• ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯
  • " />

     

    শুধুই একটি ক্রিকেট ম্যাচ?

    ঠিকঠাক ঘুমিয়েছেন গত রাতে? তার আগের রাতে? হ্যাঁ? হ্যাঁ? আচ্ছা, ঠিক আছে।

    কেন উইলিয়ামসনও সেদিন রাতে নাকি ঘুমিয়েছেন। ঠিক আছে, একটা ক্রিকেট ম্যাচই তো মাত্র। আপনাকে সামনে এগুতে হবে। তবুও উইলিয়ামসনকে কেন জানি তাড়া করে ফিরছে সেটা, আদতে ব্যাপারটা কী হয়েছিল, মেলাতে পারছেন না। নিউজিল্যান্ড কোচ গ্যারি স্টিড ঘুমাতে পারেননি। এতবার ম্যাচটা হাতে এসেও কেন জিততে পারলো না নিউজিল্যান্ড! এতো এতো রান ঘোরাফেরা করে মাঠের এখানে-সেখানে, একটা রান বের করা গেল না আর? মার্টিন গাপটিলকে তার রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের জন্য নামানো হয়েছিল, তিনি কোনও অলৌকিক গতিতে পৌঁছাতে পারলেন না কেন ক্রিজে ওই শেষ বলটায়! ঘুমাতে পারেননি ইংল্যান্ড স্কোয়াডেরও অনেকেই। কীভাবে জিতলেন তারা? স্টোকস কীভাবে কী করলেন আসলে? আর্চার স্নায়ুর চাপ ধরে রাখলেন কীভাবে! সেই ওভারথ্রো, এই জগতেই ঘটেছে সেটা? 

    জিমি নিশাম বা নিউজিল্যান্ডের অনেককেই এ ম্যাচ তাড়া করে ফিরবে, তারা তখন ব্যাখ্যা খুঁজতে যাবেন। একটা কিছু দাঁড় করাবেন। এরপর সেটা হারিয়ে যাবে মুহুর্তেই। ফিরে আসবে সেই দিনটা। ইংল্যান্ড এরই মাঝে অ্যাশেজের চিন্তা করছে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের দল ঘোষণাও হয়ে যাবে শীঘ্রই। তারা পেছনে ফেলে যাবে এই দিনটা। তবে কোনও এক মুহুর্তে, তাদের কারও সামনে ঝলক দিয়ে যাবে এদিনের কোনও একটা মুহুর্ত। হয়তো সবার সেটা মনে থাকবে না আলাদা করে। তবে তার থাকবে। একটা হার্টবিট মিস করে যেতে পারে হুট করেই, সেটা যদি ঠিক সেটাই না হতো, তাহলে তাদের পরবর্তীকালের উল্লাসটা রূপ নিতে পারতো বিষাদে। 

    আর আপনি এ ম্যাচ দেখে থাকলে, বা এ ম্যাচের গল্প পড়ে থাকলে, হয়তো এর কোনও চরিত্রকে দেখে আপনার মনে পড়ে যাবে, ঠিক এইদিন তিনি কী করেছিলেন। অথবা আপনি কী করেছিলেন। কিংবা বছরপূর্তিতে কোথাও সেদিনের এই দিনে ধরনের পোস্ট দেখলে আপনার মনে পড়বে, এদিনের মুহুর্তগুলি। আপনার স্মৃতি ক্ষয়ে যাবে, হয়তো শেষ পর্যন্ত একটা মুহুর্ত থাকবে মস্তিস্কের হার্ডড্রাইভে। কিছু একটা। সেটা হতে পারে খুবই র‍্যান্ডম কিছু। হতে পারে ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’-এর কোনও এক শেষ মুহুর্ত। 

    তেমন কিছু হবে না বলছেন? ঠিক আছে! 

    শুধুই তো একটা ক্রিকেট ম্যাচ!

    ****

    বেন স্টোকসের কিছুই হচ্ছিল না। মানে তার মুখভঙ্গি বলছিল, তার দ্বারা কিছু হচ্ছিল না। যেন দেওয়ালে আটকানো টিভির পেছনে হাত দিয়ে একটা স্ক্রু খোলার চেষ্টা করছেন আপনি, হচ্ছে না কিছুতেই। 

    হয় বেন স্টোকস, নাহলে নাই- এ পরিস্থিতি তখন। ট্রেন্ট বোল্টের দুই ব্লকহোলের বলেই অফসাইডে খেললেন, একই জায়গায়, বৃত্তের ভেতর কেন উইলিয়ামসনের কাছে আটকে গেল বল। সিঙ্গেল নিলেন না। সিঙ্গেল এখন আর কিছু করতে পারবে না। হয় তিনি বড় কিছু করবেন, আর নাহলে না। ওপাশে থাকা আদিল রশিদের ক্যারিয়ারে ১০টি প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি আছে। তবে রশিদও জানেন, কিছু করলে করতে হবে ওই স্টোকসকেই। তিনি আপাতত দর্শক।

    বোল্ট লেংথ একটু কমিয়ে ফেললেন এরপর। আগের ওভারে বোল্ট স্টোকসের ক্যাচটা প্রায় ধরে ফেলেছিলেন। গ্রুপপর্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচে কার্লোস ব্রাথওয়েট যখন আবার ইডেন গার্ডেনস ফিরিয়ে আনছিলেন, বোল্ট স্থির থেকে বাউন্ডারি লাইনে নিয়েছিলেন ক্যাচ। এদিনও নিলেন। তবে মোমেন্টাম সামলাতে গিয়ে বাঁ পাটা লেগে গেল বাউন্ডারি কুশনে। ডান পায়ে ভর দিয়েই মোমেন্টাম সামলাতে গিয়েছিলেন, অথচ দুই পা ফেলতে পারতেন। টেকনিকের ভুল? নিউজিল্যান্ড ফিল্ডিংয়ে এদিন পাশবিক রকমের নিঁখুত ছিল, ওই মুহুর্তটা ছাড়া। তবে কি কপাল? ভাগ্য? কোনও এক বিশাল কম্পিউটার প্রোগ্রামের বাগ? আপনিই বলুন না! 
     


    ছয়? ছয়? হ্যাঁ, ছয়!


    সেই বোল্টের সেই লেংথ বলে স্টোকস করলেন স্লগ সুইপ। বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন প্রায়, তার ঠিক আগমুহুর্তে মোমেন্টামটা শিফট করাতে পারলেন। ছয়? ছয়? হ্যাঁ, ছয়। হুট করেই চাপ বোল্টের ওপর। সে চাপেই বোধহয় পরেরটি করে ফেললেন ফুলটস, তবে স্টোকস সেটা তুলতে পারলেন না ঠিকঠাক। গেল মার্টিন গাপটিলের কাছে। একটা বিশ্বকাপে ব্যাটিংয়ে দিনের পর দিন ব্যর্থ হয়েও কীভাবে ফিল্ডিংয়ে দিনের পর দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়, গাপটিল সেটা দেখিয়েছেন। তার থ্রো-এর আর্কটা এর চেয়ে পারফেক্ট হতে পারতো না টম ল্যাথামের কাছ স্টাম্প বরাবর পৌঁছাতে। তবে এটা পারফেক্ট হয়ে গেল অন্যভাবে। যে পারফেকশনটা নিউজিল্যান্ড চাইত না এর ফলটা জানলে। যে পারফেকশনটা আপনাকে অলৌকিক কোনোকিছুর ওপর বিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। 

    এখন, একটু জোরে নিশ্বাস নিন। 

    আপনি এই ঘটনাটা হয়তো দেখেছেন। হয়তো পড়েছেন। হয়তো কারও কাছে শুনেছেন। তবুও, তবুও...

    ...স্টোকস ডাবলস নিতে মরিয়া। ফুলটসটা খেলতে ক্রিজের ডিপে চলে গিয়েছিলেন, ভার সামলে টেক-অফ করতে দেরি হয়ে গেল একটু। আপনি স্টোকসকে দোষ দিতে পারেন না। সে ওভারের শুরুতে ট্রফিতে এক হাত দিয়ে রেখেছিল নিউজিল্যান্ড। স্টোকসের ব্যাটে-কাঁধে-পায়ে তখন একটা জাতির ৪৪ বছরের অপেক্ষার ভার। রশিদ তখন স্টোকসের প্রোগ্রামে রান করছেন, স্টোকস ডাবলস নিতে ছুটলেন, তিনিও ছুটলেন। রশিদ যেন জানেন, থ্রো হলে ওপাশেই হবে। তিনি ঘুরে তাকাচ্ছেন, স্টোকস কতোদূর গেলেন। স্টোকস ডাইভ দিলেন, তার ক্রিজে পৌঁছাতে হবে। ঠিক যে মুহুর্তে ব্যাটটা নামিয়ে এনেছেন, সেই মুহুর্তেই বলটা এসে লেগেছে ব্যাটে। ইনিংসে টাইমিং খুব একটা ভাল হচ্ছিল না তার, এটা হলো একেবারে যুতসই। অথচ তিনি গাপটিলের থ্রো-এর দিকে তাকাননি, দিক পরিবর্তন করেননি। ল্যাথাম মুখে হাত দিয়েছেন, তখনও হয়তো তিনি শুধু রান-আউটের আফসোস করছেন, জানেন না এরপর ঠিক কী হতে চলেছে। 

    কলিন ডি গ্র্যান্ডোম ছুটছেন ছুটতে থাকা বলের পেছন, তবে সেটা স্টোকসের ব্যাটের পেছনে লাগার পরই দৌড়ে পেছনে ফেলে দিয়েছে তাকে। এ ম্যাচে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিং করেছেন তিনি, তার স্পেল ম্যাচ-নির্ধারণীর মতোই ছিল। গ্র্যান্ডোম বলের নাগাল পেলেন না। স্টোকস ব্যাট ফেলে দিয়ে দুহাত তুলে আছেন, ওভারথ্রো থেকে রান নেওয়া দূরে থাকলো। তবে বল বাউন্ডারি চলে গেলে আর কিছু করার নেই, আম্পায়াররা সেটা দিতে বাধ্য। স্টোকস স্পিরিট অফ ক্রিকেট দেখালেন, তবে সেটা যথেষ্ট হলো না নিউজিল্যান্ডের। উইলিয়ামসন দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকলেন। যেন কারও কাছে বিচার দিলেন, কীসের জন্য, কার কাছে- জানা নেই। 

    লর্ডসের মেম্বারস স্ট্যান্ডে টাই-স্যুট পড়া নিপাট ভদ্রলোকরা বসে থাকেন, যারা ব্যাটসম্যান শূন্যতে ফিরলেও তালি দিয়ে অভিনন্দন জানান। এতদূর গিয়ে খেলে আসলেন, চেষ্টা করে আসলেন- এ কারণেই বোধহয়। সেই তারাও উল্লাসে মাতোয়ারা তখন। হয়তো সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে বাউন্ডারিটা ভুলিয়ে দিল তাদের পরিচয়, তাদের পোশাক-আশাকের আবরণ। 

    ড্রেসিংরুমে থেকে সেসব দেখছেন জনি বেইরস্টো। তাকিয়েছেন তখন তাদের অ্যানালিস্ট ন্যাথাম লিমনের দিকে। ততক্ষণে আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা স্কোরারকে দেখিয়েছেন, ৬ রান যোগ করতে। যদিও সেটা তারা ভুল করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে (প্রায়)। ৭ ওভার বাকি থাকতে বেইরস্টো লিমনকে বলেছিলেন, ম্যাচ জিততে তিনটি ছয় প্রয়োজন তাদের। স্টোকস এর আগে দুটি মেরেছেন, যার মধ্যে একটিতে প্রায় আউট হয়েছিলেন। এটি ছিল তৃতীয় ছয়। ছয়? হ্যাঁ, ছয়। বেইরস্টো তার তিন নম্বরটি পেয়ে গেলেন।
     


    স্টোকস 'ক্ষমা' চাচ্ছেন। পেছনের দর্শকরা নয়।


    বিশ্বকাপ। ফাইনাল। শেষ ওভার। ওভারথ্রো। ব্যাটসম্যানের ব্যাট। বলের দিক পরিবর্তন। চার, ছয়। সম্ভব? সত্য? আসলেই? 

    আপনার তিনটি ছয় প্রয়োজন ছিল, জনি?

    আরেকটি বাউন্ডারি ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে দিতে পারতো। স্টোকস ঝুঁকি নিলেন না। পঞ্চম বলে খেলতে গিয়ে প্রায় পড়ে গেলেন, দৌড় শুরু করতে দেরি হয়ে গেল তাই। রশিদ রান-আউট হয়ে যাওয়ার পর কিছু বলছিলেন স্টোকসকে। এরপর মার্ক উড আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন শেষ বলে ডাবলসের জন্য। স্টোকস ফুলটসটা জোরের ওপর খেলতে পারতেন। তবে ঝুঁকি নিলেন না। অন্তত সুপার ওভারে তো ম্যাচ যেতে পারে! 

    সুপার ওভার? বিশ্বকাপ ফাইনাল? 

    ইউ আর কিডিং মি? নাসের হুসেইন বললেন। ইয়ান স্মিথ বেশ কিছুক্ষণ থেকেই দাঁড়িয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। এবার মাথায় হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন। স্মিথের জন্যও ব্যাপারগুলি অসহ্যরকমের অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর হয়ে গিয়েছিল।

    ****

    বেইরস্টো চাচ্ছিলেন, বলটা তার কাছে আসুক। তিনি নাকি প্রতি বলেই এমন চান। বলটা গেল জেসন রয়ের কাছে। বেইরস্টোর এরপর আর কিছু করার নেই। মিড-অনের দিকে থাকা জো রুটের মতোই তিনিও চেয়ে থাকলেন শুধু। বিশ্বাস রাখলেন রয়ের ওপর। জফরা আর্চার সতর্ক, নন-স্ট্রাইক প্রান্তে গেলেন। যদি রয় থ্রো করে বসেন সেদিকে। তবে আর্চার খুব করে চাচ্ছিলেন, রয় থ্রোটা স্ট্রাইক-প্রান্তে করুন। শুধু যে সেদিকে রান-আউটের সম্ভাবনা বেশি তা নয়, তার কাছে আসলে নাকি স্টাম্প ভাঙতে গিয়ে আঙুলই ভেঙে ফেলতে পারতেন তিনি। 

    সুপার ওভারে আর্চার বোলিং করবেন, সেটা মরগান নিজে থেকে বলেননি। আর্চার গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনিই করছেন কিনা। মরগান শুধু হ্যাঁ বলেছিলেন। আর্চার ম্যাচে ডেথ ওভারে ছিলেন অসাধারণ, ইংল্যান্ডের এই বোলিং লাইন-আপে আর্চারের বোলিংটাই যেন মিসিং ছিল তিনি দলে আসার আগে। 

    সুপার ওভারের জন্য ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে স্টোকস হতাশ ছিলেন, ম্যাচটা ঠিক শেষ করে আসতে পারলেন না বলে। এরপর ধাতস্থ হয়েছেন। আবার নেমেছেন। বাটলার ও তিনি মিলে তুলেছেন ১৫ রান, বোল্টের দ্বিতীয় শেষ ওভারে। 

    এরপর আর্চারের ওপর ভরসা রেখেছিলেন দলের সবাই। এই ইংল্যান্ড দলের বৈশিষ্ট্যই এটা। একে অপরকে খুব করে সমর্থন করেন, অন্যদের মেধার ওপর ভরসা রাখেন। আর্চারেরও আত্মবিশ্বাস ছিল। প্রথম বলটা ওয়াইড হওয়ার পর হতাশ হয়েছিলেন, কারণ তার মতে এটা ওয়াইড ছিল না। রিপ্লে দেখলেন। আবার হতাশ হলেন। তখনও তার মতে এটা ওয়াইড নয়। 

    জিমি নিশাম এরপর ছয় মারলেন। কিছুটা স্টোকসের বোল্টকে মারা ওই শটের মতো করেই। নিশাম একসময় চোট ও ফর্ম মিলিয়ে খেলা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। গত বিশ্বকাপে শেষ মুহুর্তে বাদ পড়েছিলেন গ্রান্ট এলিয়টের কাছে জায়গা হারিয়ে। এরপর এলিয়ট যখন ইডেন পার্কে ডেল স্টেইনকে সেই ছয় মেরে উল্লাসে মাতিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডকে চার বছর আগে, নিশাম ছিলেন স্ট্যান্ডে। নিশাম টুইটারে দারুণ ‘হিউমার’সম্পন্ন একজন। আর আর্চার এক জীবনের সব টুইট যেন করে ফেলেছেন এরই মাঝে। সেই আর্চারকে ছয় মেরে আবার নিউজিল্যান্ডকে বিশ্বাস করালেন নিশাম। তবে আর্চার স্নায়ু ধরে রাখলেন। বাউন্সার, স্লোয়ার, ইয়র্কারের কম্বিনেশনে। 

    গাপটিল ইয়র্কারটা খেলতে পারলেন শুধু মিডউইকেটের দিক। ২ রান দরকার ছিল। টেক-অফে দেরি হয়ে গেল একটু। বলটা গেল রয়ের কাছে। যিনি এর আগেই একটা মিসফিল্ডে অতিরিক্ত এক রান দিয়ে ফেলেছেন। এই থ্রোটা ঠিকঠাক হতে হতো তার। 

    জস বাটলার প্রস্তুত হলেন, শুরুতে স্টাম্পের পেছন দিকে অবস্থান নিচ্ছিলেন, পরে চলে এলেন সামনে। ম্যাচে স্টোকসের সঙ্গে বাটলারের জুটি ম্যাচে ফিরিয়েছিল ইংল্যান্ডকে। তার ব্যাটিং দেখে তাকে ‘ফ্রিক’ বলা ছাড়া অন্য কিছু বলার উপায় নেই। এদিনও অন্তত দুটি স্কুপ করেছেন, যেন সেসব কিছুই না! তিনি জানতেন, গাপটিল পৌঁছাতে পারবেন না। তার হাতে সময় আছে অ-নে-ক। তিনি জানতেন, তার পরের কাজের প্রভাব অনেক বেশি। তবে এটা শুধুই একটা ক্রিকেট ম্যাচ, এটা শুধুই একটা থ্রো- বছরের পর বছর যেটা করে এসেছেন তিনি। সে মুহুর্তে তার টাইমফ্রেমটা বড় হয়ে গিয়েছিল বোধহয়।

    বাটলার স্টাম্প ভাঙলেন। এরপর গ্লাভস ছুঁড়ে ফেললেন ছুটতে ছুটতে। কে কোনদিকে গেছেন, সেটার জন্য আরেকটু হলেই নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ঝুলত। লর্ডসের অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমের ব্যালকনিতে তখন শুধুই অবিশ্বাস। পৃথিবী, পৃথিবীর নিয়ম-কানুন, ঈশ্বর, ভাগ্য, কপাল- সবকিছুর ওপর থেকে যেন বিশ্বাস উঠে গেছে নিউজিল্যান্ডের।

    এদিকে মইন আলি ডাগ-আউট থেকে ছুটে এলেন। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ হারার পরই নাকি তিনি দলকে বলেছিলেন, এ টুর্নামেন্ট তারা জিতবেন, এটা তাদের জন্য লেখা আছে। মানে আল্লাহ লিখে রেখেছেন। 


    পৃথিবী, পৃথিবীর নিয়ম-কানুন, ঈশ্বর, ভাগ্য, কপাল- সবকিছুর ওপর থেকে যেন বিশ্বাস উঠে গেছে নিউজিল্যান্ডের।


    আদিল রশিদ পরে মরগানকে বলেছিলেন, তাদের সঙ্গে আল্লাহ ছিলেন। মরগানের মতে, আল্লাহ ছিলেন তাদের সঙ্গে, আর ছিল ‘রাব অফ দ্য গ্রিন’। ১৯৯২ ফাইনালের পর ডেরেক প্রিঙ্গলকে জাভেদ মিঁয়াদাদ বলেছিলেন, এলবিডব্লিউর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রসঙ্গে, তাদের সঙ্গে নাকি সেদিন আল্লাহ ছিলেন। এই ম্যাচের পর বেইরস্টো বলছেন, এটা নাকি তারার মাঝে নির্ধারিত করা ছিল, যেখানে আছেন তার ক্রিকেটার বাবা, যিনি বিষণ্ণতায় আত্মহত্যা করেছিলেন। 

    বেইরস্টো এদিন ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারের সঙ্গে ব্যর্থ হয়েছিলেন। লিয়াম প্লাঙ্কেটের স্বর্গীয় ক্রস-সিম বৃথা যেতে নিয়েছিল। ক্রিস ওকসের অনিন্দ্যসুন্দর সুইং রঙ হারিয়ে ফেলেছিল প্রায়। আর্চারের ডেথ ওভারের স্কিল প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল প্রায়। মরগানের চার বছরের পরিশ্রম কিছু না জিতেই শেষ হতে নিয়েছিল প্রায়। স্টোকসের দায়মোচনের প্রহর গুবলেট পাকিয়ে যেতে পারতো। 

    ক্রিকেটের নিয়ম, পৃথিবীর নিয়ম, জীবনের অনিশ্চয়তা, নাটক, রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপারের নতুন সংজ্ঞা, আশ্চর্য ঘটনা, কল্পনাশক্তির সীমারেখা, উল্লাস, বিষাদ, এবং আরও অনেক কিছুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অথবা অনেক কিছুর জয়গান গেয়ে লর্ডসের ফাইনাল ‘ফাইনালি’ শেষ হলো। 

    মইন বলছেন, এ ম্যাচ তাদের জীবন বদলে দেবে না। অন্তত তিনি চান না সেটা। বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হলেও তিনি দক্ষিণ বার্মিংহামের স্টোনি লেইনে তার বন্ধুদের সঙ্গে দুধের বাক্সকে স্টাম্প বানিয়ে ক্রিকেট খেলা সেই মইনই থাকতে চান। মরগান তার নিভৃত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট, সেটা না বদলে গেলেই খুশি হবেন। 

    নিউজিল্যান্ড এ ম্যাচ ভুলে খেলতে নামবে আবার, অন্তত অন্য কোনও ম্যাচে এ ম্যাচের কথা মনে পড়বে না তাদের। ইংল্যান্ড সামনেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে অ্যাশেজ মিশনে।

    কারণ, এটি তো ছিল শুধুই আরেকটি ক্রিকেট ম্যাচ! 

    শুধুই একটি ক্রিকেট ম্যাচ?