• " />

     

    পেরেরার হারিয়ে যাওয়া পাঁচ মাস ও আইসিসির শুভকামনা

    কুশল পেরেরার ব্যাটিং দেখলে সবার আগে কী মনে হয়?

    হ্যাঁ, সনাথ জয়াসুরিয়া আবার খেলা শুরু করলেন কবে! ছোট ব্যাকলিফট, হাতে প্রচুর শক্তি, আর অবিরাম সেই ক্ষিপ্রতা! যেন মাতারা হারিকেন ফিরে এসেছেন আবার লঙ্কান জার্সি গায়ে। পার্থক্য দুজনের ‘বাড়তি দায়িত্ব’ পালনে। ‘আসল’ জন ছিলেন স্লো লেফট আর্মার, আর পরের জন উইকেটকিপার।

    কুমার সাঙ্গাকারার চোট সুযোগ করে দিয়েছিল ওয়ানডে দলে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ২০১২ সালের সে সিরিজে ছোট ইনিংসগুলিতেই চিনিয়েছিলেন জাত। টি-টোয়েন্টির অভিষেকটাও সে সফরেই। দেশে ফিরে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো করলেন ডাবল সেঞ্চুরি, তারপর খেললেন ২৭৫ বলে ৩৩৬ রানের ইনিংস! নির্বাচকরা তাঁকে বিবেচনার বাইরে রাখেন কিভাবে!

    ২০১৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে পেলেন প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির দেখা। পরের বছর জুলাইয়ে নিজের ‘আইডল’ জয়াসুরিয়ার পাশে বসে গেল পেরেরার নাম। পাল্লেকেল্লেতে পাকিস্তানের সঙ্গে ১৭ বলে করলেন ফিফটি, সনাথ টেরান জয়াসুরিয়ার শ্রীলঙ্কান রেকর্ডে ভাগ বসালেন মাথুরাগে ডন কুশল জানিথ পেরেরা!

    সব চলছিল ঠিকঠাকই। একটা ফোনকল পালটে দিল সব।

     

    দুইদিন পর ডুনেডিনে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম টেস্ট।

    কুশল পেরেরা ডিনার করছেন আপনমনেই। দিনটা ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখ।

    আইসিসির কলটা এলো তখনই। ই-মেইল দেখতে নির্দেশ দেয়া হলো। হোটেলে ফিরে পেরেরা তাই করলেন। জানতে পারলেন, ডোপ টেস্টে উত্তীর্ণ হতে না পারায় তাঁকে আপাৎকালীন সময়ের জন্য বহিস্কার করা হয়েছে। অক্টোবরে ঘরের মাটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে সিরিজের সময় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তারই ফল পেরেরার বহিস্কারাদেশ। প্রথমে অবশ্য বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজে সংগ্রহকৃত নমুনাতেই নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়ার কথা।

    পড়ে থাকলো ডুনেডিন টেস্ট, পড়ে থাকলো পেরেরার গ্লাভসের কাজ। শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসতে হলো তাঁকে, পরদিনই।

     

    যেন মুখ থুবড়ে পড়লো পেরেরার ভবিষ্যত!

     

    ফিরলেন। তবে মনোবলটা হারালেন না। আত্মবিশ্বাসটা যে একটু বেশিই ছিল পেরেরার! জেনেশুনে তো তিনি কোনো অপরাধ করেন নি। তবে শুধু আত্মবিশ্বাস দিয়ে কী আর কাজ হয়? আইসিসির রিপোর্ট তো বলছে ভিন্ন কথা!

    নিজ ম্যানেজার রভি ডি সিলভাকে সঙ্গে নিয়ে পেরেরা ছুটলেন। প্রথমে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ডিনাল ফিলিপসের কাছে। পরে কেমিক্যাল প্যাথলজিস্ট প্রিয়াঙ্কা দায়ানাথের কাছে। সব দেখেশুনে দায়ানাথ সাহসই দিলেন পেরেরাকে, আইসিসির দেয়া রিপোর্টে পেরেরার নমুনায় প্রাপ্ত ১৯-নোরানড্রোস্টেনেডাইওনের মাত্রাটা যে সীমিতই মনে হচ্ছিল তাঁর কাছে!

    পেরেরা নামলেন, লড়াইয়ে। সময় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি।

     

    এরপর দ্বিতীয় নমুনার পরীক্ষার আবেদন করেছিলেন পেরেরা। সেখানেও পাওয়া গেল নিষিদ্ধ উপাদান, প্রথম নমুনার মতোই। পেরেরাকে এবার থামতে বললেন কাছের মানুষজনরা। যা হয়েছে, মেনে নিয়ে আশা করতে বললেন, বহিস্কারাদেশ যেন কম সময়ের জন্য হয়! পেরেরা শুনলেন না।

    ‘আমি ভুলটা মেনে নিতে চাইনি। যদি কোনো ভুল করতাম, তবে মেনে নিতাম। চার বছর আমি কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই তো খেলেছিলাম’!

    এরই মাঝে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন থিলাংগা সুমাথিপালা। পেরেরার ম্যানেজার ডি সিলভার পুরোনো বন্ধু আবার তিনি। প্রেসিডেন্টের সরাসরি প্রশ্ন ছিল ডি সিলভার কাছে, ‘তুমি কি বিশ্বাস করো, পেরেরা নির্দোষ?’ পুরোনো বন্ধুর পেরেরার ওপর বিশ্বাস দেখেই সুমাথিপালা আশ্বাস দিয়েছিলেন, সব রকম সহযোগীতার।

    শুরু হলো বোর্ড-পেরেরার মিলিত ‘অভিযান’। প্রথমে আইসিসির ল্যাবে পাওয়া নিষিদ্ধ বস্তুর উপস্থিতির পূর্ণ রিপোর্ট চাওয়া হলো। এরপর আইসিসিকে চ্যালেঞ্জ করার পালা। নিয়োগ করা হলো যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এক আইন পরামর্শক ফার্মকে। মরগান স্পোর্টস ল’। সেই ফার্মের খরচ বহন করলো বোর্ড।

     

    দুই মাস পর।

    ডি সিলভার সঙ্গে পেরেরা উড়াল দিলেন ইংল্যান্ডে। উদ্দেশ্য ‘পলিগ্রাফ টেস্ট’ দেয়া। পলিগ্রাফ টেস্টের চলিত নাম ‘লাই ডিটেকটর’। মানে কেউ মিথ্যা বলছেন কিনা, তা প্রমান করার পরীক্ষা! পেরেরা এরপর দিলেন ‘হেয়ার অ্যানালাইসিস’, ‘ফরেনসিক টেস্ট’- এ যা ব্যবহার করা হয়। নমুনা নেয়া হলো ইংল্যান্ডে, সে নমুনা নিয়ে যাওয়া হলো ফ্রান্সে। সঙ্গে পরীক্ষা করা হলো তার মূত্রনমুনাও। ব্যয়বহুল সব পরীক্ষা। বোর্ডের সঙ্গে পেরেরার নিজস্ব সঞ্চয়ের অংশও খরচ হলো এতে। সব পরীক্ষাতেই একটা ফল পাওয়া গেল, পেরেরা ‘স্টেরয়েড’ এর কোন অপব্যবহার করেননি।

    আরও বিশেষজ্ঞের মতামত নিলেন পেরেরারা। তাঁরা বললেন, পেরেরার নমুনায় পাওয়া ১৯-নোরানড্রোস্টেনেডাইওনের মাত্রা কোনো খেলোয়াড়কে নিষিদ্ধ করার মতো যথেষ্ট নয়।

     

    সব ‘তথ্য-প্রমাণ’  নিয়ে এবার কাতারভিত্তিক আইসিসির ল্যাবের ফলকে চ্যালেঞ্জ করার পালা। এপ্রিল, ২০১৬। আইসিসি ‘নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ’ নিয়োগ দিল। তাঁরা মত দিলেন, ‘কাতারের পরীক্ষাগারে ১৯-নোরানড্রোস্টেনেডাইওনের উপস্থিতি ঠিকই পাওয়া গেছে। তবে তা ঠিক টেকসই নয়, কিছু বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক কারণে। এ আশঙ্কাও দূর করে দেয়া যায় না, ১৯-নোরানড্রোস্টেনেডাইওন প্রাকৃতিকভাবেই খেলোয়াড়ের শরীরে তৈরী হয়েছে। অথবা নমুনা নেওয়ার পর তাতে উৎপন্ন হয়েছে।’

     

    পেরেরার এবার মুক্তি পাওয়ার পালা।  

    আইসিসির পেরেরার 'মুক্তি ঘোষণা' করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন বললেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী, আইসিসি পরিচালিত পরীক্ষাগুলোর সাপেক্ষে এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে আমরা ওয়াডা(ওয়ার্ল্ড অ্যান্টিডোপিং অ্যাসোসিয়েশন) আর ল্যাব, দুইয়ের কাছ থেকেই ব্যাখ্যা চেয়েছি। কী ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন না ঘটে তার নিশ্চয়তা পাওয়া জন্য। ওয়াডার নিয়মের বাইরে আমরা আরও কী যুক্ত করতে পারি, সব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের স্বচ্ছন্দের জন্য, আমরা সেটাও দেখছি।’

    ‘যদি মিঃ পেরেরার লিগ্যাল টিমের নিরলস চেষ্টা আর রিপোর্ট করা তথ্যের ব্যাখার জানার জন্য আইসিসির নিজস্ব ইচ্ছা না থাকতো, তবে ফলটা ভিন্ন হতে পারতো। আর ডোপের বিরুদ্ধে আমরা যারা লড়াই করছি, সকলেরই এটি ভাবা উচিৎ। আমরা মিঃ পেরেরাকে যা সহ্য করতে হয়েছে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। পুরো সময়ে তিনি যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, এর প্রশংসাও করছি।’

    ‘আমরা এটাই পরিস্কার করে বলতে চাই, মিঃ পেরেরা কখনোই পারফরম্যান্স-বর্ধক বস্তু গ্রহণ করেননি। তাঁর ভবিষ্যত ক্রিকেটীয় উদ্যমের জন্য আমরা তাঁকে শুভ কামনা জানাই।’

     

    ফিরবেন স্বরুপে? 

     

    আইসিসি যখন পেরেরাকে শুভ কামনা জানাচ্ছে, ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে পাঁচ মাস। ভারতের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি সিরিজ, এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। শ্রীলঙ্কা যখন খেলেছে, কুশল পেরেরা তখন ছুটেছেন ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-দুবাই। নিজেকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণ করতে। ভালবাসার খেলাটায় নিজের অবস্থানটা ফিরিয়ে আনতে!

    মাঝে শ্রীলঙ্কা বোর্ড একবার বললো, আইসিসি তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে ‘মৌখিক’ স্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে আইসিসি অবশ্য পরে অস্বীকার করেছে তা।

    টাকা পয়সার ব্যাপারটা নাহয় আলাদা। আসবে-যাবে-আসবে। পেরেরা বলছেন, তাঁর 'মান-সম্মানেও তেমন কালিমা লাগেনি'। আর আত্মবিশ্বাস ছিল,মানসিক ঝড়টাও নাহয় সামাল দিয়েছেন।কিন্তু পেরেরার সেই পাঁচ মাস? আর পেরেরাহীন শ্রীলঙ্কা দলের ‘ক্ষতি’? টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে হেরে যাওয়া ম্যাচগুলোর ফল পেরেরা থাকলে ভিন্ন হতে পারতো, এমনও তো মনে করেন অনেকে!

     

    তবে পেরেরা এখন আবার ইংল্যান্ডে উড়াল দিচ্ছেন। পরীক্ষা এবার মাঠেই দিবেন। ধাম্মিকা প্রাসাদের চোটে টেস্ট দলেই ডাকা হয়েছে তাঁকে। কে জানে, দ্বিতীয় টেস্টেই মাঠে নামবেন কিনা। পেরেরাও নিশ্চয়ই ‘দ্বিতীয় জীবন’ এর ‘অভিষেকের’ অপেক্ষায়। কুমার সাঙ্গাকারাও অবশ্য এ সফরেই তাঁকে দলে দেখতে চেয়েছিলেন।

     

    আর পেরেরার ঘটনা নিয়ে মাহেলা জয়াবর্ধনের কথাটা ‘দার্শনিক’ মনে হতে পারে একটু। ‘অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগে কেউই অপরাধী নয়। প্রত্যেকেরই ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকা উচিৎ। চলুন এ থেকে শিক্ষা নেই।’

    আইসিসি কি শিক্ষা নিবে পেরেরার ঘটনা থেকে? 

    আইসিসি কী শিক্ষা নিবে পেরেরার ঘটনা থেকে?

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন