• লা লিগা
  • " />

     

    বেল বনাম জিদান: এক কিংবদন্তীর হতাশাজনক বিদায়?

    ২০১৭-১৮ মৌসুম শেষে যখন আচমকাই রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্টাসে যোগ দিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, তখন আক্রমণে 'লস ব্লাঙ্কোস'দের মূল ভরসা ধরা হচ্ছিল তাকেই। কিয়েভে লিভারপুলের বিপক্ষে তার জোড়া গোলেই নিশ্চিত হয়েছিল রিয়ালের 'হ্যাটট্রিক' চ্যাম্পিয়নস লিগ। কিন্তু প্রত্যাশার ছিঁটেফোঁটাও পূরণ করতে পারেননি গ্যারেথ বেল, পুরো মৌসুমে গোল করেছিলেন মাত্র ১১টি। ২০১৮-১৯ মৌসুমে হুলেন লোপেতেগি, সান্তিয়াগো সোলারির ব্যর্থতার পর আবারও রিয়ালের হটসিটে ফিরেছেন জিনেদিন জিদান। একসময় রিয়ালের ত্রাণকর্তা হিসেবে ভাবা সেই বেলকে এখন সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, রিয়ালে আর দরকার নেই তার; ক্লাব ছাড়াতেই সবার মঙ্গল।

    রোনালদো পরবর্তী যুগে যার হাতে রিয়ালের আক্রমণের ব্যাটন দেখছিল সবাই, সেই বেলেরই ক্লাব ছাড়া এখন সময়ের ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে। প্রাক-মৌসুমে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে যুবদলের ফুটবলারদের খেলালেও বেলকে স্কোয়াডেই রাখেননি জিদান। অথচ রিয়ালের গত ছয় বছরের সেরা সাফল্যগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই সরাসরি অবদান আছে ওয়েলশ ফরোয়ার্ডের।

     

     

     

    শুরুটা ছিল সোনায় সোহাগা

    ২০১২-১৩ মৌসুমে নিজেকে অনন্য উচ্চতায়ই নিয়ে গিয়েছিলেন বেল, ২১ গোল করে জিতেছিলেন পিফএ-এর বর্ষসেরা তরুণ ফুটবলারের খেতাব। তাকে দলে নিতে ২০০৯ সালে রোনালদোর পর আবারও ট্রান্সফারের বিশ্বরেকর্ড গড়ল রিয়াল, বেল বনে গেলেন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ‘হানড্রেড মিলিয়ন ইউরো ম্যান’। ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে অভিষেকেই পেয়েছিলেন গোল। রিয়ালের জার্সিতে প্রথম মৌসুমেই নিজের সামর্থ্যের পূর্ণ জানান দিয়েছিলেন বেল। ইনজুরিতে পড়া রোনালদোকে ছাড়া বার্সেলোনার বিপক্ষে রিয়ালের কোপা ডেল রে জয়ের নায়ক ছিলেন তিনিই, দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টায় করা সেই গোল এখনও ফেরে ইউটিউবের পর্দায়।

    রিয়ালের জার্সিতে ঐ ম্যাচের চেয়েও বড় মুহূর্ত এসেছিল মাসখানেক পর। ২৪ মে, ২০১৪-তে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে এক যুগ পর চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে রিয়াল। পুরো একাধিক সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে তার গোলেই লিড নিয়েছিল রিয়াল। ‘লস ব্লাঙ্কোস’দের হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমেই ঘোচালেন রিয়ালের এক যুগের চ্যাম্পিয়নস লিগ খরা, জিতলেন 'লা ডেসিমা'। মুহূর্তেই বেল বনে গেলেন রিয়াল সমর্থকদের চোখের মণি।

     

     

    কিন্তু রিয়ালে বেলের ‘হানিমুন’ টেকেনি বেশিদিন। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সার ট্রেবলের বিপরীতে ট্রফিশূন্য থাকল রিয়াল, ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হল তাকে। প্রায় প্রতি ম্যাচেই দুয়ো শুনলেও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাঘের মতই ফিরেছিলেন বেল। ২০১৫-১৬ মৌসুমের শুরুটা একেবারেই যাচ্ছেতাই হলেও জিদান হটসিটে আসার পরই স্বরূপে ফেরে রিয়াল। ফ্রেঞ্চ কিংবদন্তীর প্রথম ম্যাচে দেপোর্তিভোকে ৫-০ গোলে হারাল রিয়াল, বেল করলেন হ্যাটট্রিক। ঐ মৌসুমেই লা লিগায় ব্রিটিশ ফুটবলারদের সর্বোচ্চ রেকর্ড (গ্যারি লিনেকার, ৪৩) নিজের করে নিলেন বেল।

    এক মৌসুম পর আবারও চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে রিয়াল, আবারও প্রতিপক্ষ অ্যাটলেটিকো। ফাইনালে সার্জিও রামোসের গোল এসেছিল বেলের ক্রস থেকেই, টাইব্রেকারে ইয়ান ওবলাককেও পরাস্ত করেছিলেন তিনি। ‘লা উনদেসিমা’ জয়ে দারুণ ভূমিকা রাখায় সেবার ইউরোপের সেরা ফুটবলারদের দৌঁড়ে তৃতীয় হয়েছিলেন তিনি। পুরষ্কারস্বরূপ তার সাথে ছয় বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করল রিয়াল। তবে বার্নাব্যুতে এক মৌসুমে মুদ্রার এপিঠ, অন্য মৌসুমে ওপিঠ দেখার যাত্রা অব্যাহত থাকল বেলের।

     

     

    ২০১৬-১৭ মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে আবারও ইনজুরির থাবা, চার মাসের জন্য মাঠের বাইরে বেল। ফিরলেন বার্নাব্যু ক্লাসিকো দিয়ে, কিন্তু ঐ ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে আবারও চলে গেলেন মাঠের বাইরে। ঐ মৌসুম থেকেই মূলত জায়গা হারাতে শুরু করেন জিদানের একাদশে। ২০১৭-১৮ মৌসুমে লা লিগা শিরোপা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলেও টানা তৃতীয়বারের মত চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে চলে যায় রিয়াল। লিভারপুলের বিপক্ষে একাদশে ছিলেন না বেল, গোলের আশায় দ্বিতীয়ার্ধে তাকে নামিয়ে দেন জিদান। ইনজুরি, ফর্মহীনতায় জিদানের একাদশে জায়গা হারালেও একটি জিনিস হারাননি বেল, বড় ম্যাচে তার গোল করার সামর্থ্য। কিয়েভে আবারও জানান দিলেন সেটিই।

    ৬১ মিনিটে নামার মিনিটখানেক পরই অবিশ্বাস্য এক ওভারহেড কিকে রিয়ালকে লিড এনে দিলেন বেল, ম্যাচের মিনিট দশেক থাকতে ‘অল রেড’দের কফিনে শেষ পেরেকটাও ঠুকে দিলেন তিনিই। ম্যাচ শেষে ক্লাব ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত বেল নয়, রিয়াল ছাড়লেন রোনালদো। লোপেতেগি এসেই বেলকে বানালেন রিয়ালের আক্রমণের ‘নিউক্লিয়াস’। কিন্তু এবার ব্যর্থ হলেন বেল, ট্রফিশূন্য থাকল রিয়ালও। এডেন হ্যাজার্ড, লুকা ইয়োভিচরা দলে আসায় বেলকে পরিকল্পনায় রাখলেন না জিদান। রিয়াল যেখানে আগামী মৌসুমের প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত, তখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে বেলকে।

     

    কে কী চায়?

    ২০১৬-তে চুক্তি নবায়ন করায় ২০২২ সাল পর্যন্ত রিয়ালে থাকার কথা বেলের। কিন্তু রিয়াল বেলকে ছাড়তে চাইলেও অন্য কেউই তার আকাশচুম্বী বেতনের চাহিদা মানতে রাজি নয়। রিয়ালে বার্ষিক ১৭ মিলিয়ন ইউরো পান বেল, তাকে ছাড়তে বেতনের অর্ধেক দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছে রিয়াল; কিন্তু তারপরও দলে নিতে চাচ্ছে না কেউ। চাইনিজ সুপার লিগ থেকে প্রস্তাব আসলেও সমস্যা অন্য জায়গায়।

    চীনের ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী, চড়া দামে কোনও ফুটবলারকে দলে ভেড়ালে পুরো ট্রান্সফার ফি-এর ওপর ১০০% ট্যাক্স গুণতে হবে ক্লাবটিকে। তাই বেলকে নিতে রিয়ালকে ৮০ মিলিয়ন ইউরো দিলে ঐ ক্লাবের আসলে খরচ হবে ১৬০ মিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ দ্বিগুণ। মার্কা জানিয়েছে, সেজন্যই তাকে দলে নিতে চাইলেও এখন আবারও পুরো বিষয়টি ভেবে দেখছে চাইনিজ ক্লাব সিনোবো গুয়ান।

     

     

    একসময় বেলকে নিতে উঠেপড়ে লাগা রিয়াল এখন যেন তাকে ছাড়তে পারলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেজন্য ধারে বেলকে ছাড়ার কথাও ভাবছে তারা। কিন্তু বেল এবং তার এজেন্ট জোনাথন বার্নেট অবশ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ধারে রিয়াল ছাড়ছেন না তিনি। বেল আরও বলেছেন, জিদান দলে না রাখলেও দরকার হলে চুক্তির বাকি সময় গলফ খেলেই কাটাবেন তিনি। গত বছর থেকেই বেলের ক্লাব ছাড়ার গুঞ্জন ডালপালা ছড়াচ্ছে বেশ।

    কিন্তু কোনওবারই নিজ থেকে ক্লাব ছাড়তে চাননি ওয়েলশ ফরোয়ার্ড। রিয়ালের মত অন্য যেকোনও ক্লাবে গেলেই ‘পে কাট’ বা রিয়ালের চেয়ে কম বেতনের চুক্তিই হয়তো সই করতে হত তাকে। সেজন্যই হয়তো আগেও বা এখনও রিয়াল ছাড়তে চাচ্ছেন না বেল। চুক্তিতে বাকি ৩ বছরের বেতন সমেত ৫১ মিলিয়ন ইউরো দিলে তখনই কেবল রিয়াল ছাড়বেন ওয়েলশ ফরোয়ার্ড, জানিয়েছেন বার্নেট।

     

     

    বেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করায় তার সাথে সম্পর্কটা আরও খারাপ হয়েছে জিদানের। বার্নেট তো বলে দিয়েছেন, বেল যত তাড়াতাড়ি রিয়াল ছাড়ে, ততই ভাল- এমনটা বলায় জিদানের লজ্জা হওয়া উচিত। জিদানের বিরুদ্ধে বেলকে অসম্মান করার অভিযোগও এনেছেন বার্নেট। গতকাল আবার নিজের অবস্থান আরও পরিষ্কার করেছেন জিদান। কাউকে অসম্মান করা নয়, বরং ক্লাব ছাড়ার কথাবার্তা চলায় বেল নিজেই খেলতে চাননি, দাবি রিয়াল ম্যানেজারের।

    কোথায় যাচ্ছেন বেল?

    পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর নামই শোনা যাচ্ছে। প্যারিস সেইন্ট জার্মেই, বায়ার্ন মিউনিখ এমনকি সাবেক ক্লাব টটেনহাম হটস্পারও তাকে নিতে চাচ্ছে। ফ্রেঞ্চ সংবাদপত্র লেকিপ জানিয়েছে, বেলের সাথে মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাবে নেইমারকে রিয়ালের কাছে ছাড়তে পারে পিএসজি। কাতারী পেট্রোডলারে পুষ্ট পিএসজির অবশ্য ঠিকই বেলের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য আছে। বেতন কাঠামোর কথা চিন্তা করলে স্পার্সের বেলকে ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। গত মৌসুম থেকেই একজন ফরোয়ার্ড দলে ভেড়াতে চাচ্ছে বায়ার্ন। পিএসজির মত বায়ার্নেরও রিয়ালে বেলের সমান বেতন দেওয়ার সামর্থ্য আছে।

     

     

    কিন্তু ইউরোপের চেয়ে বেলকে দলে নেওয়ার ইচ্ছাটা হয়তো চাইনিজ ক্লাবগুলোরই বেশি। মার্কা জানিয়েছে, বেলকে সাপ্তাহিক ১ মিলিয়ন ইউরো বেতনেরও প্রস্তাব দিয়েছে সিনোবো গুয়ান। কিন্তু ট্রান্সফার ফি-এর ওপর চাইনিজ লিগের করের জন্যই পিছিয়ে এসেছে তারা। মার্কা আরও জানিয়েছে, বেলকে ফ্রি ট্রান্সফারে ছাড়ার কথাও ভাবছে রিয়াল। চাইনিজ লিগে বেল পাড়ি জমালে বেতনের অর্ধেকও গুণতে হবে না রিয়ালকে। সেক্ষেত্রে হয়তো ইউরোপের কোনও ক্লাবের চেয়ে চাইনিজ ক্লাব সিনোবোর কাছেই বেলকে বিক্রির চেষ্টা করবে রিয়াল।      

    রিয়ালে গোল সংখ্যা, শিরোপা জয়ের দিক দিয়ে লুইস ফিগো, রাউল গঞ্জালেজ, ক্যাসিয়াস এমনকি স্বয়ং জিদানকেও পেছনে ফেলেছেন বেল। ইনজুরির কারণে রিয়ালে কাটানো ৬ বছরে মোট ৭৪ ম্যাচ মিস করেছেন বেল। কিন্তু এই সময়টায় রিয়ালের প্রায় সব বড় ম্যাচেই গোল করেছেন তিনি। ২৩১ ম্যাচে ১০২ গোল, ৬৫ অ্যাসিস্ট; শিরোপা জিতেছেন ১৪টি। কিন্তু এতকিছুর পরও সম্ভাব্য বিদায়বেলার অভিজ্ঞতাটা হয়তো তিক্তই হচ্ছে বেল এবং রিয়ালের। লা লিগায় ব্রিটিশ ফুটবলারদের সম্ভাব্য সব রেকর্ডই তার। শেষ পর্যন্ত হয়তো ক্লাব ছাড়া নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, তবে রিয়ালের কিংবদন্তীদের তালিকায় বেলের নাম আসবেই- এ ব্যাপারে কোনও বিতর্ক নেই।