bracket bracket
bracket bracket
  • ফুটবল

ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপ স্বপ্ন সুতোয় ঝুলছে আর্জেন্টিনার

গোলরক্ষকের জায়গা নিয়ে আগে থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল, সংশয়ও ছিল। প্রথমার্ধের অগোছালো খেলার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সেই গোলরক্ষকের ভুলে কপাল পুড়ল আর্জেন্টিনার। গোল খেয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ঘন্টা প্রায় বেজে গিয়েছিল তখন। ৮০ মিনিটে লুকা মদ্রিচের ডিবক্সের বাইরে থেকে করা দারুণ শটে থমকেই গেল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ আর তাদের হাতে নেই, নিশ্চিত হয়ে গেল প্রায় তখনই। শেষদিকে আরেক গোল হজম করে সেটা হয়ে গেল বিপর্যয়। ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হেরে খাদের কিনারায় চলে গেছে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ভাগ্য, গ্রুপ ডি এর পরের ম্যাচে আইসল্যান্ড জিতে গেলে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যাবে আর্জেন্টিনার বিদায়। আর টানা দুই জয়ে ১৯৯৮ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠল ক্রোয়েশিয়া।

 

 

আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্রয়ের পর উজ্জীবিত এক আর্জেন্টিনাকে দেখার আশা করেছিলেন সমর্থকেরা। যেই লিওনেল মেসি বিশ্বকাপে নিয়ে এসেছিলেন দলকে তিনিও পারেননি ডুবন্ত দলকে আশা দেখাতে। উলটো হতাশাই বাড়িয়েছেন। এই মেসি তো অচেনা!

তার চেয়েও বেশি অচেনা মনে হলো আসলে আর্জেন্টিনাকে। নিঝনি নভগরদে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন এনেছিলেন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি। খেলার কৌশলও বদলে ফেলেছিলেন। সবকিছু আবারও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে ক্রোয়াটদের দাপটে দিশেহারা আর্জেন্টিনা হাফ ছেড়ে বেঁচেছে রেফারির শেষ বাঁশির পর।

প্রথমার্ধ পর্যন্ত অবশ্য দুইদলকে আলাদা করার অবস্থা ছিল না। যদিও আর্জেন্টিনার চেয়ে ক্রোয়েশিয়াই আক্রমণে ছিল বেশি উজ্বল। ৫ মিনিটেই ইভান পেরিসিচের বাঁকানো শট ঠেকিয়ে কাজে নেমে পড়তে হয়েছিল উইলি কাবেয়ারোকে। আর্জেন্টিনাও একটা হাফ চান্স পেয়েছিল শুরুর দিকেই। ১৩ মিনিটে এদুয়ার্দো সালভিওর ক্রস থেকে মেজা শট করেছিলেন। ড্যান লভ্রেন সময়মতো ব্লক করে নিজের রক্ষণ সামলেছেন।  মার্কোস আকুনিয়ার বাঁ দিক থেকে করা ক্রস হুট করেই গোলে ঢুকে যেতে বসেছিল। ভাগ্যটা সুপ্রসন্ন ছিল না, বারপোস্টের মাথায় লেগে বল চলে গেছে বাইরে।  

এরপর শুধু দুইদলের রক্ষণের ভুলের ছড়াছড়ি। লভ্রেন আর গোলরক্ষক দানিয়েল সুবাসিচের ভুল বোঝাবুঝিতে বল পেয়ে গিয়েছিলেন এনযো পেরেজ। ডিবক্সের ভেতর থেকে ফাঁকা বারেও বল মেরেছেন সাইডনেটে। প্রথমার্ধে আর দ্বিতীয়ার্ধে একই কাজ করেছেন মারিও মাঞ্জুকিচও। ভালো জায়গায় বল পেয়েও একবার হেডে, পরের বার ডান পায়ের শটে মেরেছিলেন সাইডনেটে। তবে মাঞ্জুকিচের সেই মিসগুলোর মাসুল দিতে হয়নি ক্রোয়াটদের।

এর কারণ আর্জেন্টিনার অপরিকল্পিত খেলা। আক্রমণভাগে সার্জিও আগুয়েরো পড়ে ছিলেন একা। দ্বিতীয়ার্ধে কিক-অফ করার আগের ২১ মিনিট বলের দেখাই পাননি আগুয়েরো। যার কাছ থেকে বলের আশা করেছিলেন, সেই মেসির অবস্থাও নাজেহাল। সবমিলিয়ে মাত্র ২০ বার বল ধরতে পেরেছিলেন প্রথমার্ধে।

দ্বিতীয়ার্ধে অবস্থা বেগতিক দেখে গঞ্জালো হিগুয়াইনকে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাম্পাওলি। স্ট্রাইকারের বদলি স্ট্রাইকার, আগুয়েরো মাঠ ছেড়েছেন, হিগুয়াইন নেমেছেন। হিগুয়াইন শিন প্যাড পরার সময়ও ম্যাচ ছিল সমতায়। এরপরই গোলরক্ষক কাবেয়ারোর সেই পাগলামি। আইসল্যান্ডের ম্যাচে নিচ থেকে বিল্ড আপ করার সময় বেশ কয়েকবার বিপদ ডেকে এনেছিলেন। প্রথমার্ধেও একই কাজ করেছেন, কিন্তু বেঁচে গিয়েছিলেন। ৫৩ মিনিটে আর ভাগ্যটা ফিরে তাকালো না। এগিয়ে আসা আনতে রেবিচের মাথার ওপর দিয়ে বল পাঠাতে চেয়েছিলেন সতীর্থ মের্কাদোর কাছে। সেটা রেবিচ পর্যন্তই আটকে গেল, দারুণ ফিনিশে গোল করে কান পাতলেন ক্রোয়াট স্ট্রাইকার। নিঝনি নভগরদ আর্জেন্টাইন সমর্থকেরাই দখলে নিয়েছিলেন, তাদের চুপ করিয়ে দিলেন রেবিচ। ক্রোয়াট ফরোয়ার্ডের গল্পটা আজ অন্যরকমও হতে পারত। ৩৯ মিনিটে সালভিওকে করা ফাউলের পর দেখেছিলেন হলুদ কার্ড, অন্যদিন হলে হয়ত লাল কার্ডই দেখতে হত তাকে। কিন্তু দিনটা তো আজ রেবিচেরই ছিল!

গোল খেয়ে মাঠে দিশেহারা আর্জেন্টিনা, ডাগআউটে তখন পাগলপ্রায় সাম্পাওলি। প্রথমে নামলেন হিগুয়াইন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই আরও দুইটি পরিবর্তন, ক্রিশ্চিয়ান পাভন, পাউলো দিবালা- হাতের সবগুলো তুরুপের তাস নামিয়ে দিলেন একবারে। তাতেও ফেরেনি আর্জেন্টিনার ভাগ্য। শ্লথ মিডফিল্ড, ভুলেভরা রক্ষণ ছাপিয়ে ক্রোয়াটদের ভীতি ছড়ানোর মতো কিছুই করা হয়নি লা আলবিসেলেস্তেদের।

হিগুয়াইনের ক্রস থেকে মেজার শট, সুবাসিচের ঠেকিয়ে দেওয়া, ফিরতি বলে মেসির চেষ্টা, ইভান রাকিটিচের ব্লক- ৬৪ মিনিটে ওই একবারই ভীতি চড়েছিল ক্রোয়াটদের। মাঠের হতাশা শেষদিকে আত্মঘাতী হয়ে গেল আর্জেন্টিনার জন্য। পুরো ম্যাচে ইভান রাকিটিচ আর লুকা মদ্রিচদের আটকাতে হিমশিম খেয়েছে সাম্পাওলির দল। ৮০ মিনিটে দেখা ডিবক্সের বাইরে থেকে দারুণ শট জালে জড়াল মদ্রিচের, সেটা শেল হয়ে বুকে বিঁধল মেসিদের। ওখানেই শেষ নয়, ৮৬ মিনিটে রাকিটিচর ফ্রি কিক লাগলো বারে। কিন্তু রাকিটিচ শেষ পর্যন্ত গোলবঞ্চিত হলেন না। যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণ হতাশা খেলাই ছেড়ে দিয়েছিল, রাকিটিচ ডিবক্সের ভেতর ফাঁকায় তখন।  অসহায় আর্জেন্টিনার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে জয়ের ব্যবধান বাড়িয়েছেন মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ। তাতে নিশ্চিত হয়ে গেছে গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় হারও।  

 

 

 

ডিয়েগো ম্যারাডোনা গ্যালারিতে বসে দেখেছেন পুরো খেলা। প্রথমার্ধে দর্শকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এক গোলে দল পিছিয়ে থাকা অবস্থায় অস্বস্তিতে নখ কামড়েছেন। আইসল্যান্ডকে হারাতে না পারায় সাম্পাওলির আর আর্জেন্টিনায় ফেরার দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন। এবারও কিছু একটা বলবেন। সেটাও বোমা ফাটানোর মতোই হবে। তিনি যাই বলুন, এতোদিনে আর্জেন্টাইনদের জেনে যাওয়ার কথা ম্যারাডোনাকে যে ঈশ্বরের জায়গায় বসিয়েছিলেন তারা, সেখানে আরেকজন ঈশ্বর আসছেন না। মেসির শেষ বিশ্বকাপটা হয়ত শেষ হতে চলেছে বাজেভাবেই।

 


পরের রাউন্ডে যেতে হলে যা করতে হবে আর্জেন্টিনাকে      


  

একাদশ

আর্জেন্টিনা
কাবায়েরো, মের্কাদো, অটামেন্ডি, টালিয়াফিকো, সালভিও, পেরেজ, মাসচেরানো, আকুনিয়া, মেজা, মেসি, আগুয়েরো

ক্রোয়েশিয়া
সুবাসিচ, ভ্রাসালকো, লভ্রেন, ভিদা, স্ট্রিনিচ, রাকিটিভ, ব্রোজোভিচ, রেবিচ, মদ্রিচ, পেরিসিচ, মারিও, মাঞ্জুকিচ