• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    আমাদের ক্ষমা করুন, রানিয়েরি

    প্রিয় ক্লদিও রানিয়েরি, 


    ঠিক এই মুহূর্তে আপনি কী করছেন? সকালের কফিটা আপনার কি এর আগে কখনো এতোটা বিস্বাদ ঠেকেছে? লেস্টার শহরটা আপনার কাছে হয়তো নিজের বাড়ির মতোই হয়ে উঠেছিল। সেই লেস্টারের বাতাসই আপনার কাছে কি এখন বিষবাষ্পের মতো মনে হচ্ছে? হওয়ারই কথা। মাত্র ২৯৭ দিন আগে যেখানে আপনার মাথায় তুলে দেওয়া হয়েছিল রাজার মুকুট, সেখান থেকেই আপনাকে এখন চলে যেতে হচ্ছে দীনহীন কাঙালের মতো। মাত্র কদিন আগেই ফিফার বর্ষসেরা কোচের পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেটা আপনার কাছে মনে হতে পারে প্রহসনের মতো। এতটা বঞ্চনা, এতটা অপমান কি আপনার প্রাপ্য ছিল? 


    অনেকেই হয়তো বলবে, এটা আপনার নিয়তিতেই লেখা ছিল। ক্যারিয়ারে কখনোই তো কোনো ক্লাবে খুব বেশিদিন থিতু হতে পারেননি। ফিওরেন্টিনা আর চেলসিতেই চার বছর ছিলেন, সেটাই আপনার কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হওয়ার কথা। কোচ দুই রকম- একদল বরখাস্ত হয়েছেন, আরেকদল বরখাস্ত হতে যাচ্ছেন, কথাটা আপনিই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। ছাঁটাইয়ের চিঠি পাওয়াটাও তো আপনার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার তো সেরকম কিছু হওয়ার কথা ছিল না। লেস্টারের হয়ে যা করেছিলেন, সেটা তো ফুটবল পুরাণেরই অংশ হয়ে গেছে। মৌসুম শুরুর আগে যে ক্লাবের বাজির দর ছিল ৫০০০-১, তারাই শেষ পর্যন্ত লিগ শিরোপা জিতেছে! সেখানে আপনার অবদান কতটুকু, সেটা না বললেও চলে। কিন্তু এক বছর পার হওয়ার আগেই সেই ক্লাবটা আপনার কাছে এমন পর হয়ে গেল? চলে যাওয়ার অনুভূতিটা আপনার কাছে অচেনা নয়, আগে বহুবার সেটি টের পেয়েছিলেন। কিন্তু এবার কি আগে থেকে সেরকম কিছু ঠাহর করতে পেরেছিলেন? নাকি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই আপনার কাছে ঘোষণাটা এসেছে? 


    বিদায়টা আপনার প্রাপ্য- এমন একটা শোরগোলও উঠছে বেশ। ক্লাবের ড্রেসিংরুমে আপনি নিজের নিয়ন্ত্রণটা হারিয়ে ফেলেছিলেন, আপনার ওপর খেলোয়াড়দের আস্থার দেয়ালে ফাটল ধরেছে-এমন গুঞ্জনও শোনা গেছে। এই মুহূর্তে লেস্টার আছে ১৭ নম্বরে, প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের প্রথম বিভাগে নেমে যাওয়ার অশনী সংকেতও দেখছিলেন ক্লাবের কর্তারা। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক আগেই তো লেস্টারের ক্লাব কর্তৃপক্ষ বলেছিল, আপনার ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা আছে। কিন্তু এত দ্রুত সেই আস্থার প্রাচীর চুরমার হয়ে যাবে, সেটার কি আঁচ পেয়েছিলেন? আধুনিক যুগে লিভারপুলের ইস্তাম্বুল মহাকাব্য বলুন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মিউনিখ জয় বা ক'দিন আগেই সুপারবোলের সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচ-লেস্টার সিটির অর্জনের কাছে এসব তো কিছুই নয়। আপনি নিশ্চয় এখন জানতে পেরেছেন, এই অর্জনের কোনো মূল্য নেই। 


    সত্যি করে বলুন তো, এক বছর আগে রূপকথার সেই শিরোপা জয়ের পর আপনি কি প্রাপ্য সম্মান পেয়েছিলেন? ক্লাবের থাইল্যান্ডের মালিকরা তো নিজেদের জাহির করতেই ব্যস্ত ছিলেন, খেলোয়াড়েরাও আপনার কথা কেউ সেভাবে বলেনি। আপনি হয়তো এসব নিয়ে নিস্পৃহ ছিলেন, নিজের কাজটা নিভৃতে করে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন একরকম নীরবেই চলে যেতে হচ্ছে আপনাকে। যে লেস্টার আপনাকে নাগরিকত্ব দিতে চেয়েছিল, তাদের কাছ থেকে এমন বিদায়ী অভ্যর্থনা কি আশা করেছিলেন?


    অথচ যে লেস্টারকে নিয়ে একটা সময় ক্লাবের মালিকরাই আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন, তাদের নিয়েই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। আপনার হয়তো স্থির বিশ্বাস ছিল, এবারও আর যাই হোক, প্রিমিয়ার লিগ থেকে নামবে না। চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ার্টার ফাইনালের আশাও তো এখনো টিকে আছে। আরেকটু সময় কি আপনার প্রাপ্য ছিল না? এই নবীন শতাব্দীতে নক্ষত্রের নিচে আপনি যে গভীরভাবে অচল একজন মানুষ, এই সত্যই কি এখন জানতে পেরেছেন?


    আপনি হয়তো মুচকি হেসে বলবেন, ফুটবলটাই তো এখন এমন। মানচিনি, মরিনহো, আনচেলত্তিদেরও তো শিরোপা জেতার পরেও ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। এখানে এখন পেট্রোডলারের ঝনঝনানি, বেনিয়াদের বেসাতি। খেলাটা এখানে গৌণ, এখানে এখন বাণিজ্যে বসত লক্ষ্মী। আনুগত্য শব্দটা এখানে এখন সোনার পাথরবাটি, গিগস-টট্টিদের মতো ফুটবলাররা এখন "বিপন্ন প্রজাতি"। ভবিষ্যতের বিনিয়োগ এখানে অবান্তর, নগদ সাফল্যই এখানে নিয়ন্তা। সমর্থকদের জন্য এখন ক্লাব নয়, ক্লাবের জন্য সমর্থক। লিপজিগের মতো অর্থসর্বস্ব দল এখন তাই জার্মানির সবচেয়ে ঘৃণিত ক্লাব। চেলসি, ম্যান সিটি, পিএসজিরা তো বটেই, রিয়াল, বার্সা, ইউনাইটেডের মতো ক্লাবও টাকা খরচ করছে দেদার। কিন্তু লেস্টারের তো অমন হওয়ার কথা ছিল না?  বড় ক্লাবে না হয় টাকাই শেষ কথা, কিন্তু লেস্টারেও সেই গল্পের পুনরাবৃত্তি কি আপনি ভাবতে পেরেছিলেন? 


    কিন্তু এটাই এখন নির্মম সত্যি। আমরা, তুচ্ছ সমর্থকেরাও বুঝতে পারছি, ফুটবল আর নেই সে ফুটবল। আপনার বিদায় সেটাই আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছে চোখে আঙুল দিয়ে। যে লেস্টার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছিল, সেই গল্পটা এখন শুধুই অলীক কোনো গল্প। আপনার এই অন্যায্য বিদায়ে তাই আপনার কাছে আমরা শুধু ক্ষমাই চাইতে পারি। ক্লদিও রানিয়েরি, আপনার কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। 


    ইতি
    একজন ভগ্নহৃদয় ফুটবলভক্ত

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন