• ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯
  • " />

     

    বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০১৯ : অলৌকিক ম্যাচের সম্ভাব্য লৌকিক সমীকরণ

    সিনেমার গল্পের নাকি দুই অংশ। 

    একটা বলা গল্প। আরেকটা না বলা গল্প। সে সিনেমা কালসীমানা অতিক্রম করে যায়, যে সিনেমা না বলেও বলতে পারে অনেক গল্প। পথের পাঁচালির শেষদিকে অপু যখন দুর্গার চুরি করা মালা খুঁজে পেয়ে ডোবায় ছুঁড়ে আসে, এরপর সেদিকে তাকিয়ে থাকা তার মুখটা যেমন।  

    আবার থাকে হিসাব মেলানোর ব্যাপার। 

    সোনার কেল্লায় ভবানন্দকে তাড়া করতে জয়সালমির যাওয়ার সময় ফেলুদা তোপসেকে বলেছিলেন তিন প্যাকেট লাঞ্চ অর্ডার করতে। কিন্তু রামদেওড়ার আগেই যখন দ্বিতীয়বার চাকা পাংচার হয়ে বসে পড়তে হলো ফেলুদা, তোপসে, জটায়ুকে, তখন মনে হয় দেখা যায় ৪ প্যাকেট লাঞ্চ। তাহলে কি ফেলুদার প্রথমে মনে ছিল না ড্রাইভার সিংজির কথা? পথে নেওয়া হয়েছে পরে আরেক প্যাকেট? নাকি জটায়ু রাজি হবেন, সেটি শুরুতে ভাবেননি তিনি? 

    নাকি সেই চতুর্থ প্যাকেট বলে যেটিকে মনে হয়, সেটি লাঞ্চের প্যাকেটই নয়!  

    ____________


    অধ্যায় এক : না হওয়া ওয়াইড

    শুরুটা হোক লেগস্টাম্পের বাইরের ফুললেংথের একটা বল দিয়ে। বলটা কি ওয়াইড হতে পারতো? 

    লেগসাইডে সীমানায় শক্ত ডিফেন্স, ডিপ ফাইন লেগ থেকে লং-অনের ভেতর ৪ জন। মার্টিন গাপটিল হয়তো শর্ট বল আশা করছিলেন, ফ্রন্টফুট ক্লিয়ার করেছিলেন আগেভাগেই। হয়তো সেটা দেখেই জফরা আর্চার বলটা করলেন লেগস্টাম্পের বাইরে, যাতে সেটা গিয়ে পড়ে ব্লকহোলে। অথবা গাপটিল বলের লাইনে নিতে চেয়েছিলেন তার পা। তবে তিনি যদি ফ্রন্টফুট আগে থেকে ক্লিয়ার না করতেন, আর আর্চার সেই লাইনেই করতেন, অথবা বলের লাইন অনুসরণ করে গাপটিল পা না সরাতেন, বলটা কি ওয়াইড হতে পারতো? 

    এর উত্তর জানা যাবে না কখনোই। ক্রিকেটের সঙ্গে অন্য অনেক টিম-গেমের এটা অনেক বড় পার্থক্য-- ক্রিকেট ‘ডিসক্রিট ভ্যালু’ বা ‘বিচ্ছিন্ন মান’-এর খেলা, ‘কন্টিনিউয়াস ভ্যালু’ বা ‘ধারাবাহিক মান’-এর নয়। একেকটা ডেলিভারি তাই অনেক রকমের সম্ভাবনা তৈরি করে, এক সময়েই। তবে সব সম্ভাবনার সমীকরণ প্রাসঙ্গিক হয় না সব সময়। 

    সেই ডেলিভারিটা ওয়াইড হলে নিউজিল্যান্ড সুপার ওভার টাই করতে পারে ১ বল বাকি থাকতেই। পরের বলটা ডট করতে পারতেন তখন আর্চার? গাপটিল স্নায়ু ধরে রাখতে পারতেন? ফিল্ডার সব বৃত্তের ভেতর চলে আসতে পারতো তখন, গাপটিল তাদেরকে ফাঁকি দিতে পারতেন? 


    অধ্যায় দুই : প্রযুক্তি আশির্বাদ নাকি অভিশাপ?  

    আম্পায়ারিংয়ের কাজটা আদতে কেমন? 

    রিভিউ নেবেন কি নেবেন না, এমন সংশয়ে পড়ে যাওয়া ব্যাটসম্যান বা অধিনায়ককে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন। ওই ১৫ সেকেন্ডের জন্য তারা পড়ে যান দোটানায়, হয়তো সে সময় তারা উপলব্ধি করেন, তাদের ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিংয়ের মতো সেকেন্ড বা এর ভগ্নাংশের ব্যবধানে কতো সমীকরণ মেলাতে হয় আম্পায়ারদের। 

    মার্টিন গাপটিল আর হেনরি নিকোলস সেটাই করছিলেন। আলোচনা করে মেলাচ্ছিলেন সমীকরণ। 
     

    আরও পড়ুন- বাংলাদেশের যে ৫ ম্যাচ হতে পারতো অন্যরকম, হয়েছে শুধুই আক্ষেপের 


    টাইমারে ২ সেকেন্ড বাকি। গাপটিল সিদ্ধান্ত নিলেন রিভিউয়ের। না নিলেও পারতেন। ক্রিস ওকসের বলটা যেখান থেকে পড়ে তার ঝুঁকে পড়া পায়ের হাঁটুর নিচে লাগলো, খোলা চোখেও মনে হয়েছিল আউটই। গাপটিলের রিভিউ কাজে লাগলো না। বিশ্বকাপ ফাইনালে আশাজাগানিয়া শুরু করেছিলেন তিনি, শেষটা হলো না তেমন।  

    টাইমারে ২ সেকেন্ড বাকি। এবার নিকোলস সিদ্ধান্ত নিলেন রিভিউয়ের। ওকসের বলটা তার ব্যাকফুটের প্যাডের ফ্ল্যাপে লেগেছিল। চেস্টার-লি-স্ট্রিটে ঠিক একইভাবে আউট হয়েছিলেন একই বোলারের বলেই, তবে রিভিউ নেননি। নিলে সফল হতেন। এবার সে ভুলটা করলেন না, তবে সময় নিলেন বেশ। বল ট্র্যাকিং এবারও দেখালো, সেটি যেতো স্টাম্পের একটু ওপর দিয়ে। নিকোলসের রান তখন ৬। আউট হওয়ার আগে দ্বিতীয় জীবনে করলেন আরও ৪৯। 
     


    ক্যাচ?


    টাইমারে সময় উঠলোই না। অইন মরগান গেলেন রিভিউয়ের দিকে। আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা কিছু শোনেননি, বুঝাতে চাচ্ছিলেন এমন। তবে ইংল্যান্ড আত্মবিশ্বাসী, নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের উইকেট পেয়ে গেছেন তারা। ১৯৯২ সালে শেষ যেবার ইংল্যান্ড ফাইনাল খেলেছিল, সেবারও আগে ব্যাটিং করেছিল প্রতিপক্ষ। জাভেদ মিঁয়াদাদ বারকয়েক বেঁচে গিয়েছিলেন বেশ ‘ক্লোজ কল’ থেকে। তবে ইংলিশরা এখনও বিশ্বাস করেন, মিঁয়াদাদের উইকেট তারা আগেই পেতে পারতেন। ডেরেক প্রিঙ্গল সেটি মনে করিয়ে দিলে মিঁয়াদাদ তাকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমার সঙ্গে আছেন আজ’। ইয়ান বোথাম এখনও বলেন, সেদিন তার ব্যাটে বল না লাগলেও তাকে আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার। ’৯২-এ রিভিউ ছিল না বোথামদের, তাদের আদলে ‘রেট্রো’ জার্সি পরে খেলা মরগানদের সময় ছিল। সেই রিভিউ এনে দিল ইংল্যান্ডকে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে মূল্যবান উইকেট। 

    রস টেইলর অবশ্য রিভিউ নেওয়ার সুযোগই পেলেন না। ধীরলয়ে চলছিল ম্যাচ, থিতু হচ্ছিলেন টেইলর। এবারও মার্ক উডের বলে ট্রেডমার্ক শাফল করে খেলতে গিয়ে এলবিডব্লিউ হলেন, বল অবশ্য লেগেছিল নি-রোলের ওপরই। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের নায়ক ফাইনালে তেমন কিছু করার সুযোগই পেলেন না। অবশ্য সুযোগটা পেত পারতেন তিনি, গাপটিল যদি ২ সেকেন্ড বাকি থাকতে রিভিউয়ের দিকে না যেতেন। বল ট্র্যাকিং দেখিয়েছিল, বল যেতো স্টাম্পের ওপর দিয়ে। 

    টাইমারে ৯ সেকেন্ড। কেন উইলিয়ামসন রিভিউ নিলেন। ট্রেন্ট বোল্টের ওভার দ্য উইকেট থেকে করা বলটা ভেতরের দিকে ঢুকছিল, জেসন রয়কে আউট দেননি আম্পায়ার। উইকেটে হলো আম্পায়ারস কল, মানে অন-ফিল্ডে আউট দিলে রয়কে ফিরতে হতো শূন্যতেই। রয় শেষ পর্যন্ত করলেন ১৭। 

    রিভিউ। প্রযুক্তি। একবিংশ শতাব্দীতে আপনাকে আরেকবার স্বাগত। 


    অধ্যায় তিন : ভার হারিয়ে বা না হারিয়েও হারিয়ে ফেলা ভারসাম্য  

    টানা ৩ ওভার মেইডেন, সঙ্গে ১ উইকেট। সমীকরণটা হতে পারতো এমন। লর্ডসের উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য সহজ ছিল না সেদিন, রানতাড়ায় তো আরও না। প্রথম পাওয়ারপ্লের শেষ থেকে নিয়ে এমন একটা পর্যায়ে যেতে পারতো নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডকে যখন আরও চাপে ফেলতে পারতো তারা। সেমিফাইনালে এমন কন্ডিশনে ভারতকে যেমন চেপে ধরেছিল তারা। তবে কলিন ডি গ্র্যান্ডোম সহজ ক্যাচটাই নিতে পারলেন না জনি বেইরস্টোর। ১৮ রানে জীবন পেয়ে আউট হলেন ৩৬ রানে গিয়ে। 

    লকি ফার্গুসন অবশ্য অইন মরগানের ক্যাচটা নিলেন দারুণভাবে। ইয়ান স্মিথ তো কমেন্ট্রিতে বলেই বসলেন, চাপে থাকা অবস্থায় ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্যাচ সেটি। অবশ্য টিভি আম্পায়ারের দ্বারস্থ হলেও সে ক্যাচ নাকচ করার কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। সে ক্যাচ নেওয়ার সময় ফার্গুসন ছিলেন বেশ আত্মবিশ্বাসী। 

    তবে জস বাটলারের ক্যাচ নেওয়ার সময় টিম সাউদি ছিলেন নড়বড়ে। শুরুতে বলের ট্র্যাজেকটরি বুঝতে ভুল করে নিজের বাঁয়ে সরে গিয়েছিলেন, পরে ডানদিকটা কাভার করে ডাইভ দিয়ে নিয়েছিলেন ক্যাচটা। সাউদি একাদশে ছিলেন না, সে ক্যাচ মিস করলে হয়ে যেতে পারতেন অন্যতম ‘ভিলেন’। বনে গেলেন সুপার-সাব। বাটলারের উইকেটের আগপর্যন্ত ম্যাচ ঝুঁকে ছিল ইংল্যান্ডের দিকেই, সাউদি মিস করলে থাকতে পারত এরপরও। 

    এরপর ওকসের ক্যাচ নিতেও অবশ্য শুরুতে নিজের অবস্থান নিতে ভুল করে ফেলেছিলেন টম ল্যাথাম, শেষ মুহুর্তে ঠিক করে নিয়েছিলেন। 

    সাউদি পারলেন। ল্যাথামও পারলেন। পারলেন না শুধু ট্রেন্ট বোল্ট। 

    ৯ বলে ২২ রান দরকার, আগের বলেই লিয়াম প্লাঙ্কেট আউট হয়েছেন। জিমি নিশামের বল তুলে মারলেন বেন স্টোকস, লং-অনে বোল্ট। গ্রুপপর্বে এই বোল্টের হাতেই স্বপ্ন ভেঙেচুড়ে গিয়েছিল কার্লোস ব্রাথওয়েটের, লং-অনেই লাফিয়ে উঠে দারুণ ক্যাচ নিয়েছিলেন বোল্ট। এবারও নিলেন ভালভাবেই, মানে হাতবন্দী করলেন। বাঁ পা রাখতে গিয়েই টালমাটাল হয়ে গেল সব। ভার সামলাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন, এতটুকু বললে ঠিক সবটুকু বলা হয় না যেন। 

    ডান পা যেখানে ফেলেছিলেন, বোল্টের বাঁ পা সেরকম জায়গায় থাকলে সমস্যা হতো না কোনোই। এরপর ভার সামলাতে পারছেন না- এমন হলেও সামনে ছিলেন মার্টিন গাপটিল, বল ছুঁড়ে পার্টনারশিপ ক্যাচের অপশন ছিল তাই। বোল্ট সেটি করলেনও, তবে তার আগেই যা হওয়ার হয়ে গেছে। তার বাঁ পা গিয়ে পড়েছে বাউন্ডারি কুশনের ওপর। তার ছুঁড়ে দেওয়া বলটা গাপটিল পেলেন ঠিকই, তবে এরপরই তিনি উল্লাসের বদলে দুই হাত তুলে দেখালেন-- ছয়। 

    পরের বলে স্টোকস নিলেন সিঙ্গেল। তার পরের বলে বোল্ড হলেন আর্চার। শেষ ৬ বলে প্রয়োজন ১৫ রান। অথচ ২ বল আগে সমীকরণটা হতে পারতো এমন-- ৮ বলে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ২২ রান, বাকি ২ উইকেট, নেই স্টোকস। সেই স্টোকস থাকলেন, যিনি পরের ওভারে দুটি ছয় মারবেন। 

    মানে তার ব্যাট থেকে আসবে দুটি ছয়। 
     


    ক্যাচ নয়। ছয়। 


    অধ্যায় চার : অলৌকিক ছয় (লৌকিক পাঁচ)

    প্রথম বলেই সিঙ্গেল হতে পারতো। অন্তত স্ট্রাইকটা বদল হতে পারতো। স্টোকস ও আদিল রশিদ, দুজনই ক্রিজ ছেড়ে গিয়েও শেষ মুহুর্তে সিদ্ধান্ত বদলালেন। স্টোকস পরের বলও দিলেন ডট। তৃতীয় বলে ছয়। চতুর্থ বলেও তাই। তবে এই ছয়টা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ক্ষ্যাপাটে ছয়। যে ছয় টাইমিং শব্দটাকে নিয়ে গেল অন্য উচ্চতায়। 

    স্টোকস নিজের জীবনের জন্য দৌড়াচ্ছিলেন যেন। শেষ মুহুর্তে ডাইভ দিলেন। মার্টিন গাপটিল সে বিশ্বকাপে নিজের রানখরা যেন পুষিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন ফিল্ডিং দিয়ে, সেমিফাইনালে ভারতের সঙ্গে ম্যাচনির্ধারণী মুহুর্ত এসেছিল তার ডিরেক্ট থ্রোতেই। অবশ্য তখন গাপটিল ছিলেন ফাইন লেগে। এবার ডিপ মিডউইকেটে। কিন্তু সেখান থেকেও স্টাম্প তাক করেই মারলেন যেন। হয়তো সরাসরি স্টাম্প ভাঙতে পারতোও সেটি। 

    মাঝে এসে পড়লেন স্টোকস, কুয়াশাঢাকা রাতে নাইটকোচের সামনে যেমন হুট করেই হাজির হয় রাস্তার মোড়ের গাছ। শেষমুহুর্তে দক্ষ চালক বাসের স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দেন, কিন্তু এক্ষেত্রে স্টোকস তো দেখতেই পাননি তার উল্টোদিক থেকে আসা বলটা। গাপটিলের থ্রো গিয়ে লাগল পপিং ক্রিজের দিকে এগিয়ে দেওয়া তার ব্যাটে। বল-ব্যাটের সংঘর্ষ। এরপর দিক বদলে সেটি ছুটলো থার্ডম্যান দিয়ে, পদার্থবিদ্যার শুরুর দিকের ভরবেগের সূত্রকে প্রমাণ করতে যেন। যেন স্টোকস আরেকটি শট খেলে ফেললেন। কলিন ডি গ্র্যান্ডোম বৃথা ছুটলেন বলের পেছনে। ল্যাথাম দুহাতের গ্লাভস মুখের কাছে এনে ঠেকিয়েছেন। উইলিয়ামসন দুই হাত প্রসারিত করে যেন বলতে চাচ্ছেন, ‘এটা কী হলো’। কাকে বলছেন, সেটি নিশ্চিত নয়। গাপটিলের চোখেমুখের অনুবাদ করা যাচ্ছে না ঠিক। স্টোকস বসে পড়ে দুহাত তুলে রেখেছেন, তিনি দৌড়াচ্ছেন না। যা ঘটে গেছে, তাতে তার দায় নেই সেই অর্থে কোনও।
     


    বৈপরীত্য : স্টোকস বসে পড়েছেন দুহাত তুলে। পেছনে দুহাত তুলে দাঁড়ানো দর্শকদের উল্লাস।


    গাপটিল একটু আগে-পরে যদি বলটা ধরতেন, একটু আগে-পরে করে থ্রো করতেন, একটু এদিক-ওদিক করে থ্রো করতেন, স্টোকস একটু আগে-পরে ডাইভ দিতেন, তাহলে হয়তো ঘটতো না এই ক্ষ্যাপাটে ঘটনা। কিন্তু তেমন হলে তো টাইমিং টাইমিং করে জীবন পার করে দেওয়া দর্শকরা দেখতেও পেতেন না ক্রিকেট-টাইমিংয়ের সবচেয়ে অদ্ভুতুড়ে দৃশ্যটা। 

    স্টোকস রান-আউট না হলেও যদি ওই ‘ওভারথ্রো’ না হয়, তাহলে শেষ ২ বলে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন থাকতো ৭ রান, মানে বাউন্ডারি প্রয়োজন পড়তই। এখন দরকার ২ বলে ৩। আদতে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন পড়ার কথা ছিল ৪ রানের।

    গাপটিল যখন থ্রো করেন, মানে তার হাত থেকে যখন বল বেরিয়ে গেছে, তখন স্টোকস ও রশিদ ক্রিজে একে-অপরকে অতিক্রম করেননি। ফলে সেই থ্রো থেকে আসা বাউন্ডারির সঙ্গে তাদের দ্বিতীয় রানটা যোগ হওয়ার কথা নয় ক্রিকেটের প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী। স্ট্রাইক-প্রান্তের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা অনফিল্ডে থাকা মারাই এরাসমাসের সঙ্গে কথা বলে ৬-এর সিদ্ধান্ত দিলেন সেটি খেয়াল না করেই। অবশ্য পরে তিনি বলেছিলেন, এরাসমাসের সঙ্গে তার কথাবার্তা প্রতিটি ম্যাচ অফিশিয়ালই শুনেছেন, তবে ভুলটা ধরতে পারেননি কেউই।

    তারা সে ভুলটা না করলে শেষ ২ বলে ইংল্যান্ডের প্রয়োজন পড়তো ৪ রানের, স্ট্রাইকে স্টোকসের জায়গায় থাকতেন রশিদ। 


    অধ্যায় পাঁচ : ৩ বলে ২ আর ২ বলে ৩  

    নিজের সর্বশক্তি দিয়ে, ক্রিজের একদম ডিপে গিয়ে খেললেন স্টোকস। বোল্টের ইয়র্কারটা খেলতে গিয়ে সরে গিয়েছিলেন লেগস্টাম্পের বাইরে, খেলতে গিয়েই হারিয়ে ফেললেন ভারসাম্য। ফিল্ডিংয়ের সময় একবার পায়ের মাংসপেশিতে টান পেয়েছিলেন, ম্যাচের এমন অবস্থায় এসে স্টোকসকে দেখাচ্ছিল সব হারিয়েও কিছুই মেনে না নেওয়া যোদ্ধার মতো।

    রশিদ অপেক্ষা করছিলেন স্টোকসের জন্য, সিঙ্গেলের পর ডাবলসের সময়ও। কিন্তু স্টোকস শুরুর সেই দেরিটা পোষাতে পারলেন না। নন-স্ট্রাইক প্রান্তে রান-আউট হলেন রশিদ। অবশ্য স্টাম্প ভাঙার পরই বোল্টের যেন মনে পড়লো, এ প্রান্তে স্টাম্প না ভেঙে অন্যপ্রান্তে থ্রো করতে পারতেন তিনি, তাহলে আউট হতে পারতেন স্টোকস। সেক্ষেত্রে ১ বলে ২ লাগতো ইংল্যান্ডের, স্ট্রাইকে থাকতে পারতেন শেষ ব্যাটসম্যান মার্ক উড। 

    শেষ বলটা লেগস্টাম্পের ওপর ফুলটস করলেন বোল্ট। বড় শটের চেষ্টা করতেই পারতেন স্টোকস। বল উঠতে পারতো আকাশে। ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মিসবাহ-উল-হক যেমন চেষ্টা করেছিলেন জোগিন্দর শর্মার বলটা খেলতে। তবে ২ বলে ৩ রান থাকতেই স্টোকসের মনে পড়েছিল বাংলাদেশের কথা। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৩ বলে ২ রান প্রয়োজন থাকতেও হেরেছিল বাংলাদেশ, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর পরপর দুই বলে তুলে মারতে গিয়ে আউট হওয়ায়। স্টোকস ঝুঁকি নিতে চাননি। চেয়েছিলেন অন্তত সুপার ওভারে নিয়ে যেতে ম্যাচটা। 

    স্টোকস তেমন নাও ভাবতে পারতেন। বাংলাদেশের ওই ম্যাচের কথা, বা এমন কিছু তার মাথায় নাও আসতে পারতো। স্টোকস তুলে মারতে পারতেন। হতে পারতেন আউট। হতে পারতো ছয় বা চার। অথবা অন্য কিছু। 

    আগের রান-আউট দূর থেকে বল ধরেছিলেন বোল্ট, এবার ধরলেন বেশ কাছ থেকে। বল ধরার আগেই হাত দিয়ে স্টাম্প ভেঙেছেন কিনা, সংশয় ছিল সেটা নিয়েও। 

    স্টোকস বা বোল্টের হাত ধরে ম্যাচটা শেষ হতে পারতো সেখানেই। 
     


    টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার পাওয়া উইলিয়ামসনের এই ছবিটা হতে হতে পারতো অন্যরকম


    অধ্যায় ছয় : উল্লাস আর হতাশার ব্যবধান

    জেসন রয় বলটা ঠিকঠাক নিতে পারলে রান-আউট হতে পারতেন জিম নিশাম। ৩ বলে ৫ রানের জায়গায় হতে পারতো ৬। ক্রিজে আসতে পারতেন সুপার ওভারের শেষ ব্যাটসম্যান কলিন ডি গ্র্যান্ডোম। অথবা পরের বলে রয় থ্রো-টা করতে পারতেন স্ট্রাইক-প্রান্তে, যেদিকে চাচ্ছিলেন জস বাটলার। হয়তো সে বলেও নিশামকে রান-আউটের সুযোগ থাকত ইংল্যান্ডের। কিংবা এর পরের বলে ডিরেক্ট থ্রোটা করে দিতে পারতেন আর্চার। সেটি লাগতে পারতো স্টাম্পে, সিঙ্গেল নিতে যাওয়া নিশাম আবারও আউট হতে পারতেন, অথবা ওভার-থ্রো থেকে রান পেতে পারতো নিউজিল্যান্ড। আর্চার থ্রো করেননি। যেমন নিজেদের ইনিংসের শেষ বলে নিজেকে শট খেলা থেকে বিরত রেখেছিলেন স্টোকস। 

    সুপার ওভারের শেষ বলটা আগের দুবারের মতোই গড়বড় করে ফেলতে পারতেন রয়। অথবা থ্রো করতে পারতেন নন-স্ট্রাইক প্রান্তে, আর্চারের দিকে, যেদিকে তুলনামূলক এগিয়ে ছিলেন নিশাম। জস বাটলার শুরুতে স্টাম্পের পেছনেই দাঁড়িয়েছিলেন, থ্রো-এর গতিপথ দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন স্টাম্পের সামনে। তিনি অপেক্ষা করতে পারতেন বল তার কাছে আসা পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে হয়তো বাড়তি সময়টা পেতেন গাপটিল। পৌঁছে যেতে পারতেন ক্রিজে। 

    একটু পর উল্লাসে দিগ্বিদিক ছোটা বাটলার হয়তো নুয়ে পড়তে পারতেন হতাশায়। কিন্তু তেমন করতে হলো গাপটিলকে। নিশাম বা ওকস এসে শুধু সান্ত্বনাটুকুই দিতে পারলেন তাকে। 

    ____________


    বলটা ওয়াইড নাও দিতে পারতেন ধর্মসেনা। 

    সুপার ওভারের প্রথম বলটাই ওয়াইডের দাগঘেঁষে করেছিলেন আর্চার। ইয়ান স্মিথ ধারাভাষ্যে বলছিলেন, এটা ওয়াইড নিশ্চিতভাবেই। ইয়ান বিশপ বলছিলেন, সেটা নির্ভর করছে আপনি কোন পক্ষে। 

    শুরুর মতো শেষেও এই ওয়াইড বা না হওয়া ওয়াইড হয়তো আলোচনায় আসতো না তেমন। যদি ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ডের ফাইনালটি ঠিক যেমন হয়েছে, তেমনই না হতো। 
     


    ‘ডিসক্রিট ভ্যালু’র খেলা বলে প্রায় প্রতিটি বলের সম্ভাব্যতার ডাটাসেটেই থাকে অনেক সম্ভাবনা, অনেক সমীকরণের বিভিন্ন গতিপথ। তবে সেসব প্রাসঙ্গিক হয় না। কিন্তু যে ম্যাচ ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই লর্ডসের ওই বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো হয়, যে ম্যাচকে বর্ণনা করতে আশ্রয় নিতে হয় অলৌকিকের মতো শব্দ, সে ম্যাচের ক্ষেত্রেই হয়তো চেষ্টা করা হয় এমন সম্ভাব্য সমীকরণ ও তার গতিপথ মেলাতে। 

    গল্পের সঙ্গে তখন প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে না বলা গল্প। 
     

    সংযুক্তি : সুপার ওভারও টাই হওয়ায় মূল ইনিংস ও সুপার ওভারের সমন্বিত বাউন্ডারিসংখ্যায় জিতেছিল ইংল্যান্ড। সেখানেও বাউন্ডারি সংখ্যা সমান থাকলে দেখা হতো শুধু মূল ইনিংসের বাউন্ডারিসংখ্যা। এরপরও সমান থাকলে হতো সুপার ওভারের রানের ‘কাউন্টব্যাক’। সেক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ বৈধ ডেলিভারি থেকে শুরু করে ১ম বৈধ ডেলিভারি পর্যন্ত দুই দলের স্কোরিং দেখা হতো, যাদের আগে রান বেশি থাকতো, জিততো তারাই। 

    তবে বিশ্বকাপের এই ফাইনালের পর বাউন্ডারিসংখ্যা গণনার নিয়ম বদলে ফেলে আইসিসি। এখন আইসিসি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে সুপার ওভারও টাই হলে যতক্ষণ না এক দলের রান বেশি হয়, ততক্ষণ চলবে সুপার ওভার। বিশ্বকাপ ফাইনালও সুপার ওভার দেখে ফেলায় টুর্নামেন্টে প্রতিটি টাই ম্যাচেই এ নিয়ম রাখবে আইসিসি। আগে যা ছিল শুধু নক-আউট পর্বের জন্য। 

    এ নিয়ম আগে থাকলে নিউজিল্যান্ড সুযোগ পেতো আরেকটি, সে সমীকরণ মিলিয়ে আরও এক দফা ‘দ্বিতীয়’ সুপার ওভারের চিত্রনাট্য সাজানোর ভারটা নেবেন কিনা, তা আপনার ওপরই। 
     


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন