• ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯
  • " />

     

    • ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯

    সাকিব আল হাসান : আপনার স্বপ্নের সমান বড়

    হয়তো ইনসেপশন আপনার প্রিয় সিনেমা। শুধু নোলান-ক্ল্যাসিক বলে নয়। শুধু লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও আছেন বলে নয়। স্থাপত্যবিদ্যা আপনার প্রিয়, সে কারণেও নয়। হয়তো আপনি স্বপ্নবাজ কেউ। আপনি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসেন। স্বপ্ন আপনার কাছে নেশার মতো। তবে শেষ দৃশ্যে ডম কব-রূপী ডিক্যাপ্রিওর লাটিমটা থেমেছিল বলে ভাবতে আপনি ভালবাসেন। বাস্তবতাই যে তখন আপনার কাছে স্বপ্নের মতো প্রিয়। 

    সাকিব আল হাসান আপনার স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলেন। তিনি আপনার স্বপ্নের সমান বড়। 

    ****

    পোর্ট অফ স্পেনে ১২ বছর আগে সাকিব কি খুব বড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আলাদা করে? হয়তো না। আপনি তামিম ইকবালে ঘোরলাগা সময় পার করছেন তখন। ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে এসে স্ট্যান্ডে পাঠানো বলের সঙ্গে আপনার স্বপ্ন উড়ে চলছে। আপনি হয়তো চিমটি কেটে বাস্তবে ফিরে এসে হোস্টেল ডাইনিংয়ের থালা দিয়ে আরেকবার আঘাত করেন টেবিলে, সেটিই আপনার আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। 

    তবে ১০ বছর আগে সাকিব যখন আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর অলরাউন্ডার হলেন, আপনি তাকে বিশ্বসেরা বানিয়ে দিলেন নির্দ্বিধায়। আপনি স্বপ্নের প্রথম স্তরে গেলেন। ভাইয়ের মেসে দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে আলোচনা করতে করতে আপনি ধন্দে পড়ে যান, এটা সম্ভব কিনা। আপনার দেশের একজন ক্রিকেটার বিশ্বের এক নম্বর- এ স্বপ্ন না হয়ে পারে না। তবে আপনি স্বপ্ন ভালবাসেন। আপনি স্বপ্নবাজ। আপনার ভাইয়ের ইমেইল আইডি স্বপ্নবাজ জিরোসেভেন। আপনার ভাইও নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখেন। 

    শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সেই ম্যাচটা। সেই ৯২ রানের ইনিংসটা। যেন স্বপ্ন থেকে উঠে এসেছে। আপনার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। সাকিবকে নিয়ে আপনার স্বপ্ন বাড়ে। স্বপ্নের স্তর বদলায়। অথবা নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সেই সেঞ্চুরিটা। শের-ই-বাংলার ইন্টারন্যাশনাল গ্যালারিতে আপনি অক্টোবরেও ভ্যাপসা গরমের উত্তাপ পান। আর সাকিবের ব্যাট হাতে তেড়ে আসাটা। 

    সাইটস্ক্রিনের আশেপাশে কেউ ঘোরাঘুরি করছে। সাকিব তাকে সরে যেতে বলছেন। আম্পায়ার আলিম দার বলছেন। বোলার ড্যারিল টাফি বলছেন। সাইটস্ক্রিনের ওপরের স্ট্যান্ডে বসে আছেন বলে মাথার ওপর থেকে ছাতা নামিয়ে নিয়েছেন আপনারা, কিন্তু সাকিবের দৃষ্টি অন্য কারও দিকে। শেষকালে তিনি নিজেই ছুটে এলেন। সীমানার কাছ বরাবর। ব্যাট নাড়িয়ে কাউকে সরে যেতে বলছেন। আপনার ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন সাকিব। আপনার কাছে স্বপ্ন স্বপ্ন লাগে। আপনার স্বপ্নের স্তর বদলায়। 

     

     

    তবে ইনসেপশনে স্বপ্নের স্তর বাড়তে থাকার সঙ্গে হানা দেয় লিম্বো। যা থেকে ফেরার উপায় নেই। আপনি বাস্তবে ফিরতে পারেন না বলে স্বপ্ন আপনার কাছে একঘেয়ে হয়ে পড়ে। আপনার বয়স বাড়ে। 

    সাকিব নিষিদ্ধ হন ড্রেসিংরুমে অঙ্গভঙ্গী করে। আপনি লিম্বোতে চলে যান। সাকিবকে ‘ব্যাড বয়’ ভেবে কিছু লিখতে বসেন। সাকিবকে বাংলাদেশ বুঝে না বলে মনে হয়। সাকিব আপনাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনেন কি? 

    ২০১১ বিশ্বকাপে সাকিব আপনার দেশের অধিনায়ক। মাশরাফির কান্না ভুলে আপনি কী স্বপ্ন বাঁধেন যেন। ভারত সে স্বপ্নে আঘাত করে। ৫৮ আঘাত করে। ৭৮ বুড়ো আঙুল দেখায়। সাকিব সিনিয়রদের কোনও কথার একটু সরাসরি জবাব দেন। আপনি হয়তো সাকিবের পক্ষে যুক্তি খোঁজেন। সাকিব আপনার প্রজন্মের একজন। আপনার সঙ্গে তার জেনারেশন গ্যাপ কম। 

    চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ থেকে আপনি সাকিবকে হয়তো আলাদা করতে পারেন না। আপনার চোখে ভাসে মাহমুদউল্লাহ। কানে আসে আতহার আলি খানের ‘ব্যাক-টু-ব্যাক’। রুবেল হোসেনের দুরন্ত হয়ে ওঠা অ্যাডিলেডের বুকে। 

    চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আলাদা করে স্বপ্ন দেখায়? কার্ডিফ? সে স্বপ্ন কোন স্তরের ছিল? 

    পাকেচক্রে আপনি মিরপুরে সাকিবকে সামনাসামনি দেখেন তার প্রেস কনফারেন্সে। স্বপ্ন-বাস্তবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তখন হয়তো। আপনার সয়ে যেতে থাকে হয়তো স্বপ্নের তীব্রতা। আপনি আর আলাদা করে কিছু ভাবেন না। 

    মেসেঞ্জার কলে নেওয়া সাকিবের সাক্ষাতকারের কথা আপনি ভুলতে পারেন না অবশ্য। লর্ডস বা এমসিজিতে সেঞ্চুরির সঙ্গে ১০ উইকেট, নাকি বিশ্বকাপ ফাইনালে ম্যাচসেরা-- সাকিবকে অপশন দেওয়া হলে তিনি কোনটি বেছে নিতেন? সাকিব সোজাসাপটা বলেন- বিশ্বকাপটা পেলে আর কিছু লাগবে না। 

    আপনি স্বপ্ন দেখেন? 

    **** 

    আফগানিস্তানের সঙ্গে সাউদাম্পটনের ম্যাচ শেষের সাত ঘন্টা পরও ফেসবুক স্ক্রল করলে গড়ে দুইটি পোস্টের একটিতে আপনি সাকিবের নাম দেখেন। প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচের কাভারেজে চোখ বোলালে প্রতিটি শিরোনামে সাকিবকে দেখেন। একঘেয়ে লাগে? হয়তো না।

    এই সাল ২০১৯-এ এসে এক বিশ্বকাপে সাকিবকে প্রতি ম্যাচে পারফর্ম করতে দেখে যেমন একঘেয়ে লাগে না আপনার। ওভালকে সাকিব ভুলিয়ে দেন টনটন দিয়ে। কার্ডিফে আরেক স্বপ্ন দেখাতে গিয়েও আটকে যান। সাউদাম্পটনে এসে স্বপ্নের সীমাকে অনেক দূর ঠেলে দেন। 

    রশিদ খানের বলে তাকে প্লাম্ব মনে হয়। আম্পায়ার রিচার্ড কেটেলব্রো আউট দেন। তবে সাকিবের রিভিউ নেওয়া দেখে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মুশফিককে ইঙ্গিত করেন, বলটা ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। হক-আই সাকিবকে ভুল প্রমাণ করতে পারে না। এই বিশ্বকাপটা সাকিব নিজের করে নিয়েছেন, সেখানে একটা রিভিউ তো নস্যি! শেষ পর্যন্ত এলবিডব্লিউই হন, তবে রিভিউ নেন না। ফর্মের এই পর্যায়ে থাকলে হয়তো ব্যাটসম্যান নিজেই বুঝে যান, কোনটিতে এলবিডব্লিউ হয়েছেন, কোনটিতে হন নি। আপনার কাজে যদি এমন আত্মবিশ্বাস থাকতো আপনার! এমন কথা মনে হয় নাকি? হতেই পারে। 

     

     

    আফগানিস্তান প্রথম ১০ ওভারের ৮ ওভারই স্পিনারদের দিয়ে করিয়েছে এদিন, বাংলাদেশ করায়নি এক ওভারও। সাকিব আসেন এরপর। 

    সাকিবের বোলিং ফিগার আপনাকে ধন্দে ফেলে দেয় আরেকবার, স্কোরবারে কোনটি রান আর কোনটি উইকেট। আফগানিস্তান আপনার বুকে কাঁপুনি ধরা পারে না হয়তো আর। সাকিব আপনাকে অন্যরকমের আত্মবিশ্বাস দেন। 

    সাকিব রেকর্ড ভাঙেন। আপনার কাছে সেটা বিস্ময়ের মনে হয় না আর। হয় আপনি ঘোরের চূড়ান্ত পর্যায়ে, অথবা আপনার ঘোর কাটেনি। সাকিব মিসফিল্ড করেন। ইয়ান স্মিথ বলে ওঠেন ধারাভাষ্যে, ‘সাকিব ইজ অফিশিয়ালি হিউম্যান’। আপনার কানে বাজে ২০১৫ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ডেল স্টেইনকে ছয় মারার পর গ্রান্ট এলিয়টকে বলা স্মিথের কথা, ‘সুপারম্যান’। সাকিবকে আপনি হয়তো সুপারম্যান বলে জানেন, কিন্তু ‘অফিশিয়ালি হিউম্যান’ কথাটা আপনাকে আবার স্বপ্নের সীমানায় নিয়ে যায়। 

    **** 

    যখন ভোর হয়ে যাওয়ার পরও নিদ্রা-বাবাজি আপনার কাছে আসতে চায় না, আপনি জোর করে স্বপ্ন দেখতে চান। স্কুলের ফুটবল টুর্নামেন্টে আপনি লাফিয়ে ভলি করে গোল করছেন, আপনার নাম জানেন না এমন ক্লাসটিচার আপনার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন অপার বিস্ময়ে-- হয়তো আপনি এমন স্বপ্ন দেখতেন। 

    আপনার স্বপ্ন কয়েক স্তরের। যে স্বপ্ন পূরণের, আপনি সেটা দেখতে ভালবাসেন। যে স্বপ্ন পূরণের নয়, আপনার কাছে সেটা নেশার মতো।

    আপনি হয়তো এজবাস্টনে ভারতের অপেক্ষায়। সাকিবও তাই। আপনি হয়তো স্বপ্ন দেখছেন। এরপর আবার লর্ডস নিয়ে ভাবছেন, যেখানে থাকবে পাকিস্তান। সেই লর্ডস, ২০১০ সালে যেখানে তামিমের স্বপ্নপূরণের সেঞ্চুরিতে আপনি নতুন স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

    হয়তো স্বপ্ন পূরণ হবে। আপনি সেটা দেখতে ভালবাসেন। হয়তো হবে না। আপনার কাছে সেটি নেশার মতো হয়ে যাবে। আপনি রিপিট করবেন প্লেলিস্টের গানের মতো করে। স্বপ্ন। বাস্তব। স্বপ্ন। বাস্তব। 

    তবে অনেকদিন পর ২০১৯-এর ইংলিশ গ্রীষ্মে পেছন ফিরে তাকালে আপনি দেখবেন, সাকিব আল হাসান ছিলেন আপনার স্বপ্নের মতো বড়। 

    হয়তো ইনসেপশন আপনার প্রিয় সিনেমা। তবে শেষ দৃশ্যে ডিক্যাপ্রিওর লাটিমটা থেমে গিয়েছিল বলে ভাবতে আপনি ভালবাসেন। আপনার কাছে বাস্তবতা তখন স্বপ্নের চেয়েও মধুর। 

    সাকিব যেমন স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলেন। সাকিব আপনার স্বপ্নের সমান বড়।