• দলবদলের যত খবর
  • " />

     

    ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো, এন্ড্রিক: নেইমারকে হারানোর শোকে যেভাবে ব্রাজিল দখল করেছে মাদ্রিদ

    ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো, এন্ড্রিক: নেইমারকে হারানোর শোকে যেভাবে ব্রাজিল দখল করেছে মাদ্রিদ    

    ২০০৫ সাল। বাবাকে নিয়ে প্রথমবারের মতো মাদ্রিদে আসেন নেইমার। বয়স মাত্র ১৩ হলেও তখনই তার মধ্যে পেলের ছায়া দেখতে শুরু করেছে অনেকে। ব্রাজিলের নতুন বিস্ময়বালককে পেতে মরিয়া রিয়াল মাদ্রিদ সব ধরনের ব্যবস্থাই করে রেখেছিল। মাদ্রিদে এসে রিয়ালের একাডেমিতে অনুশীলন করেছেন নেইমার। দেখা করেছেন রোনালদো, জিদানের মতো তারকাদের সঙ্গে। রাতে ডিনার করেছেন রবিনহোর সঙ্গে। 

    নেইমার মাদ্রিদের একাডেমিতে যোগ দিচ্ছেন, তা একরকম পাকাপাকিই ছিল। তার পরিবারের জন্য বাসাও দেখে ফেলেছিল রিয়াল, নেইমার সিনিয়রকে খুঁজে দিয়েছিল চাকরি। 

    এরপর কী হয়েছে, তা হয়তো জানেন ভালোভাবেই। মাদ্রিদের সাদা জার্সি আর কখনোই গায়ে দেওয়া হয়নি নেইমারের। ২০১৪ সালে মাদ্রিদের কাটা ঘায়ে নুন দিয়ে এই ব্রাজিলিয়ান যোগ দেয় বার্সেলোনায়। 

    নেইমারকে সবার আগে শনাক্ত করেও তাকে দলে ভেড়াতে না পারা, উল্টো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হারানো, মাদ্রিদ বোর্ড ব্যাপারটা একেবারেই ভালোভাবে নেয়নি। বিশেষ করে ক্লাব প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনা পেরেজ। নেইমারের প্রথম মৌসুমে বার্সাকে ট্রেবল জিততে দেখে তিনি একরকম পণই করেন, পরবর্তী নেইমারকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না। শুরু হয় রিয়ালের পরবর্তী নেইমার খোঁজা। 

    পরবর্তী নেইমারের খোঁজে 

    মাদ্রিদের লক্ষ্য খুবই পরিষ্কার ছিল। ব্রাজিলে সামনে যত প্রডিজি ফরওয়ার্ড পাওয়া যাবে, সব দলে ভেড়াবে তারা। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় হোসে অ্যান্টনিয়ো কালাফাত ডি সৌজা নামের এক ব্যক্তিকে। হ্যাঁ, তার নাম হয়তো শুনেননি। আপনার দোষ নেই, তিনি এমনিতেও পরিচিত ‘অদৃশ্য মানব’ হিসেবে। লোকচক্ষু এড়িয়ে চলাই তার স্বভাব। বর্তমানে তিনি মাদ্রিদের প্রধান আন্তর্জাতিক স্কাউট। কিন্তু ক্লাবের ওয়েবসাইটেও তার নাম নেই। 

    পরিচিত মানুষদের কাছে তিনি ‘জুনি’ নামে পরিচিত। জুনি প্রথম জীবনে সাংবাদিক ছিলেন। ফুটবল নিয়ে এক স্প্যানিশ টিভি শোতে অ্যানালিস্টের দায়িত্ব পালন করতেন। ল্যাটিন ফুটবল নিয়ে তার জানাশোনা দেখে একসময় তাকে সেই অঞ্চলের স্কাউট করে পাঠায় রিয়াল মাদ্রিদ। তার স্কাউটিংয়ে মাদ্রিদের করা প্রথম সাইনিংদের একজন কাসেমিরো। পরবর্তীতে ফেদে ভালভার্দেও মাদ্রিদে এসেছেন তার কারণেই। দলের দুই ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার- ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো; এবং লোনে থাকা এন্ড্রিক ও রেইনার জেসুস, সবাই তার স্কাউটিং। 

    জুনির কার্যপদ্ধতি

    স্পেনের নাগরিক হলেও জুনি পর্তুগিজ ভাষাতে পাকা। কারণ শৈশবের একটা বড় সময় তিনি সাও পাওলোতে কাটিয়েছেন। এ কারণেই হয়তো ব্রাজিলীয় বাবা-মাদের মানসিকতাটাও বুঝতে পারেন ভালোভাবে। ল্যাটিন আমেরিকায় স্কাউটিংয়ে যেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 

    মাদ্রিদের সাবেক স্কাউট জেফ ভেটেরে যেমন বলেছেন, “স্কাউটিংয়ের বেলায় বিশ্বের যেকোনো মার্কেটেই খেলোয়াড়ের এজেন্ট ও বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলাটা জরুরী। ব্রাজিলের বেলায় এটা আরও বেশি সত্য। কারণ এখানকার ৯০ শতাংশ খেলোয়াড়ই গরীব, শ্রমজীবি শ্রেণি থেকে উঠে আসে। তাদের পুরো জীবন বদলে যাবে এরকম এক ডিলে।” 

    এত বড় এক ডিলের আগে খেলোয়াড়-সংশ্লিষ্ট সবার বিশ্বাস অর্জন করাটা জরুরী। যেটা করতে সময় প্রয়োজন। ভিনিসিয়াসকে ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে রিয়ালে ভেড়ানোর আগে খেলোয়াড় ও তার পরিবারের সঙ্গে ১৪ মাস কাটিয়েছেন জুনি। ফ্ল্যামেঙ্গোর তৎকালীন স্পোর্টিং ডিরেক্টর রদ্রিগো কাইতানো অ্যাথলেটিককে বলেন, “ভিনিসিয়াস ও তার পরিবারের উপর সে কতটুকু ব্যাকগ্রাউন্ড রিসার্চ করেছে, সেটা দেখেই আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ভিনির আশেপাশে কারা থাকে, তারা কী ভাবে, সব জানত সে। এই সম্পর্কের জন্যই পরে ভিনি তাদের প্রজেক্টে বিশ্বাস এনেছে। এবং রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” 

    রদ্রিগোর স্কাউটিংয়ে মোট চার বছর ব্যয় করেছেন জুনি। ২০১৪ সাল, যখন রদ্রিগোর বয়স মাত্র ১৩, তখন থেকেই তাকে ফলো করে এসেছেন জুনি। যখন দেখেছেন তার অগ্রগতি সন্তোষজনক, তখন তাকে মাদ্রিদের পুরো পরিকল্পনার কথা বলেছেন। চুক্তি কত বড় হবে, তা নিয়ে আলোচনা করেন না জুনি। তার দায়িত্ব খেলোয়াড়কে বুঝানো, কেন ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে তার জন্য মাদ্রিদই সবচেয়ে উপযুক্ত ক্লাব। একে বলতে পারেন, প্রজেক্টে বিশ্বাস আনানো। 

    কোনো কোনো খেলোয়াড়কে যেমন প্রথমে মাদ্রিদের রিজার্ভ দল, কাস্তিয়ায় রাখা হয় কিছু বছর, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। কাসেমিরো, ভিনিসিয়াস, রদ্রিগো কারোর অবশ্য কাস্তিয়ায় বেশি সময় কাটাতে হয়নি। তবে আরেক ব্রাজিলিয়ান রেইনার জেসুস সরাসরি মূল দলে জায়গা পাননি। ২০২০ সালে মাদ্রিদে আসার পর গত তিন বছর ধরে তিনি লোনে আছেন ডর্টমুন্ড, জিরোনা, ফ্রসিনোনের মতো ক্লাবে। 

    ফ্ল্যামেঙ্গোতে থাকাবস্থায় এই রেইনারের পিছনেও ছিল ম্যান সিটি, পিএসজির মতো ক্লাব। ভিনিসিয়াস, রদ্রিগোর দৌড়ে এই ক্লাবগুলোর পাশাপাশি ছিল বার্সেলোনাও। জুনির সর্বশেষ সাইনিং, এন্ড্রিকের দৌড়ে ছিল বার্সেলোনা, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, চেলসি, ম্যান সিটি, লিভারপুল, পিএসজি; বলতে গেলে ইউরোপের সব শীর্ষ ক্লাব। 

    ডাটা সাইন্সের এই যুগে যেকোনো ব্রাজিলিয়ান উঠতি প্রতিভার খবর পেয়ে যায় সব ক্লাবই। এছাড়া স্কাউটিং পর্যায়েও ইউরোপের সব বড় ক্লাবেরই উপস্থিতি আছে ব্রাজিল। কিন্তু এরপরও এই মার্কেটে মাদ্রিদই এখন সর্বেসর্বা। কারণ? রদ্রিগোর এজেন্ট, নিক আরকুরি খোলামেলাভাবেই স্বীকার করলেন,

    “সব বড় ক্লাবেরই ব্রাজিলে প্রতিনিধি আছে, কিন্তু সেখানে তফাৎটা তৈরি করে জুনি।” 

    এন্ড্রিকের বেলায় অন্যান্য ক্লাবের উপস্থিতি অনেক বেশি ছিল। কিন্তু এখানে তার কাজ সহজ হয়ে গেছে দুটি কারণে। প্রথমত, এন্ড্রিক ছোটবেলা থেকেই একজন মাদ্রিদ ভক্ত ছিলেন। ১১ বছর বয়সী এন্ড্রিকের একটি ভিডিও খুঁজে পাবেন ইউটিউবে, যেখানে তিনি বলছেন, মাদ্রিদে খেলা তার স্বপ্ন। বলতে পারেন, ঐতিহাসিকভাবে ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়দের প্রাধান্য দেওয়ার সুফল এখন হাতেকলমে পাচ্ছে মাদ্রিদ। দ্বিতীয় কারণটাও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এন্ড্রিক ও ভিনিসিয়াস দুজনের প্রতিনিধিত্ব করে একই এজেন্সি। যার কল্যাণে দলবদলের আগে এন্ড্রিকের সঙ্গে কথা বলেছেন ভিনিসিয়াস, পাঠিয়েছেন তার সাক্ষরিত একটি জার্সিও। 

    তবে অন্যান্য ক্লাবের চাপের মুখে এন্ড্রিকের দলবদলটা একটু আগেভাগেই করতে হয় মাদ্রিদের। ফিফার আইন অনুযায়ী, ১৮’র চেয়ে কম বয়সী কোনো অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড়কে সাইন করতে পারবে না কোনো ইউরোপীয় ক্লাব। ভিনি, রদ্রিগো, রেইনার সবার ক্ষেত্রেই তাই ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে মাদ্রিদকে। কিন্তু এন্ড্রিকের বেলায় ১৮ মাস আগেই তার ক্লাব পালমেইরাস ও তার পরিবারের সঙ্গে চুক্তি করে রাখে মাদ্রিদ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১৮ পূর্ণ হবে এন্ড্রিকের। সেই গ্রীষ্মেই তাকে দেখা যাবে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। 

    নেইমারকে না পাওয়ার দুঃখ যেভাবে মাদ্রিদের পুরো স্কাউটিং পদ্ধতিতেই বদলে দিয়েছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। আরেকজন নেইমার তৈরি করতে পারবে কি না তারা, তা সময়ই বদলে দিবে। কিন্তু ভিনিসিয়াস, রদ্রিগোর মতো তারকাদের সাফল্যের পর ব্রাজিলে যেই বিশ্বস্ততা তৈরি হয়েছে মাদ্রিদের, তা ধরে রাখলে সামনেও ব্রাজিলিয়ান প্রডিজির অভাব হবে না বার্নাব্যুতে।