• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    ৩০ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন লিভারপুল

    লিভারপুলে স্মরণীয় রাত কম আসেনি। তবে এই রাতের তুলনা নেই। এমন  রাত আগে দেখেননি লিভারপুল সমর্থকেরা। এমন রাত পরেও আসবে না।  অথচ এ রাতে লিভারপুল মাঠেও নামেনি। নামার আসলে দরকার হয়নি। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ গাণিতিক মার-প্যাঁচের সম্ভাব্যতার সূত্রেরও ইতি টেনেছে। অবসান হয়েছে লিভারপুলের অপেক্ষার, ৩০ বছরের অপেক্ষার। লিভারপুল প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে। লিভারপুল ৩০ বছর পর ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়ন।

    লিভারপুলের প্রিমিয়ার লিগ জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল মৌসুমের মাঝপথে। সময় গড়িয়েছে, লিভারপুল আরও কাছে গিয়েছে অধরা স্বপ্নের। মার্চ নাগাদ অজানা ভয় পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। লিভারপুলও বাদ যায়নি। মৌসুম বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাও তাড়া করেছিল অল্প হলেও। এতোসব কিছুর পর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ৯০ মিনিটের ম্যাচ আপেক্ষিকতার শিক্ষা নতুন করে দিয়ে গেছে লিভারপুলকে। ৯০ মিনিটের অপেক্ষা তখন ৩০ বছরের চেয়েও  দীর্ঘ মনে হয়েছে।
     


    চেলসির বিপক্ষে জিততে না পারলেই শিরোপা নিশ্চিত হত লিভারপুলের। ইংল্যান্ড এবার চিরায়ত শিরোপার লড়াই দেখেনি। লিভারপুল ছুটছিল শুরু থেকেই। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ম্যাচটা ওইটুকু রোমাঞ্চের স্বাদ দিয়ে দিয়েছে লিভারপুলকে। ম্যানচেস্টার সিটি চেলসির কাছে হেরেই গেছে। দুর্দান্ত গোল, লাল কার্ড, নাটকীয়তা সবকিছু উপহার দিয়ে সিটি কেবল লিভারপুলের উদযাপনে রঙ বাড়িয়েছে আরেকটু।

    ইউর্গেন ক্লপ পুরো দল নিয়ে লিভারপুলের হর্মবি গলফ ক্লাবে বসে দেখেছেন সেই ম্যাচ। তার সাবেক শিষ্য ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ গোল করে এগিয়ে দিয়ছিলেন চেলসিকে। এরপর কেভিন ডি ব্রুইন ফ্রি-কিক থেকে গোল করে দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় এনেছিলেন দলকে। ১-১ এ থাকা ম্যাচে সিটিই দাপট দেখাচ্ছিল। রাহিম স্টার্লিং- এর শট লেগেছে বারপোস্টে। লিভারপুল আঁতকে উঠেছে, পাছে অপেক্ষা না বাড়ে আরেকটু! ৭৭ মিনিটে ম্যাচ নিয়েছে নাটকীয় মোড়। ফার্নান্দিনহো গোললাইন থেকে হাত দিয়ে বল ঠেকিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন। পরে  উইলিয়ান পেনাল্টি থেকে গোল করে চেলসির জয় নিশ্চিত করেছেন। লন্ডনের ৫১৯ মাইল দূরের শহরে সেই গোলের পর ফুটেছে পটকা। মাঝরাতের ঢাকার কোনো ঘিঞ্জি গলিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে সেই শব্দ। লিভারপুল, ঢাকা- এই রাতে সব লিভারপুল সমর্থক এক।   

    উইলিয়ানের গোল লিভারপুল খেলোয়াড়দের এনে দিয়েছে শিরোপা জয়ের আনন্দ। ভ্যান ডাইক, হেন্ডারসনরা টেলিভিশনের সামনে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছেন। শেষ বাঁশি বাজার পর ক্লপের আনন্দ পরিণত হয়েছে আবেগে। স্কাই স্পোর্টসের লাইভ প্রোগ্রামে এসে জার্মান ভদ্রলোক কোনোমতে নিজের অনুভূতি জানিয়েছেন। এক নাগাড়ে শুধু কেনি ডালগ্লিশ থেকে স্টিভেন জেরার্ড, লিভারপুল ম্যানেজমেন্ট থেকে সমর্থক সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে গেছেন। ওই মুহুর্তে এর চেয়ে বেশি আর কী বলতে পারতেন তিনি! লিভারপুল সমর্থকদের উদযাপন অবশ্য তার আগে লাগাম ছিড়েছে। অ্যানফিল্ডের আতশবাজিতে বৈশ্বিক মহামারি ভুলে একসঙ্গে, "ইউ উইল নেভার ওয়াক অ্যালোনে" সুর মিলিয়েছেন লিভারপুল সমর্থকেরা।

    লিভারপুল সবশেষ লিগ জিতেছিল ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে। কেনি ডালগ্লিশের হাত ধরে। এরপর প্রিমিয়ার লিগ যুগ শুরুর পর শুধু হতাশাই সঙ্গী হয়েছে লিভারপুলের। গতবার সিটিজেনদের কাছে মাত্র ১ পয়েন্টে লিগ হেরেছিল ক্লপের দল। প্রিমিয়ার লিগে ৭ তারিখ মুখোমুখি হবে সিটি-লিভারপুল। ইতিহাদে সিটির কাছ থেকেই লিভারপুল পেতে পারে গার্ড অফ অনার। যদিও এই নিয়মের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দুই পক্ষ রাজি হলেই কেবল দেখা যাবে এই দৃশ্য।

    শেষ ১৩ মাসে লিভারপুল এই নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউয়েফা সুপার কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপের পর জিতল প্রিমিয়ার লিগ। সেটাও রেকর্ড গড়েই জিতল অল রেডরা। ৭ ম্যাচ বাকি রেখে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে ক্লপের দল। লিভারপুল ভেঙেছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (২০০০-০১) আর ম্যানসিটির (২০১৭-১৮) মৌসুমে ৫ ম্যাচ হাতে রেখে লিগ জেতার রেকর্ড। এভাবেই বোধ হয় ফিরে আসতে হয়।

    সপ্তম দল হিসেবে লিগ জিতে আবার ম্যান ইউনাইটেডের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে লিভারপুল। ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে এখন লিভারপুলের শিরোপা ১৯, ইউনাইটেডের একটি বেশি। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ইউনাইটেডের ম্যানেজার হয়ে এসে কথা দিয়েছিলেন, লিভারপুলকে সিংহাসন ছাড়া করবেন তিনি। সেটি তিনি করেছিলেনও। আর ক্লপ অ্যানফিল্ডের ডাগ আউটে এসেছে বলেছিলেন, সাড়ে চার বছর সময় পেলে তার বিশ্বাস লিগ জিতবেন তিনি। মাঝে লিগ স্থগিত না হলে হয়ত ওর আগেই কথা রাখতে পারতেন ক্লপ। সময়টা সাড়ে চার বছরের একটু বেশি লেগেছে তার।

    ৩০ বছর ৫৮ দিনের অপেক্ষা ঘুচিয়ে এখনও আরও একগাদা রেকর্ডের হাতছানি লিভারপুলের সামনে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জিতে, সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট নিয়ে, সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট ব্যবধানে লিগ জয় নিশ্চিত করার সুযোগ থাকছে লিভারপুলের সামনে। আপাতত দুইয়ে থাকা সিটির সঙ্গে পার্থক্য ২৩ পয়েন্ট! প্রিমিয়ার লিগের হিসাবে এই পার্থক্য ৩০ বছর অপেক্ষার চেয়ে কম কিছু নয়! 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন