• বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব
  • " />

     

    আফগানিস্তান বধের টোটকা পেয়েছেন তো বাংলাদেশ কোচ?

    বাংলাদেশ কোচ জেমি ডে এমনিতে আত্মবিশ্বাসী লোক। সংবাদসম্মেলনে তার কথা-বার্তা আপনাকে অন্তত হতাশ করবে না। দুই, একটা প্রশ্ন শুনে মাঝে মধ্যে মুচকি হাসেন। সেগুলো ঠিক মন মতো না হলেও এড়িয়ে যান না, জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল তাজিকিস্তানের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার দুইদিন আগে এমন একটি প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন ডে। কোচের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল আফগানিস্তানকে হারাতে বাংলাদেশের মিরাকল প্রয়োজন কী না।

    ডে এক গাল হেসেছেন। এরপর জবাব দিয়েছেন, "কোনো কিছুই মিরাকল নয়।"

    বাংলাদেশ কোচ বলেছেন ম্যাচটা এগারো জন বনাম এগারো জন। ছোট ছোট এই লড়াইয়ে যারা জিতবে তারাই হাসবে ম্যাচ শেষে। অবস্থা যেমনই হোক বাংলাদেশ কোচ আশার পালে হাওয়া দেওয়া ছাড়া কী বা করতে পারতেন? আর দলের ওপর যদি বিশ্বাসই তার না থাকবে তাহলে এ কাজ করছেনই বা কেন। অবান্তর প্রশ্নে ডে বিরক্ত হন না। তবে বারবার 'কঠিন ম্যাচ, বড় ম্যাচ' শব্দগুলো আওড়ান, তাতে ম্যাচের মাহাত্ম্য বাড়ে আরও।  

    বাড়ার কথাও। এক বছর আগেও জয় কেমন বস্তু সেটাই ভুলে গিয়েছিল বাংলাদেশ ফুটবল দল। লাওসের বিপক্ষে প্রাক বাছাইয়ে হেরে গেলে আবার নির্বাসনে যেতে হত দেশের ফুটবলকে। সেখান থেকে দলকে বাঁচিয়েছেন ডে। এখন সামনে নতুন যুগ, কঠিন যুগ, কঠিনতর প্রতিপক্ষ।  বিশ্বকাপ ও এশিয়াকাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয় পর্বে গ্রুপ 'ই' তে বাংলাদেশ তলানীর দল। ফিফা র‍্যাংকিংয়ে সবচেয়ে কাছে থাকা আফগানরাও ৩৩ ধাপ এগিয়ে। হিসাব মতে সবচেয়ে সহজ প্রতিপক্ষ আফগানিস্তানই হওয়ার কথা।

    কোচের কথাই ধরা যাক, এগারো জন বনাম এগারো জনের লড়াইয়ে আসলে যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের ২৩ জনের স্কোয়াডে ঘরোয়া লিগে খেলা খেলোয়াড় আছেন মাত্র তিনজন। বাকিরা এশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের লিগে খেলেন। খেলার টেকনিক্যাল দিকগুলো বাদ দিলেও আফগান দলটি তরুণ হলেও অভিজ্ঞতার কমতি নেই তাই। 

    যদিও বাছাইপর্বের প্রথম ম্যাচে কাতারের বিপক্ষে ৬-০ গোলে হেরেছে আফগানিস্তান। উড়েই গিয়েছে বলা যায়। কাতারের বিপক্ষে গ্রুপের বাকি দলগুলোর স্কোরলাইনের শ্রী যে একপেশে হওয়ার সম্ভাবা বেশি সেটাও একরকম নিশ্চিত করে বলা যায়। কিন্তু ওই ম্যাচেও আফগানিস্তানের খেলার ধরন বলছে বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট পরীক্ষা। সেটাকে ঘটা করে 'অগ্নিপরীক্ষা' বলার লোভ সামলানোও কঠিন।   

    আফগানিস্তানের এই দলটা খেলে ভয়-ডরহীন ফুটবল। প্রতিপক্ষ সে কাতার হোক আর যে হোক- ওয়ান টাচ পাসে তাদের দ্রুত আক্রমণে ওঠার চেষ্টা মুগ্ধ করার মতোই। আর এই আক্রমণের মূল কারিগর  তিন ফরোয়ার্ড ফয়সাল শায়েস্তে, জুবায়ের আমিরি, ও জাবের শারজা।  এদের ভেতর ফয়সালের আছে নিখুঁত বাম পা, গোলের দিকে ইগলের মতো নিরিখ তার। নেদারল্যান্ডসের এফসি টুয়েন্টির বয়সভিত্তিক দলে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ভিতটাও সেখানকার। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জাবের। দলের মূল স্ট্রাইকারও তিনি। ফিনল্যান্ডের শীর্ষস্তরের ক্লাব এইচআইফকে নাম লিখিয়েছেন তিনি এবার।

    জাবের ডিবক্সের ভেতর যতখানি ভয়ঙ্কর, ফ্রি কিক নেওয়ার ক্ষেত্রেও ততোখানি।  কাতারের বিপক্ষে আফগানিস্তানের ২৯ বছর বয়সী কোচ ও সাবেক খেলোয়াড় আনুশ দস্তগির খেলিয়েছিলেন ৫-৪-১ ফর্মেশনে। তাতে অনুমিতভাবেই মাঠে একঘরে হয়ে ছিলেন জাবের। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে আরও আক্রমণাত্মকই খেলার কথা আফগানিস্তানের। সেক্ষেত্রে জাবের একাই বিধ্বংসী হয়ে উঠলে টুটুল হোসেন, ইয়াসিন খানদের জন্য কাজটা কঠিন হয়ে উঠবে দ্বিগুণ।  

    ফরোয়ার্ড লাইনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মিডফিল্ডও কম শক্তিশালী নয় আফগানিস্তানের। ফারশাদ নূর আফগান মিডফিল্ডের মূল প্রাণ। বয়সভিত্তিক ক্যারিয়ার পার করে নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত ক্লাব পিএসভি আইন্দহোভেনের মূল দলেও খেলা হয়েছে ফারশাদের। ভূমিকা অনেকটা বক্স টু বক্স মিডফিল্ডারদের মতো। তবে আক্রমণে একটু বেশি মনযোগী। ট্যাকটিক্যালি নাম্বার এইট ও সিক্সের সঙ্কর বলা যায় তাকে। আরেক মিডফিল্ডার জুবায়ের আমিরি দুই পায়েই দক্ষ। তিনিও ফুটবল শুরু করেছিলেন ইউরোপে। জার্মানির ক্লাব আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের বয়সভিত্তিক দলে ছিলেন আমিরি।

    আফগানিস্তানের একচেটিয়ে বর্ণনা পড়ে অবশ্য আশায় বুক বাঁধা বাংলাদেশ সমর্থকদের হৃদয়ে কাঁপুনি ধরতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ভরসা বাংলাদেশ কোচের সেই বাণী, "ম্যাচের দিন যারা ভালো করবে, তারাই জিতবে।" দলটা আফগানিস্তান বলেই তাও সুযোগ থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের সামনে। আক্রমণে আফগানরা যতখানি ভালো সেই তুলনায় রক্ষণ তাদের নড়বড়ে বেশ। বাংলাদেশ অনুপ্রেরোনা খুঁজতে পারে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে। গত দুই বছরে উলটো পথে যাত্রা শুরু করেছে তাদের ফুটবলও। বাংলাদেশ মতোই প্রাক বাছাই খেলে মূল বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে তারা। বছরের শুরুতে এই আফগানিস্তানের বিপক্ষেই ২-১ গোলে জিতেছিল তারা। ম্যাচে দুই গোল করলেও মালয়েশিয়া সময়ে-সময়েই সুযোগ তৈরি করেছে, আফগানিস্তানের রক্ষণের বেহাল অবস্থার পুরো ফায়দাই নিয়েছে তারা।


    বাংলাদেশ জেমি ডের অধীনে মূলত কাউন্টার অ্যাটাক ভিত্তিক ফুটবল খেলছে গত প্রায় দেড় বছরে। ডের টোটকা কাজেও দিয়েছে। কিন্তু কাউন্টার অ্যাটাকে খেললেও ট্রানজিশনে আক্রমণ সাজাতে বারবারই ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। অগত্যা সেট পিস আর লং থ্রো তাই গোলের জন্য বাংলাদেশের মূল ভরসা। শারীরিক দিক থেকে এগিয়ে থাকা আফগানিস্তানের বিপক্ষে সেট পিস থেকে সুবিধা আদায় করা একটু কষ্টকরই হবে হয়ত বাংলাদেশের জন্য। তবে লং থ্রো কার্যকর হতে পারে পুরোপুরি। বিশেষ করে এক্ষেত্রে অফসাইড ফাঁদে ফেলার সুযোগও থাকছে না আফগানদের কাছে। আর লো থ্রোয়ের মন্থর গতি যে কোনো প্রতিপক্ষকেই বিপদে ফেলার মতো। অন্তত এই একটি জায়গায় ছিটে ফোঁটা আশার রেখা দেখতে পারে বাংলাদেশ।

    ভরসার জায়গা অবশ্য আরও একটি আছে। দলের স্ট্রাইকাররা এবার জাতীয় যোগ দিয়েছেন আত্মবিশ্বাসী হয়ে। নাবিব নেওয়াজ জীবন গতবার বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপের হতাশা ভুলে পরে ক্লাবের হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটিয়েছেন। আবাহনীর হয়ে এএফসি কাপেও দুই গোল করেছেন তিনি, অ্যাসিস্ট আছে আরও দুইটি। প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের ভেতর ১৭ গোল নিয়ে তিনে ছিলেন তিনি। আর মতিন মিয়াও এবার জায়গা করে নিয়েছেন দশজনের ভেতর। স্ট্রাইকারদের আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগার অযুহাতটা এবার আর তাই দাঁড় করানোর সুযোগ নেই।

    বাংলাদেশ কোচ এবং অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া অবশ্য আগেও বলেছেন গোল তৈরির সুযোগ করাটাই আসল। স্ট্রাইকারদের গোল মিস করা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত মনে হয়নি তাদের। বরং সুযোগ তৈরিতে জোর দিয়েছেন তারা বারবার। এক্ষেত্রে জামাল, মাসুক মিয়া, মামুনুলদের ওপর বড় দায়িত্ব বর্তায় এই ম্যাচে।  

    এরপরও আসলে বাস্তবতা বলছে ম্যাচের ফল নির্ধারক হবে বাংলাদেশ রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্স। ম্যাচ শুরুর দশদিন আগে তাজিকিস্তান পৌঁছে কোচ জোর দিয়েছিলেন ফিটনেসের ওপর। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এই ফিটনেস ধরে রেখে পুরো সময় একই তালে খেলে যেতে পারাও আপাতত চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য। প্রস্তুতি ম্যাচের ফলগুলো অবশ্য খুব একটা আশা জাগানিয়া নয়। স্থানীয় দুইটি ক্লাবের বিপক্ষে একটিতে হার, পরেরটিতে ড্র। তবে পুরো স্কোয়াড ঝালিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটা তাতে আরেকটু মসৃণ হয়েছে ডের জন্য। একাদশটাও হয়ত নির্বাচন করে ফেলেছেন এরই মধ্যে।

    আফগানিস্তান দলের খুঁটিনাটি সব জানা আছে বলে জানিয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ কোচ। কে কোথায় খেলেন, কেমন খেলেন, কোন পজিশনে খেলেন- সেসব না জানার কোনো কারণ নেই তার। এরপরও আশা দেখিয়ে গেছেন। নিজের দল আর নিজের কৌশলের ওপর ভরসা রাখছেন। দিনশেষে বাংলাদেশের ভরসাও সেটাই। ট্যাকটিক্যালি বাংলাদেশ কোচকে বেছে নিতে হবে সঠিক পদ্ধতিটি, আর মাঠে সেটা কার্যকর করতে হবে তার খেলোয়াড়দের। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের জন্য তাই কোচের কথাটাই সত্যি হয়ে থাকছে। বাছাইপর্বের নিজেদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশই হেরেছে। বাংলাদেশকে সেই ধারা ভাঙতে হলে নিজেদের সেরাটা তো দিতেই হবে, হয়ত তার চেয়েও বেশি কিছু করতে হবে। ডের মতে অবশ্য সেটা আর যাই হোক মিরাকল নয়। আফগান বধের টোটকাটা বের করতে পেরেছেন তো বাংলাদেশ কোচ?