• অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
  • " />

     

    হুইলচেয়ারেই হ্যাটট্রিক শিরোপা!

    অন্য দশটা ছেলের মতো কাটেনি তার শৈশব। স্কুলের ছুটির ঘণ্টা শেষে দৌড়ে ক্লাসরুম থেকে বের হওয়া কিংবা বিকেলে পার্কে গিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করা; কোনোটিই তাঁর দৈনন্দিন রুটিনে ছিল না। পঙ্গুত্বের অভিশাপে হুইলচেয়ারে বসে অন্যদের খেলা দেখার পীড়াটা শিশু মনে নাড়া দিয়েছিল প্রবলভাবে। কিন্তু নিজের দুর্বলতাকে স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি, হুইলচেয়ারে বসেই জিতে নিয়েছেন গ্র্যান্ড স্ল্যাম শিরোপা। তিনি ডিলান অ্যালকট, প্রতিবন্ধী টেনিস জগতে অনুপ্রেরণার অন্য নাম। আজ সকালেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের প্রতিবন্ধী বিভাগের ফাইনাল জিতে করেছেন শিরোপা জয়ের হ্যাটট্রিক।

     

    তাঁর পৃথিবীতে আসার পর থেকেই মা বাবার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়েছিল। কীভাবে হাসিটা থাকবে বলুন, ছেলের মেরুদণ্ডে জন্মগত ভাবেই টিউমার। ডাক্তাররা ডিলানের অস্ত্রোপচার করলেন ঠিকই, কিন্তু এর ফলে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে হয় তাঁকে। স্কুলের সময় থেকেই টেনিসের প্রতি ভালবাসা থাকলেও বাস্কেটবল দলেই সুযোগ পান। অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের হয়ে ২০০৮ প্যারা-অলিম্পিকে স্বর্ণও জিতেছেন। তবে মনের মাঝে একটা সুপ্ত বাসনা বরাবরই ছিল, র‍্যাকেট হাতে টেনিস কোর্টে ঝড় তুলবেন। কিন্তু বাস্কেটবল দল তাঁকে ছাড়তে চাইছিল না।

     

    শেষ পর্যন্ত অনেকটা জোর করেই টেনিসে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। এটাই পাল্টে দিয়েছে তাঁর জীবনকে। দুর্দান্ত সার্ভিস করতে পারা তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। হুইলচেয়ারে বসেও ১৫০ কিলোমিটার বেগে সার্ভিস করা তো চাট্টিখানি কথা নয়! ডিলানের মতে, হুইলচেয়ারই তাঁর জীবনকে নতুন এক পরিচিতি দিয়েছে, “ছোটবেলায় নিজের অক্ষমতা নিয়ে খুব লজ্জিত থাকতাম। কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানেও যেতাম না, খুব কম মানুষের সাথে মিশতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, এই হুইলচেয়ারই আমার জীবনকে নতুন মাত্রা দেবে। টেনিস খেলার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু অন্যদের মতো দাঁড়াতে পারতাম না। তবে আমি হার মানিনি, অন্যদেরও তাই বলবো হার না মেনে এগিয়ে যেতে।”

     

    ভক্তদের মাঝে ডিলান

     

    হার না মানা এই যাত্রায় ভক্তদের বরাবরই পাশে পেয়েছেন। টেনিসের পাশাপাশি অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিতেও দারুণ ভালোবাসেন ডিলান। একবার তাঁর বক্তব্য শেষে সামনে উপস্থিত দর্শকরা হুইলচেয়ারসহ তুলে নিয়ে অভিবাদন জানিয়েছিল। এরপর থেকেই এই ‘ট্রেডমার্ক’ উদযাপন বহুবার হয়েছে, “প্রথমে তো একটু ভয় পেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো পড়েই যাবো! তবে সত্যি বলতে এখন এটা না করলেই আমার মনে হয় আজ কী যেন করিনি। ভক্তদের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ। তারাও আমার সাথে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেন।”

     

    হাজারো মানুষকে স্বপ্নের কথা বলা ডিলানের স্বপ্নটা সত্যি হয়েছিল ২০১৫ সালের ইউএস ওপেনে। এই বছরের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা ডিলান বছরের পরের টুর্নামেন্টগুলোতেও ভালো করতে চান। একটা স্বপ্ন তো পূরণ হয়েছে, পঙ্গুদের জন্য একটা ট্রেনিং সেন্টার খোলার ইচ্ছেটা এখনো অধরাই রয়ে গিয়েছে। টেনিস খেলে যা পান, সেটা দিয়ে নিজে চলার পর এসব করাটা খুব কষ্টকর ব্যাপার বলেই মানছেন, “আগে তো আমাদের নামমাত্র প্রাইজমানি দেওয়া হতো। এখন কিছুটা হলেও বেড়েছে। আশা করি ভবিষ্যতে এই পরিমাণটা আরও বাড়বে, সেটা জমিয়ে নিজের স্বপ্নটা পূরণ করতে পারবো।”

     

    অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা হাতে

     

    শৈশবে সঙ্গীদের দৌড়ে বেড়াতে দেখে কষ্ট পেতেন। ‘ঈশ্বর কেন এরকম অভিশাপের জীবন দিলেন’, এরকম চিন্তাও হয়তো মনের মাঝে এসেছে বহুবার। কিন্তু আজ ডিলানের জীবনে কোনো আফসোস নেই। হাজারো 'সক্ষম' মানুষ তাঁর কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনের লক্ষ্য অর্থ খুঁজে পায়। স্বপ্নপূরণ করতে শারীরিক সক্ষমতা নয়, প্রচণ্ড ইচ্ছেটাই আসল; ডিলান অ্যালকট সেটা আবারো প্রমাণ করেছেন।
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন