• " />

     

    ক্রুইফের কাছে খোলা চিঠি

    প্রিয় হেনড্রিক ইয়োহান ক্রুইফ,

     

    বিদেহী জগতে কি কাগজের পত্রিকা পৌঁছায়? আজ দ্য সানের শিরোনামটা দেখেছেন? 'হেভেন হ্যাজ আ নিউ প্লেমেকার' - লাইনটা পড়ে মনে মনে হয়তো একচোট হেসে নিয়েছেন। যে অপার্থিব জগতের ওপর আপনার আস্থা ছিল না কোনোকালে, আপনাকে সবাই সেখানেই কেমন নিঃসংকোচে অধিষ্ঠান দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু চাইলেই কি আর সবকিছু হেসে উড়িয়ে দিতে পারবেন? আপনি চান আর না-ই চান, মানুষ তো আপনাকে অমরত্বের সুধা পান করিয়েই দিয়েছে। ভাবুন তো, কত লোক জনমভর সাধনা করেও যেটা পায় না, সেটা আপনি বেঁচে থাকতেই পেয়ে গিয়েছিলেন ! ফুটবলপাত্র উচ্ছলিয়া আপনার মতো মাধুরী আপনার মতো আর কে-ই দিতে পেরেছেন?

     

    হয়তো একরাশ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মুচকি মুচকি হাসছেন। তা হাসুন। স্তোক-স্তুতিতে খুব ভক্তি আপনার কখনোই ছিল না কোনোকালে। নিজে যখন খেলেছেন, বা পরে কোচ হয়েছেন- সবকিছুই যাচাই করে নিয়েছেন নিজের আদর্শের কষ্টিপাথরে। ফুটবল যদি একটা দর্শন হয়, সেটা আপনার মতো করে মননে কেউ কি ধারণ করতে পেরেছেন? 'ফুটবল খেলাটা সহজ, কিন্তু সহজ ফুটবল খেলাটাই সবচেয়ে কঠিন' - বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরতম খেলাটির জন্য এর চেয়ে ধ্রুব সত্য কি আর কেউ বলেছেন?

     

    আচ্ছা, আমস্টারডামের ওই দিনগুলোর কি কথা কি আপনার মনে আছে? বাবা মানুস ছিলেন মুদির দোকানী, ছেলেকে শখ করে ফুটবলে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন। সেই ছেলে যে লাখে একজন, সেটাও আয়াক্স বুঝে নিয়েছিল তখনই। নইলে আপনি যোগ দেওয়ার আগে যে ক্লাব ছিল আধাপেশাদার একটা উচ্চাভিলাষহীন দল, সেটা কয়েক বছরের মধ্যে পুরো ইউরোপে ছড়ি ঘোরাতে শুরু করবে কেন?

     

    শুধু বল নিয়ে নন, মননে-বিশ্বাসে আপনি যে স্বতন্ত্র সেটাও তো শুরুর দিনগুলোতে থেকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আয়াক্সের হয়ে প্রথম ম্যাচে জিভিএভির কাছে হেরে গিয়েছিলেন ৩-১ গোলে। ওই ম্যাচের পর প্রতিপক্ষের মাঠে বেশ কয়েকটা খেলায় আর মাঠে নামেননি। নিজেকে আরও পোক্ত করে, আরও শাণিত করে এরপর নেমেছিলেন মাঠে। এরপর আর ফিরে তাকানো নয়।

     

    রাইনাস মিখেলসের সঙ্গে প্রথম দেখার ঘটনা কি মনে আছে? কোন সাল সেটা, ১৯৬৫-ই হবে বোধ হয়। বধির শিশুদের একটা স্কুলের শরীরচর্চার শিক্ষক ছিলেন মিশেলস। পাগলাটে লোকটা যখন হড়বড় করে আয়াক্সকে মহীরূহ করার কথা বলে যাচ্ছিলেন, তখন কি মনে মনে হেসেছিলেন? এই টোটাল ফুটবলটা আবার কী? সবাই একসঙ্গে ওপরে উঠবে, আবার একসঙ্গে নামবে, নিজেদের স্থানটা ক্রমাগত বদলাতে থাকবে- এ ধরনের প্রলাপ ফুটবলে এর আগে কেউ বলেছে?

     

    কে জানত, কয়েক বছরের মধ্যে সেই প্রলাপটাই বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে? আর সেটার সবচেয়ে বড় কুশীলব তো আপনিই। মেসি, ম্যারাডোনা বাঁ পায়ের যাদুকর, আবার পেলের ডান পা-ই বেশি শক্তিশালী। আপনাকে তো বলা হতো চার-পেয়ে ফুটবলার। এত দ্রুত বল নিয়ে কারিকুরি করতে পারতেন - তখনকার ফুটবলে সেটা এক আধিভৌতিক ব্যাপার ছিল।

     

    ইউটিউবের যুগে এসে এখন সেসব কীর্তি সবার হাতের মুঠোয়। কিন্তু ভিডিও কি আপনাকে পুরোপুরি চেনাতে পারে? সবসময় একটা কথা বলতেন, 'কখনো পাস পায়ে দেবে না, একটু সামনে দেবে, যেন সেটা সে দৌড়ে গিয়ে ধরতে পারে। তাহলে ম্যাচের গতিটাও বেড়ে যাবে।' রক্ষণ থেকে আড়াআড়ি পাস দিতে গিয়ে কখনো বিপদ ডেকে আনবে না। টেকনিক মানে ১০০০ বার বল নিয়ে কারিকুরি করা নয়, ওটা তো সার্কাসের কাজ। টেকনিক মানে একবারের স্পর্শে, সঠিক গতিতে বলটা সতীর্থের ঠিক পায়ে পৌছানো। ফুটবলের একদম প্রাথমিক ব্যাপারগুলো আপনার মতো সহজ করে আর কে-ই বা বলতে পেরেছে?

     

    আয়াক্সেই ফিরে আসা যাক। আপনি যে বাকিদের চেয়ে আলাদা ছিলেন, সেটার প্রমাণ মাঠের বাইরেও দিতে শুরু করেছিলেন। তুমুল পেশাদারির এই যুগে খেলোয়াড়দের এজেন্টরাই সব কাজ করেন। কিন্তু সেই ষাটের দশকে যখন এটা অকল্পনীয় ছিল, আপনিই শ্বশুরকে এজেন্ট করে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন। ডাচ ফুটবলারদের খেয়ে পড়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকাই যখন আরাধ্য, আপনার জার্সিতে তখন ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষক পুমার লোগো। এমনকি ডাচ দলে যখন সবার জার্সিতে যখন অ্যাডিডাসের তিন ডোরার ছাপ, আপনি নিজের জন্য দুই ডোরাওয়ালা আলাদা একটা জার্সি বানিয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থেই ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রথম সুপারস্টার ছিলেন আপনি। শুধু মাঠ না, মাঠের বাইরেও।

     

    কিন্তু সেই খ্যাতির বিড়ম্বনাও একটা সময় কাঁটা হয়ে গলায় আটকেছে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে আপনার হল্যান্ডে ফুটবলের সবটুকু রূপ-রস-গন্ধ সঞ্জীবিত। এমনকি ১৯৭০ সালের মহাকাব্যিক ব্রাজিলিয়ান দলের কার্লোস আলবার্তো পাহেইরাও বলেছিলেন, 'ফুটবলটা যদি খেলতে চাও, ওদের মতো খেলো।' টোটাল ফুটবলের মদির সৌরভে তখন বিশ্ব আচ্ছন্ন।

     

    সেমিফাইনালে সেই ব্রাজিলকেই উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা থেকে যখন নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে, তখনই উটকো বিতর্ক। ফাইনালের আগে পশ্চিম জার্মানির বিল্ড বিশাল একটা প্রতিবেদন ছেপে বসল। সেখানে সবিস্তারে লেখা হলো, সেমিতে জয়ের পর কীভাবে ডাচ ফুটবলাররা মদিরা-নারীতে বুঁদ হয়ে সুইমিংপুলের পারে উন্মত্ত উল্লাস করছেন! সেটা নিয়ে কী তোলপাড়! পরের দিন ফাইনাল, আপনার যখন নিবিষ্ট হওয়ার কথা জার্মান-বধের ছক আঁকতে, সারা রাত আপনাকে ব্যস্ত থাকতে হলো স্ত্রী ড্যানিকে বোঝাতে- এই প্রতিবেদন একেবারেই মনগড়া, ডাহা মিথ্যা। ধূমপানের বদভ্যাস যথেচ্ছ থাকুক, চরিত্রদোষে তো দোষী নন।

     

    পরের দিন সেটাই কি অবচেতন মনে প্রভাব পড়েছিল আপনার ওপর? নইলে মাঠে অমনভাবে নিজের ছায়া হয়েই বা থাকবেন কেন? ভাগ্যটাও তো পক্ষে ছিল না, নইলে ব্রিটিশ রেফারি ওই ম্যাচে কেনো অমন বিতর্কিত পেনাল্টি দেন? কিন্তু সত্যি করে বলুন তো, সেটা নিয়ে কি কোন অনুযোগ ছিল? ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর জন্ম কি আপনার নিজের দোষেই নয়? মহাভারতের কর্ণ বা ইলিয়াডের হেক্টরের সঙ্গে যে আপনার নামও নিতে হয়, সেটা কি পুরোটাই ফুটবল বিধাতার অদৃশ্য ইশারায়? আপনার কি কোনো দায় নেই তাতে?

     

    আপনি নিজেই হয়তো সেটা মেনে নেবেন। নিয়তিতে কবেই বা বিশ্বাস করেছিলেন। নিজেই তো বলেছিলেন, খেলা শুরুর আগে বাইশজনের সবাই বুকে ক্রশ আঁকলে যদি কাজ হতো, তাহলে ম্যাচ কেউ হারত না।

     

    ক্যারিয়ারে আর যাই হোক, কখনো নিজের আদর্শের প্রশ্নে আপোস করেননি। চুয়াত্তরের সেই স্বপ্নভঙ্গের পর সেই যে রাগ করে হল্যান্ডের জার্সি তুলে রেখেছিলেন, পরের বিশ্বকাপেও সেটা আর গায়ে চড়াননি। বড় বেদনায় দীর্ণ হয়ে নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের জন্য কি কখনো আক্ষেপ হয়েছে?

     

    আয়াক্স ছাড়বেন বলে যখন ঠিক করলেন, প্রস্তাব এসেছিল রিয়াল মাদ্রিদের কাছ থেকে। একনায়ক ফ্রাঙ্কো তখন মাদ্রিদের অধীশ্বর, আপনি মাদ্রিদের অতুল বৈভব ছেড়ে আশ্রয় করেছিলেন বার্সেলোনার দীনহীন পর্ণকুটির। কে জানত, বার্সার সঙ্গে নিজের প্রাণ এমনই বাঁধনে বাঁধবেন- আজকের এই ন্যু ক্যাম্পের প্রতিটি ঘাসের ডগাও আপনার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে। আপনি না থাকলে মেসিরা হতো মেসি হতো না, আপনি না থাকলে লা মেসিয়াও সৃষ্টি হতো না! সেই লা মেসিয়া, যেখান থেকে আজ মেসি, ফ্যাব্রেগাস, ইনিয়েস্তারা মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছেন ফুটবলিশ্ব। সেটা তো আপনার মস্তিষ্কপ্রসূতই ছিল। ফুটবলের এমন সূদুরবিস্তারী পটরেখা কীভাবে এঁকেছিলেন, সেই রহস্যটা কি একটু ভেঙে বলবেন?

     

    রাগ করেই বোধ হয় এক দিন বলেছিলেন, সুযোগ থাকলে সব ক্লাবের খেলোয়াড় কেনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে শুধু খেলোয়াড় তৈরি করতে বলবেন। আজকের এই যথেচ্ছ অর্থের গ্রাসে আপনার কথা হয়তো করুণ আর্তির মতো শোনাবে। কিন্তু এটাও তো ঠিক, আপনার সেই পথরেখা ধরেই আয়াক্স, বার্সেলোনা এর পর আরও অনেক মহাকাব্য জন্ম দিয়েছে।

     

    বার্সেলোনাতেই আবার একটু ফিরে আসা যাক। খেলোয়াড় হিসেবে যে অপূর্ণতা ছিল, কখনো কি ভেবেছিলেন কোচ হিসেবে সেটা সুদে আসলে পুষিয়ে দেবেন? ন্যু ক্যাম্পের ডাগআউটে যখন এলেন, বার্সেলোনা তখন ব্যর্থতার অতলান্তে তলিয়ে যেতে বসা বিস্মৃতপ্রায় একটা নাম। সাফল্য তাদের কাছে তখন সোনার হরিণ, ১৩ বছরের মধ্যে লিগ হাতে উঠেছিল মাত্র একবার। পরিস্থিতিটা আরও সঙ্গীন হলো, যখন কোচ লুইস আরাগোনেসের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের প্রায় সবাই বিদ্রোহ করে বসলেন।

     

    আপনি এলেন, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি হলো। দুই বছরের মধ্যে দলকে লিগ জেতালেন, পরের বছর প্রথমবারের মতো এনে দিলেন ইউরোপিয়ান কাপ। যে দর্শনের আলো একটু একটু করে মিইয়ে যাচ্ছিল, সেটিতেই আবার দিলেন আগুনের পরশমনির ছোঁয়া। স্টইচকভ-গার্দিওলা-কোম্যানদের দিয়ে শুরু, এর পর রিভালদো-রোনালদিনহো-মেসি থেকে আজকের নেইমাররা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন সেই আলোকবর্তিকা।

     

    আয়াক্সের স্ট্রাইকার জবি বসম্যান একবার একটা কথা বলেছিলেন। 'ক্রুইফ ভাবতেন, তিনি সবসময় ঠিক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি আসলেই সবসময় ঠিক।' আপনিই তো একদিন মুচকি হেসে বলেছিলেন, 'আমি যদি ভুল করি, তাহলে ধরে নিও ওটা আসলে ভুল ছিল না।' নিজের ওপর কতটুকু আত্মবিশ্বাস থাকলে এমনভাবে বলা যায়? কতটা নিঃসংশয় হলে ছয় বছর আগের বিশ্বকাপের ফাইনালে নিজের দেশকে বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষ স্পেনকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া যায়? আপনি যে বিশ্বাসে দীক্ষিত, স্পেন সেটাতেই গরীয়ান বলেই তো নিজের দেশকেও হয়তো তুচ্ছ করতে পেরেছিলেন!

     

    উপভোগ জিনিসটার সঙ্গেই কখনো আপোস করেননি। ফর্মের তুঙ্গে থেকে আয়াক্স ছেড়েছেন, যখনই মনে হয়েছে বার্সেলোনায় আর মন বসছে না, তখনই ছেড়ে দিয়েছেন। সেই বার্সেলোনার ডাগআউট থেকেই যখন তিক্ত স্মৃতি নিয়ে বিদায় নিলেন, আর কখনো কোনো ক্লাবের হয়ে সেই ডাগ আউটের ছায়া মাড়াননি।

     

    পরজন্ম বলে যদি সত্যিই কিছু থাকে, তাহলে আবার কী বেশে ফিরে আসবেন? আয়াক্সের সেই তরুণ তুর্কি হয়ে, যাঁর জাদুতে ইউরোপ ছিল মোহাচ্ছন্ন? চুয়াত্তরের সেই হল্যান্ডের হয়ে, যেখানে অবিস্মরণীয় সেই ক্রুইফ টার্ন করে দেখিয়েছিলেন? নাকি ন্যু ক্যাম্পে, যেখানে আপনার ফ্যান্টম গোল এখনো অবিশ্বাসের শিহরণ জাগায়? লা মেসিয়ায়, যেখানে আপনার আদর্শ হয়ে আছে ঐশীবাণীর মতো? যেখানেই হোক, বহু বাসনায় শুধু প্রাণপণে চাইব, অন্তত একবার হলেও আসুন।

     

    আপনার কাছে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।

     

    ইতি

    আপনার একজন ক্ষুদ্র ভক্ত

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন