• " />

     

    দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!

     

    গল্পগুলো হতাশার-কষ্টের-অপমানের-দীর্ঘশ্বাসের। ক্রমাগত মাঠের খেলায় হেরে যাওয়া টেস্ট ক্রিকেটের শিশুটির প্রতি বিমাতাসুলভ ছিল খোদ আইসিসি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিপক্ষের খেলোয়াড়দেরও। সেই সময়ের দগদগে স্মৃতিগুলোর মাঝেই হয়তো আলাদা করে কিছু দিন মোটা হরফে লেখা হয়ে যায় সময়ের পাতায়। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের দুঃস্বপ্নে হানা দেয় সেইদিন গুলো। তবুও শোনা যাক সেই সব দিনের গল্প। 

     

    গল্প ১

     

    গল্পের শুরু ক্রিকেট বরপুত্র ব্রায়ান লারাকে দিয়েই শুরু। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের সাথে ওয়ানডে খেলতে নেমে তিনি নিজের জায়গা বদলিয়ে ওপেনিংয়ে আসেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি মঞ্জুর করা ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই ফেরত যান। জনশ্রুতি আছে লারা আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরার পথে নাকি বেশ দুয়োধ্বনি শুনেছিলেন। সেটার বদলা পুরোপুরি ফিরিয়ে দেন তিনি পরের দিন ব্যাটিংয়ে নেমে। লারার সেই ইনিংসটি যারা দেখেছেন তারা জানেন লারার সেই ইনিংটির প্রতিটি শটেই বাংলাদেশের উপর তার বিরক্তির ঝাল ঝরছিল। লারার ইনিংসে অবশ্য অক্রিকেটীয় তেমন কোন ব্যাপার ছিলো না। তবে সুমনের প্রথম বলেই আউট হলেও তার হাড় পুরো জুড়ায়নি সেটা বুঝা যায় বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ের সময়। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আট উইকেট পড়ে যাওয়ার পরে বোলিংয়ে এসে শেষ দুইটি উইকেট তুলে নিয়ে তবেই থেমেছিলেন তিনি। লারার ক্যারিয়ারে এই উইকেট ছাড়াও আরও দুইটি উইকেট আছে। তবে ঐ সময়ের আগে পরে কখনোই ক্রিকেট জিনিয়াসকে বল হাতে দেখা যায় নি। এবং বোলিংয়ে উইকেট নেবার পরে তার অভিব্যাক্তিতে যে তাচ্ছিল্য ছিল তাও ভালোভাবেই বিঁধেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের বুকে।

     

    "বোলার" লারার ৪টি ওয়ান ডে উইকেটের দু'টি বাংলাদেশের বিপক্ষে

     

    গল্প ২

     

    লারার তাচ্ছিল্য যদি ক্রিকেটীয় হয়, পাকিস্তান দলের তাচ্ছিল্য ছিলো কিছুটা অক্রিকেটীয়। ১৯৯৯ এর বিশ্বকাপের আগে এশীয় টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপের ফাইনাল খেলতে পাকিস্তান ঢাকায় এসেছিল। সেসময়ই বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে একটি ম্যাচ খেলতে দেয়া হয়। সেই খেলায় তখনকার পেস স্টার শোয়েব আখতারকে আল শাহরিয়ার রোকন স্ট্রেইট ড্রাইভ করে চার মারেন। অবশ্য পরের বলেই তার স্লোয়ারে রোকন বোল্ড হয়ে যান। আর মজা হলো সেটাই হয়ে থাকে শোয়েবের শেষ ওভার (ইনিংসের অষ্টম ওভার)। তার সাথে নতুন বল নেয়া ওয়াসিম আকরাম তার আগেই ম্যাচে তার নিজের শেষ ওভার (তিন ওভার) করে ফেলেছেন। সাকলাইন কিছু ওভার করলেন বটে। তারপরে আসলো চললো পুরো ইনিংস জুড়ে বাংলাদেশকে অপমান করবার পালা। ইজাজ আহমেদ,ওয়াজাতউল্লাহ ওয়াস্তি এমনকি সাঈদ আনোয়ার পর্যন্ত বল করে চললেন। সেইদিন পাকিস্তানের কিপার বাদে একজনই বল করবার সুযোগ পান নি। তিনি ছিলেন ইনজামাম উল হক। পুরো সময় ধরে ওদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিলো পাড়ার ক্রিকেটের মত, "যা ব্যাটারা জোরে বল করলে তো তোরা খেলতে পারিস না, আস্তে বল করা বোলার দেই খ্যাল"। সেসময়ের সকল বাংলাদেশী ক্রিকেট সমর্থকদের জন্যই এটা দগদগে স্মৃতি। সেদিনকার নন টেস্ট খেলুড়ে বাংলাদেশের সামর্থ্য ছিলো না সেই অপমানের জবাব দেবার। বরং ওয়াস্তি আনোয়ার আর ইজাজদের উইকেট দিয়ে বাংলাদেশ ওদের আকর্ণ বিস্তৃত হাসিকে বড় করবারই সুযোগ দিয়েছিলো।

     

    ইজাজ আহমেদ, সাইদ আনোয়ার, ওয়াজহাতুল্লাহ ওয়াস্তি - বাংলাদেশের বিপক্ষে

    উইকেট আছে এদের তিনজনেরই

     

    গল্প ৩

     

    আগের গল্পটি দুঃসহ স্মৃতি ছিলো বাংলাদেশি ক্রিকেটপ্রেমীদের। তবে সেটা একটু একটু করে মলিন হতে শুরু করেছিলো মাত্র টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরে। সেই সময়ে এদিকে সেদিকে বলার মত কিছু পারফরম্যান্স থাকলেো দল হিসাবে গড়ে উঠে নি বাংলাদেশ। এমন  সময়ই ২০০১/০২ এ বাংলাদেশ সফলে আসে পাকিস্তান। এবং সেই দুঃসহ স্মৃতিকে ফেরত আনবার জন্য ওয়াকার প্রথম ওয়ানডেকেই বেছে নেন। আগেরবার বাংলাদেশকে অপমান করার সুযোগ না পাওয়া ইনজামাম এর সুযোগ মিলে এবার। ২০২ চেজে নেমে বাংলাদেশের পরাজয় নিশ্চিত হওয়া ম্যাচে ইনজির বল করবার সুযোগ মিলে শেষ ওভারে। ইনজি শেষ ওভার করে উইকেটও নিয়েছিলেন। সেই সাথে বাংলাদেশের সাথে খেলাকে ফান ক্রিকেট হিসাবে পুরো জায়গা দান করেছিলেন এমনও বলা যায়।

     

    ইনজামামের বোলিং

     

    গল্প ৪

     

    আগের গল্পগুলোর দগদগে ক্ষত পুরো দলের গায়ে লাগলেও মাঠের ঝাপটা বয়ে গেছে ক্রিজে থাকা ব্যাটসম্যানদের ওপর। তবে এবারের ঘটনা একেবারে মাঠের এগারোজনের ওপরেই। এশীয় টেস্ট চ্যাম্পীয়নশীপের নামে তিনজাতি টেস্ট প্রতিযোগ হয়েছিলো টেস্ট ক্রিকেটের শিশু বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান শ্রীলংকাকে নিয়ে। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ভারত অংশ না নেয়াতেই প্রতিযোগিতার মোড়ক দিতেই বাংলাদেশকে নেয়া। এবং সেই স্মৃতি বাংলাদেশ দ্রুতই ভুলে যেতে চাইবে। বাংলাদেশি নির্বিষ বোলিংয়ের সুযোগ নিয়ে একের পর এক ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করে গেছেন। সেঞ্চুরি করেই নিজেকে রিটায়ার্ড আউট ঘোষণা করে অভিনব কায়দায় বাংলাদেশকে অপমানিত করেছিলেন ব্যাটসম্যানরা। পাকিস্তানের ইনজামাম নিজের ফিটনেসের ধোঁয়া তুলে রিটায়ার্ড হার্ট ঘোষণা করতে পারলেও চরম ফিট শ্রীলংকার খেলোয়াড়দের সেই সুযোগ ছিলো না। তাই তো তারা রিটায়ার্ড আউট হলেন। যার মানে হলো 'অনেক ব্যাট করলাম, এইবার পরের ব্যাটসম্যান ব্যাট করুক'। আত্তাপাত্তু আর জয়াবর্ধনের সেই অভিনব কায়দায় ইচ্ছমৃত্যু নেয়া ক্রিকেট মাঠে আর দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সেই দগদগে অপমানের জবাব দেয়া না গেলেও সেই টেস্টেই আমাদের ১৮ বছরের এক কিশোর ওদের মুরালি-ভাসদের ঠেঙিয়ে জানান দিয়েছিলো দিন আমাদেরও আসবে।

     

    টেস্ট ইতিহাসের প্রথম দুইজন "রিটায়ার্ড আউট" ব্যাটসম্যান, আত্তাপাতু এবং জয়াবর্ধনে

     

    গল্প ৫

     

    বাংলাদেশের ক্রিকেট আসলে দুই থেকে চার বছর পিছিয়ে গেছে ২০০৩ এর মুলতানে। দুই আগে হাসাহাসির পাত্র দলটার হাতেই পাকিস্তান নিজেদের মাঠে চারদিনে হেরে যেতে বসেছিল। হ্যাঁ, এইখানে যদি কিন্তু আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্ত তোলা একটু বাতুলতাই বটে। তারপরেও কি আমরা জিততাম না? ইতিহাসে একটা খারাপ দিক হলো সে খুব দ্রুতই নিজের উপর ধূলো জমায় আর শুধুই বিজয়ীর নামই লিখে রাখে। আজকে ১২ বছর পরে যে কেউ মুলতানের টেস্টের স্কোরের দিকে তাকালে দেখতে পাবে পাকিস্তান ম্যাচটি জিতেছে ইনজামাম এর অসাধারণ শতকে। কিন্তু লেখা থাকবে না আরও অনেক গল্পই। তাই চোরা লতিফ আর সৎ রফিকের গল্পটা আমরা আবার শুনি।

     

    দিনের খেলা শেষ হবার কয়েক ওভার আগে বাউন্সারের আহত হন অলোক কাপালি। রিটায়ার্ড হার্ট হিসাবে তিনি ফেরত যান। পরেরদিন খালেদ মাহমুদ আউট হয়ে গেলে তিনি আবার নামেন আরেক বীরত্ব গাঁথা লিখতেই। সেই সময়েই তাকে থামিয়ে দেন লতিফ। স্কোর কার্ডে হয়তো লেখা থাকবে লতিফের ক্যাচে আউট হয়েছেন অলক, কিন্তু রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেছে লতিফের হাতে যাবার আগে বল মাটি ছুঁয়ে যায়। অন্য অনেক সিদ্ধান্তই আম্পায়ারের উপর থাকলেও কীপার ক্যাচ ধরেছেন কিনা এটা একজন খেলোয়াড়ের সততা আর খেলার স্পিরিটের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। উল্লেখ্য পরবর্তীতে একই কাজ করবার জেরাইন্ট জোনস ও দিনেশ রামদিন জরিমানা সহ ম্যাচ ব্যানের শাস্তিও গুনেছেন।

     

    রশিদ লতিফের "চোট্টামি"

     

    এই ম্যাচেই শেষ ইনিংসে পঞ্চাশ রান দূরে থাকতে পাকিস্তানের আট উইকেট পড়ে গেছে। বাংলাদেশের জয়টা ছিলো মোটামুটি সময়ের ব্যাপার। সেই সময়েই গুলকে নিয়ে ইনজামাম ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। এমনি সময় রফিক বল করবার সময় নন স্ট্রাইক প্রান্তে গুল বেরিয়ে যান মাঝ পিচ বরাবর। ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী রফিক গুলকে আউট করতে পারতেন। কিন্তু রফিক চাননি পেছনের দরজা দিয়ে জিততে। তাই তিনি মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে গুলকে ডেকে আনেন।

     

    গল্পটা এখানেই শেষ। এই চমৎকার স্পোর্টসম্যানশিপের গল্প কি আমরা কোথাও দেখেছি, মুলতান টেস্ট নিয়ে কথা বলবার সময়? ইনজামাম অসাধারণ খেলেছিলেন সত্যি, কিন্তু বাংলাদেশ কি জেতেনি এই অসাধারণ স্পোর্টসম্যানশিপ দিয়ে?

     

    অতঃপর

     

    সাফল্যের সুবাতাসে ভাসছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। বাংলাদেশের এই জয় কেবল ষোল কোটি বাঙালির জয়ই নয় বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নিয়ে ক্রমাগত তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে যাওয়া নিন্দুকদের মুখে চপেটাঘাতও। সেই সব দিনগুলোকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে এসেছি। সময় এসেছে সেই অবজ্ঞার জবাব দেয়ার। কারণ ইতিহাস শুধু বিজয়ীদেরই যে মনে রাখে।

     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন