• ক্রিকেট, অন্যান্য
  • " />

     

    এশিয়া কাপ ২০১৮ : স্বপ্নের সীমানা পেরিয়ে

    জাহানারা আলম স্বপ্ন দেখতেন। ক্ষ্যাপাটে স্বপ্ন। অসাধারণ একটা ক্যাচ নিয়ে বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন। হয়তো সে ক্যাচ নিতে গিয়ে হাতটাই ভেঙে গেছে তার, হাসপাতালে যেতে হয়েছে এমন। কিংবা বোলিংয়ে দারুণ কোনও স্পেল বা ডেলিভারিতে জিতিয়ে দিয়েছেন ম্যাচ। তবে তার স্বপ্নের সীমানাতেও ছিল না-- ব্যাটিং করে ম্যাচ জেতাবেন তিনি। তাও এমন একটা ম্যাচ। 

    ২০১৮ সালের ১০ জুন কুয়ালালামপুরের কিনরারা একাডেমি ওভালে জাহানারা এমন কিছু করলেন হারমানপ্রিত কৌরের লেগ-মিডলে পড়া বলটার আগে-পরে, যা তার স্বপ্নের বাইরে। তার ক্যারিয়ারের শুধু নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসেরই অন্যতম স্মরণীয় একটা ইনিংস খেললেন তিনি- ১ বলে অপরাজিত ২ রানের। 

    ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির ২১ বছর পর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরেই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাস গড়লো, আগের ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে হলো উইমেনস এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়ন।

    জাহানারা জানলেন, স্বপ্ন ক্ষ্যাপাটে হয়, আবার স্বপ্ন নিজেই অতিক্রম করে যায় এর সীমানাও। 

    **** 
     

    ২০১৮ উইমেনস এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টানা ৮ হারকে সঙ্গী করে। কোচ ডেভিড ক্যাপেলের বাংলাদেশের শেষ দায়িত্ব ছিল সেটি। নতুন কোচ আনজু জেইন সরাসরি দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ভরাডুবি হলেও সেটি ‘আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল দলকে’। জাহানারার মতে, ফিল্ডিংটা আরেকটু ভাল হলে সে সফরে ফলটা অন্যরকম হতে পারতো। 

    এশিয়া কাপে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা।

    “হয়তো খেলার মাঠে কেউই ছোট না। তারপরও হিসাব-নিকাশ থাকে। সেদিক থেকে আমরা বিশ্বাস করি, শ্রীলঙ্কার চেয়ে আমরা ভাল দল। একমাত্র ওদের ওপেনিং বা ওয়ানডাউনে খেলে মাঝে মাঝে (চামারি) আতাপাত্তু- ওদের অধিনায়ক- ও ছাড়া সবাই মোটামুটি মানের। ওই টিকিয়ে রাখে দলটাকে। যদিও শেষ (টি-টোয়েন্টি) বিশ্বকাপে কয়েকটি দারুণ পারফরম্যান্স দেখেছি আরেকটি বাঁহাতির (হাসিনি পেরেরা), ও এত ভাল ছিল না। দিনদিন উন্নতি করছে সবাই আসলে।”

    আতাপাত্তু সে এশিয়া কাপে ছিলেন না ডেঙ্গুর কারণে। আতাপাত্তুবিহীন শ্রীলঙ্কা আরও খর্বশক্তির হওয়ার কথা, অথচ তাদের কাছেই ভেজা উইকেটে আগে ব্যাটিং করে ৬৩ রানে অল-আউট হয়ে গেল বাংলাদেশ। হারল বাজেভাবে।  

    “প্রথম ম্যাচ হেরে খুব মন খারাপ ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টানা ৮ ম্যাচ হারলাম, এখানে এসেও তাই। আমরা আপসেট ছিলাম, আমাদের চেয়ে একটু কম শক্তিশালি দলের কাছে হেরে গেলাম। এরপর পাকিস্তান তো আরও শক্তিশালি, বিগত চার বছরে ওদের সঙ্গে জিততে পারিনি আমরা। ধরাছোঁয়ার বাইরে ওরা। চিন্তা ছিল, দেখা যাক। শুরু যখন করেছি, আল্লাহ ভরসা।”
     


    আমরা আপসেট ছিলাম, আমাদের চেয়ে একটু কম শক্তিশালি দলের কাছে হেরে গেলাম।/এসিসি


    একদিনের ব্যবধানে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ, এর আগের ৪ বছরে ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি- কোনও ফরম্যাটেই যাদের হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। সে খরা কাটালো বাংলাদেশ। তবে এবার বাংলাদেশ শক্তিমত্তার মান দিয়ে যাচাইয়ের অন্যপ্রান্তে। সে ম্যাচ জিতে একটু ‘শ্লেষাত্মক কথা’ও শুনতে হয়েছিল তাই জাহানারাদের। 

    “ম্যাচ শেষে যারা বেঞ্চের ক্রিকেটার, বা যারা একটু কম রান করে, তারা একটু বাড়তি অনুশীলন করতে চায়। নেট দেওয়া থাকে, আধাঘন্টা এক ঘন্টা সুযোগ থাকে। সেখানে গিয়েই দেখি, পাকিস্তানী কোচ আমাদের সঙ্গে এরই মাঝে কথা বলা শুরু করেছে”, জাহানারা সবসময়ই একটু বাড়তি অনুশীলন করেন বলে তিনিও ছিলেন সেখানে।

    “আমাকে দেখে হিন্দিতে বলছে, “তোমরা কী খেললা, তোমাদের প্লেয়াররা তো সব সুইপই খেলল, একটা তো সোজা ব্যাটে খেলতে দেখলাম না।” জাহানারা জবাব দিলেন হাসতে হাসতে, “কোচ, আপনি ঠিকই বলেছেন, আমাদের প্লেয়াররা তো সব ক্রসব্যাটেই খেলেছে। কিন্তু আপনাদের বোলাররা তো কেউ অফস্টাম্পের বাইরে বল করে নাই। সব তো লেগস্টাম্পে করেছে বলে আমাদের ব্যাটসম্যানরা বাধ্য হয়েছে ক্রস খেলতে। নাকি, কী বলেন আপনি?”

    “ওই কোচের মধ্যে রাগ রাগ ভাব ছিল, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি (ম্যাচ হারের পর)। অবশ্য সাধারণত হয়না এমন। আমাদের ব্যাটসম্যানরাও সেদিন যেটিই মেরেছে, সেটাই লেগেছে। এটা আসলে আত্মবিশ্বাসের একটা ব্যাপার।”

    **** 

    শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারের পর নেমে যাওয়া আত্মবিশ্বাসের গ্রাফটা একটু উঁচুতে উঠলো বাংলাদেশের। এবার ভারত-পরীক্ষা। 

    আগের ওয়ানডে বিশ্বকাপের রানার্স-আপ ভারত, যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ এখনও খেলেনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪ বছর আগে হলেও জয় ছিল, ভারতের বিপক্ষে সেটি কখনোই এর আগে পাওয়া হয়নি বাংলাদেশের। জাহানারা ভারতের বিপক্ষে উইকেটশূন্য থাকলেন, তবে শামিমা সুলতানার ২৩ বলে ৩৩ রানের পর ফারজানা হকের ৪৬ বলে ৫২ ও রুমানা আহমেদের ৩৪ বলে ৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসে থমকে গেল ভারত। 

    সেই এশিয়া কাপে একটা দল হয়ে খেলার ফলটা ভোগ করেছিল বাংলাদেশ, জাহানারা মনে করিয়ে দেন সেটি, “এরপর ভারতের সঙ্গে যখন জিতলাম, আমাদের দলে যে ইউনিটি (ঐক্য) ছিল, এটা আসলে দেখার মতো ছিল। একটা দল একতাবদ্ধ হলে কী করতে পারে। একজন আরেকজনকে কতোখানি সহায়তা করতে পারে, দলের প্রত্যেকে অবদান রাখলে কী হয়— মাঠে কিংবা মাঠের বাইরেও— ওটা আমি এশিয়া কাপে দেখেছি। এই এতো বছরের ক্যারিয়ারে অমন দেখিনি আর। পারফরম্যান্স করার যে ক্ষুধা প্রত্যেকটা মেয়ের মাঝে ছিল, সবাই যার যার জায়গা থেকে করেছে কিছু না কিছু। ব্যাটিংয়ে না হলে বোলিংয়ে করেছে। ব্যাটিংয়ে বা বোলিংয়ে না হলেও ফিল্ডিংয়ে হয়তো দারুণ একটা ক্যাচ নিয়েছে বা বাউন্ডারি বাঁচিয়ে দিয়েছে।”

    “আপনারা হয়তো শুধু ফাইনাল ম্যাচটা দেখেছেন। এর আগে ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে জেতা ম্যাচ দুটিতে অন্যরকমের ইনটেনসিটি ছিল- “ম্যাচ জেতাতে হবে, কিছু করতে হবে দলের জন্য, কিছু একটা করতে হবে”। এমন আসলে সব টুর্নামেন্টে দেখা যায় না। জেতার পেছনে তো সব ভাল কিছু কাজ করে। যদি এমন প্রতিবার দেখা যেতো, তাহলে সবসময়ই ভালই করতাম। অবশ্য ‘পারফরম্যান্সের ঘাটতি’ তো থাকেই। তবে ওই টুর্নামেন্টে কোনও কিছুর কমতি ছিল না। সমন্বিত পারফরম্যান্স এবং ‘ইউনিটি’- আমাদের জেতাতে সাহায্য করেছে।”
     


    “আপনারা হয়তো শুধু ফাইনাল ম্যাচটা দেখেছেন। এর আগে ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে জেতা ম্যাচ দুটিতে অন্যরকমের ইনটেনসিটি ছিল- “ম্যাচ জেতাতে হবে, কিছু করতে হবে দলের জন্য, কিছু একটা করতে হবে”। এমন আসলে সব টুর্নামেন্টে দেখা যায় না। জেতার পেছনে তো সব ভাল কিছু কাজ করে। যদি এমন প্রতিবার দেখা যেতো, তাহলে সবসময়ই ভালই করতাম। অবশ্য ‘পারফরম্যান্সের ঘাটতি’ তো থাকেই। তবে ওই টুর্নামেন্টে কোনও কিছুর কমতি ছিল না। সমন্বিত পারফরম্যান্স এবং ‘ইউনিটি’- আমাদের জেতাতে সাহায্য করেছে।”


    ভারতের বিপক্ষে জয়টা হয়তো ‘অঘটন বা ভারতের জন্য দুর্ভাগ্যজনক’ বলে চালিয়ে দিলেন অনেকেই, তবে সেটা বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল অনেকগুণ। দলের ক্ষুধা বাড়লো। 

    আর বদলে গেল আরেকটা দিক। বাংলাদেশ শুধু ‘সমীহ’ বা ‘স্নেহ’ নয়, এবার পাওয়া শুরু করলো সম্মান। প্রতিপক্ষের কাছে মর্যাদা। 

    জাহানারা বদলটা দেখতে পেলেন, “পাকিস্তান ভারতের প্লেয়াররা একটু ‘মুডি’ টাইপের হয়। নিজেরা একটু অন্যভাবে চলে। একটা ভাল প্লেয়ার হয়তো ভাল প্লেয়ারের সাথে মিশবে, ভাল দল ভাল দলের সাথে কথা বলবে। তবে ছোট দলগুলিকে একটু অন্য চোখে দেখে সাধারণত তারা। কিন্তু যখন আমরা ভারতকে হারালাম, ঠিক ওইদিন বিকাল থেকে তাদের চোখে সম্মান দেখা শুরু করলাম। ‘চাক দে ইন্ডিয়া’ বা এমন মুভিতে যেটা দেখা যায়, ওরকম। এটা অবশ্য আমার একান্তই নিজস্ব অনুভূতি, অন্য কেউ এর আগে এভাবে শেয়ার করেছে কিনা জানি না। তবে আমি এটা অবলোকন করেছি।”

    “আগে যে ভারতীয় প্লেয়াররা হাই-হ্যালো দূরে থাক, তাকালে কথাও বলে নাই, তারাই এসে হাই-হ্যালো শুরু করেছে। দেখা হচ্ছে- “গুড মর্নিং”। কথা বলা শুরু করলো।”

    “পাকিস্তানকে যখন হারালাম, তখনও। এশিয়া কাপে ট্রফি জয়ের পাশাপাশি এগুলোও আমাদের একটা অর্জন বলে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি। অন্য দেশের প্লেয়ারদের চোখে সম্মান আনা। নিজের দেশের সম্মানটা বাড়িয়ে নেওয়া। এটা আসলে অন্যরকমের এক অনুভূতি।”

    “ভারতের সঙ্গে যখন খেলেছি, পাকিস্তান আমাদের সমর্থন দিয়েছে। বলেছে, “তোমরাই জিতবে দেখো। চেষ্টা করো, হয়ে যাবে”। এই যে সাপোর্ট করা— এসব হয়, ভাল দলদের সাথে হয়। ওই প্রথমবার আমরা দেখেছি। অন্যান্যবার তো আমাদের স্নেহ করা হয়, ওই সময় আসলে সম্মান জিনিসটা কী, সেটা পেয়েছি। প্রতিপক্ষকে সম্মান কীভাবে দেয়, সেটা ফিল করেছি।”

    ****

    জাহানারা অদ্ভুত এক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে। ভারতের বিপক্ষে এই ফাইনাল জয়টা হাতছাড়া করতে চান না। কোচ প্যাড-আপ করতে বলেছেন, সালমা খাতুনের আগে তাকে পাঠানো হবে। সেটা করার পর দুই পা নাচাচ্ছিলেন তিনি উত্তেজনায়। এতো কাছে এসে ফিরে যেতে চান না, সুযোগ পেলে কিছু করতে চান।

    “আমি পরিশ্রমী ব্যাক্তিদের মধ্যেই পড়ি। তবে আমি ‘নসিব’ খুব মানি। সবই ভাগ্যের ব্যাপার। আমি টেইল-এন্ডার, ব্যাটে বলে লাগাতে পারি না। এরকম অনেক হয়েছে, বল সুইং করে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি লাগাতে পারছি না। বা স্পিন খেলতে চাচ্ছি, ছয় চার মারতে চাচ্ছি, আউট হয়ে যাচ্ছি”, জাহানারা ব্যাখ্যা করেন তার শঙ্কাটা।
     


    ফাইনালে উইকেট নেওয়ার পর জাহানারা, উইমেনস এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি ২০১৮/এসিসি


    ৯ রান প্রয়োজন ছিল শেষ ওভারে, প্রথম তিন বলে রুমানার এক চারসহ উঠেছে ৬ রান। চতুর্থ বলে তুলে মারতে গিয়ে লং-অফে ধরা পড়লেন সানজিদা ইসলাম।  

    “আমাকে ওই পজিশনে সালমা আপুর আগে নামানো হয়েছিল রানিং বিটুইন দ্য উইকেটের জন্য। উইকেটে সেট ছিল রুমানা (আহমেদ)। ময়না (সানজিদা) আউট হয়ে যাওয়ার পর আমাকে পাঠানো হলো। আমি শুধু রুমানাকে বললাম, “তুই শুধু কল দে, আমি রেডি আছি”।”

    রুমানা মিডউইকেটের দিকে খেললেন, তবে তিনি যেন ক্লান্ত তখন। জাহানারা যখন অন্যপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন, রুমানা মধ্যক্রিজ পেরিয়েছেন মাত্র।  জাহানারা ওপাশ থেকে কিছু একটা বললেন,  রুমানা যেন সাড়া দিতে গেলেন অবচেতন মনেই। ঘুরে ক্রিজ থেকে বেড়িয়েছেন সবে, থ্রো এসে জমা পড়েছে বোলার কৌরের হাতে। রুমানা রান-আউট। 

    “ও কিন্তু দুই রান নেওয়ার ওভাবে চেষ্টাও করেনি। শুধু ব্যাটটা উঁচু করলো আর ওইটাই লেগে গেল”। সেট ব্যাটসম্যানকে আউট হতে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল জাহানারার। তবে আর কিছু করার নেই, সবকিছু এখন তার ওপরই। তার ‘নসিব’ তাকে হাজির করেছে ওই মুহুর্তে। 

    নামার আগে ডাগ-আউটে বসে মনে মনে আয়াতুল কুরসি (দোয়া) পড়ছিলেন জাহানারা, “এটা কেউ জানে না, এটা সিক্রেট। ভাবছিলাম, সুযোগ পেলে আমি কিছু করার চেষ্টা করব।”

    জাহানারা ক্ষ্যাপাটে স্বপ্ন দেখতেন, তবে যেটা স্বপ্নেও ভাবেননি, সে সুযোগটা এসে গেল, “ব্যাটিং করে ম্যাচ জেতার সুযোগ”।

    সালমা নামছেন অবশেষে। এর আগেই জাহানারার কাছে দ্বাদশ্য ব্যক্তি এসে পৌঁছে দিয়েছেন কোচের বার্তা, “জাহানারা আপু, কোচ আপনাকে বলেছেন, শুধু ব্যাটে বল লাগাতে।” 
     

    “আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। এটা কেউ জানে না, এটা সিক্রেট। ভাবছিলাম, সুযোগ পেলে আমি কিছু করার চেষ্টা করব।”


    জাহানারা জানেন, কোচ এমন বলে পাঠিয়েছেন আদতে কেন। দলের প্রয়োজনে ওপরের দিকে খেললেও তিনি টেইল-এন্ডার। “তার ওপর অমন পরিস্থিতি টেনশনের। আমি বললাম, “তুই যা, গিয়ে বল টেনশন না করতে। ইনশাআল্লাহ ব্যাটে বল লাগবে।”

    “পানি খাবেন কিনা জিজ্ঞাসা করল, বললাম, ‘না পানি খাব না’। চলে গেল। সালমা আপু এসে বললো, “জাহানারা, তুমি ব্যাটে বলটা লাগাইও। চেষ্টা কইরো।”

    আমি বললাম, “আপু, টেনশন কইরেন না, আপনি শুধু দৌড়াবেন। বল যেখানেই যাক।”

    জাহানারা শুধু ভাবছিলেন, “বল যেখানেই আসুক- আমি বোলার হিসেবে জানি- কেউ লেগস্টাম্পে করবে না। আমি বোলার হলেও অফস্টাম্পের বাইরে করব। সবাই লেগ-মিডলে ডাউন দ্য গ্রাউন্ড যায়। তো আমি চিন্তা করেছি আমি অফসাইডে ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে যাব। আগেই প্ল্যান ছিল। যেহেতু বল অফস্টাম্পের বাইরে করবে।”

    তার মাথায় দুটি পরিকল্পনা তখন, “আমার লম্বা শট ভাল। ময়না (সানজিদা) লম্বা শট খেলতে গিয়ে আউট হয়েছে অবশ্য। তবে হয় আমি ওভার দ্য হেড খেলব, তাতে দুই রান আসতে পারে, ওভার বাউন্ডারি হলে আলহামদুলিল্লাহ। আর না হলে যেদিকে বল, সেদিকে খেলব।” 

    এরপর একটা ‘ট্রিক’ বা কৌশল খাটালেন জাহানারা। শেষ বলটা করতে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো কৌরকে, জাহানারা কিছু একটার কারণ দেখিয়ে স্ট্রাইক ছেড়ে সরে গেছেন। বোলারের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে চান তিনি, বোলারকে বাধ্য করতে চান তার চাওয়া মতো বোলিং করতে। 

    জাহানারা এখনও অবাক হন, অমন পরিস্থিতিতে তিনি এতো কিছু ভাবলেন কীভাবে। সবই ইতিবাচক ভাবনা!

    কৌর দ্বিতীয় দফা শেষ বলটা করতে গিয়ে করলেন মিডল-লেগেই। ডাউন দ্য গ্রাউন্ডে এলেন জাহানারা পরিকল্পনামতো, খেললেন মিড-উইকেটে। যেন তিনি শট খেলার আগেই সালমা পার হয়ে গেছেন অর্ধেক ক্রিজ। জাহানারা ঠিক করে রেখেছিলেন, যে করেই হোক, ডাইভ দেবেন। 

    থ্রো-টা এলো ধীরগতিতে। উইকেটকিপার সামনে চলে এলেন, তবে ধরতে পারলেন না ঠিকঠাক। জাহানারা ডাইভ দিয়েছেন ততক্ষণে। 

    “সালমা আপু অলরেডি আমার শট খেলার আগেই পৌঁছে গিয়েছে। টু কল করেছে। আমার এন্ডে থ্রো হয়েছে। দেখেন, সবই কপাল। আমার ভাবনাই ছিল, যাই হোক আমি ডাইভ দেবো। আমি নিরাপদ পজিশনে থাকতে চাই, টিভি আম্পায়ার আছে বলে সুযোগ নিতে চাই না। ডাইভ দিয়েছি, ওইরকম মুহুর্তে কিপাররা আগে যায় না। ফিল্ডার থ্রো করেছে, কিপারও আগে গিয়েছে। আমি শুধু আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে চাই।”

    সালমা তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৪৪ গজ পাড়ি দিয়েছেন। জাহানারা বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন রূপকথার গল্পে। 

    ****

    জাহানারারা যখন এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়ন হলেন, ছেলেদের দল তখনও দুইয়ের বেশি দলের ফাইনালই জেতেনি। আন্তর্জাতিক শীর্ষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শিরোপা ‘টেকনিক্যালি’ সেটিই। তবে জাহানারা সেটা মানতে চান না, “আমার কাছে মনে হয়, আন্তর্জাতিক ট্রফি আমরা এনেছি, ছেলেরাও খুশি হয়েছে, বিসিবি খুশি হয়েছে, কিন্তু আমার কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয় ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি- যেটা আকরাম স্যার, (নাইমুর রহমান) দুর্জয় স্যাররা এনেছিলেন।
     


    জাহানারার ক্যারিয়ারের সেরা দিন/এসিসি


    “তারপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপে প্রথম জয়, সেটা আলাদা। তারপর নাহয় আমাদের এই জায়গাটা দিতে পারি। আমি কখনোই বলব না, আমাদেরটা সবচেয়ে বড়। টেকনিক্যালি হতে পারে, তবে অতীত তো ভুলে যাওয়া যাবে না। আইসিসি ট্রফি কিন্তু আমাদের প্লাটফর্ম, সেটার কারণেই আমরা ক্রিকেট খেলতে পারছি। আবার অ-১৯-এর বিশ্বকাপটা যদিও তরুণদের হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, কিন্তু বিশ্বকাপ তো বিশ্বকাপই। দেখেন অ-১৯-এর এশিয়া কাপটা কিন্তু আমরা জিততে পারিনি, কতো অল্প লক্ষ্য (১০৭) ছিল ৫০ ওভারে। কিন্তু জিততে পারিনি ((ভারতের বিপক্ষে ৫ রানে হেরেছিল পরবর্তীতে বিশ্বকাপজয়ী আকবর আলির দল)।”

    “তারপর ছেলেদের কথা ধরেন, বেশ কয়েকবার অল্প রানের ব্যবধানে জেতা হয়নি। ভাগ্যের সহায়তা লাগে আসলে”

    অবশ্য “মজার বিষয় হলো, আমার ভাল লাগে, শান্ত (হাসিবুল হোসেন) ভাইয়া, উনিও পেস বোলার ছিলেন, উনিও জিতিয়েছিলেন ‘৯৭-এ। আমিও পেসার, আমিও ২ রান নিয়ে শেষ বলে জেতালাম। আবার ভেন্যুও ছিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে। তো ‘হিস্টরি রিপিটস’। এটা অন্যরকম এক অনুভূতি। পরিশ্রম সবাই করে, সবার ‘লাক ফেভার’ করে না। এটা ভাগ্যের ব্যাপার।”

    ****

    জাহানারা নিজের ব্যাটটা খুঁজে পাচ্ছেন না। 

    ডাইভ দেওয়ার সময় ছুটে গিয়েছিল সেটি হাত থেকে। গোটা দল চলে এসেছে এরপর তার কাছে, ‘বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে মত্ত’ দর্শকরাও এসেছেন। জাহানারা তাদের সঙ্গে উল্লাসে মেতেছেন, সতীর্থদের জড়িয়ে ধরেছেন। এরপরই ব্যাটের কথা মনে হয়েছে তার, “আমার ব্যাট নিয়ে আসি আমি আগে, আমার উইনিং ব্যাট!” 

    “আনতে গিয়ে দেখি ব্যাট নাই। শুধু দর্শক আর দর্শক। সবাই বাঙালি। সবাই প্রবাসী। ওখান থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্যাটটা পেলাম। এরপর মনে হলো, আমি তো স্টাম্প নিই নাই। ইশ, মিস করে গেলাম। এরপর দেখি একটা বেলস পড়ে আছে। সেটাই কুড়িয়ে নিলাম। ভাবলাম, আলহামদুলিল্লাহ, এশিয়া কাপ জয়ের একটা বেলস তো পেয়েছি। এটাই আমার স্মৃতি।”

    জাহানারা ততক্ষণে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, আটকে পড়েছেন জয়ের নায়কের সঙ্গে সেলফি নিতে চাওয়া দর্শকদের ভীড়ে। শেষমেষ চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছেন, দুজন ছেলে এসে রীতিমতো ‘নিরাপত্তা’ দিয়ে তাকে পৌঁছে দিয়েছেন প্যাভিলিয়নে। 

    “এসব আসলে ‘সুইট মেমরি’। সবাই স্বপ্ন দেখে। আমি স্বপ্ন দেখার আগেই পেয়ে গিয়েছি। যেটা আকরাম (খান, ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ী দলের অধিনায়ক) স্যারদের আমলে হতো, জেতার সঙ্গে দর্শকরা ছুটে আসতো। একটা টুর্নামেন্টে অনেক অভিজ্ঞতা, যেটা সারাজীবন মনে রাখবে। হয়তো বিশ্বকাপ জিতলে পরিবর্তন আসবে, কিন্তু মনে হয় না, তেমন কিছু না হলে এ স্মৃতির (মূল্য) বদলাবে।”

    জাহানারা স্মারক রাখতে ভালবাসেন। তার মতে, “আমার কিন্তু ‘সেনসেটিভ এরিয়া’ আছে। আমার উইনিং ব্যাট, স্টাম্প, বা প্রথম ৫ উইকেট পাওয়া স্পাইক- সবকিছু গুছিয়ে রাখি। সংগ্রহে রাখতে ভাল লাগে।”

    এশিয়া কাপ ফাইনালের স্টাম্প নিতে ভুলে গিয়েছিলেন, ব্যাট হারিয়ে ফেলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত কুড়িয়ে পেয়েছিলেন বেইলস। 

    তবে স্মারকের বাইরে যা পেয়েছিলেন, জাহানারা সেসব ভুলবেন না। ২০১১ সালে বাংলাদেশ উইমেনসের প্রথম ওয়ানডেতে খেলেছিলেন তিনি। তবে ২০১৮ সালের ১০ জুন কুয়ালালামপুরের মতো এমন দিন তার ক্যারিয়ারে আসেনি আর। যেদিন জাহানারা নিজের স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। 

    সেই ২ রানের ইনিংসটা তার ক্যারিয়ারের সেরা কিনা, সে প্রশ্নের জবাব দিতে তাই একদমই সময় লাগে না জাহানারার, “আমার ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস। সেরা মুহুর্ত। সেরা জয়। সেরা অর্জন। একদম, সেরার মধ্যে সেরা ওই জায়গাটা। ওই মুহুর্তটা। ওই অর্জনটা। ওই ট্রফিটা।”
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন