখন অন্তর্ভুক্ত হল, তখন তিনি প্রথমেই খোঁজ করেছিলেন জাহাজের টিকেটের এবং জাহাজ যাত্রা অসম্ভব দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন একেবারেই না যাবার। বক্সিং রিংয়ের অবিসংবাদিত সম্রাটের এই উটকো ভয় কাটাতে তাঁর কোচের পুরো এক সপ্তাহ লেগেছিল! যাত্রাপথে ক্যাসিয়াস এতটাই ভীত ছিলেন যে তিনি একবারও হেলান দিয়ে বসেন নি, পুরোটা সময় স্থির হয়ে সিটের হাতল ধরে বসে ছিলেন। বিমান ভয় পাওয়া সেই ক্যাসিয়াসই পরে হলেন অলিম্পিকের লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। বিশ্ববাসীর সামনে ‘লিজেন্ড’ মোহাম্মদ আলীর সেটাই ছিল প্রথম পথচলা।

     

     

    কে জানে, কোচ তাঁকে না বুঝালে ক্যাসিয়াস ক্লে শুধু কেন, মোহাম্মদ আলী নামটাই আজকে হয়তো আপনি চিনতেন না!

     

    ‘হিটলার’স গেমস’

    ১৯৩৬ অলিম্পিক গেমস আয়োজনের জন্য বার্লিন যখন নির্বাচিত হল তখনো হিটলাররের উত্থান ঘটে নি। কিন্তু ১৯৩৩ সালে নাৎসি বাহিনী ক্ষমতায় আসার পর দুনিয়া জুড়ে শুরু হওয়া তোলপাড় আর হিটলারের ‘ইহুদি হটাও’ অভিযানের মাঝে অলিম্পিকের ভ্রাতৃত্ববোধ কতটুকু কাজ করবে আইওসির সেটা নিয়ে প্রচণ্ড উদ্বেগ ছিল। ১৯৩৪ সালে হিটলার আশ্বাস দিলেন গেমসে ইহুদি অংশগ্রহণে বাধা নেই। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়ায় গেমস নিয়ে সব ধোঁয়াশাই মোটামুটি বিদায় নিল। যথা সময়েই শুরু হল ১৯৩৬ সামার অলিম্পিক গেমস।

    হিটলার ঐ অলিম্পিককে নিয়েছিলেন জার্মানির ‘সুপার পাওয়ার’ সত্তাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার পথ হিসেবে, নতুনত্বের চমক এজন্যেই ছিল অনেক বেশি। অলিম্পিক র‍্যালির সূত্রপাত ওই আসর থেকেই, সাথে ‘টেলিফুনেক’ এর সাহায্যে সরাসরি সম্প্রচারের যাত্রাও। তবে সব কিছু ছাপিয়ে ঐ অলিম্পিক অমর একজনের জন্যে- তিনি জেসি ওয়েন্স।

     

     

    আমেরিকান ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড এথলেট জেসি ঐ আসরে জিতেছিলেন চারটি সোনা- ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৪×১০০ মিটার রিলে এবং লং জাম্প। এক আসরে ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের চারটি সোনা জয়ের ঐ রেকর্ড আজ ৮০ বছর পরও অক্ষুণ্ণ আছে!

    ট্র্যাকের বাইরে ওয়েনের অলিম্পিক ইতিহাসটা কিন্তু মোটেও সুখকর ছিলনা। ছিলেন আফ্রিকান-আমেরিকান নিগ্রো, গেমস ভিলেজে পৌঁছাতেই তাই মুখোমুখি হলেন বর্ণবাদের। কাঁচি নিয়ে তাঁর উপর হামলা হল, গায়ের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হল। গেমস ভিলেজে বাধ্য হয়ে থাকতে পারেননি, বার্লিন অবস্থানের পুরো সময় তাঁকে থাকতে হয়েছে সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায়!

    ওয়েন এই অপমানের জবাব দিয়েছিলেন ট্র্যাকে। হিটলারের ‘নাৎসি প্রপাগান্ডা’ ব্যর্থ করেছিলেন জার্মান এথলেটদের বিশাল বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে। হিটলার সরাসরি অবশ্য তাঁকে অপমান করেন নি, তবে আড়ালে বর্ণবাদী মন্তব্য ঠিকই করেছিলেন। অলিম্পিকের ঐ পারফরম্যান্সের পর ওয়েন্স জার্মানিতে বেশ পরিচিতি পান। সাদাদের সাথে এক হোটেলে থাকলে কিংবা বাস-ট্রেনের একই কামরায় ভ্রমণ করলে জার্মানরা তাঁর ক্ষেত্রে কিছু মনে করতেন না।

     

     

    কিন্তু নিজ দেশেই তিনি ছিলেন ব্রাত্য। তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট অলিম্পিক থেকে ফিরে আসার পর বাকিসব সোনাজয়ীকে প্রশংসাসূচক টেলিগ্রাম পাঠালেও ওয়েন্সকে পাঠাননি! এমনকি হোয়াইট হাউজের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজেও তিনি আমন্ত্রণ পান নি! এক অদ্ভুত পৃথিবী তখন- ভ্রাতৃত্বের গেমসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এথলেট গায়ের রঙ এর জন্য জন্মভূমিতে পাচ্ছিলেন গঞ্জনা। আবার ইহুদি বিতাড়িত জার্মানিতে সেই এথলেটই পাচ্ছিলেন সর্বতঃ সম্মান! 

    ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকের সমাপ্তির সাথে সাথে ১২ বছরের জন্য অলিম্পিক চলে যায় হিমাগারে। ১৯৪৮ সালে লন্ডনে যখন পরবর্তী অলিম্পিকের পর্দা উঠল ততদিনে কেবল ইউরোপেই নিভে গেছে দশ কোটি প্রাণ! লণ্ডন তখন ফিনিক্স পাখির মত কেবল ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলছে। যুদ্ধের ফলাফলে পাল্টে গেছে অনেক পতাকার রঙ-ও। যতই খেলাধুলাকে ভ্রাতৃত্বের বলয়ে আটকে রাখা হোক, দিনশেষে রাজনীতির ছকই যে এই দুনিয়াতে সবথেকে বড় অলিম্পিকের এই ১২ বছরের 'যুদ্ধ নির্বাসন' ই সেটার প্রমাণ। 


    পরের পর্বঃ

    অল্প গল্পে অলিম্পিক -৪ঃ লজ্জা, আফসোস এবং অন্ধকারের গল্প


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন