• " />

     

    পুরুষদের ক্রিকেটে প্রমীলা!

    পুরুষদের ক্রিকেটে প্রমীলা!    

    মতি নন্দীর কলাবতী ছেলের ছদ্মবেশে ক্রিকেট ব্যাট হাতে নেমে ‘ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’-এর অংশ হয়ে গিয়েছিল। খেলাধুলার জগতে অমন ‘ছদ্মবেশী’ নারী ক্রীড়াবিদের উদাহরণ বাস্তবেও নেহায়েত কম নেই। তবে খেলাটা যখন ক্রিকেট তখন দিনব্যাপী ছদ্মবেশে ব্যাট-বল করাটা হয়তো কঠিন কি আদতে অসম্ভবই বটে। কেট ক্রস, ক্লেয়ার কোনর, ক্যাথরিন ফিজপ্যাট্রিক, কোল ওয়ালওয়ার্ক, আরান ব্রিন্ডলরা সে পথে হাটেনও নি। রীতিমতো বলেকয়ে ‘নারী’ হিসেবেই খেলেছেন পুরুষদের ক্রিকেট আর অনন্য সাধারণ নৈপুণ্যে জয় করেছেন বাইশ গজের যুদ্ধক্ষেত্র। বিরল প্রতিভাধর ক্রিকেটারদের সে তালিকায় নতুন সংযোজন সারা টেলর। ইংল্যান্ডের এই প্রমীলা উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পুরুষদের ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপে কাল মাঠে নামছেন নর্দার্ন ডিসট্রিক্টস ক্লাবের হয়ে। সোয়াশ’ বছরের পুরনো এই অভিজাত টুর্নামেন্টে প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি হতে যাচ্ছেন আরও একটি ইতিহাসের অংশ।

     


    আরও পড়ুনঃ নারী ক্রিকেটারের আট উইকেট


     

    ‘আরও একটি’ ইতিহাস বলতে হচ্ছে কারণ সাসেক্স প্রমীলা ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ইতোমধ্যে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে ছেলেদের একাধিক আসরে খেলে ফেলেছেন, ওয়ামলের হয়ে। আন্তর্জাতিক প্রমীলা ক্রিকেটে এ পর্যন্ত ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ৮টি টেস্ট, ৯৮টি ওয়ানডে ও ৭৩টি টিটোয়েন্টি। মেয়েদের বিশ্ব ব্যাটসম্যান র‍্যাঙ্কিংয়ে আছেন দু’ নম্বরে, এ বছর হয়েছেন আইসিসির বর্ষসেরা প্রমীলা ওডিআই ক্রিকেটারও।

     

     

    অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে সারা’র অভিষেকের এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে একভাবে জড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশও। যে দলের হয়ে তিনি কাল মাঠে নামছেন সেই নর্দার্ন ডিসট্রিক্টস ক্লাবে একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্রিকেটার মার্ক ক্রসগ্রোভের ওডিআই অভিষেকটা যে হয়েছিল বাংলাদেশের বিপক্ষেই! ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সে ম্যাচে ৬৯ বলে ৭৪ রান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন মার্ক। তবে দুর্ভাগ্যই বলতে হয় তাঁর, মাস ছয়েকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মাত্র তিনটি একদিনের আন্তর্জাতিক খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। সারার সাথে কাল একই জার্সিতে দেখা যাবে কিংবদন্তী ইংলিশ ক্রিকেটার মাইক গ্যাটিংয়ের ভাতিজা জো গ্যাটিংকেও।

     

    ২৬ বছর বয়সী সারা টেলর অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন একদিনের জাতীয় প্রমীলা ক্রিকেট লিগ খেলতে। সে আসরে সাউথ অস্ট্রেলিয়া স্করপিয়ন্সের হয়ে প্রথম ম্যাচ গেলো সপ্তাহে হাঁকিয়েছেন শতকও। আসছে শীতে বিগ ব্যাশে মেয়েদের উদ্বোধনী টুর্নামেন্টে খেলবেন অ্যাডিলেড স্ট্রাইকারসের হয়ে। এ সবই ঠিক আছে। কিন্তু প্রমীলা ক্রিকেট খেলতে এসে পুরুষদের আসরে নাম লেখানো! রোমাঞ্চটুকু গোপন করছেন না সারা নিজেও, “একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ভয়ও লাগছে আবার উত্তেজনাও হচ্ছে। তবে সবসময়ই চেয়ে এসেছিলাম নিজেকে সামনে ঠেলে দিতে। দেখতে চেয়েছিলাম ক্রিকেটে আমার দৌড় ঠিক কতদূর।”

     

     

    টুর্নামেন্টে দলের হয়ে উইকেট সামলানোর পাশাপাশি ব্যাট হাতে নামবেন আট নম্বরে। প্রত্যাশা তো পূরণ হচ্ছে। সামলাতে পারবেন তো? “বলের অতিরিক্ত গতি আর বাউন্সের সাথে মানিয়ে নিতে হয়তো একটু সময় লাগবে। তবে আমি চ্যালেঞ্জটা নিতে প্রস্তুত। দস্তাবন্দী হাতে ঘরের মাঠে বছরটা খারাপ যায় নি, দেখা যাক ফর্মটা এবার ছেলেদের ক্রিকেটেও ধরে রাখতে পারি কিনা। পারলে পারলাম, না পারলে নাই!” সঙ্গে জানাতে ভুলছেন না যে অভিজ্ঞতাটা তাঁর জন্য নতুন নয়, “ব্রাইটন কলেজে ছেলেদের সাথে খেলেই বড় হয়েছি। ইংল্যান্ডে পুরুষদের প্রিমিয়ার লিগও খেলে আসলাম। অভ্যেসটা তাই আছে।”

     

     

    মঞ্চটা যখন অস্ট্রেলিয়া, ক্রিকেটের সাথে অবধারিতভাবেই চলে আসে একটা শব্দ ‘স্লেজিং’। ছেলেদের বাক্যবাণ হজম হবে তো? জবাবে সারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি অন্য ধাতুতে গড়া, “ওটাকে সম্মান হিসেবেই নেব। তার মানে দাঁড়াবে ওরা আমাকে আলাদাভাবে নিচ্ছে না!”

     

     

    অস্ট্রেলিয়ায় পুরুষদের প্রথম সারির ক্রিকেটে এর আগে কেবল একজন নারীরই খেলার অভিজ্ঞতা আছে। ক্যাথরিন ফিজপ্যাট্রিক ২০০৬-০৭ মৌসুমে ডান্ডেনোংয়ের হয়ে খেলেছিলেন একটি টিটোয়েন্টি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া প্রমীলা ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ক্যারেন রল্টন ২০০০ সালের দিকে খেলেছিলেন কিছু দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির পুরুষ টুর্নামেন্ট।

     

    ইংল্যান্ডে এই তালিকাটা অবশ্য আরেকটু লম্বাই। ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের প্রমীলা শাখার বর্তমান পরিচালক ও জাতীয় নারী দলের সাবেক অধিনায়ক ক্লের কনর চলতি শতকের শুরুর দিকে ছেলেদের ঘরোয়া ক্রিকেটারস কাপে খেলেছেন ওল্ড ব্রাইটোনিয়ান্সের হয়ে। ইংল্যান্ড জাতীয় মহিলা দলের আরেক ক্রিকেটার আরান ব্রিন্ডলের গল্পটা আরও চমকপ্রদ। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ার প্রিমিয়ার লিগে লোথের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন স্বামীর সাথে! ২০১০ সালে একই দলে তিনি নেতৃত্বও দেন! পরের বছর লোথের হয়েই প্রথম প্রমীলা ক্রিকেটার হিসেবে ইংলিশদের আধা-পেশাদার পুরুষ ক্রিকেটে করেন শতরান । দলটার হয়ে এখনও খেলে যাচ্ছেন তিনি। বছর দুয়েক আগে ল্যাঙ্কাশায়ারের বোল্টন অ্যাসোসিয়েশন লিগে প্রথম প্রমীলা ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে নেমে ওয়ালশ’র হয়ে ৪ উইকেট দখলে নিয়েছিলেন কোল ওয়ালওয়ার্ক। আর চলতি বছর ল্যাঙ্কাশায়ারের কেন্দ্রীয় লিগে ছেলেদের আট আটটি উইকেট দখলে নিয়ে তো রীতিমতো সাড়াই ফেলে দিয়েছেন আরেক নারী ইংলিশ ক্রিকেটার কেট ক্রস।

     

    তবে একটা জায়গায় উল্লেখিত সবাইকেই হারিয়ে দিতে যাচ্ছেন সারা টেলর। এ পর্যন্ত যে ক’জন প্রমীলা ক্রিকেটার ছেলেদের আসরে খেলেছেন সেসবের প্রতিটিই ছিল দেশের মাটিতে। বিদেশের কোন পুরুষ টুর্নামেন্টে কোন নারীর অংশগ্রহণ নজিরবিহীন। এই জায়গায় সারাহ প্রেরণা হতে চান আরও অনেক নারী ক্রিকেটারের, “ভাবতেও পারি নি অস্ট্রেলিয়ার এই পর্যায়ের একটি ক্রিকেট আসরে আমিই প্রথম নারী হিসেবে অংশ নেব। তবে নিশ্চিত থাকুন এটা শুরু মাত্র, শেষ নয়।”