• বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা
  • " />

     

    যে বিদায়ে অশ্রু নেই

    যেন তড়িঘড়ি করেই শেষ হয়ে গেল সবকিছু। সাইফ উদ্দিনের বলে ক্যাচটা তুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরা খুঁজে নিল তাঁকে। মেহেদী হাসান মিরাজ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। বাকিরাও তখন এগিয়ে এসেছেন তাঁর পাশে। তিনি তখন অবিচলিত, নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত মুখে যেন আবেগটা ঠেলে রেখেছেন দূরে। সামনে থেকেই সবাইকে নিয়ে মাঠ ছাড়লেন। মাশরাফি বিন মুর্তজা হয়তো চাননি, সতীর্থদের কারও আবেগের আতিশায্যে তাঁর পাথুরে গাম্ভীর্য ভেদ করে আবেগের চোরাস্রোত ঢুকে পড়ুক। টি-টোয়েন্টি থেকে বিদায়টা যে অভিমান থেকে নিলেন, সেজন্যই কি তাঁর অমন ঋষিসুলভ নিরাসক্তি?

     
    অথচ চিত্রনাট্যটা অন্যরকম লেখা হতেই পারত। দল হারলে মাশরাফি এমন বীরের বেশে মাথা উঁচু করে মাঠ নাও ছাড়তে পারতেন। তাঁর নিজের বেলায়ও ভাগ্য এমন নির্মম ভ্রুকুটি তুলে রাখবে, সেটাও কি ভেবেছিলেন? ক্রিজে নামার সময় বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে পাহাড় গড়ার সামনে, মাশরাফির সামনে মঞ্চ প্রস্তুত কুড়ি-কুড়ির ম্যাচে শেষবারের মতো ঝড় ওঠানোর। কিন্তু লাসিথ মালিঙ্গার স্লোয়ারটা বুঝতে না পেরে প্রথম বলেই হয়ে গেলেন বোল্ড! কী নির্মম পরিহাস, পরের বলে মিরাজের আউটে মালিঙ্গার হ্যাটট্রিকে ব্র্যাকেটবন্দিই হয়ে গেলেন! ১০ বছর আগে ব্রেট লির টি-টোয়েন্টি হ্যাটট্রিকের একজন শিকার ছিলেন, এই বিদায়বেলায় মালিঙ্গা এভাবে আবারও না চাওয়ার এক ইতিহাসে নাম লেখাবে, কেউ জানত? 


    কিন্তু সেটা তো ছিল কেবল শুরু। বোলিংয়ে প্রথম ওভারটা হলো একটু এলোমেলো, তাহলে কি আবেগের স্নায়ুচাপ কি তাঁকে পেয়ে বসেছে? সেই প্রশ্নটা আরও উচ্চকিত এক ওভার পর। মিরাজের বলে থারাঙ্গার সহজ একটা ক্যাচ ফেলে দিলেন। মাশরাফির জন্য কি শেষের সময়টা এমন ভুলে যাওয়ার মতো হবে? 


    সেখানেই শেষ নয়। ১৪তম ওভারে আবার বোলিংয়ে এলেন, তখনো কোনো উইকেট পাননি। চতুর্থ বলে রান নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হলো কাপুগেদারা-প্রসন্নের। সৌম্যর থ্রোটা ধরে স্টাম্পে লাগানোর জন্য যথেষ্ট সময় ছিল মাশরাফির। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন বল ছাড়াই স্টাম্প ভেঙ্গে দিলেন। বাংলাদেশের জয় তখন দৃষ্টিসীমায়, কিন্তু মাশরাফির শেষটা যে একদমই ভুলে যাওয়ার মতো হচ্ছে। 


    কিন্তু চিত্রনাট্যে তখনও বাকি ছিল অনেক কিছুর। শেষ ওভারে প্রথম চার বলে উইকেট পেলেন না, পঞ্চম বলটা উড়িয়ে মারতে গেলেন প্রসন্ন। লাইন মিস করলেন, ছত্রখান হয়ে গেল স্টাম্প। মাশরাফি তখনও প্রায় নিরাবেগ, পাথুরে মুখে কোনো আবেগের ছায়া খুঁজে পাওয়া মুশকিল। শেষের বিষাদগীতি কি তাঁকে একদমই ছুঁয়ে যাচ্ছে না? 


    আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে একটু যেন গলাটা ধরে এসেছিল। কিন্তু শেষের দিন মাশরাফি যেন আরও বেশি ভাবলেশহীন। ' শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা আমি জিতেছিলাম, এটা আমার জন্য অনেক গর্বের একটা ব্যাপার'- কথাটা বলে গেলেন গড়গড় করে। এতদূর আসার জন্য সমর্থক, সাংবাদিকদের ধন্যবাদ দিলেন খুব গুছিয়ে। যেন ঠিক করে এসেছিলেন কী বলবেন। ওয়ানডেতে আরও ভালো করার জন্য দোয়া চাইলেন- সেখানেও মাশরাফির কন্ঠে কোনো আবেগের কম্পন টের পাওয়া গেল না? তাহলে কি অভিমান এতোটাই প্রবল, জোর করেই রঙ্গমঞ্চের অভিনেতার মতো সরিয়ে রেখেছেন সবকিছু? এই টি-টোয়েন্টিতে দল যেভাবে তাঁর জন্য উজাড় করে ফিল্ডিং করেছে, মিরাজ- সৌম্য-সাব্বির-মোসাদ্দেক-সাইফরা তাঁকে জয় এনে দিতে কতটা মরিয়া ছিলেন- সেটা কি মাশরাফিকে এতটুকু ছুঁয়ে যায়নি?  


    কে জানে, মাশরাফি হয়তো অন্য একদিনের জন্য জমিয়ে রেখেছেন সবকিছু। এখনো ওয়ানডেতে অনেক কিছু দেওয়ার আছে তাঁর, জবাব দিতে হবে আরও অনেক প্রশ্নের। মাশরাফি জানেন, আবেগ দূরে রেখে এখনো ২২ গজে যেতে হবে অনেক দূর। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন