• রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮
  • " />

     

    বিশ্বকাপের বিকল্প আরেক বিশ্বকাপ

    বিশ্বকাপের বিকল্প আরেক বিশ্বকাপ    

    উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের ত্রিভুজাকৃতির একটা ছোট পার্ক। চারপাশ ঘিরে বাচ্চাদের খেলার মাঠ, রেল-লাইন, উঁচু দালানের সারি। একদল শৌখিন ফুটবলারদের অনুশীলন চলছে সেখানে। 

    জেটল্যাগ আর শহুরে পরিবেশে আচ্ছন্ন তারা। জুতার ফিতে বেঁধে দৌড় শুরু, গা-গরম। স্পিকারে বাজছে তাদের মাতৃভূমিকে নিয়ে গান। টুভালু, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এক দেশ। ইংল্যান্ডে তারা এসেছে বিশ্বকাপ জিততে। ফিফা বিশ্বকাপ নয়। দ্য কনিফা ফুটবল বিশ্বকাপ।

    ২০১৩ সালে এ টুর্নামেন্ট চালু হয়েছিল। কার্যত দেশ হয়তো স্বাধীনতা নেই, স্বঘোষিত স্বাধীন অঞ্চল, সংখ্যালঘু, “খেলাধুলার দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলসমূহ” খেলে এখানে। টুভালু, তিব্বত, পাদানিয়া, মাতাবেলেল্যান্ড, আবখাজিয়া, এমনকি আইল অব ম্যানের মতো দেশগুলোকে কাছে টেনেছে কনিফা। প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গল্প আছে, তবে সবাইকে একসুতোয় গেঁথেছে আসলে ফিফার একটা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দেশগুলোকে যে চোখেই দেখে না ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা। 

    “টুভালু বিশ্বের চতুর্থ ক্ষুদ্রতম দেশ। অস্ট্রেলিয়া ও হাওয়াই এর মাঝে, সমুদ্রের ওপর কিছু দ্বীপ”, ব্যাখ্যা করছেন সোসিয়ালা টিনিলাউ, টুভালু ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট, “আমরা স্বাধীন দেশ, তবে ফিফার টুর্নামেন্টে আমাদের অংশগ্রহণের যোগ্যতা নেই, আমরা তাদের মানদন্ডগুলো পূরণ করতে পারি না বলে। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা কতো, হোটেল নেই- এসব ব্যাপার। মাঠের খেলায় আমরা পিছিয়ে, আমার তা মনে হয় না!” 

    নিজদেশে টুভালু অনুশীলন করে নীচু ঘাসের মাঠে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়লে, জোয়ার এলেই যেসব ভেসে যায়। “পিচ ভেসে গেলেও আমরা অনুশীলন করি, হয়তো বিমানবন্দরের রানওয়ে ব্যবহার করি”, অধিনায়ক টাউফাভিয়া লোনাটানার গলায় প্রত্যয়। বিশ্বকাপে এসে অবশ্য কৃত্রিম পিচের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে তাদের, যা কখনও চোখেও দেখেননি তারা। 

    কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা


    আমি আমারই

    কনিফার অন্তর্ভুক্ত মোট ৪৭টি দল। এ বছর তৃতীয় আসরে চূড়ান্ত পর্বে এসেছে ১৬টি। ফিফার অধীনে আছে ২১১ সদস্য, বিশ্বকাপ খেলছে ৩২টি দল। ফিফার সঙ্গে কনিফার চুক্তি বা সংযোগ ধরনের কিছু নেই, তবে কনিফাকে ফিফা শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবার। 

    আন ইয়ং-হাক ইউনাইটেড কোরিয়ানস ইন জাপানের ফুটবলার কাম ম্যানেজার। ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার হয়ে। এখন খেলছেন শৌখিন ফুটবলারদের সঙ্গে। তবে নিজের জাতিসত্তার পরিচয়ে খেলতে পেরেই এখন গর্বিত ইয়ং-হাক। বিংশ শতাব্দির শুরুতে জাপানি আক্রমণ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন তাদের পূর্বপুরুষরা। ফিফা বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ান ছিলেন, কনিফা বিশ্বকাপে তিনি জানিচি কোরিয়ান। ফিফার মান অবশ্যই আলাদা, তবে কনিফার ফুটবলাররা তাদের চেয়ে কম আবেগ নিয়ে খেলেন, এটা মানতে মোটেই রাজি নন তিনি! 

    থাকবে না ভেদাভেদ

    এমন একটা টুর্নামেন্টে রাজনৈতিক সংযোগ থাকবে না, সেটা কি হয়! কেউ প্রতিবাদী চিঠি পেয়েছেন, কেউবা আবার সরকারের ভয়ে খেলতেই আসেননি। তবে কনিফা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ মনে করে নিজেদের। 

    সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট পের-আন্দেরস ব্লাইন্ড বলছেন, তারা রাজনীতি নিয়ে আলাপই করেন না এখানে। এসব পরোয়াও করেন না। তার কাছে রাজনীতি মানেই সীমানা তৈরি করা, মানুষের কাছ থেকে মানুষকে আলাদা করা। কনিফাকে তিনি দেখতে চান এর সম্পূর্ণ বিপরীতে। 

    উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সামিদের অন্তর্ভুক্ত ব্লাইন্ড। নিজে বেড়ে উঠেছেন শুধু হানাহানি দেখে। তবে ফুটবল দিয়ে তিনি মানুষকে খুঁজে পান, যেখান থেকেই আসুন না কেন, বন্ধুত্বের গান গাইতে চান। দিনশেষে সবার তো একটাই পরিচয়- মানুষ! 

    নাচি তো দেখো

    মাতাবেলেল্যান্ডের জন্য ভালবাসা

    দক্ষিণ-পশ্চিম জিম্বাবুয়ের বিস্তৃত এক অঞ্চল মাতাবেলেল্যান্ড। বিশ্বকাপে তাদের অংশগ্রহণের পেছনে অনেক বড় অবদান জনগণের তহবিল। “গোফান্ডমি” প্রোগ্রাম দিয়েই তারা তুলেছেন প্রায় ৪ হাজার পাউন্ড। 

    দীর্ঘ এক পথ পেরিয়ে এসেছেন তারা। অধিনায়ক প্রেইজ নেদলোভুর মতে, সে পথের শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। তারা লন্ডন পর্যন্ত আসতে পারেবন, এমন ভাবতেই পারেননি! জনগণের ভালবাসাই তাদেরকে টেনে এনেছে যেন। 

    “সবাই মাতাবেলেল্যান্ডের প্রেমে পড়ে গেছে,” মাতাবেলেল্যান্ডের ব্রিটিশ কোচ রীতিমতো বিস্মিত, “এটা পাগলাটে, এটা অসাধারণ। এসব ছেলেদের কেউই আফ্রিকার বাইরে কখনও যায়নি। আমি তাদেরকে বলেছি, এসো, খেলে যাও। উপভোগ করো। জীবনটা ছোট। বলে যাও, ‘আমি ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ খেলে এসেছি’।” 

    মাতাবেলেল্যান্ডের গল্পটা আদতেই অসাধারণ। লিভারপুল কিংবদন্তি ও সাবেক জিম্বাবুইয়ান গোলকিপার ব্রুস গ্রববেলার যুক্ত এই দলের সঙ্গে। কনিফা বিশ্বকাপ বদলে দিতে পারে মাতাবেলেল্যান্ডের অনেকেরই জীবন! 

    নেদলোভু যেমন আশাবাদি, হয়তো কেউ তাদের দেখছেন। কোনও স্কাউট। হয়তো ভবিষ্যতে তারা জায়গা পাবেন তৃতীয় বিভাগে, চতুর্থ বিভাগে, অথবা কে জানে, প্রিমিয়ার লিগেও! 

    অবশ্য খেলা দেখতে আসা কেউ কেউ চিন্তিত, ম্যাচের পর খেলোয়াড়রা খাবার দাবার যোগার করতে পারবেন কিনা। কেএফসিতে ডিনার করাতে তাই মাঠেই কেউ কেউ লেগে পড়েন বাড়তি তহবিল তৈরিতে। 

    জিম্বাবুয়েতে মুদ্রাস্ফিতি এখনও অন্য পর্যায়ের। কেউ হয়তো এরই মাঝে মজা করছেন, জিম্বাবুয়েতে কোটিপতি হতে চাইলে খরচ করতে হবে মাত্র পাঁচ পাউন্ড! 

    গান গাই আমার মনরে বুঝাই

    মাতাবেলেল্যান্ড, সিজিকেলি ল্যান্ড। দুই দলের সমর্থকদের বিপরীতধর্মী উল্লাস। একদিকে ধনী আফ্রিকানদের পোশাকে ঐতিহ্যবাহি নাচ, আরেকদিকে মেগাফোন, ড্রাম নিয়ে ফুটবল-চ্যান্ট। মাতাবেলেল্যান্ডের “ইয়াম্মা ইয়াম্মা” বা “হুউরে হুউরে”-তে তাই নিরপেক্ষ কেউও গলা মেলান। 

    ম্যাচশেষে অবশ্য সবাই এক। পার্কিং লটে একসঙ্গে নাচ। রীতিমতো উৎসব। তবে সে উৎসবেও বাগড়া বাঁধে। টাচলাইনে কেউ দিয়ে বসেন নাৎসি স্যালুট। পৃথিবীটাই তো এমন, কেউ শান্তিতে থাকতে চাইলেই কি পারে? 

    প্রার্থনা

    যেখানে ফিফার চেয়েও একধাপ এগিয়ে

    ফিফার নিয়মকানুন মানার বালাই নেই এখানে। পেনাল্টি বক্সে ডাইভ বা ক্রমাগত বাধার শাস্তি এখানে সবুজ কার্ড। মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গ এখানে রেফারিদের নেতৃত্বে। 

    জার্মান রেফারি রেনে জ্যাকবি যেমন বলেন, “অনেক নিয়ম আছে, যার কোনও মানে নেই। হলুদ কার্ড সরাসরি আপনার ওপর প্রভাব ফেলবে না। পেনাল্টি পাওয়ার জন্য ডাইভ দিলে কোনও ঝুঁকি নেই সেখানে। আমরা এখানে কিছু নিয়ম বদলানোর সুযোগ পাচ্ছি।” 

    “ফিফা অনেক বড়। অনেক ধীরগতির। তবে এখানে আমরা নতুন নিয়ম করে দেখতে পারি, ফুটবলের জন্য এটা ভাল কিনা।” 

    ফিফা সবুজ কার্ডের মতো কিছু ভাবতেই পারে ভবিষ্যতে! 


    এক নম্বর

    কনিফা সদস্যদের প্রত্যাশা বিভিন্ন রকম। কেউ আন্তর্জাতিক আঙিনায় খেলেই খুশি। কারও আশা, একদিন ফিফা তাদের দিকে নজর দেবে। কেউবা আবার বিশ্বজয়ের ভাবনায় মশগুল। 

    পাঞ্জাবের প্রেসিডেন্ট হারপ্রিত সিং ঘুমন্ত একটা জাতিকে ঘুম ভাঙানোর গান শোনাতে চান, “আমি খেলাধুলায় বিপ্লব ঘটাতে চাই। পাঞ্জাবের জন্য, বিশ্বজুড়ে থাকা সকল পাঞ্জাবির জন্য। দক্ষিণ এশিয়ায় পাঞ্জাব একটা সুপারপাওয়ার হবে, তারপর বিশ্বে এক নম্বর হবে।” 

    “ব্রাজিলিয়ানদের মতো হতে চাই আমরা, দেখেছেন না? তারা দারুণ। আমি পাঞ্জাবকে নিয়ে এভাবেই শুনতে চাই। আমরা এটা করবো। করবোই করবো। আমি এটার জন্য মরতেও রাজি।” 

    উদযাপন

     


    বিশ্বচ্যাম্পিয়ন

    কারপাথানিয়ান রুথেনিয়ার হাঙ্গেরিয়ান সংখ্যালঘুদের দল কারপাতিলিয়া ফাইনালে টাইব্রেকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে নর্দান সাইপ্রাসকে। ৯ জুন লন্ডনের এনফিল্ডে হয়েছে ফাইনাল। কারপাতিলিয়ার এটি প্রথম শিরোপা। তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। হয়তো তাদের বিশ্বটা একটু আলাদা। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে তারা অংশ নিতে পারে না।

    তবে ফুটবল বিশ্বকাপে তো ঠিকই খেলে! তাদের কাছে এই বিশ্বকাপের চেয়ে বড় “শো” আর কিইবা হতে পারে! 


    দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত জনি উইকসের “দ্য অল্টারনেটিভ ওয়ার্ল্ড কাপ” অবলম্বনে