bracket bracket
bracket bracket
  • ক্রিকেট

হরিয়ানার হারিকেন

 

ফলোঅন এড়াতে দরকার ২৪ রান, উইকেট বাকি একটি। উপায় দুইটি- নিরাপদে খেলে রানের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করা, বড় শট খেলে রানটা নাগালের মধ্যে আনা দ্রুত। দ্বিতীয়টিতে ঝুঁকি বেশি, ঝুঁকির অংশটা পার করতে পারলে সেটা সহজতরও বটে। 

১৯৯০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কপিল দেব বেছে নিয়েছিলেন দ্বিতীয় রাস্তাটাই। অ্যাডি হ্যামিংসের করা এক ওভারেই চার ছক্কা, যেন নিমিষেই ফলো-অন এড়িয়ে গেল ভারত। যদিও তার দল ম্যাচটি হেরেছিল, তবুও আজও সেই ম্যাচের প্রসঙ্গে সবারে আগে চলে আসে কপিল দেবের সেই চার ছক্কার মারই। সেদিনের সেই অপরাজিত ৭৫ বলে ৭৭ রানের ইনিংসটি তার পুরো ক্যারিয়ারের হাইলাইটসও বটে। সেটা ব্যাট বা বল, যেটা হাতেই হোক- প্রথম বল থেকেই যার মূলমন্ত্র ছিল একটাই- আক্রমণ, আক্রমণ এবং আক্রমণ।

১৯৫৯ সালের ৬ জানুয়ারি হরিয়ানার এক মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম কপিল দেবের। দেশভাগের সময় রাওয়ালপিন্ডি থেকে তার পরিবার ভারতে চলে আসে। পেশায় তার বাবা ছিলেন একজন নির্মাণ ঠিকাদার। এমন একটি পরিবার থেকে ক্রিকেটার হওয়ার পথটি মোটেও মসৃণ ছিলোনা ভারতের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের জন্য। তবে এক্ষেত্রে প্রথম অনুপ্রেরণা পান পরিবারের কাছ থেকেই। খেলাটার প্রতি তার ভীষণ ভালোবাসা দেখে পরিবার তাকে সমর্থন দেন ক্রিকেটের দিকে মনোযোগ দেয়ার জন্য।

 

 

১৯৭৫ সালে পাঞ্জাবের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হরিয়ানার হয়ে অভিষেক কপিল দেবের। অভিষেকেই নিজের জাত চিনিয়ে দেন ৩৯ রানে ৬ উইকেট নিয়ে। ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে ক্রিকেটে প্রথমবার ১০ উইকেট পেলেন সারভিচেসের বিপক্ষে, কপিল আসলেন আলোচনায়। এরপর ডাক পেলেন ইরানি ট্রফিতে, তারপর দুলিপ ট্রফি আর উইলস ট্রফিতেও।

তবে কপিলের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতের হয়ে খেলা। ১৯৭৮ সালে ফয়সালাবাদে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকও হয়ে গেল। সেই সিরিজে বলার মত কিছু করতে না পারলেও ভবিষ্যতের একজন দুর্দান্ত ফাস্ট বোলার এবং অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের আগমনী বার্তার জানানটা ঠিকই দিয়েছিলেন।

মাত্র বিশ বছর বয়সে ১০০০ রান এবং ১০০ উইকেট নিয়ে করেন বিশ্বরেকর্ড। ব্যাট হাতে কাণ্ডারির ভুমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি গতি আর সুইংয়ের দূর্ধষ মিশেলে বল হাতেও ভারতকে একাই জিতিয়েছেন অসংখ্য ম্যাচ। ১৫ বছরের ক্যারিয়ারে প্রায় পুরো সময়টাই ছিলেন স্ট্রাইক বোলার। ক্লান্তিহীনভাবে স্পেলের পর স্পেল বল করে গেছেন আর এনে দিয়েছেন ব্রেক থ্রু। যখনই বিপক্ষের কোন বড় জুটি ভাঙার প্রয়োজন হতো, বল তুলে নিতেন হাতে। কপিলের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ১৯৮০ সালে মেলবোর্ন টেস্ট। টানা ৩ ঘণ্টা বল করেছিলেন, অস্ট্রেলিয়াকে করেছিলেন অল-আউট। তবে এর চেয়েও বড় ব্যাপার, সেদিন হ্যামস্ট্রিং আর পেশির চোটে ভোগা কপিল মাঠে নেমেছিলেন ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে! দলের প্রয়োজনে ‘লিডিং ফ্রম দ্যা ফ্রন্ট’ এর এমন ভুমিকায় আবির্ভূত হওয়ার অজস্র নজির রয়েছে ‘হারিয়ানা হারিকেন’ খ্যাত এই অলরাউন্ডারের।

 

 

তবে সবকিছু ছাপিয়ে কপিল দেব ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলা তার অবিস্মরণীয় ইনিংসের কল্যাণে। সেমিফাইনালে যাওয়ার জন্য জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচে জয়ের কোন বিকল্প ছিলনা ভারতের। সেই ম্যাচেই ভারত ৯ রানে হারালো ৪ উইকেট, সেমিফাইনাল তখন হারিয়ে যেতে বসেছে দূর-দূরান্তে! কপিল এসে ১৭ রানে ৫ম উইকেটটাও যেতে দেখলেন। জিম্বাবুয়ে প্রথম সেমিফাইনাল নাগালে দেখছে, আর ভারত হয়ে পড়ছে বিমর্ষ। শুধু একজন ভারতীয় ছাড়া। তার কাছে ম্যাচটা আসলে সবে শুরু হয়েছিল তখন। বাকিটা ইনিংস জুড়ে যিনি একাই শাসন করলেন প্রতিপক্ষের সব বোলারদের আর একরকম ম্যাচটা ছিনিয়ে নিলেন জিম্বাবুয়ে মুঠো থেকে। খেললেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি ইনিংস। ১৭ রানে ৫ উইকেট থেকে ৬০ ওভার শেষে ভারতের কার্ডে ৮ উইকেটে ২৬৬ রান! অর্থাৎ পরবর্তী ৩ উইকেটে ২৪৯ রান! ১৬ টি চার আর ৬ টি ছয়ে ১৩৮ বলে ১৭৫ রানে অপরাজিত থাকলেন কপিল। ভারত ম্যাচটা জিতল ৩১ রানে, সেমিফাইনাল জিতে পরে গেল ফাইনালেই। 

কপিল যেন শুধু একটা ইনিংস খেললেন না, এই একটি ইনিংস দিয়ে কাগজে কলমে দুর্বল ভারতীয় দলটির মাঝে তিনি ছড়িয়ে দিলেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও। তবে ফাইনালের প্রথম ইনিংসেই ধাক্কা খেল সে স্বপ্ন। ভারতের ইনিংস শেষ ১৮৩ রানে। তবে আবারও আশা জিইয়ে রাখলেন একজন। নিজের শতভাগ উজাড় করে দেয়ার পাশাপাশি সতীর্থদেরও উজ্জীবিত করতে লাগলেন অসম্ভবকে সম্ভব করার মন্ত্রে। মহিন্দার অমরনাথ যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের শেষ ব্যাটসম্যান অ্যান্ডি রবার্টসকে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলেন, জয় থেকে তখনো ৪৪ রান দূরে ক্লাইভ লয়েডবাহিনী। 

ফাইনালে ব্যাট হাতে করতে পারেননি তেমন কিছু। বল হাতেও ছিলেন সাদামাটা। তবুও ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের প্রধান নায়ক তো কপিল দেবই! যিনি প্রায় একাই দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছিলেন ফাইনালে!

 

 

১৯৯৪ সালে যখন অবসরের ঘোষণা দেন, টেস্টে তার নামের পাশে ছিল ৪৩৪ টি উইকেট, যা ছিল তখনকার বিশ্বরেকর্ড। টেস্ট-ওয়ানডে মিলিয়ে ব্যাট হাতে করেছিলেন ৯ হাজারেরও বেশি রান। ১৯৯৯ সালে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নিলেও নানা বিতর্কের মুখে ২০০০ সালে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। মনোজ প্রভাকর যখন ফিক্সিং কেলেংকারিতে কপিল দেবের নাম নেন, ভারত বা পুরো ক্রিকেটবিশ্বেই তা বিস্ময়ের জন্ম দেয়। বিসিসিআই এবং সিবিআই উভয় পক্ষই তাকে নির্দোষ বলে রায় দিলেও কপিল বেশ মুষড়ে পড়েছিলেন।

১৯৯১ সালে ভারতের পদ্মা শ্রী পদকে ভূষিত হওয়ার পাশাপাশি ২০০২ সালে সুনীল গাভাস্কার এবং শচীন টেন্ডুলকারকে পেছনে ফেলে উইজডেনের শতাব্দী সেরা ভারতীয় ক্রিকেটার নির্বাচিত হন কপিল দেব। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই মহীরুহকে হটিয়ে তার এই অর্জনই বলে দেয়, ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে কপিল দেব কত বড় আর সম্মানিত একটি নাম।

শেষটা করা যাক কপিল দেবের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে যা তার তীক্ষ্ণ জীবনবোধেরও পরিচয় দেয়। “আপনি যখন বেড়ে উঠবেন, সবাই আপনাকে সাহায্য করবে। কিন্তু আপনি যখন উপরে উঠতে শুরু করবেন, তারাই তখন আপনাকে টেনে নামাতে চাইবে নিচের দিকে। সেই একই মানুষগুলোই যারা আপনাকে সাহায্য করেছিল তারাই আপনাকে নিচে নামানোর চেষ্টা করবে।”

কপিল দেব বোধহয় খুব বেশি নিচে নামেননি। বরং তিনি হয়ে থেকেছেন হরিয়ানা হারিকেন, তিনি হয়ে থেকেছেন চার ছয়ে ফলো-অন এড়ানো ব্যাটসম্যান, বা ভারতের প্রথম বিশ্বকাপের অন্যতম নায়ক!