• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    কোন পথে মরিনহোর ইউনাইটেড?

    ১.

    আগস্ট ৭, ২০১৬। কমিউনিটি শিল্ড, ভেন্যু ওয়েম্বলি স্টেডিয়াম। ইউনাইটেডের হটসিটে মরিনহোর প্রথম ম্যাচ। লিগ চ্যাম্পিয়ন লেস্টার সিটিকে হারিয়ে শুরুটা শিরোপা দিয়েই করলেন ‘দ্যা স্পেশাল ওয়ান’। রেড ডেভিলদের হয়ে অভিষেকেই জয়সূচক গোল করলেন স্বঘোষিত ‘গড অফ ম্যানচেস্টার’ ইব্রাহিমোভিচ। মরিনহোর অধীনে সোনালী দিনগুলো ফিরে পাবার প্রত্যাশার পারদটা গেল আরেকটু উঁচুতে।

    ২.

    আগস্ট ৮, ২০১৬। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইউনাইটেডে ফিরে এলেন পগবা। বছর চারেক আগে মাত্র আট লাখ পাউন্ডে বিক্রি করা প্রডিজিকে ফেরত পেতে ইউনাইটেডের গুনতে হল ১০৫ মিলিয়ন পাউন্ড! বেলকে হটিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে দামী খেলোয়াড় বনে গেলেন পগবা। আগেই দলে ভেড়ানো হয়েছে বেইলি, মিখিতারিয়ান, ইব্রাকে। পগবা, ইব্রাদের নিয়ে লিগের প্রথম তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয়। মরিনহোর প্রথম মৌসুম ‘জুজু’ সত্বেও ততদিনে শিরোপা স্বপ্নে বিভোর ইউনাইটেড সমর্থকেরা।

     

    ৩.

    অক্টোবর ২৩, ২০১৬। চেলসি বনাম ইউনাইটেড। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে মরিনহোর প্রত্যাবর্তন, তবে ইউনাইটেডের ম্যানেজার হয়ে। ৪-০ গোলে অপদস্থ হয়ে লিগ টেবিলে সপ্তম স্থানে অবনমন। মাঝে টানা তিন হার, লিগে পরপর দুই ড্র। পুরো মৌসুমে বলার মত পারফরম্যান্স লেস্টারের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়। সব মিলিয়ে হতাশার চরমে ইউনাইটেডের সবাই। ময়েস, ভ্যান গাল দুঃস্বপ্নের পর মরিনহোর শুরুটাও এমন হবে, এমনটা ভাবেননি কেউই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী তো ভ্যান গালের চেয়েও খারাপ মরিনহোর ইউনাইটেড! উল্লেখ্য, ময়েস, ভ্যান গালের কিন্তু পগবা, ইব্রা ছিল না...

    দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সেনানী রুনির ঠিকানা বেঞ্চ। প্রথম পাঁচ ম্যাচের চারটিতেই গোল করা ইব্রাও নেই ফর্মে। মার্সিয়াল, বেইলি ইঞ্জুরিতে। পগবা যেন এখনো ইউরো ঘোরই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। শিষ্যদের অনুপ্রারিত করা, যা মরিনহোর মূল শক্তি, সেটাতেই ব্যর্থ হচ্ছেন এই পর্তুগীজ।

    এমন নয় যে দলের খেলোয়াড়েরা একেবারেই নতুন তাই মানিয়ে নিতে সময় লাগছে। এমনও নয় যে মরিনহোর কাছে লিগটা অচেনা। রুনিকে বসানোর ম্যাচেই  লেস্টারকে উড়িয়ে দেয় ইউনাইটেড। ম্যাচটির পর অনেকেই ভেবেছিলেন, সমস্যা শুধরে ফেলেছেন মরিনহো। কিন্তু পরবর্তী হারগুলো যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে; ম্যানচেস্টারের লাল শিবিরে সমস্যা একটি নয়, একাধিক।

     

    মরিনহো যখন দুর্বোধ্যঃ

     

     

    পোর্তো, চেলসি, ইন্টার, রিয়াল, আবারো চেলসি। যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই দলকে খেলাতে পেরেছেন। শুরুতে হয়তো সাফল্য আসেনি, তবে মরিনহোর দর্শনটা বোঝাই যাচ্ছিল। প্রিয় ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলাতে পারছেন ঠিকই, কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফলটাই পাচ্ছেন না। এরপরও এই ফরমেশন থেকে সরে আসতেই চাচ্ছেন না এই পর্তুগীজ। মরিনহোর দর্শন বুঝতে না পারা এবং তার ফরমেশনে মানিয়ে নিতে না পেরে এখনো নিজেদের ছায়া হয়ে আছেন অনেক তারকাই। উদাহরণ? মিখিতারিয়ান, পগবা।

    চেলসির হয়ে দু মৌসুম আগে লিগ জিতলেও মন ভরাতে পারেননি মরিনহো। দৃষ্টিনন্দন পাসিং ও ভিশন, চকিত কাউন্টার- সব ভুলে যেন যেকোনো ভাবে জয় ছিনিয়ে আনাতেই মনস্থির করেছিলেন ‘দ্যা স্পেশাল ওয়ান’। শিরোপা জিতলেও  জিততে পারেনি সমর্থকদের মন। ইউনাইটেডেও যেন একই কাজ করছেন মরিনহো। লেস্টারের বিপক্ষে জয় ছাড়া আর কোনো ম্যাচেই সন্তোষজনক পারফরম্যান্স নেই রেড ডেভিলদের। মন জয়ের চেয়ে কোনোমতে ম্যাচ জয়ের দিকেই বেশ মনোনিবেশ করছেন মরিনহো।

    সেরা একাদশঃ

    ইউনাইটেডে প্রায় মাস চারেক কাটিয়ে ফেললেও এখনো সেরা একাদশটাই জানেন না মরিনহো। মূল দলে জায়গা পাকা কেবল ডি গেয়া, বেইলি, পগবা, ইব্রার। অন্যান্য পজিশনে একাধিক গবেষণার পরও এখনো খুঁজে পাননি সেরা একাদশ। প্রতি সপ্তাহে ভিন্ন একাদশের কারণেই দেখা মিলছে না ইউনাইটেডের। খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব স্পষ্ট। পছন্দের পজিশনে না খেলানোয় পগবা, মাতা, র‍্যাশফোর্ডরা এখনো পূরণ করতে পারেননি সমর্থকদের প্রত্যাশা।

    ইব্রা, ফেলাইনি প্রীতিঃ

     

     

    মরিনহো, ইব্রা। ফুটবল ইতিহাসের দুই বর্ণময় চরিত্র মিলেছেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে। কিন্তু ইউনাইটেডের জন্য অবশ্য এখন তা এখন হিতে বিপরীত হয়েই দাঁড়িয়েছে। ইব্রা ফর্মে নেই, দলের বিল্ড-আপেও সাহায্য করতে পারছেন না। প্রথম কয়েক ম্যাচে গোল এলেও গত কয়েক ম্যাচে সহজ সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি। বয়স ৩৪ হয়েছে মাসখানেক আগে। আগের মত ধার, গতি কোনোটাই নেই ইব্রার। বার্নলির সঙ্গে ম্যাচেও সুযোগ পেয়ে কাজে লাগাতে পারেননি। সর্বশেষ  ছয় ম্যাচে গোল পাননি, এমন অভিজ্ঞতা সর্বশেষ হয়েছিল ২০০৭ সালে ইন্টার মিলানের হয়ে। 

    হেরেরা, শোয়েনস্টেইগার, ক্যারিক থাকলেও ফেলাইনিকেই খেলিয়ে যাচ্ছেন মরিনহো। মধ্যমাঠের দখল তো রাখতেই পারছেন না, উলটো বিপজ্জনক জায়গায় ফাউল করে প্রতিপক্ষকে সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করছেন। ফেলাইনিকে বসানোর দৃঢ় আবেদনেও সাড়া দিচ্ছেন না মরিনহো। এর ফলে কপাল পুড়ছে অ্যান্দার হেরেরার। সাবে নেমে পারফর্ম করা সত্বেও মূল একাদশে জায়গা পাচ্ছেন না এই স্প্যানিয়ার্ড।

     

    হতভাগা তিনঃ

     

     

    যত বড় খেলোয়াড়ই হোক না কেন, মরিনহোর ‘গুডবুকে’ না থাকলে বেঞ্চই হয় তার ঠিকানা। বেলেত্তি, পান্ডেভ, ক্যাসিয়াস, রামোস, পেপে, মাতা- নেহায়েত ছোট নয় হেন তারকাদের লিস্ট। এই লিস্টের সর্বশেষ সংযোজন ফুলব্যাক জুটি লুক শ এবং মাতেও দারমিয়ান। ওয়াটফোর্ডের সাথে হারের পর প্রকাশ্যে শ’কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন মরিনহো। শ ও কম যাননি, মিডিয়াতেই জবাব দিয়েছেন নিজ ম্যানেজারের। এরপর থেকেই মূল একাদশ থেকে ছিটকে গেছেন এই তরুণ। লেফটব্যাকে ব্লিন্দের ফর্মহীনতার পরও শ’কে নামাতে অপারগ জোসে।ইতালীয়ান মাতেও দারমিয়ানেরও কপালে জুটেছে একই ‘সাজা’। ইউনাইটেড ক্যারিয়ারটা অসাধারণভাবে শুরু করলেও এখন কালেভদ্রেও দেখা যায় না এই রাইটব্যাককে। ভ্যালেন্সিয়ার একাধিক বাজে পারফরম্যান্সের পরও ইকুয়েডর কাপ্তানেই আস্থাটা একটু বেশিই রাখছেন মরিনহো। বার্নলির সঙ্গে ম্যাচে অবশ্য শ-দারমিয়ানকে নামিয়েছেন, কিন্তু সামনে খেলাবেন তো? 

    ডর্টমুন্ড থেকে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা মিখিতারিয়ান ইঞ্জুরড না থাকার পরও তা খেলাচ্ছেন না মরিনহো। একাধিকবার এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেও এড়িয়ে গেছেন তিনি। মিখিতারিয়ান এখনো ইংলিশ লিগের জন্য প্রস্তুত নয় বলে ভ্রুকুটিটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। 

     

    শোয়াইনি যেখানে ব্রাত্যঃ

     

    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের শতকোর্ধ্ব ব্যাপ্তিকালে খেলা একমাত্র জার্মান খেলোয়াড় বাস্তিয়ান শোয়াইস্টাইগার। ভ্যান গালের অধীনে অভিষেকের পর থেকেই ইউনাইটেড সমর্থকদের অন্যতম প্রিয় খেলোয়াড় হয় ওঠেন বাস্তি। কিন্তু মরিনহো আসার পর থেকে শোয়াইন্সটাইগার যেন ‘পর’ কেউ! নামা তো দূরের কথা, প্রিয় শোয়াইনিকে স্কোয়াডেই জায়গা দিচ্ছেন না মরিনহো!

    ভুল জায়গায় পগবা, মাতা? 

    ইউনাইটেডে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত নিজের ছায়া হয়েই আছেন পগবা। জুভেন্টাসের সেই দুর্ধর্ষ মিল্ডফিল্ডার ইউনাইটেডে এখনো নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। অবশ্য পগবার ফর্মহীনতার কারণ অনেকাংশেই মরিনহো। পছন্দের ‘নাম্বার টেন’ রোল থেকে সরিয়ে পগবাকে খেলাচ্ছেন ফেলাইনির পাশে, মধ্যমাঠ দখলে রাখতে। এর ফলে পগবাকে মাঠে কিছুটা ‘খাঁচাবন্দী বাঘ’ এর মতই মনে হয়। রুনিকে বসিয়ে ইব্রার পেছনে খেলাচ্ছেন হেরেরাকে, যেখানে এই স্প্যানিয়ার্ডের পছন্দের পজিশন মধ্যমাঠ। চেলসির সঙ্গে অবশ্য পগবাকে সামনেই খেলিয়েছেন, কিন্তু নিজেকে হারিয়েই খুঁজেছেন ফ্রেঞ্চ মিডফিল্ডার।

    শুধু এই দু’জন নন, মাতা ও ইউনাইটেডের নতুন মধ্যমণি র‍্যাশফোর্ডকেও খেলতে হচ্ছে অন্য পজিশনে। মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভিশন। কিন্তু গতিহীন মাতাকে কিনা মরিনহো খেলাচ্ছেন উইঙ্গে! অবশ্য মাতাকে ইব্রার পেছনেও খেলিয়েছেন এই পর্তুগীজ; তাও সেই হাতেগোনা কয়েকবারই। পুরোস্তুর ‘নাম্বার নাইন’ র‍্যাশফোর্ড এই মৌসুমে ইউনাইটেডের সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও ইব্রার কারণে খেলতে হচ্ছে উইঙ্গে। মাতা, পগবা, হেরেরা, র‍্যাশফোর্ড- ইউনাইটেডের একাধিক তারকা খেলোয়াড়কে ছন্দের ভিন্ন পজিশনে খেলিয়ে তাদের সেরাটা আদায়ে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন খোদ মরিনহোই।

    চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদে খুব সম্ভবত ব্যতিক্রম হচ্ছে না এই মৌসুমেও। কিন্তু ট্রফি শূন্য গেলেও দলের সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই দেখতে চান সমর্থকেরা। কিন্তু এখনও ইউনাইটেডকে যেখানে নিজের দর্শনটাই বোঝাতে পারেননি মরিনহো, সেখানে প্রত্যাশা পূরণ তো হ্যালির ধূমকেতু। ইউনাইটেড কিংবদন্তী পল স্কোলস তো বলেই দিয়েছেন, এই দলটা ময়েস, ভ্যান গালের হলে এতদিনে তাদের মুণ্ডুপাত করতো সমর্থকেরাই। ঘুরে দাঁড়ানোটা অবশ্য মরিনহোর চেয়ে ভাল খুব কম ম্যানেজারই করে দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় মৌসুমে সর্বদা সফল এই পর্তুগীজের ওপর থেকে তাই এখনই হয়তো বিশ্বাস হারাচ্ছে না ইউনাইটেড ভক্তরা।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন