• ক্রিকেট

ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ হারের (প্রধান) কারণগুলো...

পোস্টটি ১৬০৯২ বার পঠিত হয়েছে

কুক-রুটের হাহাকার 

অ্যালেস্টার কুকের অভিষেকের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইংল্যান্ড অ্যাশেজ জিতেছে একবার। গত ৩০ বছরেও জিতেছে ওই একবারই। সে সিরিজে কুকের গড় ছিল ১২৭.৬৬। এবার ক্যারিয়ারের ৭ম অ্যাশেজ খেলছেন সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক। ২০০৬-০৭ এ ইংল্যান্ড হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল, কুকের গড় ছিল ২৭.৬০। ২০১৩-১৪ সিরিজেও ফল ০-৫, কুকের গড় ২৪.৬০। অস্ট্রেলিয়ায় ইংল্যান্ডের ভাল ফলের তাই অন্যতম শর্ত- কুকের গ্রে নিকোলসকে হাসতে হবে। সেই কুক এখন পর্যন্ত ৬ ইনিংসে করেছেন ৮৩ রান, গড় ১৩.৮৬। 

কুকের মতো সঙ্গীণ অবস্থা নয় হয়তো রুটের, তবে তার অক্সিজেন সরবরাহও যে অপ্রতুল নয়, সেটা তো বলা যাচ্ছে না! দুইবার এলবিডাব্লিউ, দুইবার স্লিপে ক্যাচ, দুইবার উইকেটকিপারকে ক্যাচ। দুইটা ফিফটি। আর টসে জিতে অ্যাডিলেডে নেওয়া ব্যাটিং। জো রুটের অ্যাশেজ গল্প। অন্যদিকে স্টিভ স্মিথ যখন হয়ে উঠেছেন অতিমানব, রুট তখন ব্যর্থ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে। ঘুরেফিরে লড়াই করার কথা বলেছেন বটে, তবে তার ব্যাটই যে নিশ্চুপ! 


পেস তুমি কই! 

২০১০-১১ অ্যাশেজে অস্ট্রেলিয়ায় সেরা বোলার ছিলেন জেমস অ্যান্ডারসন। এরপরই ছিলেন ক্রিস ট্রেমলেট। অ্যান্ডারসন খেলছেন এবারও, কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজ দক্ষতার যা ঝলক দেখিয়েছেন তিনিই। তবে ট্রেমলেটের মতো কারও পেস মিস করেছে ইংল্যান্ড। ক্রিকভিজের এক ডাটা বলছে, তিন টেস্ট মিলিয়ে ইংল্যান্ডের গড় গতি ঘন্টায় ১৩৫.৩৭ কিলোমিটার। আর অস্ট্রেলিয়ান পেসাররা বল করেছেন গড়ে ঘন্টায় ১৪১.৪৪ কিলোমিটারে। পেসের অভাব তাদের শর্ট বলের ধার কমিয়েছে, তার ওপর ছিল নিয়ন্ত্রণে অধারাবাহিকতাও। গুডলেংথে টানা বল করে যেতে পারেননি ব্রডরা, অথচ কন্ডিশনের দাবি ছিল এমনই। ক্রেইগ ওভারটন ঝলক দেখিয়েছিলেন, তবে যথেষ্ট হয়নি সেটাও। স্টার্কের সুইং, ফুললেংথ, কামিন্সের শর্ট বলে দারুণ নিয়ন্ত্রণ, আর হ্যাজলউডের অসাধারণ লাইন-লেংথের কাছে ইংলিশ বোলিং আক্রমণ হয়ে থেকে নির্বিষই, যারা ‘করে নাকো ফোঁসফাঁস’!

 

 

ঘূর্ণিও নেই...

ন্যাথান লায়ন। মইন আলি। টিম পেইন। ক্রিস গ্যাফানি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার সমন্বয়ে বদলে যায় ম্যাচ, সিরিজ। অ্যাশেজে তেমনই এক ঘটনায় ছিলেন এই চারজন। গ্যাবায় মইন স্টাম্পড হলেন, গ্যাফানির দেওয়া সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠলো ঝড়। সে ঝড় অবশ্য মিলিয়ে গেছে, তবে লায়নঝড় ছাড়েনি মইনকে। সিরিজে এখন পর্যন্ত ছয়বার ব্যাটিং করে ইংলিশ স্পিনের ত্রাতা পাঁচবারই আউট হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান স্পিনের ভরসার বলে। মইন নিজে পেয়েছেন ৩ উইকেট, আর লায়ন নিয়েছেন ১৪টি। এর বেশ কয়েকটিই আবার দারুণ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এনে দেওয়া ব্রেকথ্রু। প্রথম দুই টেস্টে মইনসহ ইংল্যান্ড এক বোলার বেশি নিয়েই খেলেছে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। তবে মইন লায়নের বলে আউট হওয়া ছাড়া বল হাতে করতে পারেননি কিছুই। 
 

লেজের ঝটকা...

ওয়াকা। ব্যাটিং কন্ডিশনে বড় স্কোর উঁকি দিচ্ছেন ইংল্যান্ডকে, সঙ্গে সিরিজে ফিরে আসার ইঙ্গিতও। প্রথম ইনিংসে ৩৫ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে যেন মিলিয়ে গেল সব। শুধু পার্থ নয়, তিন টেস্টেই ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লেজে যেন বাসা বেঁধেছে কোনও ভয়ঙ্কর জীবাণু। ক্রেইগ ওভারটন বা ক্রিস ওকসের দুইটি ইনিংস বাদ দিলে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়েছে ইংলিশ ব্যাটিংয়ের শেষপ্রান্ত।

৮ থেকে ১১ নম্বর পজিশনে তিন টেস্ট মিলিয়ে ছয়জন খেলেছেন ইংল্যান্ডের, ২৪ ইনিংসে তারা করেছেন ২৪৭ রান। এর মধ্যে একটা ইনিংস আবার আছে জনি বেইরস্টোর মতো স্বীকৃত ব্যাটসম্যানরেও। আর ৫ জন অস্ট্রেলিয়ান তাদের চেয়ে ১০ ইনিংস কম খেলেই করেছেন ২১৪ রান। এক প্যাট কামিন্সই খেলেছেন তিনটি ৪০ পেরুনো ইনিংস, অথচ প্রথম শ্রেণিতে তার ফিফটিই মোটে একটি! আর ওদিকে স্টুয়ার্ট ব্রডের টেস্ট সেঞ্চুরি আছে, ক্রিস ওকসের প্রথম শ্রেণিতে সেঞ্চুরি ৯টি! তবে কাজের সময় কাজ করতে পেরেছেন কামিন্সরাই! 


এবং ‘স্টোকস-হোল’

অ্যাশেজ তো আর শুধুই মাঠের ক্রিকেটের ব্যাপার নয় সবসময়। ২০০৫ সালের অ্যাশেজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বলের ওপর পা পিছলে পাওয়া গ্লেন ম্যাকগ্রার চোট। এজবাস্টন মহাকাব্যে জিতেছিল ইংল্যান্ড, জিতেছিল অ্যাশেজ। ম্যাকগ্রা সেই চোটটা না পেলে ঘটনা অন্যরকম হতেই পারতো। কিছুটা একই রকম আক্ষেপ থাকতে পারে ইংলিশদের, বেন স্টোকসকে নিয়ে! ব্রিস্টলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ওয়ানডের পর সেই পানশালার ঘটনাটা যদি না ঘটতো! ২০১৩-১৪ সালের হোয়াইটওয়াশে বলতে গেলে যা লড়াই করেছিলেন স্টোকসই, এবার সেটা করতে পারতেন কিনা, সেটা নিয়ে বিস্তর তর্ক হতেই পারে, এবং অনেক তর্কের পরও ফল নাও আসতে পারে। তবে এই অ্যাশেজ নিয়ে যখন কথা হবে, ইংল্যান্ডের অ্যাশেজ হারা নিয়ে যখন কথা হবে, তখন স্টোকস না থেকেও আসবেন! 

‘প্যারালাল ইউনিভার্স’-এর তত্ত্বটা ইংলিশদের কাছে এখন প্রিয় হয়ে উঠতেই পারে। যেখানে হয়তো আছেন স্টোকস। এই অ্যাশেজে।