• বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    আর্জেন্টাইন 'জলদস্যু'কে বসুন্ধরার জাঁকালো বরণ

    পেছনে জায়ান্ট স্ক্রিনে লেখা 'হেয়ার কামস বার্কোস', সামনে টেবিলে হের্নান বার্কোসের সামনে চুক্তির কাগজ-পত্র। চুক্তি স্বাক্ষর করলেন বার্কোস, হাত মেলালেন ক্লাব প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। এর পর জার্সি মেলে ধরলেন। কিছুক্ষণ বাদে সেই জার্সি পরে মঞ্চে উঠে গেলেন। আগুনের ফুলকির মাঝে এক হাতে চোখ ঢেকে রেখে দেখালেন নিজের 'বিখ্যাত' গোল উদযাপন। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে বার্কোসের এই জলদস্যু উদযাপন ছিল নিয়মিত ছবি। এবার আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার এসেছেন বাংলাদেশে, বসুন্ধরা কিংস সে উদযাপন দেখার অপেক্ষায়। 

    এই খন্ড-চিত্রগুলো আপনাকে ইউরোপিয়ান ফুটবলের নতুন কোনো খেলোয়াড়ের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। বার্কোসের জন্য অবশ্য এমন জাঁকালো আয়োজনই বেমানান নয় মোটেই। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবে বাংলাদেশে খেলতে এসছেন তিনি। ছিলেন লিওনেল মেসির সতীর্থ। বসুন্ধরা কিংস বার্কোসকে দলে ভেড়াচ্ছে সে খবরেই খরার ফুটবলে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল একরকম। সেই চুক্তিটাই পাকাপাকি হলো রবিবার, বসুন্ধরার নিজেদের মাঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া খেলোয়াড়ও হতে যাচ্ছেন তিনি।  মাসে পাবেন ১৭ লাখ টাকা। নভেম্বর পর্যন্ত বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তার- এ কথাগুলো এখন তাই আনুষ্ঠানিকভাবেই লেখা যাচ্ছে, যেমনটা লেখা হয় ইউরোপিয়ান দলবদলে কোনো খেলোয়াড়ের চুক্তি স্বাক্ষরের পর!

    ৮ দেশ, ৩ মহাদেশ, ১৫ ক্লাব ঘুরে ফুটবলের অখ্যাত মানচিত্র বাংলাদেশে এসেছেন বার্কোস। ব্রাজিলের পালমেইরাস, গ্রেমিও আর ক্রুজেরিওতে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। সবশেষ খেলা কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব অ্যাটলেটিকো নাসিওনালেও গোলের ধারা রেখেছিলেন সচল। দক্ষিণ আমেরিকায় 'এল পিরাতা' বললে এক নামে বার্কোসকে চেনে সবাই। যার অর্থ পাইরেট বা জলদস্যু।

     


    নতুন ক্লাবে নাম লেখানোর দিনে বার্কোসই জানালেন, ওই জলদস্যুর উদযাপনটা ঢাকার মাঠে নিয়মিত দৃশ্যতে পরিণত করতে চান তিনি। বার্কোস নামের অর্থ জাহাজ, আর গোল করে প্রতিপক্ষকে ধ্বসিয়ে দেওয়ার জন্য তার নাম হয়ে গেছে জলদস্যু। গোলের উদযাপনও তাই জলদস্যুদের মতো তার, "আমি বাংলাদেশে খুব দ্রুতই জলদস্যু উদযাপন করতে চাই। আশা করি সমর্থকেরাও আমাকে সঙ্গ দেবে। তবে এখানে গোল করা চ্যালেঞ্জ হবে। আমি অবশ্য এখানে শুধু নিজের গোল উদযাপন করতে চাই না। গোল করা আমার কাজ, তবে আমি এখানে দলের সঙ্গে কাজ করতে চাই। সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।"

    বাংলাদেশে দলবদলের সময় ফুরিয়ে যাওয়ায় আপাতত লিগের প্রথম অর্ধে মাঠে নামা হচ্ছে না আর্জেন্টিনার হয়ে ৪ ম্যাচ খেলা বার্কোসের। খেলবেন মার্চ থেকে শুরু হওয়া এএফসি কাপে, এর পর ঘরোয়া লিগের দ্বিতীয় অর্ধেও বসুন্ধরার হয়ে মাঠে নামবেন তিনি।

     


    জাতীয় দলে খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ না হলেও বার্কোস দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে মোটামুটি নিজের জাত চিনিয়ে এসেছেন। আর্জেটিনায় বার্কোস প্রথমবার ডাক পেয়েছিলেন ২০১২ সালে। সেবার বিশ্বকাপ বাছাইসহ, সুপারকোপাতে ব্রাজিলের বিপক্ষে মেসির সঙ্গে আক্রমণভাগে খেলার সুযোগ হয়েছিল বার্কোসের। অবশ্য জাতীয় দলের অভিজ্ঞতাটা আর বাড়েনি বার্কোসের, ৪ ম্যাচেই আটকে গেছে। লিওনেল মেসি, গঞ্জালো হিগুয়াইন, সার্জিও আগুয়েরো, কার্লোস তেভেজদের সেই আমলে আর্জেন্টিনার আক্রমণেভাগে জায়গা পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার! বার্কোস জানাচ্ছেন জাতীয় দলে দুবারের বেশি ডাক না পেলেও সবসময়ই জাতীয় দলের রাডারে থাকতে পেরেই ভাগ্যবান তিনি, "আমার হয়ত জাতীয় দলে বেশি খেলার সুযোগ হয়নি। তবে আমি সবসময়ই আর্জেন্টিনার ফেডারেশনের রাডারে ছিলাম। আমি ভাগ্যবান যে জাতীয় দলে খেলার জন্য বিবেচনায় করা হত আমাকে।"

    পেশাদার ক্যারিয়ারে সবমিলিয়ে ৪৯৪ ম্যাচে ২৩১ গোল বার্কোসের। খেলার অভিজ্ঞতা আছে লুই ফিলিপে স্কলারির অধীনে। দুই দফায় ব্রাজিলিয়ান লিগের দুই ক্লাব পালমেইরাস ও গ্রেমিওতে স্কলারির মূল স্ট্রাইকিং ভরসা ছিলেন বার্কোস। দুই দফায় ইউরোপের সার্বিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেড, পর্তুগালের স্পোর্টিং সিপির হয়েও খেলেছেন এই আর্জেন্টাইন। বয়স বলছে সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি। তবে বসুন্ধরায় নাম লেখানোর আগে বার্কোসের কাছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দুইটি ক্লাবের প্রস্তাবও এসেছিল। বয়স ৩৫ হলেও বার্কোস মনে করিয়ে দিয়েছেন মাত্র দুই মাস আগেও কলম্বিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে খেলেছেন তিনি।   

    বসুন্ধরা প্রেসিডেন্ট ইম্রুল হাসান বলছেন এএফসি কাপের ভালো কিছু করার সঙ্গে ফুটবলের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দর্শকদের টানতে বার্কোসের মতো একজনকে দলে টেনেছেন তারা। খেলোয়াড় চুক্তির আয়োজনেও রেখেছেন পেশাদারিত্বের ছাপ। আর বার্কোসের লক্ষ্য কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ব্রাজিলের মাঠভর্তি দর্শকের সামনে করা 'পারেইট' উদযাপন দিয়ে বাংলাদেশ ফুটবলের জিরো পয়েন্ট বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে নীলফামারি পর্যন্ত একটা বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়া। বার্কোস বলছেন, বসুন্ধরা কিংসের চ্যালেঞ্জটাই মনে ধরেছে তার, সে কারণেই এসেছেন বাংলাদেশে।

    বার্কোস এই চ্যালেঞ্জ কতোখানি উতরাতে পারবেন সেটা বোঝা যাবে কিছুদিন পরই। মার্চের ১১ তারিখ এএফসি কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে বসুন্ধরা কিংস। বাংলাদেশের নতুন জায়ান্টদের প্রত্যাশার অনেকটা জুড়েই অনুমিতভাবে থাকবেন 'জলদস্যু' বার্কোস।