• " />
    X
    GO11IPL2020

     

    বিপিএলের কাবুলিওয়ালারা

     

    ক্রিকেটে ‘মার্সেনারি’ শব্দটা মোটা দাগে ওইসব ক্রিকেটারদের জন্য ব্যবহার করা হয় যারা কিনা বিভিন্ন কারণে স্ব স্ব জাতীয় দলে নিয়মিত নন, কিন্তু বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজনে তাঁরা পরিচিত মুখ। এঁদের কারও গায়ে থাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য ‘আনফিট’ তকমা, কেউ নিজ দেশের ক্রিকেট কর্তাদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে বিবাগী, কেউবা আবার স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন ‘ফ্রিল্যান্স’ ক্যারিয়ার। দু'দিন পরেই শুরু হতে যাওয়া বিপিএলের তৃতীয় আসরকে সামনে রেখে বাংলাদেশেও বসতে যাচ্ছে দেশী-বিদেশী ক্রিকেটারদের মেলা। সেখানে এমন ‘কাবুলিওয়ালা’ ভিনদেশী ক্রিকেটার কতজন আছেন? প্যাভিলিয়নের এই আয়োজনে সেটাই খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এখানে যাদের কথা বলা হচ্ছে, তাঁদের সবাই যে জাতীয় দলে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন তা নয়। এঁদের কেউ কেউ স্বদেশের হয়ে যেমন এখনও প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন, তেমনি মাতিয়ে যাচ্ছেন কুড়ি ওভার ক্রিকেটের নানা দেশী সংস্করণ।


     

    ক্রিস গেইল

    টিটোয়েন্টির বর্তমান দুনিয়ায় হাতে গোনা যে ক’জন ক্রিকেটারকে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক দল প্রথম একাদশে পেতে চাইবে, ক্রিস গেইল নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম। ৩৬ বছর বয়সী এই জ্যামাইকান জায়ান্টকে ‘মার্সেনারি’ মানতে যদি কারো আপত্তি থাকে, তবে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে তাঁর আন্তর্জাতিক আর ক্লাব পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই কোন সংশয় থাকার কথা নয়। এ পর্যন্ত সব ধরণের আসর মিলিয়ে ২২২টি টি-২০ ম্যাচ খেলেছেন, এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সি গায়ে নেমেছেন মাত্র ৪৫ বার।

    আন্তর্জাতিক ম্যাচ বিবেচনায় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬ নম্বরে, রান করেছেন ১৪০৬। আর সব ধরণের টুর্নামেন্ট মিলিয়ে তাঁর টি২০ রানসংখ্যা ৮ হাজার ২২৪; বলা বাহুল্য, তাঁর ধারেকাছেও নেই কেউ। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে রয়্যাল চ্যালেঞ্জারস ব্যাঙ্গালোরের হয়ে তাঁর করা অপরাজিত ১৭৫ রান এই ফরম্যাটের ক্রিকেটে এখনও পর্যন্ত এক ইনিংসে সর্বোচ্চ। ওই ইনিংসে কেবল চার আর ছয় থেকেই তুলে নিয়েছিলেন ১৫৪ যা কিনা টিটোয়েন্টির ইতিহাসে এক ইনিংসে শুধু বাউন্ডারি থেকে নেয়া সবচেয়ে বেশী রান।

    অন্তত ত্রিশটি ম্যাচ খেলেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে চল্লিশের উপর গড়টাও তাঁর একার দখলে, ৪৪.২১। সর্বাধিক ১৬টি শতক, ৫২টি অর্ধশতক আর ৫৮৬টি ছয়ের মারে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল তিনিই। বলও খেলেছেন সবচেয়ে বেশী ৫ হাজার ৫১০টি। দু’শর বেশী ম্যাচ খেলে টিটোয়েন্টিতে তাঁর ১৪৯.২৫ স্ট্রাইক রেটকে পিছনে ফেলা একমাত্র ক্রিকেটার তাঁরই স্বদেশী কাইরন পোলার্ড (১৫৩.১২)।

    আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে এ পর্যন্ত খেলেছেন ১৪টি দলের হয়ে। বিপিএলের গত দুই আসরে ছিলেন যথাক্রমে বরিশাল বার্নার্স ও ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসে। এ যাত্রায় তাঁকে দলে ভিড়িয়েছে বরিশাল বুলস।

     

    ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের জার্সিতে ক্রিস গেইল

     

    ব্র্যাড হজ

    ৬, ২৫, ১৫; অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের হয়ে ব্র্যাড হজের খেলা টেস্ট, ওয়ানডে ও টিটোয়েন্টির সংখ্যা। অথচ সব ধরণের আসর মিলিয়ে টিটোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশী ম্যাচ খেলা ক্রিকেটারদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ষষ্ঠ। সর্বাধিক রান সংগ্রাহকদের মধ্যে ক্রিস গেইলের পরই আছেন তিনি। দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টিটোয়েন্টিতে ৬ হাজার রানের মাইলফলক পেরিয়েছেন, এ পর্যন্ত করেছেন ৬ হাজার ৬৬১ রান। ডেভিড ওয়ার্নারের সাথে এই মুহূর্তে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪টি টি-২০ অর্ধশতকের মালিকও তিনি। ডানহাতি এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান একটা জায়গায় অবশ্য এই মুহূর্তে সবার উপরে, টিটোয়েন্টিতে হাঁকিয়েছেন সবচেয়ে বেশী ৬৬০টি চার।

     

    বরিশাল বার্নার্সের হয়ে গত বিপিএলে ব্র্যাড হজ

     

    বয়সে ৪১ ছুঁইছুঁই হজ জাতীয় দলের বাইরে আজ অব্দি খেলেছেন ১৬টি দলে; এর চেয়ে বেশী ১৭টি দলে খেলেছেন একজনই, আরেক অস্ট্রেলিয়ান ‘মার্সেনারি’ ডার্ক ন্যানেস। অবশ্য বিপিএলের আসন্ন আসরে সিলেট সুপারস্টারসের জার্সি গায়ে চড়ালেই ন্যানেসকে ধরে ফেলবেন ইতিপূর্বে বরিশাল বার্নার্সে খেলে যাওয়া এই টিটোয়েন্টি স্পেশালিস্ট।

     

    রায়ান টেন ডেসকাট

    তাঁর দেশ এখনো আইসিসির সহযোগী সদস্য। স্থায়ী আন্তর্জাতিক মর্যাদা আছে কেবল টিটোয়েন্টিতে। সঙ্গত কারণেই দেশের হয়ে খুব বেশী ম্যাচ খেলার সৌভাগ্য এখনও পর্যন্ত হয় নি রায়ান টেন ডেসকাটের। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে এ যাবত খেলতে পেরেছেন মাত্র ৯টি ম্যাচ। অথচ সব ধরণের আসর মিলিয়ে সবচেয়ে বেশী টিটয়েন্টি খেলা ক্রিকেটারদের তালিকায় তাঁর অবস্থান চমকে দেয়ার মতোই, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডোয়াইন ব্রাভোর সাথে যৌথভাবে তৃতীয়!

     

    ঢাকা ডায়নামাইটসের দুই সতীর্থ নাসির-মুস্তাফিজের সাথে টেন ডেসকাট (ডানে)

     

    জাতীয় দল ছাড়া খেলেছেন আরও ৯টি দলের হয়ে। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায়ও আছেন ১২ নম্বরে (৫ হাজার ২৫৬ রান)। ২৯.৩৬ গড় আর ১৩৮.৪২ স্ট্রাইক রেট ব্যাট হাতে সামর্থ্যের জানান দেয়। ২৬.৪৬ গড়ে উইকেটও নিয়েছেন ৯৬টি। টিটোয়েন্টিতে ২ শতক ও ২৩ অর্ধশতকের মালিক দ. আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই ক্রিকেটার গত বিপিএলে খেলে গিয়েছেন চিটাগং কিংসে। সেবার ঢাকা লিগেও খেলেছেন গাজী ট্যাংকের হয়ে। এবারের বিপিএলে তাঁর দল ঢাকা ডায়নামাইটস।  

     

    শোয়েব মালিক

    এক দশকের ক্যারিয়ারে টিটোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ২০৭টি, রান করেছেন ৫ হাজার ৩৮২। কুড়ি ওভারের ম্যাচ খেলার দিক থেকে তিনি বিশ্বে ক্রিকেটারদের মধ্যে ১৮তম, আর রানের খাতায় তাঁর অবস্থান দশম। পাকিস্তান জাতীয় দলসহ এ পর্যন্ত খেলেছেন দশটি দলে। টিটোয়েন্টি শতক না থাকলেও আছে ৩৫টি অর্ধশতক। ৩৮.৪৪ গড়ের সাথে স্ট্রাইক রেট ১২৪.০৯। বল হাতেও অফ স্পিনে ১২৯ ইনিংসে উইকেট নিয়েছেন ১০৩টি, ২ বার ৫ উইকেট। এই পাকিস্তানি তারকা প্রথমবারের মতো বিপিএল মাতাবেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে।

     

     

    সুনীল নারিন

    ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের বাইরে এ যাবত টি-টোয়েন্টি খেলেছেন কেবল পাঁচটি দলের হয়ে। এসবের মধ্যে আইপিএলের কলকাতা নাইট রাইডার্সই তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা। সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটের ক্রিকেটে তাঁর অফ স্পিনের কার্যকারিতা ঠিক পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। তাও অংকের হিসেব কষতে গেলে জানবেন একশ’র বেশী টিটোয়েন্টি খেলেছেন এমন বোলারদের মধ্যে রানপ্রতি উইকেট নেবার গড় সবচেয়ে ভালো তাঁরই, ১৬.৩৩।

     

    আইপিএলের কলকাতা নাইট রাইডার্সই নারিনের সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা

     

    চার বছরের ক্যারিয়ারে খেলে ফেলেছেন ১৬৪টি টি-টোয়েন্টি, উইকেট নিয়েছেন ২১২টি। এক ইনিংসে চার উইকেট নিয়েছেন ১০ বার, পাঁচ উইকেট ১ বার। সবচেয়ে বেশী ১১ বার ইনিংসে চার বা ততোধিক উইকেট নেবার কৃতিত্বে তাঁর একমাত্র অংশীদার লঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গা। মালিঙ্গা অবশ্য রেকর্ড ৪ বার পাঁচ উইকেট পেয়েছেন, তবে নারিনের চেয়ে তিনি ম্যাচ বেশী খেলে ফেলেছেন ৫৬টি । প্রথমবারের মতো বিপিএলে নারিন যাদু দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে কুমিল্লার ফ্র্যাঞ্চাইজিটি।


     

    আন্দ্রে রাসেল

    টিটয়েন্টিতে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশী স্ট্রাইক রেটের রেকর্ডটা দুই বছরেরও বেশী সময় ধরে নিজের করে রেখেছেন। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে তালাওয়াজের হয়ে ট্রাইডেন্টের বিপক্ষে করেছিলেন ৬ বলে ২৯ রান, ৪৮৩.৩৩ স্ট্রাইক রেটে। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেট বিবেচনায় তাঁর অবস্থান এই মুহূর্তে বিশ্বে দ্বিতীয়, আর একশ’র বেশী ম্যাচ খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে তাঁর ১৬৭.৬৪ স্ট্রাইক রেটই সবচেয়ে বেশী।

     

     

    ছয় বছরের ক্যারিয়ারে ১২৯ ইনিংসে ২ হাজার ২৩১ রান। শতক না থাকলেও আছে ১০টি অর্ধশত রানের ইনিংস। ৩২.৩৩ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ১০৯টি; ৪ বার চার উইকেট। ক্যারিবিয়ান লিগ ছাড়াও টিটোয়েন্টিতে খেলেছেন আইপিএল, বিপিএল, বিগ ব্যাশ আর ইংলিশ কাউন্টিতে; এ পর্যন্ত মোট দশটি দলে। ইতিপূর্বে খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসে খেলে গেছেন, এবার তাঁকে দলে ভিড়িয়েছে কুমিল্লা।

     

    শহীদ আফ্রিদি

    মার মার, কাট কাট ব্যাটিংয়ের জন্যই তাঁর খ্যাতি-কুখ্যাতি। অবিবেচকের মতো শট খেলে ইনিংস বড় করতে পারেন না বলেও দুর্নাম আছে। তথাপি কুড়ি ওভারের ক্রিকেটের দুনিয়াজোড়া আসরগুলোতে নিজের উপস্থিতি সগর্বে জানান দিয়ে যাচ্ছেন মূলত ব্যাট হাতে ঈর্ষণীয় স্ট্রাইক রেটের পাশাপাশি লেগ স্পিনে বল হাতেও উল্লেখ করার মতো সাফল্যের কারণে।

     

     

    দেড়শ’র বেশী টিটোয়েন্টি খেলেছেন এমন ক্রিকেটারদের মধ্যে তাঁর ১৫৩.৭০-এর চেয়ে বেশী ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট আছে এই মুহূর্তে এক জনেরই, আন্দ্রে রাসেলের। ৭টি অর্ধশতকসহ তাঁর টিটোয়েন্টি রানসংখ্যা ২৬৯৯। বল হাতেও ২১.৬৩ গড়ে নিয়েছেন ২০৩টি উইকেট। দু’শর বেশী টিটোয়েন্টি উইকেট থাকা মাত্র ১২ জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের মধ্যে তাঁর অবস্থান ১১তম। ওভারপ্রতি রান খরচটাও টিটোয়েন্টির বিচারে ব্যয়বহুল বলার সুযোগ নেই, ৬.৭০। জাতীয় দল ছাড়া টিটয়েন্টি খেলেছেন ১৪টি দলের হয়ে। বিপিএলে এ যাত্রায় তাকে নিশ্চিত করেছে সিলেট সুপারস্টারস।

     

    রবি বোপারা

    টিটোয়েন্টিতে এ পর্যন্ত দু’শ ম্যাচ খেলা ২৪ জন ক্রিকেটারের একজন তিনি। ৪ সহস্রাধিক রানের সাথে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে এই পেসার অলরাউন্ডারের উইকেট আছে ১৩৩টি। ইংল্যান্ড জাতীয় দল আর ইংলিশ কাউন্টির বাইরে খেলেছেন আইপিএল, বিগ ব্যাশ, বিপিএল আর নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া টুর্নামেন্টে।

    এর আগে চিটাগং কিংসে খেলে গেছেন, বিপিএলের তৃতীয় আসরে তাঁকে দেখা যাবে সিলেটের দলে।

     

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন