• ফুটবল

রোনালদো-জাদুতে ইতালিতে অবাক বসন্ত

ভেরোনার স্তাদিও বেন্তেগদির পার্কিং লটে শেষ গাড়িটাও যখন ঢুকে যাবে, পুরো স্টেডিয়ামে আর সূচ ঢোকার জায়গা রাখবে না পুলিশ। এমন দিন ছোট্ট ভেরোনা শহরে কমই এসেছে। শুধু ভেরোনা বা ইতালি নয়, আজ পুরো বিশ্বেরই যে শ্যেন নজর থাকবে ভেরোনার ওপর। এখানকারই ক্লাব চিয়েভো, যাদের সঙ্গে ম্যাচ দিয়ে সিরি আ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে জুভেন্টাস। ও হ্যাঁ, এতক্ষণে আর বোধ হয় বলার দরকার নেই, এই ম্যাচ দিয়েই ইতালিতে শুরু হতে যাচ্ছে সিআরসেভেন যুগের।

‘মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়...’

রোনালদোর জুভেন্টাসে আসার পর থেকে পুরো ইতালিতে যেন ভেসে বেড়াচ্ছে উৎসবের মৌতাত। অথচ এই বছরটা মোটেই ভালো যাওয়ার কথা ছিল না ইতালির। বিশ্বকাপে নেই আজ্জুরিরা, চার বারের চ্যাম্পিয়নদের রাশিয়ার আনন্দযজ্ঞ দেখতে হয়েছে দর্শক হয়ে। বিশ্বকাপের সময় দর্শকও কমে যাওয়ার কথা ছিল অনেক। ১৫ জুলাইয়ের ফাইনাল দেখেছে তিন ভাগের দুই ভাগ ইতালিয়ান। বিশ্বকাপের সব ম্যাচ মিলে দর্শক হয়েছে ২৯৭ মিলিয়ন, ২০১৪ সালের চেয়েও যা ৪৯ মিলিয়ন বেশি। কিন্তু ইতালির আসল উপহারটা তখনও ছিল বাকি। রোনালদো আসায় রসি, বাজ্জিওদের দেশে এখন আক্ষরিক অর্থেই ‘ঈদ’, আর ভেরোনায় যেন আজ ‘চাঁদ রাত’।

 

 

ইতালির ফুটবলে এরকম হবে কে ভেবেছিল? পাতানো ম্যাচের কলঙ্ক এখনো কাটেনি পুরোপুরি, ২০০৭ সালে কাকা জেতার পর ব্যালন ডি অরের শীর্ষ তিনেই ঠাঁই করে নিতে পারেনি ইতালির কেউ। মিলানের ওই ২০০৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্মৃতির জাবর কেটে বেড়াতে হয়েছে এতোদিন। ইতালির মাঠে আঁচড় লেগেছে বর্ণবাদের, জুভেন্টাসের মতো দল দুর্নীতির কালি নিয়ে নেমে গেছে দ্বিতীয় বিভাগে। বড় তারকারা সব মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ইতালি থেকে, মাঠে কমতে শুরু করেছে দর্শক। ওদিকে লা লিগা, ইংলিশ লিগ ধারে-ভারে-জৌলুসে এগিয়ে গেছে অনেকদূর। চ্যাম্পিয়নস লিগেও সিরি আর ক্লাবগুলো খেলেছে যেন অংশ নেওয়ার জন্যই। এক জুভেন্টাসই যা একটু সমীহ জাগানোর মতো, গত পাঁচ বছরে দুইবার ফাইনালে গিয়েও পারেনি। কিন্তু বাকিদের আর যাই হোক, পরাশক্তি বলা চলে না। মিলান-ইন্টারের মতো ক্লাবের জায়গা হয়েছে ইউরোপায়। ইতালির ফুটবল একরকম ঘুমন্ত রাজকন্যার মতো ছিল অনেকদিন, সেই ঘুম ভাঙাতে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় করে সোনার কাঠি-রূপার কাঠি নিয়ে আসার দরকার ছিল একজন রাজপুত্রের। সেটা রোনালদোর চেয়ে যোগ্য আর কে হতে পারে?

আপনি বলতে পারেন, এটা তো আসলে একটা জুয়াই। রোনালদোকে আনার জন্য জুভেন্টাসের খরচ হয়েছে সব মিলে খরচ হয়েছে ৩৪০ মিলিয়ন ইউরো, ৩৩ বছর একজনের জন্য অঙ্কটা একটু পাগুলেই শোনাবে। কিন্তু রোনালদো আসার এক মাসের মধ্যে জুভেন্টাস কী পেয়েছে শুনবেন? শোনা যাচ্ছে, এর মধ্যে পাঁচ লাখ জার্সিও বিক্রি হয়ে গেছে। এটা অবশ্য নিশ্চিত করা যায়নি, তবে এটা নিশ্চিত, জুভেন্টাস গত পুরো মৌসুমে যে জার্সি বিক্রি করেছে, গত এক মাসে করেছে তার চেয়েও বেশি। ‘সিজন টিকেটের’ দাম বাড়ার পরেও এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার বিক্রি হয়ে গেছে, বাকিগুলো নিয়েও কাড়াকাড়ি।

 

আর সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার কথা ধরুন। রোনালদো আসার পর এক সপ্তাহে জুভেন্টাসের ইন্সটাগ্রামে ফলোয়ার বেড়ে গেছে চল্লিশ লাখ, ফেসবুকে এক সপ্তাহে হয়ে গেছে ২০ লাখ লাইক। টুইটারের ১৫ লাখ ফলোয়ার বাড়াটা সেই তুলনায় কমই মনে হবে। গত জুলাই মাসে সব ক্লাবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা হয়েছে জুভেন্টাসের ইউটিউব চ্যানেল, এর মধ্যে তা পেরিয়ে গেছে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি। ১৯৯৮ সালে এক রোনালদো এসেছিলেন ইন্টারে, এরপর আরও একবার রোনালদো-জ্বরে বুঁদ হয়ে আছে ইতালি। না, জুভেন্টাস নয়, পুরো ইতালিই।

আপনি হয়তো বলতে পারেন, রোনালদো আসায় লাভ তো হয়েছে শুধু জুভেন্টাসেরই। এই রোনালদোই সর্বশেষ দুই বার চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে খালি হাতে ফিরিয়েছেন তুরিনের বুড়িদের। একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের জন্য জুভেন্টাসের যে আক্ষেপ, সেটা পূরণ করার জন্য রোনালদোর চেয়ে যোগ্য আর কে হতে পারেন? আপনি বলতে পারেন, কিন্তু সিরি আ তে জুভেন্টাস তো এমনিতেই বাকিদের চেয়ে যোজন এগিয়ে। গত মৌসুমে যে ক্লাব ৯৫ পয়েন্ট নিয়ে লিগ জিতেছে, রোনালদো আসায় তারা তো বাকিদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই চলে যেতে পারে। সিরি আ তো সেক্ষেত্রে আরও বেশি একপেশে হয়ে যাবে না?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে কিছুটা গত মৌসুমের শিরোপাদৌড়ে, আর কিছুটা অন্য ক্লাবগুলোর এবারের দলবদলের বিকিকিনিতে। গত মৌসুমে জুভেন্টাস শিরোপা জিতলেও নাপোলি শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে সবচেয়ে বেশি লড়াই হয়েছে ইতালিতেই। এবার মরিজিও সারি চলে যাওয়ায় নাপোলি কিছুটা মলিন বটে, কিন্তু উত্তরসূরি কার্লো আনচেলত্তির সামর্থ্য নিয়ে কারও সন্দেহ থাকার কথা নয়। আর জর্জিনহো ছাড়া বাকিদের কাউকে ছাড়েওনি নাপোলি।

বরং বাকি ক্লাবগুলো যেভাবে কেনাকাটা করেছে, তাতে এবারও আরেকটি জমজমাট লড়াই দেখা যেতেই পারে। ইন্টার অনেক দিন পর এবার আঁটঘাট বেঁধে নামছে, রোমা থেকে নিয়ে এসেছে সিরি আর অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার রাদজা নাইঙ্গোলানকে। ইন্টার কোচ জুলিয়ানো স্প্যালেত্তি জানেন, কীভাবে নাইঙ্গোলানের কাছ থেকে সেরাটা বের করে নিতে হয়। লরাটো মার্টিনেজ, স্টেফান ডি ভ্রিজ, সিমি ভ্রাসালকো, লতারো মার্তিনেজরা এসেছেন দলে।

বা প্রতিবেশী মিলানের কথাই ধরুন। রোনালদোকে আনার পর গঞ্জালো হিগুয়াইনকে ধারে মিলানে পাঠিয়েছে জুভেন্টাস। এর মধ্যে মিলান নিয়ে এসেছে টিমোথি বাকায়াকোকে, জুভেন্টাস থেকে এসেছে মাত্তিয়া কালদারেয়া। তার চেয়েও বড় কথা, দুই পুরনো সৈনিক লিওনার্দো ও পাওলো মালদিনি আবার যোগ দিয়েছেন ক্লাব ম্যানেজমেন্টে। এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাদের জন্য আর কী হতে পারে?

রোমা সেই অর্থে বড় কাউকে আনেনি, তবে তাদের স্পোর্টিং ডিরেক্টর মঙ্কি কাঁচা হিরে চিনতে ওস্তাদ। প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট তনয় জাস্টিন ক্লুইভার্ট, প্যাট্রিক শিক, চেঙ্গিস আন্দারদের মনে করা হচ্ছে এই প্রজন্মের সবচেয়ে প্রতিভাবানদের তিনজন। সেটার কিছুটাও যদি পূরণ করতে পারেন তাঁরা, তাহলেই দেখা যাবে রোমাঞ্চকর একটা ত্রয়ী। আর পিএসজি থেকে হাভিয়ের পাস্তোরে আসায় মধ্যমাঠের ধার তো বেড়েছেই। ওদিকে সাভিচ-মিলিনকোভিচকে রেখে দিতে পারলে লাৎসিও ছেড়ে কথা বলবে না ।

রোনালদো আসায় শুধু জুভেন্টাসের নয়, জৌলুস বেড়েছে পুরো সিরি আর। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখন আবার আগ্রহ পাচ্ছেন, এর মধ্যে ইন্টার-মিলান-রোমায় তারা টাকা ঢালছেন। টিভি স্বত্ব থেকেও আয় বাড়বে, ইএসপিএনের সঙ্গে এর মধ্যেই ৩০০ ম্যাচ দেখানোর লোভনীয় যুক্তি করেছে সিরি আ। ক্লাবগুলোর পকেটও তাই ভরতে শুরু করবে। কে জানে, রোনালদোর হাত ধরেই হয়তো ফিরে আসবে রাইকার্ড-ফন বাস্তেনদের সময়ের সিরি আর সেই সোনালী দিন!