• " />

     

    একজন মায়ের বিশ্বজয়

    হেপ্টাথলন - অ্যাথলেটিক্সে সাতটি ভিন্ন ইভেন্টের সমন্বিত এক প্রতিযোগিতার নাম। মেয়েদের আসরে ১০০ মিটার হার্ডলসে শুরু হয়ে এই আয়োজন শেষ হয় ৮০০ মিটার দৌড়ে। সাথে আছে ২০০ মি দৌড়, শটপুট, লং জাম্প, হাই জাম্প আর জ্যাভেলিন থ্রো-ও। খাটুনিটা আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়ই! শেষ ইভেন্ট ৮০০ মিটারের শেষ সীমা ছাড়িয়ে ফুসফুস আর পায়ের পেশীগুলো যখন খানিক ফুরসত চেয়ে হাহাকার করে, তখন একজন প্রতিযোগীর পক্ষে হাসি হাসি মুখ করে ছবির জন্য পোজ দেয়াটাই সম্ভবত দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। জেসিকা ইনিস-হিলও দৌড় শেষ করেই ট্র্যাকে শুয়ে পড়েছিলেন, আর যথারীতি তাঁকে ঘিরে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন গণমাধ্যমকর্মীরা। অমন অমানুষিক পরিশ্রমের পর মেয়েটার যে দুদণ্ড বিশ্রাম আর অক্সিজেন প্রয়োজন সে নিয়ে ভাবতে যেন বয়েই গেছে সবার! ইনিস-হিল পারতেন অন্যদের মতো চোখেমুখে একটা শক্ত ভাব এনে বিরক্তিটুকু প্রকাশ করতে। কিন্তু কিসের কি! ২৯ বছরের ব্রিটিশ ললনার বাঁধভাঙ্গা হাসিতে বেইজিংয়ের দ্য বার্ড’স নেস্ট স্টেডিয়ামের গোটাটাই যেন ঝলমলিয়ে উঠছিল।

     

     

    খেলার মাঠের অনেক অভাবনীয় সাফল্যই দর্শকদের মনে গেঁথে যায়। চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স কখনও বিস্ময়ে হতবাক করে দেয়, অতি উত্তেজনায় হয়তোবা দুয়েকটা হার্টবিটও কেউ মিস করে বসেন। কিন্তু চমকেরও তো একটা সীমা থাকে। মা হবার ১৩ মাসের মাথায় হেপ্টাথলনের মতো ইভেন্টে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাকে ঠিক সম্ভাব্যতার কোন সমীকরণে মেলাবেন? সদ্য সমাপ্ত বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসরে হেপ্টাথলনের সোনা জিতে ক্রীড়াজগতে পৌরাণিক প্রত্যাবর্তনের এক নতুন ইতিহাসই লিখে ফেলেছেন ব্রিটিশ প্রমীলা অ্যাথলেট জেসিকা ইনিস-হিল।

     

     

    মা হওয়ার পর খেলার মাঠ কিংবা রেসের ট্র্যাকে ফিরে আসার ঘটনা আনকোরা নতুন তা নয়। তবে ইতিহাস বলে এমন কীর্তিমানরা সবাই ছিলেন নেহাতই সাধারণ কোন ইভেন্টের প্রতিযোগী যার কোন কোনটিতে সন্তান ধারণ করাটা বাড়তি সুবিধেও এনে দিতে পারে! কিন্তু তাই বলে হেপ্টাথলন? এই প্রতিযোগিতায় এমন ঘটনা একেবারেই নজিরবিহীন। গত বছর ইনিস যখন গর্ভধারণের কথা জানান তখনই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন অনেকে। চিকিৎসক থেকে শুরু করে সাবেক তারকা হেপ্টাথলেট সবাই এক সুরে বলেছিলেন, ইনিসের ট্র্যাকে ফেরা অসম্ভব!

     

    ইনিস হিলের কোলে পুত্র রেগি

     

    গুণ-মানের বিচারে হেপ্টাথলনকে ট্র্যাক আর ফিল্ডের স্নাতক সনদের তকমা দেয়াই যায়। এই প্রতিযোগিতার সাতটি ইভেন্ট কেবল যে আপনার গতি, শক্তি আর সহিষ্ণুতার পরীক্ষা নেবে তা নয়; শরীরটাকে আপনি কতো অনায়াসে মোচড়াতে, বাঁকাতে, ছুঁড়ে দিতে আর ভাসাতে পারেন এ সব কিছুর ওপরই নির্ভর করে সাফল্য। মোদ্দাকথা, দেহের উপর আপনার নিয়ন্ত্রণের এক পরিপূর্ণ পরীক্ষার নাম হেপ্টাথলন। গর্ভাবস্থা থেকে উঠে আসার পর হরমোনাল প্রভাবে যখন শরীরের ভেতরের জোড়াগুলো অসার হয়ে পড়ে, লিগামেন্ট পিচ্ছিল তরলে ভরে ওঠে তখন এমন এক পরীক্ষায় অবতীর্ণ চিন্তাটুকু ‘অবান্তর’ বলে উড়িয়ে দিতে বোদ্ধা হতে হয় না।

     

    মা হওয়ার অভিজ্ঞতা ‘অসাধারণ’ মানলেও সেখান থেকে পেশাদার অ্যাথলেটের জীবনে ফিরে যাওয়া কতোটা কঠিন তা পদে পদেই টের পেয়েছেন ইনিস, “নতুন করে শুরু করাটা খুব কঠিন ছিল। বুঝতে পারছিলাম গর্ভধারণের আগের আমি আর পরের আমিতে বিস্তর ফারাক। জানতাম সময় লাগবে। তার ওপর প্রায় প্রতি রাতেই দু’ তিনবার করে জাগতে হত বাচ্চাকে খাওয়াতে।”

     

    গত নভেম্বরে যখন সাধারণ এক সাইকেলে চড়ে প্রত্যাবর্তনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেন, মাত্র ১৫ মিনিট প্যাডেল ঘুরিয়েই হাপিয়ে উঠেছিলেন। হাতে-কলমে হেপ্টাথলনের অনুশীলন বলতে যা বোঝায় ইনিস সেটা শুরু করতে পেরেছিলেন গত ফেব্রুয়ারিতে, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কম করেও মাস ছয়েক পর।

     

     

    এই স্বল্প মেয়াদের অনুশীলনও সময়ে-অসময়ে বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে ইনজুরির হানায়। আকিলিসের (পায়ের পিছনদিকের পেশীর সাথে গোড়ালির সংযোগকারী টেন্ডন) ব্যথা থেকে তো সেরে উঠলেন এই মে মাসে। ইনিসের প্রশিক্ষক টনি মিনিশেলোও একটা পর্যায়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন, “গত শীতে এমন বহু দিন গেছে এই ভেবে যে মেয়েটা কি আসলেই পারবে? আমি অন্তত নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। এই ফেব্রুয়ারিতেও যদি কেউ বলত যে, ইনিস এবারের বেইজিং আসরে অংশ নেবে তাহলে সবার আগে আমিই ভ্রু কুঁচকাতাম!”

     

    কোচেরই বা কি দোষ? প্রতিযোগিতার ক’দিন আগেও স্বয়ং ইনিসই পদক জেতা দূরে থাক, অংশগ্রহণ নিয়েই সংশয়ে ছিলেন, “হাল ছেড়ে দেয়ার চিন্তা একদমই করি নি বললে মিথ্যা বলা হবে। প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। কাজটা খুব কঠিন লাগতো। এমনও মনে হয়েছে যে, আমি তো অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হয়েই গেছি, নতুন করে এই ঝক্কিঝামেলা পোহানোর কি দরকার?” তবে শেষপর্যন্ত ইনিস শেষটা দেখতে চেয়েছিলেন, “এই ভেবে নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে ভবিষ্যতে যেন পিছন ফিরে হাহাকার করতে না হয়, ইশ ওটা বোধহয় হলেও হতে পারতো!”

     

     

    হাহাকার তাঁকে করতে হয় নি। বড় মঞ্চের সবচেয়ে বড় তারকা হয়েই ফিরে এসেছেন ইনিস। ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে এবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ পর্যন্ত মোট ন’টি আন্তর্জাতিক আসরে অংশ নিয়েছেন। আর এসবের মধ্যে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেরা হেপ্টাথলন স্কোরটি এবারই পেলেন! নামের পাশে দু’ দুটো বিশ্বসেরার খেতাব আর একটি অলিম্পিক সোনা; ইনিস যে কেবল উঁচু পাহাড় ভাঙতেই পারদর্শি তা নয়, তিনি জানেন কিভাবে চূড়ায় চড়তে হয়।

     

     

    এর আগে অবশ্য গত মে মাসে ম্যানচেস্টারে গ্রেট সিটি গেমসে স্ট্রিট অ্যাথলেটিক্স ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন, ওই মাসেরই শেষদিকে আগামী বছর অনুষ্ঠেয় রিও অলিম্পিকের বাছাইপর্ব উতরেছেন। এসব ইনিসকে সাহস যুগিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে। তবে তাঁর দাবী পদকের খাতায় বড়জোর ব্রোঞ্জের আশা করেছিলেন, সুদূরতম কল্পনায়ও সোনার চিন্তা করেন নি।

     

    লন্ডন অলিম্পিকে সোনাজয়ের পর বাবা ভিনি হিলের ভালোবাসায় সিক্ত ইনিস

     

    গত ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে ঘরের মাঠের ট্র্যাকের ‘পোস্টার গার্ল’ ছিলেন। সেবারের ক্যারিয়ারসেরা স্কোর থেকে এবার প্রায় ২৫০ পয়েন্ট কম পেয়েছেন। ইনিস যে মানের হেপ্টাথলেট, তাঁর জন্য ৬ হাজার ৬৬৯ পয়েন্ট মোটেও আহামরি কিছু নয়। কিন্তু তা দিয়ে কি আর এই প্রত্যাবর্তনের গল্পে নম্বর দেয়া সম্ভব? এ যাত্রায় ঠিক পারফরম্যান্স দিয়ে নয়, ইনিস জিতেছেন নিজের দৃঢ়তাকে পুঁজি করে। প্রতি ধাপে একটু একটু করে নিজের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর লং জাম্পের যে ইভেন্টটিতে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভুল করে বসলেন, সেটিতেই তিনি তাঁর সময়ের সেরা লাফটা দিলেন।

     

     

    এই অভাবনীয় কীর্তির অনেকটা ভাগ কোচ মিনিশেলো দাবী করতেই পারেন। তিনি অবশ্য উল্টোটা করছেন! বলছেন তিনি নিজেই নতুন করে শিখেছেন এবার, “কঠিন একটা সময় গেছে, আমি নিজে অনেক কিছু শিখেছি নতুন করে। যদি সে ফের গর্ভধারণ করে তবে আমার করণীয় কি হবে তা এখন আমি জানি। তার মানে আবার এই না যে, আমি তেমন কিছু করতে তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছি!”

     

    সোনা জয়ের পর কোচ টনি মিনিশেলোর সাথে

     

    কোচিং টিমের পাশাপাশি ইনিস কৃতজ্ঞ তাঁর স্বামী ও পরিবারের কাছেও। মা হওয়ার তিন মাসের মাথায় অনুশীলনে ফিরতে যতটুকু মানসিক সমর্থন এবং বাচ্চা দেখাশোনাসহ আনুষঙ্গিক যেসব সহযোগিতা প্রয়োজন তাঁর সবটুকুই তিনি পরিবার থেকে পেয়েছেন বলে জানান।

     

    সোনাজয়ের পর টুইটার প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বাসটুকু লুকোনোর কোন চেষ্টা করেন নি ইনিস, “অবিশ্বাস্য অনুভূতি! এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন! আমার অসাধারণ পরিবার আর দলকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না।”

     

    স্বামী অ্যান্ডি হিলের সাথে ইনিস হিল

     

    আসছে বছর ব্রাজিলের রিওতে আবার বসছে অলিম্পিকের আসর। দু’ অলিম্পিকের মাঝের সময়ে মা হয়ে দুটো অলিম্পিকেই সোনা জিতেছেন এমন কীর্তি অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে আছে কেবল দু’জনের। ৮০ মিটার হার্ডলসে ১৯৫২ আর ‘৫৬ সালে সোনা জেতা অস্ট্রেলিয়ার শার্লি স্ট্রিকল্যান্ড ‘৫৩ সালে পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। ২০০৪ সালে ট্রিপল জাম্পে সোনাজয়ী ফরাসী-ক্যামেরুনিয়ান ফ্রাঙ্কোস বাংগো এটোন ২০০৬ সালে মা হয়ে ওই ইভেন্টের সোনা ধরে রেখেছিলেন ২০০৮ অলিম্পিকেও।

     

    বলা বাহুল্য, হেপ্টাথলনে কাজটা অনেক বেশী দুঃসাধ্য। ইনিস নিজেও জানেন ‘অভাবনীয়’ এই সাফল্য লাভের পথে ব্রায়ান থিয়েসেন ইটন, জনসন থম্পসন, নাদিন ভিসাররা রিও ডি জেনিরোতে ঢের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে হাজির হবেন। তবে তিনিও যে ততোধিক কঠিন রূপে ব্রাজিল জয় করবেন না, সে নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে?

     

    ইনিস নিজে কোন নিশ্চয়তাই দিচ্ছেন না, “কাজটা কল্পনাতীত কঠিন হবে। তবে আমি আমার সেরাটুকু দিয়েই চেষ্টা করবো। তারপর দেখা যাক আরও একবার মঞ্চ আলো করতে পারি কিনা!”

     

    ইনিস আরও একটা ইতিহাস নতুন করে লিখতে পারবেন কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে বেইজিং চমকের পর তাঁর অভিধানে ‘অসম্ভব’ শব্দটা যে নতুন করে খুঁজতে হবে এটা মানতে বোধহয় কারও আপত্তি থাকার কথা নয়!

     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন