• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    আক্ষেপ নিয়েই যাচ্ছেন, রুনি?

    প্রিয় ওয়েইন রুনি, 


    ম্যানচেস্টারের পাট চুকিয়ে লিভারপুলের জন্য নিশ্চয় বাক্সপ্যাটরা গুছিয়ে ফেলেছেন। সেই লিভারপুল, যে শহর জানে আপনার প্রথম সবকিছু। ১৩ বছর আগে কৈশোরের সারল্য মেখে এসেছিলেন জন্মশহর থেকে। তখন কি ভেবেছিলেন, একদিন এই ওল্ড ট্রাফোর্ড থেকে মহীরূহ হয়ে যাবেন? কিন্তু বিদায়বেলায় কি একটু চাপা ক্ষোভ আছে আপনার? মাত্র ৩১ বছর বয়সেই একরকম অপাংক্তেয় হয়ে চলে যেতে হচ্ছে-ব্যাপারটা কি আপনি খুব সহজভাবে নিতে পেরেছেন? 


    আজ থেকে ১১ বছর আগে হলেও হয়তো ক্ষোভটা চেপে রাখতেন না। রুনি মানেই তখন আগ্নেয়গিরির যে কোনো মুহূর্তে ফুঁসে ওঠা, হুটহাট মেজাজ হারিয়ে ফেলা। বিশ্বকাপে আরেকটু হলেই হাতাহাতি হয়ে যাচ্ছিল সে সময়ের সতীর্থ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে, লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার ওই স্মৃতি অনেক দিন তাড়া করে বেড়ানোর কথা। ব্যাডবয় তকমাটা নামের সঙ্গে প্রায় জুটে যাচ্ছিলই। 'ওয়াজ্জা' ডাক নামের মতো ইংল্যান্ডের পূর্বসূরি পল গ্যাসকোয়েন 'গাজ্জার' ছায়া যেন পিছুই ছাড়ছিল না আপনার। সেই 'মাথাগরম' ছেলেটা কয়েক বছরের মধ্যেই দুই কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব নেবে, সেটাও কি কেউ ভেবেছিল? 


    অনেক কিছুই তো হয়েছে, কেউ ভাবেনি আগে। আপনার অভিষেকের কথাই ধরুন। অ্যালেক্স ফার্গুসন যখন আপনার জন্য বোর্ডের কাছে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ড চাইলেন, ভুরুটা কুঁচকে ফেলেছিলেন অনেকে। এই 'পুঁচকে' ছেলের জন্য এত টাকা! ফার্গুসন বলেছিলেন, গত ৩০ বছরে এই ছেলে আমার দেখা সবচেয়ে সেরা ইংলিশ তরুণ। স্যার অ্যালেক্সের কথা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার সাহস হয়তো ছিল না অনেকের, তবে সংশয়বাদীদের পাল্লাই বেশি ভারি থাকার কথা। যা বলার, ফেনারবাচের সঙ্গে অভিষেকেই সব বলে দিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগ অভিষেকেই হ্যাটট্রিক, জানিয়ে দিলেন ইউনাইটেডের নতুন তারা এসে গেছে। 'ওভার দ্য মুন, হেয়ার কামস দ্য রুন'- ওল্ড ট্রাফোর্ডে সেদিন ব্যানারটা টিভি ক্যামেরায় দেখিয়েছিল অনেকক্ষণ। আপনি কি তখন জানতেন, এই ক্লাবকেই এভাবে জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়ে ফেলবেন?


    বলতে পারেন, এই যুগে এসে এরকম দিব্যি দেওয়া সত্যিই কঠিন। টাকা ছড়ালে যেখানে দেদার সাফল্য মেলে, সবুজ মাঠ পেট্রোডলারের কেনা ঘাসে মোড়া, একটা ক্লাবকে হৃদয় উজাড় করে দেওয়াটা একটু বেশিই নাটুকেপনা হয়তো হয়ে যায়। আপনিও মানুষ, ওল্ড ট্রাফোর্ড ছাড়ার ব্যাপারে তাই দু'বার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন। ২০১০ সালে হঠাৎ করে বলে বসলেন, ইউনাইটেড শিরোপার জন্য যথেষ্ট লড়াই করতে পারছে না। স্যার অ্যালেক্সও স্বীকার করলেন, রুনি আর থাকতে চাইছে না। আপনার ছাড়াটা যখন সময়ের ব্যাপার, পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি করলেন নতুন করে। 


    তিন বছর পর আবারও গুঞ্জন উঠল, আপনি আর ওল্ড ট্রাফোর্ডে থাকছেন না। এবার গন্তব্য নাকি চেলসি, কথাও প্রায় পাকাপাকি। শেষ পর্যন্ত থেকে গেলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডেই। পেশাদার দুনিয়ায় অর্থই শেষ কথা, চাইলেই তো আপনি ওই সময় নিজের ব্যাঙ্কব্যালান্স বাড়িয়ে নিতে পারতেন অনেক বেশি। কিন্তু যে কারণে থেকে গিয়েছিলেন, এখন কি সেটার জন্য কোনো আফসোস হয়? 


    আক্ষেপ আর অতৃপ্তির সঙ্গে হতাশা থাকাও কি আছে একটু? সেই ২০০৪ সাল থেকেই তো যখনই ফর্মের তুঙ্গে, অদৃশ্য একটা শক্তি যেন সব সময়ই বাধ সেঁধে বসেছে বেরসিকের মতো। ওই বছর ইউরোটা মনে হচ্ছিল আপনারই। চার ম্যাচে চার গোলের পর চোট ছিটকে দিল টুর্নামেন্ট থেকে। ইউনাইটেডের হয়ে নাম লেখালেন, প্রথম দুই বছর দারুণও করলেন। এরপর একজন রোনালদোর ছায়া যেন ম্লান করে দিল আপনাকে। চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার ওই মৌসুমে রোনালদো যদি হন অর্জুন, আপনি তাহলে তাঁর রথের সারথী কৃষ্ণ। ২০০৯ সালে রোনালদো চলে গেলেন, আপনার ওপর আরও দায়িত্ব। চোটজর্জর হয়েও ওই মৌসুমে ৩৪ গোল করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলকে আর জেতাতে পারলেন না বড় কিছু। পরের বছর ক্লাব লিগ জিতল, কিন্তু আগের মৌসুমের সেই রুনিকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ক্লাবের হয়ে সবকিছু জিতেও তাই আপনার মনে একটু খচখচানি থাকলে দোষ দেওয়া যাবে না। 


    একটু কি অভিমানও মিশে আছে আপনার? ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই খেলেছেন স্ট্রাইকার হিসেবে, তবে নিজের আগে সব সময় দলকেই বড় করে দেখেছেন। রোনালদো-তেভেজের সঙ্গে ত্রিফলায় নিজের ভূমিকাও একটু বদলে ফেলেছিলেন, সেটাও দলের স্বার্থেই। এই দুজনের বিদায়ের পর ফিরে গেছেন নিজের পুরনো পজিশনে। কিন্তু বয়স ৩০ পেরুনোর আগেই দলের জন্য নিচে নামতে হয়েছে, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার থেকে এমনকি খেলতে হয়েছে মধ্যমাঠের মাঝেও। স্যার অ্যালেক্সের পর ময়েস বা ফন গাল বা হালের মরিনহোর অধীনে থিতু হতে পারেননি, সেই দোষ কি আপনার? দলের জন্য এই ত্যাগের কি স্বীকৃতি সত্যিই পেয়েছেন? 


    অথচ লাল জার্সি গায়ে এমন অনেক কিছুই করেছেন, যা কেউ করেনি আগে। ইউনাইটেডের হয়ে ববি চার্লটনের রেকর্ডটা তো প্রায় অমর হয়েই গিয়েছিল। সেই রেকর্ড আপনার পায়ে লুটিয়েছে, গ্যালারি থেকে অভিবাদন জানিয়েছেন স্বয়ং স্যার ববি। গোলের পাশাপাশি গোল করিয়েছেন, প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে ১০০-র বেশি গোল করার ও করানোর কীর্তি আপনি ছাড়া শুধু গিগস আর ল্যাম্পার্ডেরই আছে। রেকর্ড না হয় বাদ গেল, এসব তো কিছু সংখ্যাই। কিন্তু নিউক্যাসলের সঙ্গে ওই ভলির কথা কি ভোলা যায়? বা ম্যান সিটির সঙ্গে ওই ওভারহেড কিক, স্যার অ্যালেক্স যেটিকে বলেছিলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডে তাঁর দেখা সেরা গোল। যে গোলের বর্ণনায় ধারাভাষ্যকার মার্টিন টেইলার আক্ষরিক অর্থেই ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু ইউনাইটেডের সর্বকালের সেরাদের তালিকা যখন করা হয়, বেস্ট, চার্লটন, ল বা ক্যান্টনা, গিগস, স্কোলসদের সঙ্গেও সেভাবে আপনার নাম আসে না কেন? নিজেকে ওই উচ্চতায় নেওয়ার জন্য আর কী করতে পারতেন আপনি?


    অনেকেই বলতে পারে, একটু আগেই হয়তো ফুরিয়ে গেছেন। বয়স এখনও ৩১, বেশি বয়সের রোনালদো এখনও গোল করে যাচ্ছেন অমানুষীয় সামর্থ্যে। কিন্তু ফুলের গন্ধটা শুরু থেকে যত বেশি তীব্র, তা হয়তো ঝরেও পড়ে একটু আগে। পৃথিবীটা ঠিকঠাক চিনে ওঠার আগেই কাঁধের ওপর চেপেছে দায়িত্বের বোঝা, ২০ পেরুনোর আগেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্লাবগুলোর একটিতে হয়ে গেছেন প্রথম পছন্দের স্ট্রাইকার। টানা খেলে গেছেন ওই সময়, ইংলিশ মৌসুমের ধকলটা পুরোদমে নিয়েছেন নিজের ওপর। আপনি মানুষ, সেটা কয়জন মনে রেখেছে? চাওয়ার বেলায় কেউ অবশ্য কার্পণ্য করেনি। 


    আপনি হয়তো এখন এসবের কিছুই মনে রাখতে চাইবেন না। ওল্ড ট্রাফোর্ডের হলি ট্রিনিট্রির মতো আপনার মূর্তি হয়তো ঠাঁই পাবে না। কিন্তু তাতে কি আপনার আদৌ কিছু যায় আসে? কেউ মানুক আর না মানুক, স্বীকৃতি আসুক বা না আসুক, মহীরুহ হয়েই ফিরে যাচ্ছেন আপনি। স্মৃতিটুকুর জন্য একটা ধন্যবাদ আপনার পাওনাই, ওয়াজ্জা।

     
    ইতি
    আপনার একজন ক্ষুদ্র ভক্ত

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন