• ইউরো বাছাইপর্ব
  • " />

     

    ইউরো বাছাই: রামোসের রেকর্ড, গোলমেশিন রোনালদো আর কসোভো রূপকথা

    ইউরো বাছাইয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ ম্যাচ ডে তে প্রত্যাশিত ফলাফলই পেয়েছে বড় দলগুলো। কিন্তু ফলাফলের আড়ালেও আছে বেশকিছু গল্প, যা হয়তো মিস করে গেছেন ক্লাব ফুটবলের ফেরার প্রহর গুণতে থাকা আপনি।

     

    রামোসের রেকর্ড, রেকর্ডের রামোস

    স্পেনের জার্সিতে কাটিয়ে দিয়েছেন ১৪টি বসন্ত। ইউরোপের আর দশটা দলের একটি থেকে ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জেতা স্পেনের স্বর্ণযুগের অমরত্ব, বা ২০১৪-এর ভরাডুবি- সব কিছুরই সাক্ষী হয়ে আছেন সার্জিও রামোস। জাভি, কার্লোস পুয়োল, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তারা বিদায় নিয়েছেন আগেই, ‘লা রোহা’দের জার্সিটা আজীবনের জন্য তুলে রেখেছেন তার প্রিয় বন্ধু ইকার ক্যাসিয়াসও। স্প্যানিশদের একাদশে এখন ইস্কো, আলোভারো মোরাতাদের তারুণ্যের জয়গান। কিন্তু স্পেনের নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের ব্যাটনটা থাকছে ‘পুরনো’ রামোসের হাতেই। হেডব্যান্ডে বাঁধা কাধছোঁয়া লম্বা চুলে রাইটব্যাকের দিনগুলো বিদায় জানিয়েছেন অনেক আগেই।

     

     

    তরুণ মাথাগরম রামোস এখন সেন্টার ব্যাকে খেলছেন অনেকদিন ধরেই, মাঠে নিজের মেজাজটাকেও নিয়ন্ত্রণে এনেছেন দারুণভাবে। স্পেনের হয়ে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ সবই দেখা রামোস গত সপ্তাহে ফারো আইল্যান্ডের বিপক্ষে নেমে ভাগ বসালেন স্পেনের হয়ে ক্যাসিয়াসের সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডে (১৬৭)। নরওয়ের বিপক্ষে অক্টোবরে বাছাইপর্বের পরের ম্যাচ খেললেই রেকর্ডটা নিজের করে নেবেন রামোস। 

     

     

    শুধু ম্যাচ খেলা নয়, একজন ডিফেন্ডার হয়েও স্প্যানিশদের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায়ও ঢুকে গেছেন রামোস। রোমানিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টিতে লক্ষ্যভেদ করে স্পেনের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষ দশে এখন তিনি। ফ্রান্সেসকো টট্টি, ইনিয়েস্তা, ডেভিড বেকহামদের চেয়েও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে গোল বেশি রামোসের। আর নয় গোল করলেই ঢুকে যাবেন শীর্ষ পাঁচে। স্প্যানিশদের পেনাল্টির দায়িত্বে থাকা এবং সেটপিসে বিশ্বে অন্যতম সেরা রামোসের জন্য এই নয় গোল করা হয়তো কিছুই না।

     

    কসোভো: ফুটবল যাদের ভাষা

    ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় সার্বিয়ানদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে মাথা উঁচু করে সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করল কসোভো। এখন পর্যন্ত তাদের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি সার্বিয়া, কিন্তু তাতে থেমে থাকেনি কসোভোর ফুটবল রূপকথা। জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে অর্থনীতি, রাজনীতিকেই বেছে নেয় বেশিরভাগ মানুষ। কিন্তু পৃথিবীর বুকে নিজেদের চেনাতে কসোভো বেছে নিয়েছিল এমন এক ভাষা, এমন এক মাধ্যম; যাতে ঘৃণার চেয়ে ভালবাসাটাই বেশি। ফুটবল। ১৮ লাখ মানুষকে ফুটবলে স্বপ্ন দেখার সাহসটা অবশ্য করিয়েছিলেন আরেকজন।

     

     

    কসোভোর ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার ধরা হয় তাকে। সার্বিয়ানদের নির্যাতনের মাঝেও স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন কসোভোর। ২০০৮ সালে যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে কসোভো, তখনই ফিদাল ভখরিকে নিজেদের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দেওয়া হয়। একদম গোড়ার থেকে শুরু করেন ভখরি। মাত্র বছর তিনেক আগে ফিফা এবং ইউয়েফার সদস্য হওয়া কসোভো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারের আগে অপরাজিত ছিল টানা ১৫ ম্যাচ, প্রায় দুই বছর। এত লম্বা সময় অপরাজিত থাকার রেকর্ড নেই ফ্রান্স, জার্মানির মত দলেরও।

    কসোভিয়ানদের যিনি ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস যুগিয়েছিলেন, সেই ভখরি পরপারে চলে গেছেন ২০১৮ সালে। তার সম্মানে কসোভোর হোমগ্রাউন্ডের নাম এখন ফিদাল ভখরি স্টেডিয়াম। ইংলিশদের কাছে হারলেও ২০২০ ইউরোতে কোয়ালিফাই করার স্বপ্ন ঠিকই দেখছে কসোভো। ওপার থেকে হয়তো সন্তানের অর্জনে গর্বিত বাবার মতই স্মিত হাসি হাসছেন ভখরি।

     

    ছোট মাঠে রোনালদো বড় রেকর্ডের ছড়াছড়ি

    দুই দেশের মাঝে র‍্যাঙ্কিংয়ের পার্থক্য ১২৪। কিন্তু নিজেদের মাঠ ভিলনিয়াসের এলএফএফ স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধ শেষে পর্তুগালের বিপক্ষে সমতায় থেকে বড় এক অঘটনের স্বপ্ন দেখছিল লিথুনিয়া। ৫,০০০ মানুষ ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে লিথুনিয়ার আর অঘটন ঘটানো হয়নি, দ্বিতীয়ার্ধের রীতিমত রেকর্ড বন্যা বইয়ে ম্যাচে চার গোল করে পর্তুগিজদের জয় নিশ্চিত করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

     

     

    আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে রোনালদোর গোলসংখ্যা এখন ৯৩। সামনে আছেন কেবল ইরানের আলি দাইয়ি (১০৯)। প্রীতি ম্যাচ বাদে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের হিসাবে রোনালদোর চেয়ে বেশি গোল (৭৪) নেই কারোই। ক্যারিয়ারে হ্যাটট্রিক সংখ্যা ৫৪-তে নিয়ে গেলেন ‘সিআর৭’। এতদিন ইউরো বাছাইপর্বের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন আয়ারল্যান্ডের রবি কিন (২৩)। লিথুনিয়া ম্যাচের আগে সাবেক লিভারপুল এবং টটেনহাম স্ট্রাইকার ইন্সটাগ্রামে মজা করে রোনালদোর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, অন্তত এই রেকর্ডটি যেন না ভাঙ্গেন জুভেন্টাস ফরোয়ার্ড।

    কিন্তু রোনালদো কি আর গোল করা থামাবেন। কিনের ঐ পোস্টের পরের ম্যাচেই   রেকর্ডটা নিজের করে নিলেন তিনি। ক্যারিয়ারে মোট ৪০টি দেশের বিপক্ষে গোল করেছেন তিনি। রোনালদোকে ফুটবলের ‘মিস্টার ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ বললেও হয়তো ভুল হবে না খুব একটা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও হয়তো খুব বেশি দূরে নয় রোনালদোর।

     

    ফিনল্যান্ডের দুর্ধর্ষ ফিনিশার 

    ২০১৮-১৯ মৌসুমে ইংলিশ দ্বিতীয় বিভাগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি, নরউইচ সিটিকে নিয়ে এসেছেন প্রিমিয়ার লিগে। বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক লিগের শুরুটাও স্বভাবসুলভ দুর্দান্ত হয়েছে ফিনল্যান্ডের টিমু পুকির। প্রিমিয়ার লিগে ৪ ম্যাচে করেছেন ৫ গোল। শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, দেশের হয়েও সমান উজ্জ্বল পুকি।

     

     

    নরউইচের মতই ফিনল্যান্ডের হয়েও ৪ ম্যাচে ৫ গোল করেছেন তিনি। ইতালির বিপক্ষে বাছাইপর্বের ম্যাচে খালি হাতে ফিরলেও একটা সময় দলকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন তিনিই। স্বদেশি ক্লাব কেটিপির হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন পুকি। এরপর ইউরোপ চষে বেড়িয়েছেন সেভিয়া, শালকে এবং সেল্টিকের হয়ে; কিন্তু কখনোই তেমন সাফল্য পাননি। ২০১৪ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার আরেক ক্লাব ব্রন্ডবিতে ফিরে স্বরূপে ফেরা পুকি নরউইচে পাড়ি জমান গত বছর, এর পর থেকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি তাকে। দেশের হয়ে অভিষেকের এক দশক পরও কোনও বড় টুর্নামেন্টে খেলা হয়নি পুকির। ইউরো বাছাইপর্বে ‘জে’ গ্রুপে টেবিলের দুইয়ে আছে পুকির ফিনল্যান্ড। প্রত্যেক গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি খেলবে আগামী বছরের ইউরোতে। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ইউরোর মূলপর্বে জায়গা করে নিতে তাই খুব সম্ভবত ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে থাকা পুকির ওপরই ভরসা রাখবে ফিনিশরা।

     

    মাদ্রিদ, আলবেনিয়া, অ্যান্ডোরা এবং গ্রিযমান

    ইউরো বাছাইপর্বে তুরস্ক ছাড়া এখন পর্যন্ত তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। এবারের আন্তর্জাতিক বিরতিতে আলবেনিয়া এবং অ্যান্ডোরার বিপক্ষেও এসেছে সহজ জয়। কিন্তু দল জয়ের ধারায় থাকলেও এই দুই ম্যাচ হয়তো সতীর্থদের মত উল্লাস করতে পারছেন না আঁতোয়া গ্রিযমান।

     

     

    আলবেনিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি পেয়েছিল ফ্রান্স। এগিয়ে আসলেন গ্রিযমান, গোলরক্ষককেও পরাস্ত করলেও বল প্রতিহত হল ক্রসবারে। হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড, হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে গেলেন ২০১৭ সালে। মিলান, চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ বনাম রিয়াল মাদ্রিদ। রিয়াল লিড নিলেও পেনাল্টি মিসে সমতায় ফেরার সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন গ্রিযমান। টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ায় এত কাছে এসেও ছুঁয়ে দেখে হয়নি  চ্যাম্পিয়নস লিগ। পরের ম্যাচে অ্যান্ডোরার বিপক্ষে আবারও পেনাল্টি পেল ফ্রান্স, গ্রিযমানেই আস্থা রাখল ‘ব্লুজ’রা।

    কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালে পেনাল্টিতে গোল করা গ্রিযমান মিস করলেন আবারও, এবার অবশ্য সেভটা ছিল দুর্দান্ত। রক্ষণ, মাঝমাঠ, আক্রমণ- ফ্রান্সে প্রতিভার অভাব নেই কোথাওই। ইউরোপে খুব সম্ভবত সেরা ফুটবলটাই খেলে দেশমের দল। কিন্তু তারপরও এই একটা জায়গা নিয়েই তাই হয়তো ভাবতে হচ্ছে ফ্রান্সকে। দলে আছেন কিলিয়ান এম্বাপ্পে, পল পগবারা। হয়তো ভবিষ্যতে গ্রিযমান নয়; তাদের একজনকেই পেনাল্টির দায়িত্ব দিতে পারেন দেশম।