• ফুটবল

ভাগ্য ফিরবে লিভারপুলের?

দুর্ধর্ষ এক আক্রমণভাগের কল্যাণে এক দশক পর পৌঁছে গিয়েছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। কিন্তু শিরোপা জিততে ভাল খেলার চেয়েও ফলাফল বের করে আনাটা বেশি জরুরি, যা ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুল পুরোপুরি পারেনি এখনও। ম্যানচেস্টার সিটির মত দলকে যেমন একদিকে উড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি আবার নিজেদের মাঠে হেরেছে ওয়েস্ট ব্রমের কাছে। নিতান্তই সাধারণ গোছের রক্ষণভাগ এবং মিডফিল্ড দিয়ে আর যাই হোক, লিভারপুলের সোনার হরিণ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ আর জেতা হবে না। সেজন্যই এবারের দলবদলে দুর্দান্ত কিছু খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়েছে লিভারপুল। শিরোপার খরা ঘুচবে এবার- সব মিলিয়ে এই আশাতেই বুক বাঁধছেন ‘কপাইট’রা।

 

আস্থা যখন অ্যালিসন

লরিস কারিওস বা সিমন মিনিওলে- লিভারপুলের দুই গোলরক্ষকের কারও ওপর ভরসা করা আর উলুবনে মুক্তো ছড়ানো ছিল একই কথা। একের পর এক ভুলে দলকে ডুবিয়েছেন দুজনই। কারিওসের দুটি ভুলেই তো চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে ক্লপের দলের। অধারাবাহিক পারফরম্যান্সে একজনের কাছে জায়গা হারিয়েছেন আরেকজন। কিন্তু গোলবারের নিচে ভরসা করার মত কাউকে পায়নি লিভারপুল। এজন্যই এবারের দলবদলে বিশ্বমানের একজন গোলরক্ষককে দলে ভেড়াতে রীতিমত উঠেপড়ে লেগেছিলেন ক্লপ।

সফলও হয়েছেন তাতে। হাজারো জল্পনা-কল্পনা শেষে রোমার এবং ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারকে বিশ্বরেকর্ড গড়ে দলে ভিড়িয়েছেন ‘অল রেড’রা। ব্রাজিলের হয়ে এবারের বিশ্বকাপে দারুণ খেলেছেন তিনি। আর রোমার হয়ে ছিলেন অবিশ্বাস্য। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর গোলবারের নিচে ভরসা করার মত কাউকে পেল লিভারপুল। ইনজুরি বা বিশ্রাম ছাড়া পুরোটা মৌসুমই লিভারপুলের ‘নাম্বার ওয়ান’ থাকবেন তিনি। তার ‘আন্ডারস্টাডি’ হিসেবে কাকে রাখেন ক্লপ- দেখার বিষয় এখন সেটিই।

 

শঙ্কার নাম রক্ষণ

সেন্টারব্যাক জুটি নিয়ে সমস্যাটা গত কয়েক মৌসুম ধরেই। বিশ্বরেকর্ড গড়ে ভার্জিল ভ্যান ডাইককে দলে এনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল লিভারপুল। গত মৌসুমে এই রক্ষণের ভুলেই জেতা অনেক ম্যাচে পয়েন্ট খুইয়ে বা হেরে ফিরতে হয়েছে লিভারপুলকে।

কিছুটা বিস্ময়করভাবে রক্ষণে এবার কাউকেই দলে ভেড়ায়নি লিভারপুল। নিয়মিত রাইটব্যাক নাথানিয়াল ক্লাইনের ইনজুরির কারণে গত মৌসুমে সুযোগ পেয়েই দলে জায়গা পাকা করে ফেলেছেন তরুণ ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড। এই মৌসুমেও রক্ষণের ডানপ্রান্তে নিয়মিত থাকবেন তিনি। আর্নল্ডের মতই গত মৌসুমে সুযোগ পেয়েই নিজেকে চিনিয়েছেন অ্যান্ডি রবার্টসন। আর্নল্ড-রবার্টসনের বিকল্প হিসেবে থাকবেন ক্লাইন এবং আলভারো মরেনো। দুজনই আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক হওয়ায় রক্ষণে জায়গা ফাঁকা রেখে উপরে উঠে যান। এর ফলে প্রতি-আক্রমণে বেশ ভুগতে হয় লিভারপুলকে। আবার ‘লাস্ট ডিফেন্ডার’ দেয়ান লভ্রেনের ওপরও ভরসা করা যাচ্ছে না খুব একটা। যদিও ক্রোয়াট ডিফেন্ডার ছিলেন বিশ্বকাপে দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবুও তার প্রমাণের অনেককিছুই বাকি। ভার্জিল ভ্যান ডাইকের সঙ্গে তার জুটি কেমন হয়- সেটাই পুরো মৌসুমে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে লিভারপুলের। তবে শঙ্কা কাটাতে লিভারপুলের দরকার আরও একজন পরীক্ষিত সেন্টারব্যাক। মৌসুমের বাকি মাত্র দিন কয়েক। 
 

খোলনলচে বদলে যাওয়া মাঝমাঠ

মিলনার-হেন্ডারসন-ওয়াইনাল্ডামকে নিয়ে সাজানো মাঝমাঠ নিয়েই গত মৌসুমটা কাটাতে হয়েছে লিভারপুলকে। তিনজনই আক্রমণে বেশ সাহায্য করলেও রক্ষণে একেবারেই দক্ষ নন কেউই। এজন্যই বড় দলগুলোর বিপক্ষে মাঝমাঠে প্রায় প্রতি ম্যাচেই মার খেয়ে যেতে হয়েছিল লিভারপুলকে। কিন্তু আগামী মৌসুমের লিভারপুলের মাঝমাঠ দেখে ঈর্ষায় ভুগতে পারে যে কেউই।

গিনির মিডফিল্ডার নাবি কেইটাকে দলে নিয়েছিলেন আগেই। গ্রীষ্মকালীন দলবদল শুরু হওয়ার সাথে সাথেই মোনাকোর ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস’ ফাবিনহোকে কিনে নিয়েছে লিভারপুল। রাইটব্যাক, উইঙ্গার, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, সেন্ট্রাল মিড- যেকোনো জায়গাতেই সমান পারদর্শী তিনি। তবে মাঝমাঠে কেইটার পাশেই তাকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আক্রমণের সাথে রক্ষণেও সমান দক্ষ দুজন। গত মৌসুমের মত প্রতি-আক্রমণে মাঝমাঠ নিয়ে আর তেমন ভাবতে হবে না ক্লপকে। ফাবিনহোর খেলার সাথে তার খেলা বেশ যায়- এমনটা নিজেই বলেছেন কেইটা। আক্রমণ বা রক্ষণে ভূমিকা অদলবদল করেই খেলবেন এই দুজন। তবে নিজেদের মাঝে বোঝাপড়াটাই দরকার সবচেয়ে বেশি। ‘ডিপ লাইং মিডফিল্ডার’ হিসেবে খেলবেন ফাবিনহো। তার থেকে একটু উপরেই অধিনায়ক জর্ডান হেন্ডারসনের সাথে নামবেন কেইটা। আক্রমণাত্মক খেলার ধরন আর গোলমুখে দক্ষতার কারণে সালাহ-মানেদের সাথে কেইটাকেই হয়ত দেখা যাবে বেশিরভাগ সময়। সেক্ষেত্রে মাঝমাঠে ‘ডার্টি ওয়ার্ক’-এর দায়িত্বটা বর্তাবে হেন্ডারসন-ফাবিনহোর ওপর। তবে দলের প্রয়োজনে আক্রমণেও খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন- মোনাকোতেই এমনটা প্রমাণ করেছেন ফাবিনহো। মাঝমাঠের এই ত্রয়ী ক্লিক করলে শিরোপা ঘরে তোলা অসম্ভব কিছু হবে না।

 

আগের চেয়েও ধারাল আক্রমণভাগ

সালাহ-ফিরমিনো-মানে। প্রথম মৌসুমেই ইউরোপে শেষ কোন ত্রয়ী এতটা দুর্ধর্ষ ছিল- তা হয়ত বলতে পারবেন না কেউই। এমনকি ইউরোপের সাম্প্রতিক সময়ের সাবেক ‘এমএসএন’-এর চেয়েও তাদেরকে এগিয়ে রাখেন অনেকেই। লিভারপুলের গত মৌসুমে দুর্দান্ত খেলার প্রায় পুরো কৃতিত্বটা এই তিনজনেরই। এমন এক নির্জীব মাঝমাঠ নিয়েও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে যেতে পারাটাই এক দুর্দান্ত অর্জন। নিজেদের জায়গায় তারা তিনজনই অদম্য। কিন্তু লম্বা মৌসুমে বিকল্প নিয়ে বেশ ভাবতে হয়েছে ক্লপকে। সমাধানও এনেছেন তিনি।

স্টোকের সুইস তারকা জের্দান শাকিরিকে দলে নিয়েছে লিভারপুল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে নিজের অভিষেকে দুর্দান্ত এক গোল করে এবং অন্য একটি করিয়ে নিজ সামর্থ্যের জানান দিয়ে রেখেছেন তিনি। তবে সালাহ-ফিরমিনো-মানে ফিট থাকলে হয়ত বেঞ্চেই সময় কাটাতে হবে শাকিরিকে। প্রিমিয়ার লিগ জিততে হলে দরকার একটা বড় স্কোয়াড, যাতে থাকবে একাধিক বিশ্বমানের খেলোয়াড়। সেটাই পাচ্ছে এবার লিভারপুল।

ডানপ্রান্ত দিয়ে সালাহ, বাঁ-প্রান্তে মানে। আক্রমণে দুই সতীর্থের সাথে গতিতে পাল্লা দিতে না পারলেও নিজের ‘ফুটবলীয় মাথা’টা দুর্দান্তভাবে ব্যবহার করেন ফিরমিনো। প্রায় সময়ই নিচে নেমে রক্ষণ বা মাঝমাঠে সাহায্য করেন এই ব্রাজিলিয়ান। লিভারপুলের পুরো আক্রমণভাগকে এক সূতোয় গেঁথেছেন তিনিই। গতির সাথে ‘ডিসিশন মেকিং’টাও দারুণ সালাহ-মানের। ফিরমিনোর সাথে বোঝাপড়ায় গত মৌসুমে তিনজন মিলে ছাড়িয়ে গেছেন গোলের ‘সেঞ্চুরি’র মাইলফলক। এবারও এমন দারুণ কিছুর অপেক্ষায় আছে লিভারপুল। নামলে সালাহর বদলেই হয়ত নামবেন শাকিরি। অথবা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে দল সাজালে ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে দলকে খেলাতে পারেন ক্লপ। সেক্ষেত্রে হয়ত হেন্ডারসনের বদলে শাকিরিই নামবেন মাঠে। খেলবেন ‘ফ্রি রোল’-এ।

নব্বইয়ের দশকের পর আর ইংলিশ লিগ জেতা হয়নি লিভারপুলের। প্রতি মৌসুমেই নতুন প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নামা লিভারপুল খেই হারিয়ে ফেলে সময়ের সাথে। কিন্তু এবারের হিসেবটা যেন একটু হলেও ভিন্ন। নিজের মনমত দল সাজিয়েছেন ক্লপ। গোলরক্ষকের সমস্যাও সমাধান করেছেন। সেই সাথে মাঝমাঠের চেহারাটাই বদলে দিয়েছেন তিনি। গত মৌসুমে কেবল দারুণ এক আক্রমণের জোরেই চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলেছিল তারা। আর এবার তো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তারা। সব মিলিয়ে লিভারপুল সমর্থকদের লিগ জেতার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হলেও অবাক হওয়ার থাকবে না খুব একটা।

 

প্রেডিকশন: ২য়
দলে তারকার ছড়াছড়ি। মূল একাদশের জোরেই অনেক দূরে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল লিভারপুলের। ক্লপের ‘গেগেনপ্রেসিং’ ট্যাকটিক্সের কারণে গত মৌসুমে ইনজুরিতে ভুগতে হয়েছে অনেককেই। এবার এমন হলে আবারও শেষমেশ খালি হাতেই ফিরতে হবে তাদের। তবে লিভারপুলের আপাত প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভবৎ ম্যানচেস্টার সিটিই। লিগ জেতার দৌড়ে পাল্লাটা দিতে হবে তাদের সঙ্গেই। দলের মান বাড়িয়ে প্রত্যাশাটাও বাড়িয়ে দিয়েছেন ক্লপ, সেটা কি চাপে পরিণত হবে? সেই চাপকে জয় করতে পারবেন ক্লপ?