• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    টাইব্রেকারে চেলসিকে হারিয়ে ইস্তাম্বুলে আবার হাসল লিভারপুল

    অ্যালিসনের ইনজুরি ভাগ্য খুলে দিয়েছিল আদ্রিয়ানের। লিভারপুলের স্প্যানিশ গোলরক্ষক নতুন ক্লাবে এসে প্রথম ম্যাচেই খেলার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন। ইউয়েফা সুপার কাপের ম্যাচটাও সামলাতে হত তাকে। পুরো ম্যাচে ভালো কিছু সেভ করলেন, এরপর টাইব্রেকারে হয়ে গেলেন জয়ের নায়ক। ট্যামি আব্রাহামকে ফাউল করে আদ্রিয়ান অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি উপহার দিয়েছিলেন চেলসি। কিন্তু এই দুইজনের আরও একটি পর্ব বাকি ছিল ম্যাচে। আব্রাহামের পঞ্চম কিকটি নেওয়ার আগে ৯ পেনাল্টিতেই সফল দুই দল। আদ্রিয়ান আব্রাহামকে ঠেকিয়ে দিলেন। নাটকের শেষ অঙ্ক একজন নায়ক খুঁজছিল, ১২০ মিনিটের ম্যাচ ও ৯ পেনাল্টি শেষে পাওয়া গেল সেটা। ২-২ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে চেলসিকে  ৫-৪ ব্যবধানে হারিয়ে ইউয়েফা সুপার কাপ জিতেছে লিভারপুল। ইস্তাম্বুল তাই আরও একবার দেখেছে লিভারপুলের উদযাপন।

    ২০০৫ সালে ইস্তাম্বুলে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে পরে সুপার কাপ জিতেছিল লিভারপুল। ইংলিশ কোনো দলের সেটাই ছিল শেষবার সুপার কাপ জয়। ১৪ বছর পর আবার সেই কীর্তি গড়ল লিভারপুল। চতুর্থ শিরোপা জিতে লিভারপুল এখন মিলান ও বার্সেলোনার পর সুপার কাপের দ্বিতীয় সফল দলের। প্রথমে থাকা দুইদলই এই ম্যাচ জিতেছে ৫ বার করে। আর চেলসির ভাগ্য বদলালো না এবারও। ছয় বছর আগে বায়ার্ন  মিউনিখের কাছে সুপার কাপে টাইব্রেকারে হেরেছিল তারা। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সুপার কাপ থেকে খালি হাতে ফিরল ব্লুজরা।


     

    ভোডাফোন অ্যারেনাতে প্রথমার্ধে ছিল চেলসির দাপট। ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড এ ম্যাচে আনলেন কিছু পরিবর্তন। এনগোলো কান্তে এলেন, জর্জিনিয়োর সঙ্গে খেললেন রাইট সাইড মিডফিল্ডে ওপরের দিকে। পুরো ম্যাচেই খেললেন দারুণ। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন পেদ্রো ও ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ। স্ট্রাইকার হিসেবে গত মৌসুমে ইউরোপা লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা অলিভিয়ের জিরুও এদিন থাকলেন শুরু থেকেই। তাতে ছন্দ তুলল চেলসি।

    জিরুকে শুরু থেকে বেশ সাহায্য করছিল চেলসির মিডফিল্ড। জিরু অবশ্য স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন। পেদ্রো প্রথমবার শট করলেন বাইরে দিয়ে, ২২ মিনিটে তার শট লাগল বারপোস্টে। এর কিছুক্ষণ পর পেদ্রোর থ্রু পাস কোভাসিচকে নিয়ে গেল গোলের সামনে। কিন্তু আদ্রিয়ান এগিয়ে এসে আগেই বল ক্লিয়ার করে, কোভাসিচকে বিপদ বাড়াতে দিলেন না। ওই সময় পর্যন্ত লিভারপুলের আক্রমণ বলতে ছিল কেবল সাদিও মানের পাওয়া দুইটি হাফচান্স। দুইবারই ক্রিস্টেনসেন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রথমবার শট ব্লক করেছেন। আরেকবার ফারপোস্টে মানের উদ্দেশ্যে পাঠানো ক্রস আটকেছেন চেলসি ডিফেন্ডার।

    ৩৬ মিনিটে কেউ আটকাতে পারল না কান্তেকে। মিডফিল্ডে দারুণ দক্ষতায় প্রথমে বল আগলে নিলেন। এরপর পাস বাড়ালেন সামনে থাকা পুলিসিচকে। তিনি মাতিপ আর ভ্যান ডাইকের মাঝে দিয়ে বাড়ালেন নিখুঁত এক থ্রু পাস। জিরু এবার বল পেয়ে গেলেন পছন্দের বাম পায়ে। কোণাকুণি ফিনিশে গোল করে ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকার এগিয়ে নিয়ে গেলেন ইউরোপা লিগ জয়ীদের।

    চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ী লিভারপুলকে অবশ্য ধরা হচ্ছিল ম্যাচের ফেভারিট। তবে ফাবিনহো, মিলনার, হেন্ডেরসনের মিডফিল্ড প্রথমার্ধে লিভারপুলকে মলিন করল কিছুটা, তার চেয়েও বেশি ভোগালো আসলে রবার্তো ফিরমিনোর অনুপস্থিতি। তার জায়গায় নামা অ্যালেক্স অক্সলেড চেম্বারলিনকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। তাই দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ইউর্গেন ক্লপ আর দেরী না করে নামিয়ে দিলেন ফিরমিনোকে। ফল পেতে সময় লাগত তিন মিনিট। কর্নার থেকে ফাবিনহো বল পেলেন ডিবক্সের ঠিক বাইরে, উঁচিয়ে মারলেন ফিরমিনোকে। তিনি অফসাইড ফাঁদ ফাঁকি দিলেন প্রথম, সিক্স ইয়ার্ড বক্সের মাথায় পেলেন বল। আরেক খোঁচায় পাশে থাকা মানেকে বাড়ালেন পাস, মানে এরপর সহজ ফিনিশে গোল করে লিভারপুলকে ফেরালেন ম্যাচে।


     

    ২০০৫ এ শেষ সুপার কাপ জিতেছিল লিভারপুল আর ২০০৬ সালে শেষ কোনো আফ্রিকান খেলোয়াড় গোল করেছিলেন সুপার কাপে। ফাইনালে আলিজেরিয়ার কাছে হেরে আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসের শিরোপা জেতা হয়নি মানের। তবে ২০০৬ সালে ফ্রেডেরিক কানুটের পর দ্বিতীয় আফ্রিকান হিসেবে গোল পেলেন তিনি সুপার কাপে। শেষে অবশ্য আরও একটি যোগ করেছেন। এসবকিছুই নির্ধারক হতে পারে তার বর্ষসেরা খেলোয়াড় খেতাব জেতার দৌড়ে।

    দ্বিতীয়ার্ধে  ল্যাম্পার্ডও অদল বদল করেন, ডাবল চেঞ্জ আনেন।  জিরুর জায়গায় নামেন ট্যামি আব্রাহাম। আরেক তরুণ মেসন মাউন্টকেও সুযোগ দেন ল্যাম্পার্ড। দুইজনই বাকি সময়ে বেশ ভালো প্রভাবই রাখলেন খেলায়। প্রথম অবদানটা অবশ্য রাখলেন সালাহর শট ব্লক করে দিয়ে। ওই আক্রমণ থেকেই ভার্জিল ভ্যান ডাইককে করেছিলেন হেড। কেপা এবার দুর্দান্ত এক সেভ করে চেলসিকে টিকিয়ে রাখলেন ম্যাচে।

    দুই অর্ধে অবশ্য দুইবার চেলসি বল জড়িয়েছিল লিভারপুলের জালে। একবার পুলিসিচ, আরেকবারমাউন্ট। দুইবারই রেফারির অফসাইড সিদ্ধান্তে উদযাপন খাটো হয়েছে চেলসির। শেষদিকে মানেও হয়ত ভিএআরের অফসাইড সিদ্ধান্তে আটকে যেতেন যদি গোল পেতেন। সালাহর থ্রু পাস ধরে এগিয়ে কোণাকুণি শট করেছিলেন মানে। কিন্তু লক্ষ্যে থাকেনি তার শট। তখন অবশ্য গোল হলেও হয়ত বাতিল হত পরে ভিএআরের সিদ্ধান্তে। ১-১ গোলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

    লিভারপুল-চেলসি ম্যাচ মানেই যেন উত্তেজনা। একটা সময় নিয়মিত চ্যাম্পিয়নস লিগের ফিক্সচার হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই দুই দলের ম্যাচ। বহুদিন পর এবার সুপার কাপে দেখা তাদের। সেই ম্যাচ মনে করিয়ে দিয়েছে পুরনো সেইদিনের কথাই। অতিরিক্ত সময়ের ৫ মিনিটের মধ্যেই মানে আরেক গোল করে এগিয়ে নিয়ে গেলেন লিভারপুলকে। মানেই শুরুর করেছিলেন আক্রমণ। বামদিক থেকে বল নিয়ে পাস দিয়েছিলেন ফিরমিনোকে। এরপর দৌঁড়ে ঢুকেছেন ডিবক্সের ভেতর। ফিরমিনোর কাছ থেকে মাইনাস পেয়ে শুধু দিক বদলে দিয়েছেন বলটার, বারপোস্টের নিচে লেগে এরপর টপ কর্নারে জড়িয়েছে মানের সেই শট।

    কিন্তু সেই লিডও টেকেনি বেশিক্ষণ। ১০১ মিনিটে লিভারপুল গোলরক্ষক আদ্রিয়ানের বিরুদ্ধে পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন রেফারি স্টেফানি ফ্রাপার্ট। ভিএআরে রিভিউয়েও রেফারির সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো না। তবে প্রথমবার এমন ম্যাচে রেফারিং করতে নামা নারী রেফারি স্টেফানি ফ্যাপার্ট ইতিহাসে ঢুকে গেছেন আগেই। এরপর সাহসী এক সিদ্ধান্তই দিয়ে ম্যাচটা স্মরণীয়ও করে রাখলেন বোধ হয় সে দফায়। টিভি রিপ্লে দেখে সেটা ভুল বলারও সুযোগ নেই তার ওই পেনাল্টি সিদ্ধান্ত।

    জর্জিনিয়ো সফল স্পটকিক নিয়ে এরপর আবার ফিরিয়ে আনলেন চেলসিকে। অবশ্য এর দুই মিনিট আগেই ট্যামি আব্রাহামকে দারুণ এক সেভ করে গোলবঞ্চিত করেছিলেন আদ্রিয়ান। আব্রাহাম বদলি নামার পর থেকেই খেলায় বেশ প্রভাব রাখছিলেন। নেমেই একটা শট ব্লক করেছিলেন সালাহর, এরপর পেনাল্টি আদায় করেছেন তিনিই। তবে সেরা সুযোগটা পেয়েছিলেন ১০৩ মিনিটে। পেদ্রোর ক্রস থেকে গোলটাই কেবল করতে পারেননি তিনি। বারপোস্ট ঘেঁষে বল গেছে বাইরে দিয়ে। চেলসির জয়-পরাজয়ের মধ্যে পার্থক্য হয়ে গেছে শেষে আব্রাহামের এই মিসটি।

    দ্বিতীয়ার্ধে দুইদলই খেলেছে কিছুটা সাবধান হয়ে। তবে লিভারপুলের রক্ষণ ফাঁকা হয়ে গেছে বেশ কয়েকবার। তবে সেটা পুঁজি করে চেলসির আর এগিয়ে যাওয়া হয়নি। মেসন মাউন্টের ডিবক্সের বাইরে থেকে করা ১১২ মিনিটের শট আদ্রিয়ান ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন সহজেই। ১১৮ মিনিটেও একবার আদ্রিয়ানকে ঠেকাতে হয়েছে মাউন্টের শট। আর মানেকে তুলে নেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে আর সেভাবে নিজেদের খুঁজে পায়নি লিভারপুল

    টাইব্রেকারে লিভারপুলের হয়ে ফিরমিনো, ফাবিনিহো, অরিগি, আর্নল্ড, সালাহ- সবাই সফল কিক নেন। কেপা অবশ্য দুইবার সেভ করতে করতেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি টাইব্রেকারে। চেলসির হয়ে জর্জিনিয়ো, বার্কলি, মাউন্ট, এমারসনরাই বরং বেশি আত্মবিশ্বাসী কিক নিয়েছিলেন। তবে শেষটায় এসে তরুণ আব্রাহাম মারলেন সোজাসুজি, আদ্রিয়ানও বসে পড়ে সেভ করে ঢুকে গেলেন লিভারপুলের বর্ণিল ইতিহাসে।

    ম্যাচশেষে অবশ্য দুই ম্যানেজারই তৃপ্তি খুঁজতে পারেন। লিভারপুল তাদের অনুমিত শিরোপাটা পেয়েছে। ক্লপ লিভারপুলকে জেতালেন দ্বিতীয় শিরোপা। আর চেলসি প্রায় পুরোটা সময়ই তাড়া করেছেন লিভারপুলকে। লিগে এই দুইদলের বেশ বড়সড় পার্থক্য আঁচ করা যাচ্ছিল। তবে চেলসি যে প্রেরণা সঙ্গী করে নিয়ে ফিরছে সেটা কাজে লাগাতে পারলে একেবারে হতাশায় মৌসুম শেষ হওয়ার কথা নয় তাদের।