• বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ ২০২০
  • " />

     

    আরিফুল হক এবং 'ফানি' ক্রিকেটে 'হারানোর কিছু নেই'-এর অর্থ

    আরিফুল হক এবং 'ফানি' ক্রিকেটে 'হারানোর কিছু নেই'-এর অর্থ    

    “ক্রিকেট ইজ এ ফানি গেম।”

    ক্রিকেটকে নিয়ে প্রবাদ-প্রচলন, কথ্য-- যা কিছু আছে, ওপরের কথাটা সেসবের একটি নিশ্চিতভাবেই।

    “ক্রিকেট ইজ এ ফানি গেম”, কমেন্টেটর বা ক্রিকেটার বা কোচদের প্রায়ই এমন বলতে শুনবেন আপনি। “ক্রিকেট মজার খেলা”-- ওপরের বাক্যটার এমন অনুবাদ করলে সেটি কেমন গুগল ট্রান্সলেট ধরনের শোনায়। এবং ক্রিকেট যে মজার একটি খেলা, সেটি আসলে আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না। দিনশেষে সবধরনের খেলাই তো ‘ফান’ বা ‘মজা’, মানে একেবারে গোড়া থেকে যদি ভাবেন।  

    তবে সাধারণত কিছু বিশেষ মুহুর্তে ওপরের কথাটা ব্যবহৃত হয়। যখন অদ্ভুত কিছু ঘটে, মানে ঠিক সরলভাবে যেটিকে ব্যাখ্যা করা যায় না, সেই মুহুর্তে যা ঘটলো-- আদতে তা আরও অনেক কিছুর সমন্বয়, অথবা অনেক কিছুর থেকে বিশাল একটা বিচ্যূতি-- তখনই আসলে ক্রিকেট ‘ফানি’ গেম হিসেবে হাজির হয়। 

    “ক্রিকেট ডাজ ফানি থিংস টু ইউ”-- ওপরের ওই কথারই আরেকটি সংস্করণ। “ক্রিকেটও আসলে আপনাকে নিয়ে খেলে”, যেটির কাছাকাছি অর্থ হতে পারে এমন। যেমন “ক্রিকেট এক বলের খেলা”, কেউ এমন বললে আপনি নিশ্চয় বুঝবেন না, বক্তা ক্রিকেটের দৈর্ঘ্য বুঝাচ্ছেন। “ইউ নিড ওয়ান ডেলিভারি টু গেট আউট”-এর কাছাকাছি কথাই নিশ্চয়ই এটি। 

    “অনেকদিন পর আমরা খেলতে নেমেছি। আসলে এরকম হতেই পারে। কারণ ক্রিকেট-- এটা এক বলের খেলা”, আরিফুল হক বলছিলেন জেমকন খুলনার এমন “শক্তিশালী” দলের পরও ১৫৩ রান তাড়া করতে গিয়ে তাদের এ অবস্থা হলো কেন-- এমন প্রশ্নের জবাবে। 

    “হয়তো হাতে-কলমে (কাগজে-কলমে) আমরা ভাল দল, কিন্তু প্রত্যেকটা ম্যাচ আমাদের খেলেই জিততে হবে। আমরা যদি আগেই বুঝে নেই যে আমরা ভাল দল… এভাবে আসলে ক্রিকেট খেলা হয় না। নামে (নামের ভারে) আসলে ক্রিকেট খেলা হয় না।” 


    ****

    “মাইরা দিতে চাইলে তো মারাই যায়, তখন আরেকটা গাইল খাই আরকি”, স্টাম্পমাইকে লিটন দাসের বলা কথাটা স্পষ্ট বাংলায় শোনা গিয়েছিল। বোলিং এন্ডে ব্যাক-আপ নাই দেখে থ্রো করতে গিয়েও করেননি লিটন, এরপরই হয়তো স্লিপের সঙ্গে এই কথোপকথন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের পচেফস্ট্রুমে সেই টেস্টে বাংলাদেশ হেরেছিল ৩৩৩ রানে। 

    লিটনের একটা ওভারথ্রো হয়তো ম্যাচে তেমন প্রভাব ফেলতো না। তবে সম্ভাব্য কিছু হারানোর শঙ্কা লিটনকে সেই থ্রো করতে দেয়নি, সম্ভাব্য উইকেট প্রাপ্তির পথে এগুতে দেয়নি। মাঝে মাঝে ক্রিকেট জুয়ার বোর্ডের মতো, 'কী পেলাম-কী হারালাম'-এর মাঝে ব্যবধান যেখানে খুবই সূক্ষ্ণ, অথচ হিসাব-নিকাশ বড়।  


    "ক্রিকেট এক বলের খেলা"


    সে সফরে ৭ ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পায়নি কোনও। আরিফুলের বাংলাদেশ জাতীয় দলে অভিষেক ঠিক পরের টি-টোয়েন্টি সিরিজেই। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যেতে না পারলেও শ্রীলঙ্কা সিরিজে ডাক পেয়েছিলেন। সেবার বিপিএলে খুলনা টাইটানসের হয়ে খুব বেশি স্কোর না করলেও ইমপ্যাক্টফুল ইনিংস খেলেছিলেন। যার একটি ছিল রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে।

    শেষ ১৮ বলে ২ উইকেট বাকি রেখে ৩৬ রান প্রয়োজন ছিল খুলনার। আরিফুল সেই ৩৬ রান একাই তুলেছিলেন, ১৩ বল খেলে। ৪ বল বাকি থাকতেই জিতেছিল তার দল। বিপিএলে প্রথমবারের মতো ম্যাচসেরা হয়েছিলেন আরিফুল, কিছু না হারিয়ে সব পেয়েছিলেন যেন সেদিন। 

    ****

    কাঁচামিঠা। 

    সমাসবদ্ধ এই পদের ব্যাসবাক্য বেশিরভাগ বইয়েই দেওয়া (এবং শিক্ষকরাও হয়তো সেটিই পড়ান বা পড়াতেন)-- যা কাঁচা তাই মিঠা। মানে যেটি কাঁচা, সেটিই মিষ্টি। 

    আমাদের এক শিক্ষক (তিনি তখনই চোখে প্রায় দেখতেন না, কিন্তু আমাদের পড়াতেন সেভাবেই) এটি শুনলেই রীতিমতো ক্ষেপে যেতেন, বলতেন, “কাঁচা পেঁপে খেয়ে দেখিস দেখি, কেমন মিষ্টি লাগে!” তার মতে, আসলে কাঁচামিঠার ব্যাসবাক্য হবে এমন-- কাঁচা হয়েও যা মিঠা। যেমন- কাঁচামিঠা আম। সাধারণত যেটি মিষ্টি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে একটা বিশেষ জাত তৈরি করেছে।

    বাংলা ব্যাকরণ এবং ভাষায় এর প্রয়োগ ‘ফানি থিং’, আমরা বলতেই পারি। তবে এর অর্থ 'বাংলা ব্যাকরণ মজার' করলে অনেকেই তেড়ে আসতে পারেন। 

    যেমন-- হারানোর কিছু নেই কথাটা। জীবনের আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো ক্রিকেটেও এই কথা ব্যবহৃত হয়। আদতেই সবসময়ই কি হারানোর কিছু থাকে না? অবশ্যই থাকে। ফ্রি-হিটেও কদিন আগেই মইন আলি রান-আউট হয়েছেন আইপিএলে। 

    এই কথাটায় আসলে এক বা একাধিক শব্দ উহ্য অথবা অদৃশ্য’ থাকে প্রায়ই। আর (নতুন করে) হারানোর কিছু নেই, যা হারানোর, তা হারিয়ে গেছে। 

    জাতীয় দলের দুয়ার আরিফুলের জন্য খুলেছিল ২০১৮ সালে, সেটি বন্ধও (আপাতত) গেছে সে বছরই। এই ২০২০ সালে এসে আরিফুলের এদিন হারানোর কিছু ছিল না আর, নতুন করে। 

    ****

    লেগস্পিন-- ক্রিকেটের এই বিশেষ প্রজাতিকে নিয়ে বাংলাদেশ যা করে, সেটিকে বলা যায় ‘ফানি’। লেগস্পিন যেন টানে এদেশের ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট (যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন বিশেষ করে) সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে আর জড়ানো হয় না। লেগস্পিনের আগে-পরে ‘বিগ-হিটার’ নিয়ে এই ব্যাপারটা আছে বাংলাদেশে। 

    আপনি এক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের নাম বলতে পারেন। মুক্তার আলির নাম বলতে পারেন। এবং বলতে পারেন আরিফুল হকের নাম। তিনজনই পেস বোলিং অলরাউন্ডার, তিনজনেরই ঘরোয়া ক্রিকেটে পরিচিতি ‘বিগ-হিটার’ হিসেবে। এবং তিনজনের কেউই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে থিতু হতে পারেননি সেভাবে। 

    ৩১ বছর বয়সী মুক্তার খেলেছেন শুধু একটি টি-টোয়েন্টি, ৩৪ বছর বয়সী জিয়া সব ফরম্যাট মিলিয়ে ২৮টি এবং এ দুজনের মাঝে বয়স ও ম্যাচসংখ্যায় স্যান্ডউইচ হয়ে থাকা ২৮ বছর বয়সী আরিফুল ১২টি ম্যাচ। 

    টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচের সংখ্যা ফিল্টারের মধ্যে না আনলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটধারী ব্যাটসম্যানের যে তালিকা, তাতে নয়ে আছেন জিয়া, বারোতে মুক্তার। আরিফুল সে তুলনায় বেশ নিচে, তার স্ট্রাইক রেট একশরও কম। স্ট্রাইক রেট বেশি হলেই বিগ-হিটার নয় বা বিগ-হিটার হলেই স্ট্রাইক রেট বেশি হতে হবে, ব্যাপারটা তো আসলে এতো সরল নয়। 

    বিপিএলে মুক্তার খেলেছেন ৫ মৌসুম, তিনটি দলের হয়ে। ৬ দলের হয়ে জিয়া ও ৫ দলের হয়ে আরিফুল-- দুজনই খেলেছেন ৭টি করে মৌসুম। বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপের প্রথম দিন জিয়ার দলের ম্যাচ ছিল না, তবে আলাদা দুই ম্যাচে খেললেন মুক্তার ও আরিফুল। 

    ****

    মুক্তারের এদিন ব্যাটিংয়ের শুরুতে যেন কিছুই হারানোর ছিল না। তবে পাওয়ার ছিল। বোলিংয়ে দলের সেরা ফিগারটা তার, ব্যাটিংয়ে যখন নামলেন ১৭ বলে দরকার ৩৬, থিতু হওয়া দুই ব্যাটসম্যানের দ্বিতীয়জনকে হারিয়েছে ঢাকা। শেষ ২ ওভারে মুক্তারের দলের প্রয়োজন ছিল ২৯। ফরহাদ রেজা এলেন ১৯তম ওভারে, রাজশাহীকে শেষ পর্যন্ত একটা ভাল স্কোর এনে দিয়েছিল যে জুটি, রেজা সেটির অংশ ছিলেন। রেজার হারানোর কিছু ছিল না? 

    মুক্তার হয়ে উঠলেন বিগ-হিটার। ৩ ছয়। ওভারে ২১ রান। মুক্তার আত্মবিশ্বাসী তখন, শেষ ওভারের আগে নিজের আর্মগার্ডটাও খুলে ফেরত পাঠালেন। ডিফেন্সের কিছু নেই, তখন হবে শুধু আক্রমণ। 


    মাহাদি-- ক্রিকেটে আইফোনের এসই ভার্শন


    এরপর মাহাদি হাসান হয়ে উঠলেন আইফোনের এসই ভার্শনের মতো, যেটির বডি এক মডেলের, ওএস আরেক মডেল থেকে আনা। অফস্পিনার হয়ে পেসারদের মতো ইয়র্কার করার অদ্ভুত অথচ অনিন্দ্যসুন্দর এক স্কিল (অন্তত টি-টোয়েন্টিতে) ক্রমাগত দেখিয়ে গেলেন তিনি। পেসারদের মতো করলেন নো-বলও (স্পিনাররাও করেন, তবে ইয়র্কারের মতো নো-বলকেও খুব নিরপেক্ষ থেকে বললে, পেসার-ঘেঁষাই বেশি মনে হয়)। 

    মাহাদি এর আগে ব্যাটিংয়ে খেলেছেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। তবে শেষ ওভারের আগে যেন হারানোর কিছু ছিল না তার, যা হারিয়ে যাওয়ার, রেজার ওভারেই যেন চলে গেছে তা রাজশাহীর। প্রথম তিন বলে ডট অসম্ভবের ভরসা জোগালো, মুক্তার মরিয়া হয়ে চতুর্থ বলে একটা বাউন্ডারি পেলেন, মাহাদি নো করলেন, সোহান উইকেটের পেছনে গোলকিপার হয়ে উঠে হাত-পা সবকিছুর দৃশ্যমান প্রয়োগ করলেন, মাহাদি মুক্তারকে পরাস্ত করলেন। মুক্তার সব হারিয়ে ফেললেন, মাহাদি পেলেন সবকিছু। তার জন্য, রেজার জন্য, তার অধিনায়ক কিংবা তার উইকেটকিপারের জন্যও। 

    ****

    “না, ধন্যবাদ। তোমার কাজ শুধু দৌড়ানো।”

    সিঙ্গেল আছে, কিন্তু স্ট্রাইক-প্রান্তের ব্যাটসম্যান যখন সেটি নাকচ করে দেন-- নন-স্ট্রাইক প্রান্তের ব্যাটসম্যানের কাছে যে বার্তা যায়, সেটির অর্থ তো ওই ওপরের কথাই। আরিফুল হক সেটি করলেন শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। সেই শহিদুল, আগের ওভারের শেষ বলেই তাসকিনের ব্যাক অফ আ লেংথ বলকে টেনে যিনি লং-অন দিয়ে ছয় মেরেছেন! 

    মিরাজকে প্রথম দুই বলে ছয় মারার আগ পর্যন্তও মনে হচ্ছিল, শামিম হোসেনকে আগে না পাঠানো ছিল খুলনার ট্যাকটিক্যাল ভুল। তার হিটিং সামর্থ্য তিনি দেখিয়েছেন, তবে তখন পর্যন্ত আরিফুল ছিলেন খুলনার রান পাওয়া ব্যাটসম্যানদের মাঝে সবচেয়ে ধীরগতির। আরিফুলের গতি চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল শামিমের ওপর। ফল-- অতি আক্রমণাত্মক হতে গিয়েই আউট।

    আরিফুলের হারানোর কিছু ছিল না আর, তিনি সব হারিয়েই ফেলেছিলেন যেন ততক্ষণে। শেষ বিপিএলেও তিনি নিজেকে হারিয়েই খুঁজেছেন শুধু, খুলনার হয়ে ৬ ম্যাচ মিলিয়ে করেছিলেন ৬৩ রান, বোলিং করেননি ১ ওভারও। 

    ‘নাইনটিন ইজ দ্য নিউ টোয়েন্টি’, মানে ওভারের ১৯তম ওভারই শেষ ওভারের মতো ধরে নিয়ে এদিন এগিয়েছেন দুই অধিনায়কই-- রাজশাহীর শান্ত আর বরিশালের তামিম। তবে দুজনের হয়েছে দুই অভিজ্ঞতা। যেমন দুই অভিজ্ঞতা হয়েছে মুক্তার ও আরিফুলের। যেমন রেজা ও তাসকিনের। যেমন মাহাদির (বা মাহেদি বা মেহেদি) মতো ইয়র্কার পর্যন্ত যেতে চেয়েও আরও আগেই থেমেছে মেহেদির (মিরাজ) লেংথ। প্রথম বলে প্রায় রিটার্ন-ক্রিজ ঘেঁষে অ্যাঙ্গেল তৈরি করলেন রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে বোলিং করা মিরাজ। তবে লেংথটা একটুর জন্য মিস করে গেলেন, আরিফুল যে শট খেললেন, সেটিকে বলা যায় বড়সড় মিসহিট বা বিশাল আউটসাইড-এজ। লং-অনের দিকে চালিয়ে ছয় পেলেন লং-অফে। 

    এরপর মিরাজ যখন লেংথ হারিয়ে ফেলছেন একের পর এক, আরিফুল তখন ফিরে পাচ্ছেন এতক্ষণে যা হারিয়েছিলেন। 

    “ক্রিকেট এক বলের খেলা” বা “ক্রিকেট ইজ এ ফানি গেম”। জীবনের মতো-- যখন (আর নতুন করে কিছু) হারানোর থাকে না, তখন সেটি আরও “ফানি”। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন