• বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া
  • " />

     

    ক্রিকেটার বনাম ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

    আজ হবে কাল হবে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া আর ক্রিকেটারদের সমস্যা মেটেনি এখনও। ঘনীভূত হয়েছে বরং। ১ জুলাই থেকে প্রায় ২৩০ অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার কার্যত ‘বেকার’ হয়ে পড়েছেন। সমস্যার শুরু, ভিত্তি, ভবিষ্যত আলোচনা করে হয়েছে এখানে। 
     
    কে কী চান? 

     

    প্রায় দুই যুগ ধরেই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা টাকা পান আয় ভাগাভাগির মাধ্যমে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মোট আয়ের একটা নির্দিষ্ট ভাগ পান তারা, সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী তা ২৬ শতাংশ। এই ভাগটা আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রায় সব শীর্ষ ক্রিকেটাররাই পেয়ে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের তাই নির্দিষ্ট কোনো বার্ষিক বেতন নেই। 
     

    ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার আয় বেশি হলে ক্রিকেটাররা বেশি পাবেন, কম হলে পাবেন কম। ক্রিকেটারদের আয় তাই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বা সিএর সাফল্য-ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে। বিপত্তিটা এই মডেল নিয়েই। ক্রিকেটাররা চান, এই মডেল থাকুক। ২০ বছর ধরে যদি এই পদ্ধতিতে কাজ চলে, তাহলে এটা ভেঙে নতুন কিছু করার কী দরকার! 
     

    তবে সিএ এই পদ্ধতি বদলাতে চায়। তারা মনে করেন, ক্রিকেটের সম্প্রসারণে এটা তাদেরকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেয় না। তৃণমূল ক্রিকেটে তারা বেশি বিনিয়োগ করতে চান। আর সে কারণেই শীর্ষ ক্রিকেটারদের তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন দিতে চান। যাতে ক্রিকেট-পিরামিডের নিচের দিকে বেশি ব্যয় করা যায়। 
     

     

    ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রস্তাব 
     

    সিএর বিশ্বাস, ঘরোয়া ক্রিকেটাররা যেহেতু তাদের আয়ে আন্তর্জাতিক তারকাদের মতো কোনো  অবদান রাখে না, সেহেতু আয় ভাগাভাগিতেও তাদের অন্তর্ভুক্তির কোনো মানে নেই। সিএর তাই প্রস্তাব, শুধুমাত্র শীর্ষ ২০ ক্রিকেটারকে আয় ভাগাভাগিতে রাখা হবে। বাকি ক্রিকেটাররা একটা নির্দিষ্ট বার্ষিক বেতন পাবেন। 
     

    মার্চ মাসে সিএর দেয়া প্রস্তাবে ছিলঃ 
    উদ্বৃত্ত আয় থেকে ২০ মিলিয়ন ডলারের একটা পুল করা হবে(উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত শব্দটা গুরুত্বপূর্ণ), যা শীর্ষ ২০ ক্রিকেটারকে ভাগ করে দেয়া হবে। ১৬ মিলিয়ন ছেলেদের জন্য, ৪ মিলিয়ন মেয়েদের জন্য। 
    ২০১৭-২০২২ সালের মধ্যে মোট আয় ৩১১ মিলিয়ন থেকে ৪১৯ মিলিয়ন হয়ে যাবে। ফলে ছেলে ক্রিকেটারদের গড় আয় ১ লাখ ৯৯ হাজার থেকে বেড়ে হবে ২ লাখ ৩৫ হাজার ডলার। আর মেয়েদের আয় ৭৯ হাজার থেকে বেড়ে হবে ১ লাখ ৭৯ হাজার ডলার। রাজ্য ক্রিকেটাররা আগে পেতেন ২২ হাজার ডলার, এখন পাবেন ৫২ হাজার ডলার। রাজ্য ক্রিকেটে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা ম্যাচ ফি রাখারও প্রস্তাব রাখা হয়। তবে তাদের ঘন্টায় আয় হবে একই। 

     

    তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের সংগঠন এসিএ এই প্রস্তাব নাকচ করেছে তখনই। তাদের মূল দাবিই সেই আয় ভাগাভাগি মডেলেই থাকা। জুনের শেষে এসে সিএ লভ্যাংশ ভাগাভাগির নতুন মডেল দেয়। সেখানে সব রাজ্য ক্রিকেটারকেই পে-রোলের মাঝে রাখা হয়, ঘরোয়া ছেলে ক্রিকেটারদের বেতন বাড়িয়ে দেয়ার কথাও বলে। তবে এসিএ এই প্রস্তাবও নাকচ করে দেয়। 
     

     

    ক্রিকেটারদের আপত্তি কোথায়? 
     

    সিএর প্রস্তাবে ক্রিকেটারদের দিতে চাওয়া অঙ্কটা নেহায়েত কম নয়। নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকে অঙ্কটা বরং বেশিই। ক্রিকেটারদের তাহলে আপত্তিটা আসলে কোথায়? 
    সিএ সামনের বছর নতুন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করবে। বিগ ব্যাশের তুমুল জনপ্রিয়তা এই স্বত্বের অঙ্কটা বাড়িয়ে দেবে অনেক। যদি এ থেকে সিএ লাভবান হয়, ক্রিকেটাররা সেটারও ভাগ চান। আর সিএর প্রস্তাবনা সেই লাভের অংশ থেকে ক্রিকেটারদের বাদ দেয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মনে করেন তারা। 

     

    এসিএর অখুশি হওয়ার একটা বড় কারণ, সিএর সঙ্গে এই জুটি থেকে তাদের বাদ দেয়া। তাদের মতে, আগের চুক্তি ‘ক্রিকেটারদের সকল উঠানামায় সঙ্গী করতো, মিডিয়া স্বত্ব থেকে শুরু করে সবকিছুতেই।’ 
     

    ‘অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ভূমিকাকে এখানে অসম্মান করা হয়েছে। ক্রিকেট থেকে আয়ের স্বত্ব থেকেও মহিলা ক্রিকেটারদের বঞ্চিত করা হয়েছে।’ এসিএর বক্তব্য এটাই। 
    শুধু তাই নয়, রাজ্য ক্রিকেটারদের বেতন পাঁচ বছরে ১৮ শতাংশ বৃদ্ধিতেই থেমে যাবে। এসিএর আপত্তির একটা কারণ এখানেও। সমস্যা অবশ্য আরও আছে। 
    ক্রিকেটারদের বার্তাটা তাদের হয়ে বলেছিলেন অজি সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার। যেসব ক্রিকেটার ঘরোয়াতেই ক্যারিয়ার শেষ করবেন, রাজ্য ক্রিকেটেও থাকেন যাওয়া-আসার মধ্যে, সিএ তাদেরকে হিসাব থেকেই বাদ দিতে চায়! 

     

    শীর্ষ ক্রিকেটাররা বরাবরই বলে এসেছে, তারা ঐক্যবদ্ধই থাকবেন। তারা মনে করেন, আয় ভাগাভাগির পদ্ধতিটা সব ক্রিকেটারদেরই ভাল করে। কিন্তু সিএর প্রস্তাবনা শুধু শীর্ষ ক্রিকেটারদের ঘিরেই। 
    এসিএ এরপর নতুন একটা প্রস্তাব দিয়েছিল সিএকে। সেখানে বলা হয়েছিলেন, ৫৫ শতাংশ লভ্যাংশ পাবে সিএ, ২২.৫ শতাংশ পাবে তৃণমূল ক্রিকেট, ২২.৫ শতাংশ পাবে ছেলে ও মেয়ে ক্রিকেটাররা। সিএ এই প্রস্তাব মানেনি। 

     

    সমস্যাটা আসলে অল্প কথায় বললে সহজই। ক্রিকেটারদের দাবি, আগের মডেলের যতো কাছাকাছি একটা মডেলে যাওয়া যায়। আর সিএ করবে না সেটাই। 
     

     

    খাদের কিনার থেকে একত্রে ঝাঁপ 
     

    গত মঙ্গলবার এসিএ স্বীকার করে নিয়েছে, ৩০ জুন মধ্যরাতের ডেডলাইনে শেষ হওয়া সমস্যা সমাধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন তারা। ‘আমরা খাদের কিনার থেকে একসঙ্গে ঝাঁপ দিচ্ছি। সিএ এবং এসিএ এখনও অনেক দূর-দূরান্তে অবস্থান করছে। চুক্তির ভিত্তিগুলো সমাধানের কাছাকাছিও নেই আমরা।’ 
     

    ওদিকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাই পারফরম্যান্স ম্যানেজার প্যাট হাওয়ার্ড গত বুধবারে সব রাজ্য ও এসিএকে উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে চিঠি পাঠিয়েছেন। যদি ৩০ জুনের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক না হয়, তাহলে যেসব ক্রিকেটারদের চুক্তির মেয়ার পার হয়ে যাবে, তারা বেকার হয়ে যাবেন। 
     

    ‘যদি ৩০ জুন আপনার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তবে আপনি সিএ, রাজ্য সংস্থা বা বিগব্যাশ অথবা মহিলা বিগব্যাশের দলের অধীনে আর থাকবেন না। এর অর্থ হলো, আপনার আর খেলা, অনুশীলন, মিডিয়ার সামনে পারফর্ম করার প্রয়োজন নেই। নতুন সমঝোতা স্মারক না হওয়া পর্যন্ত তাই আপনাকে বেতন দেয়া হবে না। আপনি আমাদের কাছে লিখলেই নতুন চুক্তিপত্র হবে।’ 
    হাওয়ার্ড এক্ষেত্রে আইসিসির নিয়মের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। ‘আইসিসি স্বীকৃত যে কোনো ক্রিকেটে আপনি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার অনুমতি ছাড়া খেলতে পারবেন না। আর যারা অস্বীকৃত কোনো ম্যাচ(যেমন প্রদর্শনী ম্যাচ) খেললে এরপর থেকে কমপক্ষে ছয় মাসের জন্য আইসিসিস স্বীকৃত ক্রিকেট থেকে আপনাকে বহিষ্কার করা হবে।’ 

     

    বিদেশী লিগে খেলার অনাপত্তিপত্র ‘কেস-বাই-কেস’, মানে আলাদা আলাদা করে আলোচনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে ক্রিকেটাররা সিএ বা রাজ্য সংস্থার সুযোগ সুবিধা পাবেন অনুশীলনের জন্য। 
     

     

    এরপর কী? 
     
    সামনের আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে আসার কথা। সেই সফরও তাই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সামনের অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্মে অ্যাশেজ হওয়ার কথা। ডেভিড ওয়ার্নার বলেছেন, সে সিরিজও নাও হতে পারে! ভবিষ্যত তাই ধোঁয়াশা এখনও। 

     

    অস্ট্রেলিয়া এ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফর রয়েছে। সংবাদ বলছে, সিএ দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটারদের কথা ভাবছে। উসমান খাওয়াজা বা গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা এ সফর বয়কট করতে পারেন। তবে অ্যাশটন অ্যাগার বা হিলটন কার্টরাইটের মতো ক্রিকেটারদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়নি তাদেরকে এ সফরে যেতেই হবে। 
     

    টি-টোয়েন্টি বিপ্লবের অর্থ হলো, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খেলে ক্রিকেটাররা আয় করতে পারেন। যদি ক্রিকেটাররা বেকার হয়ে পড়েন অস্ট্রেলিয়াতে, তবে তারা ভারত, ইংল্যান্ড বা ক্যারিবীয়তে হওয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের দিকে ঝুঁকতে পারেন। 
     

    তবে উপরে উল্লেখিত প্যাট হাওয়ার্ডের চিঠি অনুযায়ী, এসব টুর্নামেন্টে খেলতে হলেও সিএর অনুমোদন লাগবে। 
     

     

    ভবিষ্যত? 
     

    ৩০ জুনের মধ্যে চুক্তিপত্রে সই না করলে ক্রিকেটাররা বেকার হয়ে যাবেন, এই চিঠি দেয়া ছাড়া সিএর প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ডকে দর কষাকষিতে তেমন দেখা যায়নি। বরং সিএর প্রধান আলোচনাকারি কেগিন রবার্টসকে দায়িত্ব দিয়েছেন। 
     

    সাবেক অজি অলরাউন্ডার শেন ওয়াটসন সাদারল্যান্ডকেই এগিয়ে আসতে বলছেন। তিনি এসবে অভিজ্ঞ বলেই মনে করেন ওয়াটসন। 
    আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া বলছে, ডেডলাইন পার হয়ে যাওয়ার পরও সমঝোতা স্মারক না হওয়ায় ক্রিকেটারদের যে টাকা দেয়ার কথা, তা তৃণমূলে ব্যয় করা হবে। 

     

    এসিএর প্রধান নির্বাহী অ্যালিস্টার নিকোলসন বলেছেন, ক্রিকেটারদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে জরুরি মিটিং ডাকা হয়েছে। স্টিভ স্মিথের মতো যারা অস্ট্রেলিয়াতে নেই, তারা ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেবেন। 
     
    আর যেসব ক্রিকেটার আর্থিক সঙ্কটে ভুগবেন, তাদের জন্য তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর আবেদন প্রক্রিয়া চালু হওয়ার কথা রবিবারে। 
     
    তথ্যসূত্রঃ 
    হেরাল্ড সান, ফক্সস্পোর্টস 

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন