• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    ওল্ড ট্রাফোর্ডেও একজন 'সুপারম্যান' ছিলেন

     

    একটা বিকট আওয়াজ, কিছু মানুষের আর্তনাদ। মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল হ্যারি গ্রেগের।

    সম্বিত ফেরার পর টের পেলেন, শরীরের বেশ কিছু জায়গায় প্রচণ্ড ব্যথা। বেঁচে যে আছেন, ব্যথার এই তীব্র অনুভূতিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল তাকে। আঁধার সয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পারলেন, প্রায় ধ্বংসস্তুপের মধ্যে চাপা পড়ে আছেন। কোনোমতে সিটবেল্ট খুললেন, দেখতে পেলেন একদিক থেকে মৃদু আলো চুইয়ে চুইয়ে আসছে। আলোর সেই উৎসই বের হওয়ার পথ করে দিল তাকে। সে সময়েই দেখলেন, যুব দলের কোচ বার্ট হুইটলি নিথর পড়ে আছে। ষষ্ঠেন্দ্রিয় গ্রেগকে বলে দিল, হুইটলিকে বাঁচানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। গ্রেগ কোনোমতে জানলা গলে বেরিয়ে পড়লেন বাইরে। তুষারশুভ্রে মিউনিখ বিমানবন্দরের রানওয়ে তখন যেন একটুকরো খাণ্ডবদাহন, একপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে ব্রিটিশ ইউরোপিয়ান এয়ারওয়েজের বিমান। গ্রেগ এতক্ষণ নিজে বেঁচেছিলেন, এরপর বাস্তবের সত্যিকার সুপারহিরো হওয়ার শুরু। মিউনিখ-ট্র্যাজেডির ৬২ বছর পর পার হওয়ার পর আজ সবকিছুর সঙ্গে স্মৃতি হয়ে গেলেন সেই গ্রেগ।

     

    **

    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খুব পাঁড় ভক্ত না হলে গ্রেগকে মনে রাখার তেমন কোনো কারণ নেই। ইউনাইটেডের হয়ে কখনো বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি। প্রিমিয়ার লিগ, ইউরোপিয়ান কাপ দূরে থাক এমনকি এফএ কাপও জেতা হয়নি। ইউনাইটেডের আগে পরেও খেলেছেন স্টোকসে, তখনো কোনো বড় ট্রফিতে চুমু খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের হয়ে ২৫টি ম্যাচ খেলেছেন, তবে গ্রেগের সেরা সময় এসেছিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপে। সেবার দেশের হয়ে দুর্দান্ত কিপিং করেছিলেন, পেলেদের এই বিশ্বকাপে তার জন্য কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পেরেছিল নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। সেই বিশ্বকাপে সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার উঠেছিল তার হাতে, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সেটাই। তবে গ্রেগকে আসলে এর চেয়েও বড় কারণে মনে রাখবে ফুটবল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে যা করেছেন, সেটার ঋণ  চেষ্টা করলেও কখনো শোধ করতে পারবে না ইউনাইটেড।

     

    ***

                                                               মিউনিখকে ভুলতে পারেননি গ্রেগ

    গ্রেগের জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে। এরপর ডনকাস্টারের হয়ে খেলেছেন পাঁচ বছর। সেটা ১৯৫৭ সাল, ম্যাট বাসবির মনে হলো ভালো একজন গোলরক্ষক দরকার তার। গ্রেগকে ২৩ হাজার ৫০০ পাউন্ড দিয়ে নিয়ে এলেন ইউনাইটেডে, সে সময় কোনো গোলরক্ষকের জন্য তা ছিল বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু কে জানত, মাস তিনেক পর ইউনাইটেডের গোলপোস্টের চেয়েও অনেক অনেক বড় কিছু বাঁচাতে হবে তাঁকে!

    ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৮। মিউনিখের সেই দুর্ঘটনার কথা ফুটবলের যারা এক আধটু খোঁজখবর রাখেন, তারাও কমবেশি জানেন। রেডস্টার বেলগ্রেডের সাথে ইউরোপিয়ান কাপের ম্যাচ খেলে ম্যানচেস্টারে ফিরছিল বাসবির দল, আদর করে যাদের ডাকা হতো বাসবি বেবস। ৩-৩ গোলে ড্র করেও সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল ইউনাইটেড, মিউনিখে জ্বালানি ভরতে থামার কথা ছিল বিমানের।

    সবকিছুই চলছিল ভালোমতোই। বিমানেই ছেলেদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছিলেন বাসবি, সেমিতে ওঠার পর সবার মন বেশ ফুরফুরে। জ্বালানিও ভরা হলো, প্রথম বিপত্তিটা বাধল টেক অফ করার সময়। উড়াল দিতে পারলেন না পাইলট, এরপর দ্বিতীয় দফা চেষ্টা করলেন। সেবারও লাভ হলো না। বিমানের সবার মধ্যে তখন চাপা অস্বস্তি। বাইরে তখন তুষার পড়ছে, আবহাওয়া বেশ দুর্যোগপূর্ণ। আরেকবার চেষ্টা করা হবে কি না তা নিয়ে খানিকটা দোটানা বিমানের ক্রুদের মধ্যে। কিন্তু পাইলট ঠিক করলেন, মিউনিখে আর এক দিন অপেক্ষা না করে শেষ একটা চেষ্টা করবেন। সেটা করাটাই হলো কাল। টেক অফ করার আগেই রানওয়ের পাশে আছড়ে পড়ল বিমান।

    গ্রেগও আর সবার মতো চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন টেক অফের জন্য। প্রচণ্ড ধাক্কায় সম্বিত হারিয়ে ফেলার পর ফিরে পেতে সময় লাগেনি। জানালা গলে বাইরে বেরিয়ে আসার পর সবার আগে দেখা হয়ে গেল ক্যাপ্টেন জিম শেইনের সাথে।

    ‘গাধা, দৌড় দাও। যে কোনো মুহূর্তে বিমান ধসে পড়বে’- গ্রেগ কিছু বলার আগেই চেঁচিয়ে উঠলেন শেইন।

    ‘আহাম্মক, ভেতরে অনেক লোক এখনো জীবিত’- গ্রেগও পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলেন।

    মনে পড়ল, প্রিয় বন্ধু জিমি জ্যাকি ব্লাঞ্চফ্লাওয়ার রয়ে গেছেন বিমানের ভেতরে। গ্রেগ ঠিক করলেন, তাকে আনতে যাবেন। একটা ফাঁক গলে বিমানের ভতর ঢোকার পর কানে এলো কান্নার ক্ষীণ আওয়াজ। আরেকটু এগুতে বুঝতে পারলেন, একটা শিশু কাঁদছে। গ্রেগ শিশুটিকে কোলে নিলেন, পাশে আহত মা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এক এক করে মা আর শিশু দুজনকে নিয়েই চলে এলেন বাইরে। তখনই দেখলেন, ইউনাইটেডের দুই সতীর্থ দরজার পাশেই মৃতবৎ পড়ে আছে। ববি চার্লটন আর ডেনিস ভায়োলেটেরও জ্ঞান নেই তখন, গ্রেগ মনে করেছিলেন দুজন আর বেঁচে নেই। তারপরও আগুন থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য ট্রাউজার ধরে দুজনকে বের করে আনলেন বাইরে। তখন একটু একটু করে বিমানকে গ্রাস করতে শুরু করেছে আগুনের লেলিহান শিখা। শুরু হয়ে গেছে লোকজনের ছোটাছুটি, হিম বাতাস ভারি হয়ে আছে তুষারশুভ্র চিৎকারে। গ্রেগ বাইরে এসে দেখলেন, কোচ ম্যাট বাসবি বজ্রাহতের মতো মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন রানওয়েতে। চোখে শুন্য দৃষ্টি, গ্রেগ হঠাৎ দেখলেন ব্লাঞ্চফ্লাওয়ারকে বের করে আনা হচ্ছে। হাতের একটা অংশ  প্রায় নেই হয়ে গেছে। গ্রেগ তড়িঘড়ি করে তাকে তুলে দিলেন অ্যাম্বুলেন্সে। তবে খানিক পরেই সবিস্ময়ে দেখলেন, চার্লটন আর ভায়োলেট শুধু বেঁচে নেই, জ্ঞান ফিরে পেয়ে উঠেও বসেছেন। তবে বাসবি বেবসের আটজনকে সেদিন বাঁচাতে পারেননি গ্রেগ।

                                                                       ববি চার্লটনের সাথে

    সেই আটজনের মধ্যে রজার বায়র্নকে না বাঁচাতে পারার কষ্ট অনেক দিন তাড়া করে বেরিয়েছে গ্রেগকে। সেই গ্লানিতে ৪০ বছর বায়র্নের বিধবা স্ত্রীর মুখোমুখি হতে পারেন নি, অনেক পরে এসে ওল্ড ট্রাফোর্ডের একটা সম্মাননায় এসে কিছুটা কমেছে সেই কষ্ট। গ্রেগ যে কয়জনকে বাঁচিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে চার্লটনের হাত ধরে এসেছে ইউনাইটেডের স্বর্ণালী সময়। বাসবির ছানাপোনারা শুধু লিগ নয়, ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে জিতেছে ইউরোপিয়ান কাপও। তবে সেই দলে গ্রেগ ছিলেন না, তার আগেই ছেড়ে গেছেন ইউনাইটেড।

    ছাড়তে হয়েছে তাকে আরও অনেক কিছুই। মিউনিখ-দুর্ঘটনার মাত্র ১৩ দিন পরেই আবার গ্লাভস হাতে নেমে পড়েছেন মাঠে। ক্লাবের হয়ে ক্লিন শিটও পেয়েছেন। সে বছরেই এফএ কাপের ফাইনালেও নিয়ে গিয়েছিলেন দলকে, শিরোপা জেতাতে পারেননি অবশ্য। সব হারিয়ে ফেলা ইউনাইটেডের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে আগলে রেখেছিলেন আরও অনেক দিন। এর মধ্যে বড় একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় আরেকবার জীবন সংশয় হতে বসেছিল, অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন এবারও। তবে মিউনিখের সেই দিনের চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি এসেছে জীবনে। ১৯৬১ সালে স্তন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ে হার মেনে চলে গেছেন প্রথম স্ত্রী। সেই শোক অনেকদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তাকে, খেলার ওপর থেকে মন উঠে গিয়েছিল প্রায়। তবে গোলপোস্টের নিচে শেষ পর্যন্ত বড় ভরসা হয়ে ছিলেন সবসময়। শেষ পর্যন্ত আজ চলে যেতে হলো জীবনের গোলপোস্ট ছেড়ে।

    তবে গ্রেগ চলে যাওয়ার আগে আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, মাঠের নায়ক তো অনেকেই হয়, বাস্তবের নায়ক হতে পারেন কয়জন? সুপারম্যানরা তাই কল্পনায় নয়, আমাদের আশেপাশেই আছেন।