• ক্রিকেট

'অতিমানব' স্মিথের সব জয়ের দিন

পোস্টটি ১২৪৩২ বার পঠিত হয়েছে

‘অমানুষ!’ 

মানুষের সামর্থ্যকে কেউ যখন বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যান অনবরত, এটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। যে শব্দে মিশে থাকে অশেষ প্রশংসা, অপার বিস্ময়। যে শব্দ আদতে বোঝায় 'অতিমানব'।

স্টিভ স্মিথ গ্যাবায় অতিমানব হয়ে উঠলেন। খেললেন অতিপ্রাকৃত এক ইনিংস। 

সতীর্থদের ব্যর্থতার চাপ। জো রুটের অসাধারণ অধিনায়কত্ব। ইংলিশ বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিং। দারুণ ফিল্ডিং। অধিনায়ক হিসেবে অ্যাশেজের প্রথম টেস্টেই পিছিয়ে পড়ার চাপ। এবং সব কিছুর পর নিজের সঙ্গে লড়াই। স্মিথ জিতলেন সবকিছুতেই। 

 

 


দ্বিতীয় নতুন বল পেতে তখনও কয়েক ওভার বাকি। জো রুট তার ফিল্ডারদের নিয়ে আরেকবার খেললেন। লেগসাইডে তিনজন- লং লেগ, ডিপ স্কয়ার লেগ, ডিপ মিডউইকেট। শর্টেও তিনজন। স্কয়ার লেগ, শর্ট মিডউইকেট, মিড-অন। অফসাইডে তিনজনের একজনও ইন ফ্রন্ট অব স্কয়ারে নেই। মানেটা পরিষ্কার, ধেয়ে আসছে শর্ট বল। বোলার জেক বল। একটা, দুইটা শর্ট বল। জোড়ায় জোড়ায় শর্ট বল। 

রুট ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন স্মিথের। পুল করতে যাবেন স্মিথ। কতক্ষণ থাকবেন পুল না করে? 

ওপাশ থেকে ক্রিস ওকসকে দিয়েও করিয়ে নিচ্ছেন সেটাই। 

মার্ক নিকোলাস ধারাভাষ্যে। তার কাছে মনে হলো, রুটের ব্যাপারটা ‘আধুনিক বডিলাইন’। সে যুগের বডিলাইনে ডগলাস জারডাইনের দল জিতেছিল। হ্যারল্ড লারউড কাবু করেছিলেন ডন ব্র্যাডম্যানদের। সে বডিলাইন নিয়ে ছিল বিতর্ক। 

ধেয়ে আসা শর্ট বলে স্মিথ পুল করবেন না, এটা তখন নিশ্চিত হয়ে গেছে প্রায়। আর দশটা সাধারণ মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ থাকতে পারে। স্মিথের নেই। এদিন ছিল না। থাকলেও সেটা অসীমে, তার নাগাল রুট-ওকস-বলরা পাননি। 

স্মিথ এবার আপার কাটের দিকে মনোযোগ দিলেন। লেগস্টাম্পের বাইরে গিয়ে চেষ্টা করলেন। রুট কম যান না। তিনি এবার দিলেন ফ্লাই স্লিপ। আপার কাটের দরজাও বন্ধ। স্মিথ অন্যদিকে খুঁজছেন গ্যাপ।


স্মিথ তখন ডাক করছেন। আলতো হাতে যেসব ডেলিভারিতে পারছেন, নামিয়ে আনছেন মাটিতে। ওভারে ‘বাউন্সার’ এর সীমা দুইটি। বল এক ওভারে দুইটা করে ফেললেন। স্কয়ার লেগ আম্পায়ারের কাছ থেকে নিশ্চিত হলেন স্মিথ। পরের বলটাও এমন হলে নো হবে তো? 

বল পরের বলটাও শর্ট করলেন, তবে ‘নো’ হওয়ার মতো করে নয়। স্মিথ জানতেন, তার ভয় নেই। ভয় দেখানোর জন্য রুট করলেন আরেকটা কাজ। সিলি পয়েন্টকে আনলেন খুব কাছে। খুব খুব কাছে। যে ফিল্ডারকে বলা যায়, ‘সিলি সিলি পয়েন্ট’। অথবা, ‘ভেরি ভেরি সিলি সিলি পয়েন্ট’। 

স্মিথ ভয় পেলেন না। উলটো ভয় পেলেন বলই। বলের অ্যাঙ্গেলটা বেশি হয়ে গেল। কোমরের একটু ওপরের বলটা স্মিথ ঘুরিয়ে দিলেন। স্মিথের টাইমিং নিয়ে সংশয় থাকার কথা নয়। রুটের নেই, বলেরও নেই। বলটা কই গেল, সেটা নিয়েও তাই সংশয় নেই। 

 

যখন নেমেছিলেন, তখন ৩০ রানে নেই ২ উইকেট। ৫৯ রানে ৩ উইকেট গেল, ৭৬ রানে হয়ে গেল ৪ উইকেট। শন মার্শ এলেন। মার্শের দলে থাকা নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। স্মিথকেও সামলাতে হয়েছে সে বিতর্কের ঝাঁঝ। মার্শকে নিয়ে স্মিথ দিনটা কাটিয়ে দিলেন। 

সেই মার্শ পরদিন ধোঁকা খেলেন স্টুয়ার্ট ব্রডের কৌশলে। স্মিথ আরেকবার একা হয়ে গেলেন। সঙ্গী টিম পেইন। দুইজনের অভিষেকে একই টেস্টে। পেইন নেমেছিলেন সাত নম্বরে। স্মিথ আট নম্বরে। স্মিথ তখন লেগস্পিনার ছিলেন। 

স্মিথের আজ ২১তম সেঞ্চুরি হয়ে গেল। ক্যারিয়ারের এ সময়ে, মানে ৫৭ টেস্টের পর আর কারও এতো বেশি রান নেই, যা আছে স্মিথের। আর কারও গড় এত না। অবশ্যই এ তালিকায় স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে বাদ দিতে হবে। তিনি খেলেছিলেনই ৫২টি টেস্ট। আর এসব পরিসংখ্যান-টরিসংখ্যানে তাকে বাদ দেওয়াই ভাল। 


নতুন বল এলো। প্রথম ওভারেই অ্যান্ডারসনের জাত চেনানো অ্যান্ডারসনীয় বলে ক্যাচ দিলেন পেইন। স্মিথ তখনও আশিতে পৌঁছাননি। সেঞ্চুরি করতে তার লেগেছে ২৬১ বল। এতো বল কখনও লাগেনি এর আগে।  ক্রিজে তখন হঠাৎ ব্যাটসম্যান বনে যাওয়া প্যাট কামিন্স। স্মিথ ব্রডকে চার মারছেন, কাভার ড্রাইভে। যে কাভার ড্রাইভকে ঠিক কাভার ড্রাইভ বলে মনে হয় না, হাত-পা-ব্যাট যেসব জায়গায় থাকে, সেসব সেখানে রেখে এমনভাবে মারতে পারেন তো শুধু স্মিথই! তার সেঞ্চুরি হচ্ছে, আর এদিকে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করছেন কামিন্স। 

প্রথমে উল্লাসে শুধু উচ্ছ্বাসই মিশে থাকলো স্মিথের। একটু পর শার্টের ব্যাজের ওপর হাত এনে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কাম’অন’! দৃষ্টি তখন ড্রেসিংরুমের দিকে। ওখান থেকে কেউ যদি সামনের টেস্টগুলোর জন্য প্রেরণা নিতে চান, তাহলে এর চেয়ে বড় উদাহরণ পাবেন না। 

স্টার্ক ছয় মেরে ক্যাচ দিলেন। এবার ওদিকে বিরক্ত হলেন স্মিথ। হতাশ হলেন। হয়তো আরও কিছুক্ষণ খেলতে চেয়েছিলেন। গ্যাবায় অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ‘অজেয়’ ইতিহাসে প্রথম ইনিংসে লিডটা গুরুত্বপূর্ণ। সে লিডটা স্মিথ আনলেন চার মেরে, ওপাশে লায়ন। তার ওপর ভরসার প্রতিদানটা লায়ন বেশিক্ষণ দিতে পারলেন না। স্মিথ ক্রিজে থাকলেন ৫১২ মিনিট। এর চেয়ে ১ মিনিট বেশি ছিলেন কিংসটনে। সেবার করেছিলেন ১৯৯। ৫১২ মিনিট ছিলেন রাঁচিতে। সেবার করেছিলেন অপরাজিত ১৭৮। 


স্মিথের এ ইনিংস অ্যাশেজের গতিপথ পালটে দিয়েছে। সে গতিপথকে আবার পাল্টাতে রুটের মতো কাউকে করতে হবে আরও দারুণ কিছু। তবে আপাতত সব ভুলে ‘অতিমানব’ স্মিথের প্রশংসার সময়। 

দিনের শেষ বল খেলে উঠে যাওয়ার সময় জো রুট যেটা করলেন। স্লিপে দাঁড়ানো স্মিথকে কিছু একটা বললেন। স্মিথের জবাবের ‘লিপ-রিডিং’ করলে এটাই দাঁড়ায়, ‘থ্যাঙ্কস মেট’।