• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    সিজন প্রিভিউ: তিরিশে গিয়ে আশা পুরবে লিভারপুলের?

    সেই ২০১২ সালে শেষবার শিরোপা উল্লাসে মেতেছিল তারা। শিরোপাখরা ছিল সাত বছরের, তবে চ্যাম্পিয়নস লিগের জন্য সময়টা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিক দ্বিগুণ। ২০১৮-১৯ মৌসুম শেষে সেই খরা ঠিকই মিটিয়েছিল লিভারপুল, কিন্তু দুর্দান্ত ধারাবাহিকতার পরও প্রিমিয়ার লিগটা এখনও রয়ে গেল অধরাই। নতুন মৌসুমের আগে তাই ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার চেয়েও হয়তো ইয়ুর্গেন ক্লপের দলের মূল লক্ষ্য, ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ আধিপত্য নিজেদের করে নেওয়া।

     

    যারা এলেন, যারা গেলেন

    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, সিটি, আর্সেনালরা দলবদলের বাজারে কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করলেও স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছে লিভারপুল। দলবদলের মাঠে তেমন সরব উপস্থিতি নেই লিভারপুলের। প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের চেয়ে তরুণদের ওপরই আস্থা রাখছেন ক্লপ; দলে নিয়েছেন দুই ১৭ বছর বয়সী সেপ ভ্যান ডেন বার্গ এবং হার্ভি এলিয়টকে। ওয়েস্ট হাম থেকে গোলরক্ষক আদ্রিয়ানকে দলে নিয়েছে লিভারপুল। ফিলিপ কুতিনিয়োর লিভারপুলের ফেরার গুঞ্জনও উঠেছিল, কিন্তু তাকে নেওয়ার সামর্থ্য নেই ক্লাবের, জানিয়েছিলেন ক্লপ।

    পাকাপাকিভাবে ক্লাব ছেড়েছেন সিমন মিনিওলে, ড্যানিয়েল স্টারিজ, আলবার্তো মরেনো। ধারে লিভারপুল ছেড়ে বোর্নমাউথে যোগ দিয়েছেন হ্যারি উইলসন, সাউদাম্পটনে পাড়ি জমিয়েছেন ড্যানি ইঙ্কস, মিডফিল্ডার মার্কো গ্রুয়িচের গন্তব্য জার্মান ক্লাব হার্থা বার্লিন। চুক্তি বাতিল করা হয়েছে গোলরক্ষক অ্যাডাম বগডান এবং কনোর র‍্যান্ডালের।

     

    আমরা যা জানি

    গোল করা বা গোল ঠেকানোর জন্য অন্তত প্রিমিয়ার লিগের সেরা ফুটবলাররা আছেন লিভারপুলেই। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের সেরা গোলরক্ষক ছিলেন অ্যালিসন বেকার, যৌথভাবে শীর্ষ দুই গোলদাতা মোহামেদ সালাহ এবং সাদিও মানেও খেলেন অ্যানফিল্ডেই। খুব সম্ভবত বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডারদের তালিকায় সবার চেয়ে এগিয়েই থাকবেন লিভারপুলের ভার্জিল ভ্যান ডাইক। দলে বিশ্বমানের ফুটবলারদের অভাব নেই। ধারাবাহিকভাবে টানা পারফর্ম করে যাওয়ার দিক দিয়েও লিভারপুলের জুড়ি মেলা ভার।

    আর ডাগআউটে থাকা ক্লপের কথা যেন না বললেই নয়। গত চার বছরে লিভারপুলকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়, খেলায় এনেছেন আমূল পরিবর্তন। যে সিটির সামনে গত মৌসুমে রীতিমত অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে আর্সেনাল, চেলসিরা; সেই সিটিকে একেবারে সমানে সমান টেক্কা দিয়েছে তারা। সালাহ-মানে-অ্যালিসনরা দুর্দান্ত ফর্মে থাকলেও দলকে এভাবে খোলনলচে বদলে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব খুব সম্ভবত ক্লপেরই। প্রাক মৌসুম ম্যাচগুলোতে লিভারপুলের অবস্থা ছিল একেবারে যা-তা। কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে কমিউনিটি শিল্ডের ম্যাচে স্বরূপে ফিরল লিভারপুল। প্রেসিং, সাজানো গোছানো গতিশীল আক্রমণ সবই ধরা দিল সালাহদের পায়ে।

     

     

    সময়মতো লিভারপুল যে প্রস্তুত সেই দাবি ক্লপ করতেই পারেন। এই ম্যাচেও অবশ্য হারল লিভারপুল, হারল ইঞ্চি দূরত্বে। কিন্তু সিটির সঙ্গে দূরত্ব তো ক্রমেই কমিয়ে আনছে তারা। এবারও যে প্রিমিয়ার ল্গিএর শিরোপা লড়াইটা এই দুই ক্লাবের মাঝেই হবে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত করে বলা দেওয়া যায়। গত দুই মৌসুমে দুই ক্লাবের দূরত্বটা কমিয়ে আনতে আনতে লিভারপুল এখন প্রায় সমকক্ষ। আর এক ধাপ দূরত্ব কমাতে পারলেই তো অধরা স্বপ্ন পূরণ হয়ে যায় লিভারপুলের।

    নতুন মৌসুমের আগে দলে তেমন পরিবর্তন আনেনি লিভারপুল। কিন্তু নতুন মৌসুমের আগে হয়তো ফর্ম বা ধারাবাহিকতা নিয়ে খুব একটা ভাবতে হচ্ছে না তাদের। গত মৌসুমের প্রায় পুরোটাই ইনজুরির জন্য মাঠের বাইরে ছিলেন অ্যালেক্স অক্সলেড-চেম্বারলেইন এবং অ্যাডাম লালানা; এবার সিটির বিপক্ষেই কমিউনিটি শিল্ডের ম্যাচ দিয়েই ফিরেছেন দুজনই। গত দুই মৌসুম একসাথেই খেলেছেন লিভারপুলের একাদশের অনেকেই। দলের সাথে তাদের বোঝাপড়া দারুণ।

    সাথে আছে ক্লপের ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। নিজের ‘গেগেনপ্রেসিং’ ট্যাকটিক্সের মারপ্যাঁচে যেকোনও প্রতিপক্ষকে সামলাতে সক্ষম লিভারপুল। প্রিমিয়ার লিগে এবারও ‘ফেভারিট’-এর দৌড়ে সিটিকে হয়তো আবারও সবচেয়ে বেশি ভোগাবে ‘অল রেড’রাই। তাই দলবদলের বাজারে কিছুটা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও শক্তিমত্তার বিচারে ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর তালিকায় শুরুর দিকেই থাকবে লিভারপুল।

    গতবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার পর এবার লিভারপুলের পুরো মনোযোগ হয়ত থাকবে লিগের ওপর। ২৯ বছর লিগ শিরোপা বিহীন তারা। গতবার শিরোপা ধরতে ধরতেও হাত ফস্কে গিয়েছিল। আক্ষেপ তো বেড়েছেই, কিন্তু আত্মবিশ্বাসও লিভারপুলের সঙ্গী হয়েছে পরে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে। মনোবলের দিক দিয়ে এর চেয়ে ভালো অবস্থানে থেকে লিগ শুরু করতে পারত না লিভারপুল।

     

     

    যা নিয়ে সংশয়

    ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন তারা, ৯৭ পয়েন্ট নিয়েও একটুর জন্য জিততে পারেনি লিগ। দলবদলের মৌসুমে এবার শক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল লিভারপুলের। কিন্তু সেই পথে হাঁটেনি তারা। সেটাই কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে লিভারপুলের জন্য। দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানোর পর তাই লিভারপুলের দূর্বলতা খোঁজা বেশ কষ্টসাধ্যই। কিন্তু স্কোয়াড ডেপথকেই হয়তো নিজেদের দূর্বলতা হিসেবে দেখবেন লিভারপুল সমর্থকেরা। তবে গত মৌসুমে ডিভক ওরিগি এবং জেরদান শাকিরি বেঞ্চ থেকে নেমে  খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। লম্বা মৌসুমে এমন ম্যাজিক দরকার হবে- ক্লপও জানেন সেটা। কিন্তু এমন চমক তো ধারাবাহিক কিছু নয়। পুরনোরাই নতুন করে দুঃসময়ে হাল ধরতে পারবেন তো?

    লিভারপুলের রক্ষণে ভ্যান ডাইকের সঙ্গি নিয়ে আছে সংশয়। জোয়েল মাতিপ এই মৌসুম শুরু করেছেন কমিউনিটি শিল্ডে সিটির বিপক্ষে গোল করে। কিন্তু গত মৌসুমে বেশ কয়েক ম্যাচে তার ভুলেই গোল খেয়েছিল লিভারপুল। মাঝমাঠে একজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের অভাবটাও ভোগাতে পারে লিভারপুলকে। নাবী কেইটা, ফাবিনহো, জর্ডান হেন্ডারসন, জর্জিনিও ওয়াইনাল্ডামদের কেউই সেই অর্থে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার নন। এসব সীমাবদ্ধতা অবশ্য গতবার ঠিকই টপকে গিয়েছিল লিভারপুল। এবারও হেন্ডারসনদের থেকে সেরকম ধারাবাহিকতাই চাইবেন ক্লপ।

     

    শেষ পাঁচ মৌসুমের লিভারপুল

    ২০১৪-১৫: ৬ষ্ঠ

    ২০১৫-১৬: ৮ম

    ২০১৬-১৭: ৪র্থ

    ২০১৭-১৮: ৪র্থ

    ২০১৮-১৯: ২য়

     

     

    প্রিমিয়ার লিগ এবং ইউরোপে সুদিন ফিরিয়ে আনা এবং শ্রেষ্ঠত্ব পুনরোদ্ধারের জন্যই ক্লপকে ম্যানেজার বানিয়েছিল লিভারপুল। জার্মান ম্যানেজার সময় নিয়েছেন বছর তিনেক, কিন্তু ‘অল রেড’দের ঠিকই ইউরোপসেরা ক্লাবগুলোর একটি বানিয়েছেন তিনি। ইউরোপিয়ান সাফল্যের দিক দিয়ে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সফল দল তারা, দশক খানেক আগে ছিল প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে সফল দলও। প্রায় ১৫ বছর পর লিভারপুলের ইউরোপখরা ঘুচিয়েছেন ক্লপ, এবার অপেক্ষা প্রিমিয়ার লিগের ২০ বছরের খরা মেটানোর। 

     

    প্যাভিলিয়নের প্রেডিকশন: চ্যাম্পিয়ন (প্যাভিলিয়ন মনে করে ৩০ বছরের অপেক্ষা ঘুচতে যাচ্ছে লিভারপুলের। গতবারের যতখানি কাছাকাছি গিয়েছিল লিভারপুল, এবার সেটা টপকে যাবে তারা। ম্যানচেস্টার সিটি গত দুইবারের লিগ চ্যাম্পিয়ন। প্যাভিলিয়নের মতে এবার তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে যেতে পারে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়। সেক্ষেত্রে ফোকাস হারাতে পারে লিগ। আর টানা তিন বছর লিগ জেতাও তো সহজ কিছু নয়।)