• ফ্রেঞ্চ ওপেন
  • " />

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের আদ্যোপান্ত

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের আদ্যোপান্ত    

    বছর ঘুরে আবার শুরু হতে যাচ্ছে ফ্রেঞ্চ ওপেন- ক্লে কোর্টের বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদার টুর্নামেন্ট। বছরের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টের ঠিক আগে আগে চলুন শুনে আসি এর ভেতরের গল্পগুলো।



    ইতিহাসঃ

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের শুরু আজকে থেকে প্রায় সোয়াশো বছর আগে। ১৮৯১ সালে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের নাম দীর্ঘদিন ছিল ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়নশিপস- শুধুমাত্র ফরাসি ক্লাবের সদস্যদের সুযোগ ছিল এই টুর্নামেন্টে খেলার। মজার ব্যাপার, ফরাসিদের একচেটিয়া এই টুর্নামেন্টের প্রথম চ্যাম্পিয়ন কিন্তু একজন ব্রিটিশ ভদ্রলোক- এইচ ব্রিগস- ফ্রান্সে বসবাসের সুবাদে যার ফরাসি ক্লাবের সদস্যপদ প্রাপ্তি এবং প্রথম ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়নশীপ জয়ের সম্মানলাভ। প্রথম নারী চ্যাম্পিয়ন পেতে ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়নশীপকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও ৬ বছর- ১৮৯৭ সালে নারীদের জন্য আয়োজিত টুর্নামেন্ট জিতে নেন ফ্রান্সের আদিন মাসন।

     

    ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট হিসেবেই চলে আসছিল এই টুর্নামেন্ট। ১৯২৫ সালে এসে সারা বিশ্বের সব এমেচার টেনিস খেলোয়াড়দের জন্য দুয়ার খুলে দেয়া হল- টুর্নামেন্টের নাম বদলে হল দি ফ্রেঞ্চ ইন্টারন্যাশনালস। প্রথম ইন্টারন্যাশনালে অবশ্য বিদেশিদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল না- ফ্রান্সের রেনে লাকোস্তে চ্যাম্পিয়ন হলেন (ভদ্রলোকের বিখ্যাত ছিলেন "দি ক্রোকোডাইল” হিসেবে- আজকে বাজারে ক্রোকোডাইল ব্র্যান্ডের যেসব কাপড় পাওয়া যায়, সেগুলোর আসল ব্র্যান্ড নেম কিন্তু লাকোস্তে)। এর তিন বছর পর, ১৯২৮ সালে- ফ্রেঞ্চ ইন্টারন্যাশনালস নিজের একটা স্থায়ী আবাস পেল- প্যারিসের তিন হেক্টর জায়গায় গড়ে ওঠা স্তাদে দি রোলাঁ গারোঁতে। সেই থেকে এই টুর্নামেন্টের অপোশাকী নামও হয়ে গেল  রোলাঁ-গারোঁ। উল্লেখ্য, রোলাঁ-গারোঁ ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত এক ফ্রেঞ্চ বৈমানিক। 

     

    রেনে লাকোস্তে


    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা তাদের দাপট ধরে রেখেছিলেন বেশ ভালমতই- কিন্তু ১৯৪০-৪৫ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের জন্য স্থগিত থাকাতে সব হিসাব উলটে পালটে গেল। ১৯৪৬ সালে সেই যে ফরাসী মার্সেল বার্নার্ড জিতলেন, তারপরে জিতলেন ইয়ানিক নোয়া; ১৯৮৩-তে এসে। মেয়েদের এককেও ফরাসিদের সাফল্য তলানিতে ঠেকল- মাত্র তিনজন চ্যাম্পিয়নকে পেল ফ্রান্স, যাদের সর্বশেষ মেরি পিয়ার্স, ২০০০ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ টুর্নামেন্টের আয়োজনের সময়কালেও প্রভাব ফেলেছিল- ১৯৪৬ আর ৪৭ এই দু’বছর ফ্রেঞ্চ ইন্টারন্যাশনালস হয়েছিল উইম্বলডনের পরে- বছরের তৃতীয় চ্যাম্পিয়নশীপ হিসেবে।

     

    শুরুর সময় থেকে চার গ্র্যান্ড স্ল্যামেই খেলার অধিকার ছিল শুধু অপেশাদার খেলোয়াড়দের- ১৯৬৮ সালে এসে ফ্রান্সের হাত ধরেই এই ধারা ভাঙ্গল। ফ্রেঞ্চ ইন্টারন্যাশনালস হয়ে গেল ''ফ্রেঞ্চ ওপেন'' আর অপেশাদার খেলোয়াড়দের আধিপত্যও শেষ হয়ে গেল গ্র্যান্ড স্ল্যামে। খেলার ধরণ বদলালেও ফ্রেঞ্চ ওপেনের আসল বৈশিষ্ট্য কিন্তু বদলাল না- ট্রেডমার্ক লাল মাটির কোর্ট ওপেন যুগেও সগৌরবে বিদ্যমান থাকল। 

     

    স্ত্যাঁদে রোঁলা গাঁরো 

     

    রোলাঁ-গারোঁর বিশেষত্বঃ

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব এর আইকনিক লাল মাটির কোর্ট- আদর করে অনেকে যেটাকে লাল দূর্গ বলে ডাকেন। রোলাঁ-গারোঁই একমাত্র গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্ট যেখানে মাটির কোর্টে খেলা হয়। ইটের গুঁড়ো আর পোড়ামাটির বানানো এই কোর্টগুলো ধীরগতির, কিন্তু বল একটু বেশি লাফায় এসবে। এজন্যই বেজলাইন ধরে দ্রুত ছুটতে পারা খেলোয়াড়রা এই কোর্টে নিয়মিত সাফল্য পেয়ে আসছেন শুরু থেকেই।

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য তার ভিন্ন ধরণের শেষ সেট। সাধারণ সেটে ৬-৬ গেমে পৌঁছে গেলে টাইব্রেকার গেম খেলা হলেও শেষ সেটে টাইব্রেকার দেয়া হয় না এখানে- বরং যতক্ষণ পর্যন্ত দুই গেমের ব্যবধান না হচ্ছে, খেলা চলতেই থাকে। এজন্যই টেনিস ইতিহাসের সবচেয়ে লম্বা খেলাগুলোর বেশ কয়েকটা এই ফ্রেঞ্চ ওপেনেরই উপহার।

     

    এই দুই বৈশিষ্ট্যই ফ্রেঞ্চ ওপেন চ্যাম্পিয়নদের আলাদা জায়গা দিয়েছে টেনিসের ইতিহাসে। শারীরিকভাবে শক্তিশালী, দ্রুতগামী এবং শক্তিশালী টপ স্পিনের ওপর ভরসা করা খেলোয়াড়রা এই কোর্ট থেকে অনেক বেশি সহায়তা পান- এতটাই যে, এই টুর্নামেন্টের অনেক চ্যাম্পিয়ন অন্য কোথাও গিয়ে কখনও সুবিধা করতে পারেন নি। একইভাবে, গ্রাস কোর্ট আর হার্ড কোর্ট দাপিয়ে বেড়ানো অনেক খেলোয়াড়কে ফ্রেঞ্চ ওপেন খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বছরের পর বছর।

     

                                                                                      বিয়ন বোর্গ

     

     

    পুরস্কার আর প্রাইজমানিঃ

     

    অন্যান্য সব গ্র্যান্ড স্ল্যামের মতই ফ্রেঞ্চ ওপেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় টুর্নামেন্ট হল পুরুষ এবং নারী একক- এই দুটোর পাশাপাশি পুরুষ দ্বৈত, নারী দ্বৈত এবং মিশ্র দ্বৈতও চলে মূল টুর্নামেন্টের অংশ হিসেবে। ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত নারী চ্যাম্পিয়নরা পুরুষদের চেয়ে কম প্রাইজমানি পেতেন- তাদের সর্বোচ্চ তিন সেটের ম্যাচ খেলতে হয় এই অজুহাতে। অবশেষে ২০০৭ থেকে দু’পক্ষকেই সমান প্রাইজমানি দেয়ার চল শুরু হয় (অন্য অনেক কিছুতে অগ্রগামী ফ্রেঞ্চ ওপেন এই উদ্যোগে ছিল সবচেয়ে পেছনের গ্র্যান্ড স্ল্যাম)। বর্তমানে একজন ফ্রেঞ্চ ওপেন এককজয়ী খেলোয়াড় পান সাড়ে ষোল লক্ষ ইউরো, আর দ্বৈত বিজয়ীদের পকেটে আসে চার লক্ষ ইউরো।

     

    বিজয়ীদের ট্রফি আর প্রাইজমানি ছাড়াও বিশেষ কয়েকটি পুরস্কার দেয়ার চল চলে আসছে ১৯৮১ থেকে- সেরা খেলোয়াড়োচিত আচরণের পুরস্কার প্রি অরাঞ্জে, দৃঢ় মনোবলের জন্য প্রি সিত্রো, আর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় পান প্রি বুর্জোয়া পুরস্কার।

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের মহারথীরাঃ

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেনের প্রথম সত্যিকার তারকা ধরা হয় সুইডিশ কিংবদন্তী বিয়ন বোর্গকে- যিনি ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১’র মধ্যে ছয়বার জিতে নিয়েছিলেন ফ্রেঞ্চ ওপেনের শিরোপা, যার মধ্যে ছিল ’৭৮ থেকে ’৮১ পর্যন্ত টানা চারটি শিরোপা। সাতবারের চ্যাম্পিয়ন ক্রিস এভার্ট, ছ’বারের চ্যাম্পিয়ন স্টেফি গ্রাফ কিংবা চারবারের চ্যাম্পিয়ন জাস্টিন হেনিনকেও দুহাত ভরে দিয়েছে ফ্রেঞ্চ ওপেন। তবে ফ্রেঞ্চ ওপেনের সত্যিকারের বরপুত্র হলেন একজন স্প্যানিশ- 'কিং অফ ক্লে' রাফায়েল নাদাল। ২০০৫ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি ওপেনের নয়টিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন “মাটির রাজা”।

     

                                                                                       রাফায়েল নাদাল

     

    সাফল্যের গল্পগুলোর উল্টোপিঠে ফ্রেঞ্চ ওপেন করুণ রাগিনী বাজিয়েছে অনেক কিংবদন্তীর জন্য। অন্য সব মাঠ জয় করে এসে ফ্রেঞ্চ ওপেনে ধাক্কা খেয়ে ফিরেছেন এমন টেনিস গ্রেট একেবারে কম নেই ইতিহাসে। পিট সাম্প্রাস, জন ম্যাকেনরো, জিমি কনর্স, মার্টিনা হিঙ্গিস, স্টেফান এডবার্গ, ভেনাস উইলিয়ামসদের বছরের পর বছর হতাশ করেছে প্যারিস। টেনিসের সর্বকালের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়, ১৭ গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক সুইস মায়েস্ত্রো রজার ফেদেরার মাত্র একবার ছুঁয়ে দেখতে পেরেছেন চ্যাম্পিয়নের ট্রফিটা- বর্তমান এক নম্বর নোভাক জোকোভিচের সেই সৌভাগ্য হয় নি এখনও।

     

                                                                                ক্রিস এভার্ট

     

     

                                                                *****

     

    আগামী রবিবার, ২৪ মে, পর্দা উঠতে যাচ্ছে ২০১৫ ফ্রেঞ্চ ওপেনের। টেনিসপ্রেমীদের আগ্রহের নিশ্চিতভাবেই কোন কমতি নেই এবারের টুর্নামেন্ট নিয়ে- দশ বছর পর যে সত্যি সত্যি আবার “ওপেন” হবার সম্ভাবনা নিয়ে আসছে শতাব্দী-প্রাচীন এই প্রতিযোগিতাটি! রাফায়েল নাদাল কি পারবেন তার মাটির দুর্গের দখল রাখতে? নাকি গত দু’বছরে টেনিস দুনিয়া দাপিয়ে বেড়ানো জোকোভিচ হাতে তুলে নেবেন দু’বার ফাইনালে উঠেও ছুঁতে না পারা পরম আরাধ্য সেই ট্রফিটাকে? ফেড এক্সপ্রেস কি পারবেন ২০০৯’র পুনরাবৃত্তি করতে? মারিয়া শারাপোভা কি পারবেন শিরোপা ধরে রাখতে? নাকি সেরেনা উইলিয়ামস ফিরিয়ে আনবেন ২০১৩’র স্মৃতি? উত্তরগুলো নাহয় তোলা থাক জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহের জন্যই। 

       

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন