• লা লিগা
  • " />

     

    সেদিনের এই দিনে : রোনালদোর গোলে শুনশান ন্যু ক্যাম্প

    ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তখনও গোল উদযাপনে বাধা-ধরা কোনো নিয়ম ছিল না। যখন যেভাবে মনে হত, সেভাবেই গোল উদযাপন করতেন। গোল উদযাপন নিয়মিত  হলেও, শিরোপা উদযাপন করার সুযোগ তখনও কালে-ভদ্রে মিলত রিয়াল মাদ্রিদের। ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বার্সেলোনার একচ্ছত্র আধিপত্য রিয়াল মাদ্রিদ ভেঙেছিল ২০১১-১২ মৌসুমে। তার শেষটা লেখা হয়েছিল রোনলাদোর হাতে। হাতে অবশ্য নয় পায়ে। এর পর ন্যু ক্যাম্পে রোনালদোর সেই বিখ্যাত উদযাপন, “কালমা..কালমা”। শান্ত হও, শান্ত হও। বার্সেলোনার সাম্রাজ্যের শেষের শুরুটাও তখন থেকে।

    রিয়াল মাদ্রিদের ওই মৌসুমে একরকম শিরোপা জিততেই হত। আগের তিন মৌসুমে রোনালদো, কাকাদের মতো খেলোয়াড় ভিড়িয়েও লাভ হয়নি তেমন। ইন্টার মিলানকে ট্রেবল জিতিয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ডাগআউটে বসা হোসে মরিনহোও প্রথম মৌসুমে ফ্লপ। পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা তখন রিয়াল মাদ্রিদের কাছে অদ্ভুত এক ভয়ের নাম।

    ওই ভয়টাই জয় করতে শিখিয়ে গিয়েছিলেন মরিনহো। নিজের দ্বিতীয় মৌসুমে তার অধীনে দুর্দান্ত রিয়াল মাদ্রিদ। এপ্রিলের শুরুতেও বার্সেলোনার চেয়েও ১০ পয়েন্টে এগিয়ে ৪ বছরের লিগ শিরোপা খরা ঘোচানোর পথে ছিল লস ব্লাঙ্কোরা। তখনও এপ্রিলের ২১ তারিখের এল ক্লাসিকোটা মনে হচ্ছিল শুধুই আনুষ্ঠানিকতার।

    ওই ক্লাসিকো পর্যন্ত যেতে যেতে অবশ্য বার্সেলোনা ব্যবধান কমিয়ে আনল। রিয়ালের ১০ পয়েন্টের লিড নেমে গেল ৪ এ। ন্যু ক্যাম্পে লিগের ৩৪ তম ম্যাচের আগে তাই অবধারিতভাবেই ‘যুদ্ধ’ পরিস্থিতি।


    গার্দিওলা অবশ্য ম্যাচের আগেই বলে রেখেছিলেন, ক্লাসিকো না জিততে পারলে শিরোপা জেতার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর ক্লাসিকোর আগে মরিনহো নিজের চুলে ক্রু কাট দিয়ে হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত তিনি।

    তখনকার ক্লাসিকোতে ডাগ আউটের দুই কোচ আলো কাড়তেন অনেকটাই। তবুও মাঠের দুইজন- রোনালদো আর লিওনেল মেসির সামনে সে আলো অন্ধকারের মতোই ছিল। ক্লাসিকোর আগেও দুইজনের পারফরম্যান্সের দারুণ স্থিতিশীলতা- রোনালদোর গোল ৪১, মেসিরও তাই।

    ক্লাসিকোতে রিয়ালের জয় মানে  শিরোপা মোটামুটি নির্ধারণ হয়ে যাওয়া। আর ড্র মানে ঝুলে থাকা, বার্সার জয় মানে রিয়াল মাদ্রিদ তখনও থাকবে ১ পয়েন্টে এগিয়ে। লা লিগার ওই মৌসুমে লড়াই হচ্ছিল হাড্ডাহাড্ডি।

    ন্যু ক্যাম্পে শুরুতেই ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী রোনালদো। আগের দুই ক্লাসিকোতেও এই মাঠে গোল করে গিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচের ৩ মিনিটে আরেকটু হলে তৃতীয়টাও পেয়ে যেতেন। কর্নার থেকে লাফিয়ে উঠে যে হেড করেছিলেন, সেটা ভিক্টর ভালদেস দারুণ এক সেভে কোনোমতে বাইরে ঠেলে দিলেন।

    কর্নার থেকেই অবশ্য ১৭ মিনিটে কপাল পুড়েছিল বার্সার। পেপের হেড শুরুতে ঠেকিয়ে দিলেও পরের দফায় আর রক্ষা করতে পারেননি ভালদেস-পুয়োলরা। সামি খেদিরা এগিয়ে নেন রিয়ালকে। ম্যাচের তখনও লম্বা সময় বাকি, ওই গোলে অস্বস্তি চাপলেও ভীতি চাপেনি ন্যু ক্যাম্পে।

    গার্দিওলা সে ম্যাচেও একাদশে চমক রেখেছিলেন। মেসির সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ান টেয়ো আর আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা আক্রমণভাগে, বেঞ্চে অ্যালেক্সিস সানচেজ আর ফ্যাব্রিগাস। এরপরও অবশ্য বল পজেশন নিয়ে খুব বেশি ধকল পোহাতে হয়নি বার্সাকে। তবে সমস্যা একটাই, সময় যত গড়িয়েছে ওই বল পজিশন হয়ে পড়েছে ততো অর্থহীন।

    সানচেজকে দ্বিতীয়ার্ধে নামাতেই হলো গার্দিওলাকে। মাঠে নেমেই গোলও করে বসলেন তিনি। ম্যাচের ৭০ মিনিটে ন্যু ক্যাম্পের ফল তখন ১-১। গুমোট ন্যু ক্যাম্পে আশা আলো। নিদেনপক্ষে ড্র হলেও তো সুযোগ থাকে তাদের!


    এখন ভাবলে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু সেসময় রোনালদোর নামের সঙ্গে একটা ‘অপবাদ’ ছিল। বড় ম্যাচে মুষড়ে পড়েন নাকি তিনি! ক্লাসিকোর আগেও ফিরে ফিরে এই কথা বহুবার শুনতে হয়েছে রোনালদোকে। লিগের শেষ ৮ ক্লাসিকোতে জিততে পারেনি রিয়াল মাদ্রিদ। রোনালদো আগের দুই ক্লাসিকোতে গোল পেলেও তাই নিরর্থক সবকিছু।

    সানচেজের গোলের পর আরেকটি হতাশার রাত চোখ রাঙাচ্ছিল রিয়ালকে। গতবার এই মাঠে ৫-০ গোলে হেরে ফেরার স্মৃতিটাও সঙ্গী। ৮ ম্যাচ ধরে লিগে বার্সেলোনার বিপক্ষে জয় নেই রিয়ালের। ‘প্রতিশোধ’ আর খরা কাটাতে হলে এর চেয়ে মধুর মঞ্চ আর হয় না। জিতলেই তো শিরোপা! সানচেজের গোলের পর স্বাভাবিকভাবেই দ্বিগুণ উৎসাহে ন্যু ক্যাম্প জেগেও উঠেছিল। রোনালদোর জন্য সেটা বিরক্তির কারণ না হয়ে পারে না।

    রিয়াল মাদ্রিদ এরপর সময় নিল ৩ মিনিট। অ্যানহেল ডি মারিয়া কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করলেন মিডফিল্ড থেকে। ডানদিকে পাস বাড়ালেন মেসুর ওজিলের দিকে। রোনালদো ততক্ষণে দৌড় শুরু করে দিয়েছিলেন মিডফিল্ড থেকে। হাত দিয়ে নিজের সামনে ফাঁকা জায়গাটা ওজিলকে দেখাতে দেখাতে দৌড়ালেন। ওজিল বাম পায়ে বার্সার হাই ডিফেন্সিভ লাইনের পেছনে ফেললেন পাস।

    অমন সময় ওখান থেকে গোল পেতে আপনাকে মেসি-রোনালদো গোত্রের কিছুই হয়ত হতে হবে। রোনালদোর কাজটা অবশ্য আরেকটু সহজ করে দিয়েচিলেন ভালদেস। সামনে এগিয়ে এসে রোনালদোর জন্য অপশন কমিয়েছিলেন তিনি। তাতে উলটো কাজ আরও সহজ হয়েছিল রোনালদোর জন্য।

    রোনালদো বক্সের ভেতর ঢুকলেন আলোর গতিতে। এক টাচে বল আরেকটু ঠেলে কোণায় নিলেন, এরপর আরেক টাচে সোজা সেই বল পাঠালেন জালে। ধারাভাষ্যকারের কথায় সেটা ‘প্লাটিনাম টাচ’। ওই গোলের জন্য অবশ্য এরপর রোনালদোর উদযাপনটাই বিখ্যাত হয়ে থাকল আরও।

    ন্যু ক্যাম্পের কর্নার ফ্ল্যাগের কাছাকাছি গিয়ে এক হাতে পুরো গ্যালারি শান্ত থাকার নির্দেশ রোনালদোর। একটু আগে পা দিয়ে নিশ্চুপ করে দিয়েছেন ‘শত্রুবাহিনীকে’, এবার বাকি কাজ করলেন হাত দিয়ে। এক আঙ্গুলে নিজের দিকে নির্দেশ করে, এরপর হাত প্রশস্ত করে সামনের দিকে এনে অনেকটা, “বসেন, বসেন, বসে যান” ঢংয়ে হলো সেই উদযাপন। আর মুখ দিয়ে তুবড়ি ছুড়লেন, “কালমা...কালমা”। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়- থামো, চুপ করো, শান্ত থাকো। যেটা আপনার মনমতো হয়!

    রোনালদোর ওই গোল ছিল সেবার লিগে রিয়ালের ১০৯ তম। মৌসুম শেষে ১২১ এ গিয়ে থেমেছিলেন রোনালদোরা। লা লিগার এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড। মরিনহোর রিয়াল সেবার লিগ জিতেছিল ১০০ পয়েন্ট নিয়ে। লা লিগার ইতিহাসে সেটাও হয়ে আছে আরেক রেকর্ড। রিয়ালে রোনালদোর সাফল্যের অধ্যায় শুরু করতে এমন একজন দরকার ছিল যিনি রাতারাতি জুজুর ভয় তাড়াতে পারেন। মরিনহোর চেয়ে ভালো সেটা আর কেই বা হতে পারতেন!

    রোনালদোর ওই উদযাপনের ছবি কতো-শত জন প্রোফাইল পিকচারে দিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। রোনালদোর ক্যারিয়ারে এর আগে পরে বাঁধিয়ে রাখার মতো ছবির অভাব নেই। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের জন্য সম্ভবত ওই ছবির আবেদন বাকি সবকিছুর চেয়ে আলাদা। সে রাতেই তো আবার জেগে ওঠার সাহস দেখিয়েছিলেন রোনালদো। বার্সেলোনাকে তাদের ঘরে চুপ করিয়ে আসার চেয়ে সুখের আর কী হতে পারে রিয়াল সমর্থকদের জন্য?