• লা লিগা
  • " />

     

    বেতন, বার্তোমেউ, বার্সেলোনা : মেসিদের যত জটিলতা

    লিওনেল মেসির আরেকটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বোর্ডের সঙ্গে বার্সেলোনা খেলোয়াড়দের দূরত্বটা স্পষ্ট হয়েছে আরেকটু। করোনাভাইরাসের সঙ্কটাবস্থার ভেতর শেষ পর্যন্ত বেতন ৭০ শতাংশ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেসিরা। তবে এর আগে শোনা গিয়েছিল প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না তারা। যদিও মেসি বলছেন, এই বেতন কম নেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা আগেই রাজি ছিলেন। বরং বিভিন্ন মিডিয়ায় খেলোয়াড়দের সমালোচনার জন্য উলটো বোর্ডকেই দায়ী করেছেন মেসি। বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের বেতনাদি সংক্রান্ত জটিলতা স্পষ্ট করে বিশ্লেষণ করলে অবশ্য মেসিদের কথাটাকেই সত্যি বলে ধরে নিতে হবে।

    সমস্যার শুরু যেখানে
    ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর ভেতর সবার আগে বার্সেলোনার পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের বেতন ছাঁটাইয়ের কথা উঠেছিল গত সপ্তাহে। ক্লাব প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া বার্তোমেউ তখন এর্তে (ইআরটিই) প্রণয়নের কথা বলেছিলেন। স্প্যানিশ লেবার আইনের এই নিয়ম অনুযায়ী জরুরী অবস্থায় খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ বেতন কেটে নেওয়ার আইন রয়েছে।

    বার্তোমেউয়ের দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী বার্সেলোনার ফার্স্ট ফুটবল টিম, নারী ফুটবল দল, বাস্কেটবল দল, আইস হকি দল সহ, এর সঙ্গে যুক্ত সকল স্টাফদের বেতনের ৭০ শতাংশও কেটে নেওয়ার কথা ছিল। তবে এই নিয়মে বেশ কিছু ফাঁক-ফোকরও ছিল। মেসিদের বেতন আর বার্সেলোনার আইস হকি খেলোয়াড়ের বেতনের অঙ্কে রয়েছে বিশাল ফারাক। সে হিসেবে তাদের থেকেও একজন আইস হকি খেলোয়াড়ের ৭০ শতাংশ বেতন কেটে নেওয়া মানে তার জন্য বড় ধাক্কাই। প্রশ্ন থেকে যায় আরও একটি, স্পোর্টিং স্টাফদের বেতন কাটা হলে তাতে ক্লাবের যে ভরণ-পোষণের কথা বলা হচ্ছে সেটিই বা কার্যকর হলো কোথায়?

    স্প্যানিশ গণমাধ্যমের দেওয়া খবর অনুযায়ী বার্তোমেউয়ের প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না মেসি-পিকেরা। লা লিগায় এপ্রিলের ৩০ তারিখ পর্যন্ত খেলা বন্ধ। তবে এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আদৌ আবার কবে ফুটবল মাঠে গড়াবে সেই দিন তারিখ জানা নেই কারও।

    শেষ পর্যন্ত নেওয়া সিদ্ধান্তে তাই ফার্স্ট টিমের সব ফুটবলার ও বাস্কেটবল দলের বেশ কিছু খেলোয়াড়ের ৭০ শতাংশ বেতন কমিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর যেহেতু এর্তের নিয়ম অনুযায়ী ৭০ শতাংশের বেশি বেতন কাটার নিয়ম নেই, তাই মেসিরা ঘোষণা দিয়েছেন স্টাফদের শতভাগ বেতন নিশ্চিত করতে আরও আর্থিক সহযোগিতা করবেন তারা।


    বার্সেলোনার আর্থিক অবস্থা কি এতোটাই খারাপ?
    আপনি ভাবতে পারেন কেন বার্সাকে এই কঠিন পথে হাঁটতে হচ্ছে। এর পেছনে কারণ অবশ্য বার্সার আর্থিক দৈন্যদশা। গত বছর ১.০৪৭ বিলিয়ন ইউরো বাজেটের ৬৬ শতাংশই বার্সা খরচ করেছে ফার্স্ট টিমের খেলোয়াড়দের বেতনভাতা মিটিয়ে। এবার সেটা কমে ৬১ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। এর পরও এই অঙ্কটা আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রিয়াল মাদ্রিদের জন্য যে খরচটা ৫০ শতাংশের মতো।

    আর জরুরী অবস্থায় বার্সেলোনাকে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে অন্যান্য দিক দিয়ে। ক্লাবের যে মিউজিয়াম ও স্টোর থেকে থেকে বছরে বার্সেলোনার আয় প্রায়  ১৫০ মিলিয়ন ইউরো- সেটিও এই অবস্থায় বন্ধ রয়েছে। লা লিগায় ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আদৌ এর পর আবার কবে লিগ শুরু হবে সেটি এখনও অজানাই। টেলিভিশন সম্প্রচারসত্ব থেকে যে বড় অঙ্কের টাকা বার্সার পাওয়ার কথা সেটিও বাকি ক্লাবগুলোর মতো বার্সার জন্যও রয়েছে ঝুলে। এমন পরিস্থিতিতে বেতন কমানোর পথে হাঁটতেই হত বার্সাকে। মেসিও তার বিবৃতিতে সে কথাই বলেছেন, খেলোয়াড়রা বেতন কমিয়ে আনার ব্যাপারে একমত ছিলেন আগে থেকেই।  

    তবে তাদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটা ছিল ভিন্ন। এ বছর বার্সার ফুটবলারদের বেতনের পেছনে ক্লাবের ব্যয় হবে ৩৯১ মিলিয়ন ইউরো। খেলোয়াড়রা এই বার্ষিক বেতনের ১০%-১৫% কেটে নেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তাতে টাকার অঙ্কটা দাঁড়াতো সবমিলিয়ে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো। যেটি এখন কেটে নেওয়া খেলোয়াড়দের মাসিক ৭০ শতাংশের বেতনের যোগফলের কম।

    এর্তের নিয়ম অনুযায়ী জরুরী অবস্থা কেটে গেলে খেলোয়াড়দের আবারও শতভাগ বেতন দিতে হবে ওই প্রতিষ্ঠানকে। তবে যেহেতু জরুরী অবস্থা কতোদিন চলবে সেটি নিয়ে ধারণা নেই কারও- তাই বোর্ডের দেওয়া ৭০ শতাংশ বেতন কমিয়ে আনার প্রস্তাবে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হয়েছে মেসিদের।

    খেলোয়াড়দের সঙ্গে বোর্ডের দূরত্বটা স্পষ্ট
    এই নিয়ে দুই মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার মেসি ইনস্টাগ্রামকে বেছে নিয়েছেন নিজের বিবৃতি দেওয়ার জন্য। পরে ওই পোস্ট শেয়ার করেছেন পিকে, গ্রিযমান, সুয়ারেজরা। আরও মজার বিষয় হলো, বার্সেলোনার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসার আরও কিছুক্ষণ আগেই খেলোয়াড়রা নিজেদের বেতন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। বোর্ডের ওপর খেলোয়াড়দের বিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে আরও।

    মেসি তার বিবৃতিতে সরাসরি ক্লাব অফিসিয়ালদের এক হাত নিয়েছেন, “আমরা সবসময়ই বেতন কমিয়ে আনার ব্যাপারে একমত ছিলাম। এর পরও ক্লাব অফিসিয়ালদের কেউ কেউ আমাদের আতশ কাঁচের নিচে ফেলে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে আমরা অবাক না হয়ে পারেনি।”

    আসলে সত্যিটা হচ্ছে মেসির অবাক হওয়ার কোনো কারণই নেই। “আমাদের বেতন নিয়ে গত কয়েকদিন অনেকরকম কথা হয়েছে।” -  বিবৃতির শুরুতেই এ কথা বলে অবশ্য মেসি তার স্পষ্ট বিরক্তি আড়াল করেননি বা করতে চাননি। মূলত নিজেই আগে বিবৃতি দিয়ে বোর্ডের সঙ্গে তাদের দূরত্বটাই  বোধ হয় তারা স্পষ্ট করতে চেয়েছেন বার্সা খেলোয়াড়রা।

    আর নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭০ শতাংশ বেতনের সঙ্গে, আরও আর্থিক সহয়াতার আশ্বাস দিয়ে আসলে একরকম বার্তোমেউকে এক হাত নিয়েছেন মেসিরা। একটা দৃষ্টান্তই স্থাপন হয়েছে তাতে। ব্যাপারটা এমন যে বেতন তো দিচ্ছিই, সঙ্গে যে স্টাফদের বেতন কাটতে চেয়েছিলে তাদেরকেও পুরো বেতন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি- এবার দেখো! 

    ফ্রান্সের জনপ্রিয় পত্রিকা মেসিদের এই সিদ্ধান্তের খবর ছেপেছে প্রথম পাতায়। প্রচ্ছদে চে গুয়েভারার দাঁড়ি-টুপিতে মেসির মাথা বসিয়ে তারা শিরোনামে লিখেছে, "বার্সেলোনার চে গুয়েভারা"।