• লা লিগা
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    ফ্যান্টাস্টিক রামোস, বেনজেমার পুনর্জন্ম : জিদান যেভাবে শিরোপা জেতালেন রিয়ালকে

    জিনেদিন জিদান দ্বিতীয় দফায় রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হয়ে এসেই ঘোষণা দিয়েছিলেন লিগ জেতাই তার দলের প্রধান লক্ষ্য। রিয়ালের মত টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের রেকর্ড আর কারও নেই। রিয়াল মাদ্রিদও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেই তৃপ্ত। কিন্তু জিদান সেই ধারায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। সম্ভবত স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে লিগ জয়ের বিকল্পও নেই। জিদান কথা রেখেছেন, রিয়াল মাদ্রিদকে লিগ জিতিয়েই ছেড়েছেন তিনি। লা লিগার এক ম্যাচ হাতে রেখে ৩৪-তম শিরোপাটা ঘরে তুলেছে রিয়াল মাদ্রিদ। প্রায় এক বছরের মৌসুমে বিশ্লেষণ করার মতো ঘটনা আছে বহু, তবে মোটা দাগে ঘুরে-ফিরে পাঁচটি ব্যাপারই বার্সেলোনার চেয়ে আলাদা করে দিয়েছে রিয়ালকে।

    ১. জিদান 'জাদুকর' জিদান

     


    স্কোয়াড রোটেশনের মাস্টার ছিলেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই স্কোয়াডে পরিবর্তন আনতেন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তার সাফল্য তো ইতিহাসে লেখাই আছে। কোচ হিসেবে পেপ গার্দিওলার কাছ থেকেও নাকি শিখেছেন জিনেদিন জিদান, নিজেই স্বীকার করেন তিনি। গুনীরা জ্ঞান অর্জন করেন কাদামাটি থেকেও, এরপর সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়ে নিজেরাও কিংবদন্তীর আসনে বসেন। জিদানের গল্পটাও তেমনই।

    স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, গার্দিওলার সঙ্গে এক জায়গায় অবশ্য তার বড় পার্থক্য আছে। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ছিলেন জিদান। সাথে কোচ হিসেবে সাড়ে তিন বছরে ১১ শিরোপা জিদানকে তাই অন্যদিক দিয়ে এগিয়ে দেয় আরও অনেকটা।

    স্কোয়াড ডেপথের হিসেবে প্রতিপক্ষ বার্সেলোনার চেয়ে সম্ভবত এবার এগিয়েই ছিল রিয়াল। কিন্তু স্কোয়াডে বড় বড় খেলোয়াড় থাকলেই তো আর হয় না, তাদের ব্যবহার করতেও জানতে হয়। জিদান সেই কাজটা করেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। স্কোয়াড রোটেশনের সঙ্গে ট্যাকটিকসেও সময়মতো পরিবর্তন আনতে দুইবার ভাবেননি।

    শেষ কয়েক ম্যাচের কথাই ধরা যাক। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে করিম বেনজেমা আর এডেন হ্যাজার্ডকে নামিয়ে ৪-৪-২ ফর্মেশনে দল সাজালেন। জুনে লিগ পুনরায় শুরু হওয়ার পর ১০ ম্যাচের ভেতর ওইদিনই সবচেয়ে আয়েশী জয় বাগিয়ে নিয়েছিল জিদানের রিয়াল।

    পরের ম্যাচে মায়োর্কার বিপক্ষে গ্যারেথ বেল, হ্যাজার্ড, ভিনিসিয়াস, বেনজেমাকে একসঙ্গে নামিয়ে ৪-২-৩-১ এর বিধ্বংসী আক্রমণভাগ সাজালেন। সেটাও কাজেও দিল টনিকের মতো। আবার গ্রানাডার বিপক্ষে খেলালেন ৫ মিডফিল্ডার, সেখানেও সফল জিদান।

    লেফটব্যাক পজিশনে মার্সেলোর জন্য যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজছিলেন জিদান। দ্বিতীয় মেয়াদে রিয়ালে আসার পর দলে ভেড়ালেন ফার্লন্ড মেন্ডিকে। ফ্রেঞ্চ ফুটবলার হওয়ায় জিদানের সঙ্গে তার জমলোও ভালো। প্রথম মৌসুমে এরই মধ্যে ২৩ ম্যাচে একাদশে সুযোগ পেয়েছেন মেন্ডি। আর মার্সেলো কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়লেও রক্ষণে আগের চেয়ে মনযোগী হয়েছেন তিনি। দলে নিজেদের ভেতর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে সেটা সাফল্য হয়ে আনে, ব্যাকরণের নিয়ম মেনে জিদানও সফল হয়েছেন।

    ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো চলে যাওয়ার আগেই ক্লাব ছেড়েছিলেন জিদান। পরের বার এসে হ্যাজার্ড আর মেন্ডিকে যোগ করলেন তিনি। হ্যাজার্ড পুরো মৌসুমেই ছিলেন যাওয়া-আসার ভেতর। তার বড় কোনো অবদান দরকারও হয়নি রিয়ালের শিরোপা জয়ে। জিদান উলটো বয়সভিত্তিক দল থেকে উঠিয়ে এনেছেন ১৮ বছর বয়সী রদ্রিগোকে। ভিনিসিয়াসও ধারাবাহিক হয়েছেন আগের চেয়ে। প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়ই জিদানের অধীনে উন্নতি করেছে। আর ডাগআউটে মাথার ভেতর ট্যাকটিকসের প্যাঁচ-ঘোচ পাকিয়ে একের পর এক সূত্র আবিষ্কার করে গেছেন জিদান। মাঠে বাকিরা শুধু অঙ্ক কষে গেছেন।

    ২. সার্জিও রামোস (এনাফ সেইড)
    সার্জিও রামোসের নেতৃত্ব ছাড়া এই রিয়াল সাদামাটা- সেটা এই মৌসুমেও বেশ কয়েকবার প্রমাণ হয়েছে। আর রামোস তো শুধু অধিনায়ক বা শুধু ডিফেন্ডারও নন, লিগে এরমধ্যেই তার ১০ গোলও আছে। ওই ১০ গোলের অর্ধেক বাদ দিলেও রিয়াল আর রিয়াল থাকে না। তিনি দলে না থাকলে রিয়াল অনেকটাই অসহায়। মাঠের দুই প্রান্ত, মাঠের বাইরে, মাঠের ওপরে, মাঠের নিচে - সবখানে সার্জিও রামোস সর্বদা বিরাজমান। এই রিয়ালের সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবিও তিনি।  

    ৩. বেনজেমার পুনর্জন্ম
     


    রোনালদো চলে যাওয়ার পর গোল কে করবে সেই আশঙ্কা যেন কাটছিল না রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের। রোনালদোবিহীন প্রথম মৌসুমেও ফর্মে ছিলেন বেনজেমা। কিন্তু কার্যকরী ছিলেন না। তবে এবার তার ২১ গোলই তো মোটা দাগে রিয়ালের শিরোপা জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখল।

    অথচ এই বেনজেমা খোদ মাদ্রিদেই কতবার দুয়ো শুনেছেন! জিদান তাকে সমর্থন যুগিয়ে গেছেন প্রতিবার। মাদ্রিদের লোকজনের রিয়ালের কাছ থেকে প্রত্যাশা কতোখানি, সেটাও জিদান জানেন। মাঠে প্রত্যাশার ছাপ রাখা কতো কঠিন তাও জিদানের জানা। গত ১১ বছরে এসব জানা বাকি নেই বেনজেমারও। এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বেনজেমা বরং জবাব দিয়েছেন মাঠেই।

    এস্পানিওলের বিপক্ষে কাসেমিরোর গোলে বেনজেমার ব্যাকহিল অ্যাসিস্টটাও বড় প্রভাব রেখেছে রিয়ালের শিরোপা জয়ে। ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে তার বাম পায়ের ভলি তো মৌসুমের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার। বেনজেমার ওপর প্রত্যাশার চাপ কতোখানি ছিল ভাবুন একবার। আপনার প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসি, আপনাকে পূরণ করতে হবে রোনালদোর অভাব। বেনজেমা দুই কাজই করে দিয়েছেন। আত্মবিশ্বাসী বেনজেমা কতোখানি ভয়ঙ্কর তা টের পেয়েছে শেষ ১০ ম্যাচে রিয়ালের প্রতিপক্ষরা।

    পরিণত বেনজেমা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে অলিম্পিক লিঁওর কিশোর বেনজেমাকে। কিলিয়ান এমবাপের চেয়ে তাকে নিয়ে মাতামাতি কম ছিল না। সেই বেনজেমা শুধু স্ট্রাইকারই ছিলেন না, ক্ষীপ্র গতিতে নিমিষেই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারদের বোকা বানাতে জানতেন। বেনজেমা ঠিক জায়গাতেই এসেছিলেন, তারকাদের কারখানায়। প্রথম মৌসুমে গঞ্জালো হিগুয়াইনের ছায়ায় ছিলেন, এরপর থেকে তো বরাবর রোনালদোই রিয়ালের প্রাণ। তখন বেনজেমাকে রিয়ালের দরকার ছিল রোনালদোকে যোগ্য সমর্থন দেওয়ার জন্য। বেনজেমা হাসিমুখেই সেই কাজ করে গেছেন। রোনালদোর ৯ বছরে বেনজেমা ২০ গোলের মাইলফলক ছাড়িয়েছিলেন মাত্র দুইবার। আর রোনালদো যাওয়ার পর টানা দুই বছরই লিগে ২১ গোল করা হয়ে গেছে ফ্রেঞ্চ স্ট্রাইকারের।

    রোনালদোর মতো গোলমেশিন বেনজেমা নন। রোনালদোর সঙ্গে তুলনা দেওয়ার মতো ফুটবলার পৃথিবীতে কমই আছেন। তবে ৩২ বছর বয়সে এসে এবার বেনজেমাও বা রোনালদোর চেয়ে কম গেলেন কই? রোনালদোর আমলে ৯ বছরে দুইবার লিগ জিতেছিল রিয়াল। রোনালদোকে ছাড়া দুই বছরের মাথায় যে রিয়াল লিগ জিতে ফেলল তার বড় কৃতিত্ব তো বেনজেমারও।


    আরও পড়ুন :  'দর্শক' রোনালদো, ভিনিসিয়াস 'সিনিয়র' আর বৃষ্টিস্নাত বার্নাব্যুর খরা কাটানোর রাত


    ৪. দুর্দান্ত মিডফিল্ড
    রিয়াল মাদ্রিদ এবার লিগে এখন পর্যন্ত গোল করেছে ৬৮টি। এই ৬৮ গোল এসেছে মোট ২১ জন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে! যে কাসেমিরোর আসল কাজ মিডফিল্ডে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল ইন্টারসেপ্ট করা, তিনিও করেছেন ৪ গোল। কাসেমিরো লিগে সবশেষ যেবার ৪ গোল করেছিলেন সেবারও লিগ জিতেছিল রিয়াল!

    ক্রুসও কাসেমিরোর মতো ৪ গোল করেছেন, মদ্রিচ যোগ করেছেন আরও ৩টি, ফেদেরিকো ভালভার্দেও গোল করেছেন দুইটি। পুরো মৌসুম ইনজুরিতে কাটিয়ে ফেরার পর মার্কো আসেনসিও গোল করে যোগ দিয়েছেন তাদের সঙ্গে। ব্রাত্য হয়ে পড়া হামেসের এক গোল। শুধুমাত্র মিডফিল্ডাররাই রিয়ালকে দিয়েছেন ১৫ গোল। ক্রুস-কাসেমিরো তো ছিলেনই, লুকা মদ্রিচ শেষ বয়সে এসেও আরেকবার নতুন করে নিজেকে চিনিয়েছেন। এই তিনজনের মিডফিল্ডের সঙ্গে যখনই ভালভার্দে সুযোগ পেয়েছেন, তখনই একাদশে জায়গা পাওয়ার দাবি জানিয়ে রেখেছেন।

    ৫. "ডিফেন্স উইনস টাইটেলস"
    স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিখ্যাত উক্তি, "আক্রমণ ম্যাচ জেতায় আর রক্ষণ জেতায় শিরোপা।" জিদান জানতেন, বার্সার মতো ভুরি ভুরি গোল করার ক্ষমতা হয়ত তাদের নেই। তাই রক্ষণেই জোর দিয়েছে রিয়াল। পুরো মৌসুমে রিয়াল গোল খেয়েছে মাত্র ২৩টি। জিদানের আগের দুই মৌসুমে রিয়াল গোল খেয়েছিল যথাক্রমে ৪১ আর ৪৪টি।

    ৩৭ ম্যাচে থিবো কোর্তোয়া ক্লিনশিট রেখেছেন ১৯টি। ২০০৮ সালে ইকার ক্যাসিয়াসের পর প্রথমবারের মতো রিয়ালের গোলরক্ষক হিসেবে রিকার্ড জামোরা ট্রফির (লা লিগার সেরা গোলরক্ষক) বড় দাবিদার এখন তিনি।

    অথচ এই কোর্তোয়া বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক হয়ে রিয়াল এসেও ভালোবাসা পাননি শুরুতে। গেল মৌসুমটা দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছিল কোর্তোয়ার। এবারও শুরুটা ভালো ছিল না তার। প্রথম ৪ ম্যাচেই ৬ গোল খেয়েছিলেন। কেইলর নাভাসকে রিয়াল সমর্থকেরা যে স্থান দিয়েছিল, কোর্তোয়াকে সেই আসনে বসাতে চাননি মাদ্রিদ সমর্থকেরা। কোর্তোয়া সেই ভালোবাসা আদায় করে নিয়েছেন।

    রিয়াল মাদ্রিদের চরিত্রটাই বোধ হয় এমন। এখানে কেউ কাউকে ভালোবাসা বিলিয়ে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। যেভাবে শিরোপাটা আদায় করে নিল রিয়াল মাদ্রিদ!

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন