• " />

     

    'ট্রুম্যান শো' এবং উইকেটের এভারেস্ট-জয়ীদের গল্প

    নিল হক ক কলিন কাউড্রে ব ফ্রেড ট্রুম্যান

    টেস্ট ক্রিকেটের বহতা নদীতে নতুন একটা বদ্বীপ এঁকে দিল যেন এই উইকেট। একটা সময় মাইলফলকটা ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরের অনেক কিছু। ১৮৭৭ সালে টেস্ট ক্রিকেট শুরুর পর সেই চূড়ায় উঠতে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ৮৭ বছর। অবশেষে ফ্রেড ট্রুম্যান ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে উঠলেন সেখানে, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম কারও নামের পাশে লেখা হলো ৩০০ উইকেট। সেই পথ ধরে এরপর উঠেছেন আরও অনেকে, প্রথমের জায়গাটা তো ট্রুম্যানের কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না!

    অদ্ভুতই বলতে হবে, ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে আজকের এই দিনের সেই টেস্টটা ট্রুম্যান নাও খেলতে পারতেন। ম্যানচেস্টারে আগের টেস্টেও বসে থাকতে হয়েছিল ট্রুম্যানকে, অভিজ্ঞতার অভাব খুব করেই তখন টের পেয়েছিল ইংল্যান্ড। সিরিজে তখন ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে স্বাগতিকেরা, ওভাল টেস্টে তাই আবার ডাক পড়ল ৩৩ বছর বয়সী এই ‘বুড়ো’ পেসারের। এর আগে বেশ কয়েকবারই ইংল্যান্ড দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছ। কখনো ফর্মখরায়, আবার কখনো নির্বাচকদের রোষানলের শিকার হয়ে। ফিরে এসে বেশ কয়েকবারই মাঠেই জবাবটা দিয়েছেন। তবে এই টেস্টটা ছিল জবাব দেওয়ার চাইতে আরও বেশি কিছু।

    ওভাল টেস্ট যখন শুরু হয়, ট্রুম্যানের উইকেট তখন ২৯৭। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষেও মনে হচ্ছিল, এই টেস্টে সেটি এই ইংলিশ পেসারের অধরা থেকে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ছয় উইকেটেও ট্রুম্যান উদযাপনের সুযোগ পাননি। অবশেষে সেটি পেলেন তৃতীয় দিন লাঞ্চের ঠিক আগে। প্রথমে রেডপ্যাথের স্টাম্প উড়িয়ে দিলেন, পরের বলেই নতুন ব্যাটসম্যান ম্যাকেঞ্জিকে স্লিপে ক্যাচ বানালেন কাউড্রের। ট্রুম্যানের সামনে তখন হ্যাটট্রিক করে ৩০০ উইকেট ছোঁয়ার সুযোগ। পারত। ২২ গজে সব সময় তো আর রূপকথা হয় না। ট্রুম্যানকে তাই অপেক্ষা করতে হলো আরেকটু।

    লাঞ্চের পর ভিভারস ও হক মিলে ২৪ রান যোগ করে ফেলেছিলেন। এরপরেই আসে সেই মুহূর্ত। পুরনো অস্ত্র অফকাটারেই কাজ হলো, উইকেটের পেছনে খোঁচা দিয়ে হক ক্যাচ দিলেন কাউড্রেকেই। ট্রুম্যান তো আগে থেকেই জানতেন, এমন কিছু হবে। ক্রিকেট পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের অনেক কিছুই ছিল তাঁর নখদর্পণে। জানত ওভালও, ইতিহাস হতেই তাই শুরু হলো হাততালির সশব্দ কোরাস। ক্রিজে ফেরার সময় এমন অভিবাদন বোধ হয় হকও আগে কখনো পাননি!

    ম্যাচ শেষে ট্রুম্যানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আর কেউ ৩০০ উইকেট কখনো নিতে পারবে? ট্রুম্যান স্বভাবসুলভ চাছাছোলা ভাষায় বলেছিলেন, ‘যে-ই নিক, সে ক্লান্তির একেবারে শেষ সীমায় চলে যাবে।’

    ট্রুম্যানের এই কথায় অবশ্য মিশে আছে একটু আক্ষেপ আর অনুযোগও। এই ৩০০ উইকেটের কীর্তি তো তাঁর আগেই হয়ে যাওয়ার কথা। অভিষেক হয়েছিল আরও ১২ বছর আগে, শুরুতেই হেডিংলিতে ৮ উইকেট নিয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ভারতকে। অমন একটা অভিষেকের পরও ট্রুম্যান থিতু হতে পারেননি, অধিনায়কের আস্থাও তাঁর ওপর থাকেনি সবসময়। সেজন্য নিজের একগুঁয়ে মনোভাবটাও অবশ্য কম দায়ী নয়। গতিটা মূল অস্ত্র তাঁর কখনোই ছিল না, সুইং আর নিয়ন্ত্রণের ওপর ভরসা করতেন বেশি। ইংল্যান্ডের বাইরে তাই একটা সময় ট্রুম্যানকে বাদ দিয়ে ভরসা রাখা হয়েছিল তুলনামূলক বেশি গতির ফ্রাঙ্ক টাইসনকে। শুরুতে সৌরভ ছড়িয়েও ট্রুম্যান বেশিদিন মদির করে রাখতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত আবার যখন ফিরলেন, ইংলিশ ক্রিকেটের জন্য সেটা ছিল সঞ্জীবনী সুধার মতো। বেনোর অস্ট্রেলিয়া ও ওরেলের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইংল্যান্ডকে কয়েকটা ম্যাচ বলতে গেলে প্রায় একাই জিতিয়েছেন।

    তবে সবার আগে ৩০০ উইকেট বলেছেন শুধুই নয়, সর্বকালের সেরা বোলারদের তালিকায় অনেকে ট্রুম্যানকে রাখেন অন্য কারণেই। পরিসংখ্যানও তো কথা বলে তাঁর হয়েই। অন্তত ৩০০ উইকেট নিয়েছেন, এমন বোলারদের মধ্যে ট্রুম্যানের চেয়ে ভালো স্ট্রাইক রেট আছে শুধু অ্যালান ডোনাল্ড, ম্যালকম মার্শাল, ওয়াকার ইউনিস ও ডেল স্টেইনের। আর গড়ের হিসেব করলে তাঁর চেয়ে এগিয়ে থাকবেন শুধু কার্টলি অ্যামব্রোস ও মার্শাল। ৬৫ টেস্টেই ট্রুম্যান পেরিয়ে গিয়েছিলেন সেই মাইলফলক, তাঁর চেয়ে কম টেস্ট খেলে ৩০০ উইকেট পেয়েছেন্ শুধু আটজন। মাঝে ওই সময়টা হারিয়ে না গেলে কে জানে হয়তো ৪০০ উইকেটের কাছাকাছিও চলে যেতেন। বল করতে তো তাঁর কখনোই ক্লান্তি ছিল না। টেস্ট বাদ দিলে শুধু ইয়র্কশায়ারের হয়েই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রায় এক লাখ বল করেছেন। কোনো কোনো মৌসুমে প্রায় এক হাজার ওভার করেছেন বিরামহীন, একজন ফাস্ট বোলারের জন্য প্রায় অবিশ্বাস্য একটা কীর্তি। খনি শ্রমিকের পরিবারে জন্ম, ছোটবেলায় কাজ করেছেন বাবার সঙ্গে কয়লাখনিতেও। পা জোড়া শুরু থেকেই তাই ক্লান্তিহীন চাপ নেওয়ার জন্য তৈরি ছিল, সারাজীবন তো সে দুটোর ওপর দিয়ে কম ঝড় যায়নি।

                                         ট্রুম্যানের সেই কপিবুক অ্যাকশন

     

    ট্রুম্যান অবশ্য একটুর জন্য দেখে যেতে পারেননি, টেস্ট ইতিহাসে একদিন ৭০০ উইকেটের এভারেস্টেও উঠেছেন দুজন। শেন ওয়ার্ন যখন ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সেই চূড়ায় উঠলেন, তার ১০ মাস আগেই অন্যলোকে পাড়ি জমিয়েছেন ট্রুম্যান। ৬০০ উইকেটের সিড়িটা অবশ্য ওয়ার্নকে ভাঙতে দেখেছেন, ২০০৫ সালে ওই কীর্তির কয়েক মাস পরেই ট্রুম্যান চিরতরে চলে গেছেন।  

    তবে ট্রুম্যানের পর ৩০০ উইকেটের চূড়ায় উঠতে পরেরজন সময় নিয়েছেন প্রায় ১১ বছর। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ল্যান্স গিবস আবার প্রথম স্পিনার হিসেবে সেখানে উঠেছিলেন। সত্তরের দশকে আর কেউ সেখানে উঠতে পারেননি। আশির দশকে ডেনিস লিলি মাত্র ৫৬ টেস্টেই কীর্তিটা করে ফেলেছিলেন, এরপর সেটি হয়ে গেছে আধুনিক যুগে এভারেস্টে ওঠার মতোই সহজ।

    তবে ৪০০ উইকেটের মাইলফলকটা ভাঙতে অপেক্ষা করতে হয়েছে নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউজিল্যান্ড গ্রেট রিচার্ড হ্যাডলি সেখানে প্রথম পতাকাটা পুঁতে দেন, দুই বছর পরেই অবশ্য সেখানে যোগ দেন কপিল দেব। পরে তো সবশুদ্ধ যোগ দিয়েছেন আরও ১১ জন, সর্বশেষ প্রতিনিধি ডেল স্টেইন।

    তবে চূড়াটা যখন ৫০০ উইকেট, তখন সবার আগে উঠেছেন ওয়ালশ। ৪০০ উইকেট নেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে ইতিহাসটা গড়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি। খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, বছর কয়েকের মধ্যেই পেয়ে গেছেন ওয়ার্ন, কুম্বলে, মুরালিধরন ও ম্যাকগ্রাকে।

                              প্রথম ২০০ উইকেট নিয়েছিলেন ক্ল্যারি গ্রিমেট

     

    অথচ একটা সময় ২০০ উইকেটের হাতছানিও কতটা অস্পর্শনীয় ছিল! টেস্ট ইতিহাসে সেখানে প্রথম উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ান স্পিনার ক্ল্যারি গ্রিমেট। ১৯৩৬ সালে গ্রিমেট প্রথম যখন সেখানে উঠেছেন, নামের পাশে তাঁর ৩৬ টেস্ট। সেটার প্রায় ৮১ বছর পর একটুর জন্য সেই কীর্তিটা ভাঙতে পারেননি রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ২০০ উইকেট পেতে ভারতের স্পিনারকে খেলতে হয়েছে এক টেস্ট বেশি!

    তবে ১০০ উইকেটের মাইলফলকটা টেস্ট ক্রিকেট দেখেছে বিংশ শতক শুরুর আগেই। অস্ট্রেলিয়ার চার্লি ‘টেরর’ টার্নার ১৮৯৫ সালে যখন প্রথম তিন অঙ্কের উইকেট পেয়েছেন,তখন খেলেছেন ১৭ টেস্ট। বছরখানেক পরেই সেখানে বসেছেন ইংল্যান্ডের জর্জ লোম্যান, টার্নারের চেয়েও খেলেছেন একটি কম। লোম্যানের সেই ১৬ টেস্টে ১০০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি অমর হয়ে আছে এখনো, ১৭ টেস্টে ১০০ উইকেট নিয়ে আধুনিক সময়ে তাঁর কাছাকাছি শুধু যেতে পেরেছেন পাকিস্তানের ইয়াসির শাহ।

    টার্নার, গ্রিমেট, ট্রুম্যান, হ্যাডলি, ওয়ালশ, ওয়ার্ন, মুরালিধরনের কীর্তি একটা সময় হয়তো কেউ পেরিয়ে যাবেন। তবে একটা দিক দিয়ে তাঁদের অধিষ্ঠান কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ২২ গজের স্মরণীয় অনেক প্রথমের প্রথম সাক্ষী তো তাঁরাই।  

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন