• আইপিএল ২০১৯
  • " />

     

    • আইপিএল ২০১৯

    'মানকাড' কি আসলেই ক্রিকেটের চেতনাবিরুদ্ধ?


    ব্যাটসম্যানের মুখভঙ্গি দেখেই হয়তো অনুমান করে নিতে পারবেন, বলটা ব্যাটে লেগেছে তার। কিপার, বোলার, স্লিপ কর্ডন, ক্লোজ-ইন ফিল্ডাররা আবেদন করে গলা ফাটিয়ে ফেললেন। আম্পায়ার নির্বিকার। রিভিউ নেই। ব্যাটসম্যান পরের বলের জন্য গার্ড নিলেন। ক্যাচ মিসের মতো করে আরেকটা জীবন পেলেন তিনি।

    ব্যাটসম্যান ‘ওয়াক’ করলে তাকে অভিনন্দন জানানো যায়। তবে ‘ওয়াক’ না করাটা তার অধিকার।


    অধ্যায় এক : দ্য রাউন্ড-আর্মারস

    একটা গল্প প্রচলিত আছে।

    তখন ‘আন্ডার-আর্ম’ বোলিংয়ের সময়। অর্থ- বল করার সময় হাতটা কনুইয়ের ওপরে উঠবে না। জন উইলিস ভাবলেন অন্য কিছু। ঠিক তিনি ভাবলেন, তা নয়। বলা হয়, আন্ডার-আর্ম থেকে প্রথম ‘উঠে’ দাঁড়িয়েছিলেন জনের বোন ক্রিশ্চিয়ানা। ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে বোলিংয়ের সময় তার পোশাক বড়ই সমস্যা করতো আন্ডার-আর্ম বোলিংয়ে। তাই তিনি শুরু করেছিলেন রাউন্ড-আর্ম। উইলিস উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তাতেই। ধীরে ধীরে সেটা আয়ত্ত করলেন, ব্যবহার শুরু করলেন। তবে বিপত্তি বাঁধাল তখনকার ‘ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ’। রাউন্ড-আর্ম করা যাবে না। ক্রিকেটের সঙ্গে সেটা যায় না।

    ১৮২২ সালের ১৫ জুলাই। কেন্টের সঙ্গে ম্যাচ এমসিসির। কেন্টের হয়ে বোলিং ওপেন করতে এলেন উইলিস। রাউন্ড-আর্ম করলেন। আম্পায়ার ডাকলেন নো। বলটা একদিকে ছুঁড়ে মাঠের বাইরের দিকে হাঁটা দিলেন উইলিস। গিয়ে উঠলেন ঘোড়াতে। চলে গেলেন। সেই যে গেলেন, কথিত আছে, উইলিস আর কোনোদিন সেরকম বড় কোনও ম্যাচে খেলতে নামেননি।

    রাউন্ড-আর্ম বোলিংয়ের শুরুর কৃতিত্ব দেওয়া হয় টম ওয়াকারকেও। হ্যাম্পশায়ারের ওপেনার ছিলেন তিনি মূলত। তবে বোলিংয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালবাসতেন। শরীর থেকে দূরে হাত নিয়ে বল ছুঁড়লে বাড়তি পেস আর বাউন্স মেলে, যেসব ঝামেলায় ফেলে দেয় ব্যাটসম্যানদের- ওয়াকার দেখেছিলেন। রাউন্ড-আর্ম শুরু করেছিলেন। তবে ‘নো’ ডাকা হয়েছিল বারবার। বাধ্য হয়ে ‘নিচে’ নামতে বা আন্ডার-আর্মে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন ওয়াকার।

     

    অধ্যায় দুই : আশ্বিনী বাতাসে নড়ে ওঠে ক্রিকেট

    রবি আশ্বিন কী করেছেন? একটা রান-আউট। একটু ‘অন্যরকম’ রান-আউট। এমন নয় যে, এটা হয়নি এর আগে। তবে এ আউট প্রতিবারই বিতর্ক ছড়ায়। আইপিএলের ম্যাচ চলছিল, রাজস্থান রয়্যালসের ইংলিশ ব্যাটসম্যান জস বাটলার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন, কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব অধিনায়ক আশ্বিন বল করার আগেই। আশ্বিন বলটা করেননি, ঘুরে গিয়ে নন-স্ট্রাইক প্রান্তে ফেলে দিয়েছেন বেইলস। আবেদন গেছে টেলিভিশন আম্পায়ারের কাছে, খুব একটা সময় না নিয়েই বাটলারকে দেওয়া হয়েছে আউট। খানিকটা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় আর একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন বাটলার। উঠে গেছে বিতর্ক। আর উঠেছে কয়েকটা প্রশ্ন।

    প্রশ্ন- আশ্বিন এমন করতে পারেন কিনা। উত্তর- অবশ্যই পারেন। ক্রিকেটের আইন তাকে বাধা দেয় না কোনোভাবেই। এমসিসির ৪১.১৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নন-স্ট্রাইকারের ব্যাটসম্যান যদি বল ‘খেলায় আসার’ পর থেকে বোলারের সাধারণত প্রত্যাশিত সময়ে বল ছোঁড়ার সময়ের আগেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যান, তবে বোলার তাকে রান-আউটের চেষ্টা করতে পারেন।  

    এবং আশ্বিন ব্যাপারটা জানেন বেশ ভালভাবেই। অবশ্য যারা আশ্বিনের সমালোচনা করছেন, আইন তাদেরও জানার কথা। আর এর আগেও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একবার ‘মানকাড’ করেছিলেন তিনি লাহিরু থিরিমান্নেকে, অবশ্য তখন ভারতের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক বিরেন্দর শেওয়াগ তুলে নিয়েছিলেন আবেদন।

    প্রশ্ন- বাটলারের রান-আউটে নিয়ম মানা হয়েছে কিনা। উত্তর- এমসিসি বিবৃতি দিয়েছে। তাদের মতে, এটা আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত। আর যে বিষয় নিয়ে খটকা, আশ্বিন ইচ্ছা করে বলটা করতে দেরি করেছিলেন কিনা, যাতে বাটলার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, এমসিসির মতে সেটা করে থাকলে আশ্বিন ঠিক করেননি। আশ্বিন এটা অস্বীকার করেছেন। তার মতে, তিনি অ্যাকশন ‘লোড’ই করেননি।

    আর এমসিসি যোগ করেছে, ‘আইসিসির ব্যাখ্যানুযায়ী, বল ছোঁড়ার প্রত্যাশিত সময় মাপা হবে ডেলিভারি অ্যাকশনের যে সময়ে হাত সর্বোচ্চ উচ্চতায় ওঠে, সে সময়ে। আম্পায়ার কী বুঝে বাটলারকে আউট দিয়েছেন, সেটা বোধগম্য।’

    প্রশ্ন- ব্যাটসম্যানকে সতর্ক করা উচিৎ ছিল কিনা আশ্বিনের। উত্তর- এর কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তবে একটা অলিখিত ব্যাপার ছিল, বোলার এক্ষেত্রে ব্যাটসম্যানকে ব্যাপারটা ধরিয়ে দেবেন, তিনি ঠিক করছেন না। তবে সেটা মানা না মানা একান্তই বোলারের ব্যাপার।

    প্রশ্ন- আশ্বিন স্পিরিট অফ ক্রিকেট ভঙ্গ করেছেন কিনা। উত্তর- এমসিসি বলছে, তিনি সেটা করেননি।

    এমসিসি আরও যোগ করেছে, “যখন ব্যাটসম্যানরা মিলিমিটার ব্যবধানে এখন টিভি রিপ্লেতে আউট হন, তখন তাদের উপযুক্ত সময়ের আগে ক্রিজ ছেড়ে যাওয়া উচিৎ নয়।”


    অধ্যায় তিন : খলনায়ক

    ১৯৮১। ফেব্রুয়ারি।

    রাউন্ড-আর্ম অ্যাকশন স্বীকৃতি পেয়েছে আরও প্রায় ১২৭ বছর আগে। বোলারদের অ্যাকশন রাউন্ড-আর্ম থেকে হাই-আর্মে উঠেছে। আর আন্ডার-আর্ম এখন হয়ে পড়েছে ক্রিকেটে অচ্ছুত। তবে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়নি সেটা।

    এমসিজিতে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট সিরিজ কাপের পাঁচ ফাইনালের তৃতীয়টি। শেষ বলে টাই করতে ৬ রান প্রয়োজন সফরকারিদের। ট্রেভর চ্যাপেলকে অধিনায়ক ও তার ভাই গ্রেগ চ্যাপেল পরামর্শ দিলেন, আন্ডার-আর্ম বোলিং করতে।  আম্পায়ারকে বললেন ট্রেভর। করলেন সেটাই। ঢুকে গেলেন ইতিহাসে।

    নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া- দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীই রীতিমতো ক্ষোভ জানিয়েছিলেন এরপর। আর অনেকদিন পর ট্রেভর বলেছিলেন, সেই ব্যাপারটা না ঘটলে হয়তো কেউ তাকে মনেই রাখতো না। ট্রেভরের সে কথা অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। ২৩ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারকে কেইবা মনে রাখেন সেভাবে!

    সে সিরিজের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্ডার-আর্ম বোলিং নিষিদ্ধ করে আইসিসি। আন্ডার-আর্ম ছিল, চেতনা-পরিপন্থী বলে কেউ হয়তো সেটা অনুশীলন করতেন না। ট্রেভর সেটার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন।

    উইলিস আন্ডার-আর্ম না করাতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। আন্ডার-আর্ম করাতে ক্রিকেটের ইতিহাস ট্রেভরকে বানিয়ে দিয়েছে ‘খলনায়ক’।

    ক্রিকেট কখন কী চায়, বলা মুশকিল!


    অধ্যায় চার : স্পিরিট অফ ক্রিকেট

    ২০০০ সালে ক্রিকেটের আইনের শুরুতে একটা ভূমিকা যোগ করা হয়, ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ নামে- “ক্রিকেট এর অনন্য আবেদনের জন্য অনেকাংশেই এর ‘শুধু আইন নয়, স্পিরিট অনুযায়ী খেলা হবে’, এই কারণের কাছে ঋণী।”

    তবে মাঝে মাঝেই আইন আর চেতনায় বেঁধে যায় সংঘর্ষ। কখনও চেতনা জেতে। কখনও না।

    ২০১২ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে একটা মানকাড আউটের পর ক্ষমা চেয়েছিল সারে। সমারসেটের ব্যাটসম্যান অ্যালেক্স ব্যারোকে মানকাড করেছিলেন সারের স্পিনার মুরালি কার্তিক। সে মুহুর্তে আবেদন সরিয়ে না নিলেও পরে সারে অধিনায়ক গ্যারেথ ব্যাটি বলেছিলেন, তাদের এই কর্মকান্ডে ক্রিকেটের ‘স্পিরিট’ আহত হয়েছে। অবশ্য কার্তিক টুইটারে মানকাডের পক্ষেই কথা বলেছিলেন।

    ২০১৪ সালেও একবার মানকাডের শিকার হয়েছিলেন জস বাটলার, শ্রীলঙ্কার সচিত্র সেনানায়েকের কাছে। দুইবার বাটলারসহ দুই ইংলিশ ব্যাটসম্যানকে ‘সতর্ক’ করেছিলেন সেনানায়েকে, এরপর আউট করেছিলেন বাটলারকে। শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস আবেদন বহাল রেখেছিলেন। বাটলার আউট হয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কার সে দলে ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে।

    ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আইসিসির স্পিরিট অফ ক্রিকেট পুরস্কার জিতেছিল শ্রীলঙ্কা। জয়াবর্ধনে ব্যক্তিগতভাবে জিতেছিলেন ২০১৩ সালে। ২০১১ সালে এমসিসির স্পিরিট অফ ক্রিকেট- কলিন কাউড্রি লেকচার দিয়েছিলেন সাঙ্গাকারা।

    স্পিরিট বা চেতনা মানকাড আসলেই কেমন রঙ বদলায় ক্রিকেটে!

     

    অধ্যায় পাঁচ : ব্যাটসম্যান-বোলারের লড়াই

    আইপিএলের ওপেনিং ম্যাচ। চেন্নাইয়ের মুখোমুখি বেঙ্গালুরু, এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়াম।

    বেঙ্গালুরু গুটিয়ে গেল ৭০ রানে। চেন্নাই সেটা তাড়া করতে খেলল ১৮তম ওভার পর্যন্ত। বেঙ্গালুরু অধিনায়ক বিরাট কোহলি হতাশ। হতাশ চেন্নাই অধিনায়ক মাহেন্দ্র সিং ধোনিও। কারণটা চিদাম্বরমের উইকেট। সেখানে ব্যাটসম্যানদের জন্য কিছু নেই। এমন উইকেট টি-টোয়েন্টির জন্য আদর্শ নয়। লোকে রান দেখতে আসে।

    তাদের কথা শুনেই যেন হতাশ হরভজন সিং। ম্যাচে ২৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে সেরা ক্রিকেটার হওয়া অফস্পিনার বললেন, “বোলারদের জন্য উইকেট কিছু থাকলেই এসব কথা ওঠে। ব্যাটসম্যানরা রান করলে তো ওঠে না। মাঝে মাঝে এমন উইকেট দরকার, যেটা মনে করিয়ে দেবে, ক্রিকেট খেলাটাই বোলারদেরও একটা ভূমিকা আছে।”

    শুধু টি-টোয়েন্টি নয়, সামনে টেস্ট ক্রিকেটেও আসতে পারে ফ্রি-হিট। বোলারের পা মিলিমিটার ব্যবধান ছাড়ালেই তাকে মাশুল দিতে হবে হয়তো উইকেটের। হয়তো গুণতে হবে বাড়তি কিছু রান। তবুও ব্যাটসম্যান আগে থেকেই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেলে তাকে কেন আউট করা যাবে না?

     

     

    এরপরও যদি কোনও বোলার ব্যাটসম্যানকে নন-স্ট্রাইক প্রান্তে সুযোগ পেয়েও রান-আউট না করেন ইচ্ছা করেই, তবে তাকে অভিনন্দন জানাতে পারি আমরা।

    তবে, ওই বোলারের অধিকার ছিল ওই ব্যাটসম্যানকে আউট করার।