• বিশ্বকাপ বাছাই
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    বাঙ্গালির অস্ট্রেলিয়া-দর্শন

    খেলা শুরুর একদিন আগেই ইন্টারনেটের কল্যাণেই জানা গিয়েছিলো প্রায় অর্ধেক টিকেট বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা। সে খবরের সত্যতা যাচাই করা দুরূহ। কিন্তু খেলা শুরুর ঘন্টাখানেক আগেই স্টেডিয়াম গেটে ঢোকার লাইন বায়তুল মোকাররম থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ছাড়িয়ে গেলে সে খবর যে নিতান্তই বানোয়াট ছিলো না সেরকম ইঙ্গিতই পাওয়া গেলো। সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এমন ঘটনা তো নতুনই বটে। আর আশি-নব্বই দশকের আবাহনী-মোহামেডানের গল্প শুনে বড় হওয়া প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদ।  



    ক্রিকেটের টেস্ট প্লেয়িং কান্ট্রি হওয়ার সুবাদে ওয়ার্নার-ওয়াটসন- মিচেল জনসনদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ আসে প্রায়ই। ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের দূরত্ব যতোখানি, ফুটবলে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশী। আর সকারুদের কাছে বাংলাদেশ ফুটবল তার চাইতেও বেশী অপরিচিত! ওহ! ক্রিকেটের অস্ট্রেলিয়া ক্যাঙ্গারু হলেও, ফুটবলে কিন্তু তাবৎ দুনিয়া তাদের সকারু নামেই চেনে। ফিফা বিশ্বকাপ আর এশিয়া কাপের বাছাইপর্বের নতুন ফরম্যাট না হলে হয়তো কখনোই ঢাকার মাঠে দাপিয়ে বেড়াতে দেখাও যেতো না জেদিনাক, মুইদের।

     



     

    গত ৪ বিশ্বকাপের ৩টিতেই খেলা এই অস্ট্রেলিয়া দল আবার এই বছরের শুরুতেই জিতেছে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। এই দলের টিম কেহিল অনেকদিন ধরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের দল এভারটনের হয়ে খেলেছেন। গত বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে করা কেহিলের গোল তো পুরো টুর্নামেন্টেরই অন্যতম সেরা। ক্যাপ্টেন জেদিনাক খেলছেন ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে। দলে আরো আছে স্টুটগার্ট, লাতসিওর মতো নাম করা ক্লাবে খেলা ফুটবলার। রাত জেগে ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখা এই প্রজন্মের জন্য আশীর্বাদ নয় তো কি?



    সেই টিম কেহিলরাই যখন ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরের পাড়ের দেশে, তখন এই খেলার উন্মাদনা তো চূড়ায়ই থাকবে। ঠিক যেমনটি ভাবা হয়েছিলো, হলোও তাই। নিরাপত্তা আর র‍্যাংকিং এর আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছাপিয়ে মাঠ ভর্তি দর্শক মামুনুল, জামাল ভুঁইয়াদের খেলতে দেখলো বাংলাদেশের বিচারে পরাক্রমশীল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। সেই কেহিলই হ্যাট্রিক করে বড় জয় ছিনিয়ে নিলেন দলের হয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তো আর প্রতিদিন হ্যাট্রিক আসে না। সে কথা নিশ্চয়ই কেহিলও ভালো জানেন। তাই আলাদা করে বাংলাদেশকে মনে রাখার এক উপলক্ষই পেলেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশী গোল করা এই স্ট্রাইকার। বড়  জয়টা তো অনুমিতই ছিলো।

     



    কেহিলের প্রথম গোলের পর কিন্তু একটা সময় মনে হচ্ছিলো, ফাবিও লোপেজের দলের জন্য হারটা বোধ হয় বড় ব্যবধানে নাও হতে পারে। কিন্তু খেলার আধ ঘণ্টা পার হওয়ার পর মিনিট দশেকের মধ্যে ৩ গোল খেয়ে কপাল পোড়ে বাংলাদেশের, আর বড় জয়ের পথেই হাটে সকারুরা। প্রথম গোলের পর তো উত্তর গ্যালারির কয়েক জন অস্ট্রেলিয়ান সমর্থক আদুল গায়ে পতাকা হাতেই মাঠে ঢুকে পড়লেন। অগত্যা তাদের তাড়াতে, পুলিশকে ডেকে আনতে হলো অস্ট্রেলিয়ার দলের কর্মকর্তাদের একজনকে! ম্যাচের বাকী সময় ঐ ১০/১২ জন সমর্থকই মাতিয়ে রাখলেন গ্যালারি! ভিআইপি গ্যালারির দো’তলায় ও দেখা মিললো হলুদের মাঝে সবুজ রঙ্গে অস্ট্রেলিয়া লেখা ব্যানারের পেছনে কিছু সকারু সমর্থকদের। আর গ্যালারি ভরা লাল-সবুজের দর্শক দলের আক্রমণ, আক্রমণের চেষ্টা, ভালো ডিফেন্স, এমন কি মাঝমাঠের থ্রো-ইন আদায়েও সমর্থন যুগিয়ে একেবারে ঝানু সমর্থক হিসেবেই নিজেদের পরিচয় করিয়ে দিলেন ভিনদেশী অতিথিদের কাছে। দ্বিতিয়ার্ধে গোল না খাওয়ার কেমন তৃপ্তিও কাজ করলো তার সাথে।



    হারটা ৪ গোলের হলেও তাই অসম্মানের না। এমন দলের বিপক্ষে বরং ৪ গোল হজম করাও নাকি কম, এমন কথাও শোনা গেলো গ্যালারীর দর্শকদের মুখ থেকে। এদিন ফলাফল থেকে মাঠের খেলা উপভোগ করাই ছিলো মূল আকর্ষণ। অবশ্য উচ্চাভিলাষী কিছু সমর্থককে ৪৩ মিনিটের জেদনিয়াকের গোলের পর গ্যালারী থেকে বের হয়ে যেতে দেখা গেলো। বাড়ি ফিরে দ্বিতীয়ার্ধে আর কোন গোল না খাওয়ার সংবাদ শুনে তাদের কেউ কেউ নিজেদের ‘অপয়া’ ভেবে বসে থাকলেও থাকতে পারেন!



    পুরো খেলার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য অবশ্য দেখতে পেলো শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকা আধ ভরা গ্যালারীর দর্শকেরা। পুরো দুনিয়ার বোধ হয় শুধুমাত্র বাংলাদেশেই এমনটা হয়। এটিকে এখন বাংলাদেশ দলের “ট্র্যাডিশন” ই বলা চলে। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই মাঝমাঠে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো অস্ট্রেলিয়া দলের সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালির চিরচেনা “আতিথেয়তার” জানানটা দিয়ে রাখলো মামুনুলরা। মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারীর দর্শকদের উদ্দেশ্যে তালি দিতে দিতে কয়েক জন জার্সিও ছুড়ে মারলেন গ্যালারীর দিকে। মাত্র এক দিনের জন্য বাংলাদেশে এসে, যেন কিছু দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এ দেশের সমর্থকদের। সকারু গোলরক্ষক অ্যাডাম ফেডিরিচির সাথে জার্সি বদলের সময় তাকে কি যেন একটা বললেন শহীদুল। হয়তো, আবার কখনো এখানে আসার আমন্ত্রণটাই দিয়ে রাখলেন তাঁকে!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন