• ফুটবল

সারি-গানেই চেলসির নতুন ভোর?

নিজের প্রথম মৌসুমেই চেলসিকে প্রিমিয়ার লিগ এনে দিয়েছিলেন আন্তোনিও কন্তে। তবে পরের মৌসুমে স্বর্গ থেকে নামতে হয়েছে মাটিতে। শীর্ষ চারেই দলকে রাখতে পারেননি, ২০১৮-১৯ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সুযোগও নেই ‘ব্লুজ’দের। এফএ কাপের শিরোপা ঘরে তুললেও তাই চাকরি হারাতে হয় কন্তেকে। নতুন মৌসুমে চেলসির হটসিটে বসেছেন কন্তের স্বদেশী মরিজিও সারি। ২০১৭-১৮ মৌসুমে নাপোলিকে নিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আসা সারিতেই তাই নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে চেলসি সমর্থকেরা।

 

বিশ্বরেকর্ডের চাপ সইতে পারবেন কেপা?

চেলসি ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমানোর ন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করেছেন থিবো কর্তোয়া। সফলও হয়েছেন তাতে। তবে ‘বিদ্রোহী’ কর্তোয়াকে ছাড়ার আগে তাঁর বদলিকে ঠিকই দলে ভিড়িয়েছে চেলসি। ৭১ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্বরেকর্ড গড়ে অ্যাথলেটিক বিলবাও থেকে তরুণ গোলরক্ষক কেপা আরিজাবালাগাকে দলে নিয়েছে চেলসি। কর্তোয়ার বদলে দলে আসা কেপাই হবেন চেলসির ‘নাম্বার ওয়ান’। আর তার বদলি হিসেবে থাকবেন উইলি কাবায়েরো এবং এই মৌসুমেই দলে ভেড়ানো রবার্ট গ্রীন।

 

রুডিগারের সঙ্গী কে?

ইতালিয়ান হলেও কন্তের মত ‘তিন সেন্টারব্যাক’ নীতিতে বিশ্বাসী নন সারি। ৪-৩-৩ ফর্মেশনটাই তার প্রথম পছন্দ। সেক্ষেত্রে রক্ষণে ডানপ্রান্তে খেলার কথা সিজার অ্যাজপিলিকুয়েতার। স্প্যানিশ ডিফেন্ডারের বদলি হিসেবে থাকবেন দাভিদ জাপাকস্তা এবং ভিক্টর মোজেস। ফুলব্যাকদের থেকে আক্রমণে সাহায্য চাইলে মোজেসকেই দেখা যেতে পারে অ্যাজপিলিকুয়েতার বদলে। সারির সিস্টেমে ফুলব্যাকদের কাজটা বেশ কষ্টসাধ্য। আক্রমণে যেমন দক্ষ হতে হয়, তেমনি রক্ষণে জায়গা ছেড়ে আসাটা তার কাছে রীতিমত ‘দন্ডনীয় অপরাধ’। আক্রমণে উঠে গিয়ে নিচে নেমে আসার অনীহার কারণে নাপোলির রাইটব্যাক এলসি হুসাইকেও বেশ কয়েক ম্যাচ বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন সারি। আর লেফটব্যাকে প্রথম পছন্দ সম্ভবত মার্কোস আলোন্সো। চেলসির আক্রমণে গত মৌসুমে অন্যতম অস্ত্র ছিলেন আলোন্সো। রক্ষণে তেমন সাহায্য করতে হয়নি কারণ খেলেছিলেন একটু উপরে, ‘থ্রি ম্যান ডিফেন্স’-এর কারণে। তবে এবার সারির দলে রক্ষণের দিকেও সমান মনোযোগী হতে হবে তাকে। আলোন্সোর ‘আন্ডারস্টাডি’ হিসেবে থাকছেন এমারসন পালমিয়েরি।

চেলসির রক্ষণে গত মৌসুমে একেবারেই ভাল খেলেননি গ্যারি কাহিল। মূল একাদশ থেকে ছিটকেও পড়েছেন অনেকবার। আর ডেভিড লুইজ তো খেলেছেনই হাতেগোনা কয়েক ম্যাচ। তবে সারির অধীনে কমিউনিটি শিল্ডে খেলেছেন লুইজই। ডিফেন্সিভ দক্ষতার কারণে সেন্টারব্যাকে রুডিগার তার প্রথম পছন্দ- এমনটা জানিয়েছেন সারি নিজেই। তার সঙ্গী হিসেবে দেখা যেতে পারে আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেনকে। বল পায়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা সেন্টারব্যাক পছন্দ হওয়ায় লুইজের জায়গায় ক্রিস্টেনসেনকেই দেখা যেতে পারে তাই সারির দলে।

 

নিষ্প্রাণ মাঝমাঠে চাই আক্রমণের সঞ্চার

নিজের পছন্দের ৩-৪-৩ ফর্মেশনে মাঝমাঠের দু’পাশে দুই ফুলব্যাককে খেলাতেন কন্তে। আর মাঝমাঠে খেলতেন এন’গোলো কান্তে এবং ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার। দুজনেই স্বভাবত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হওয়ায় আক্রমণে হ্যাজার্ড-মোরাতাদের তেমন সাহায্য করতে পারতেন না। নাপোলি থেকে এবার জর্জিনহোকে দলে নিয়েছেন সারি। কান্তের সাথে মাঝমাঠে নামবেন তিনি। তবে গত মৌসুমের সমস্যাটা থেকেই যাচ্ছে। দুজনই রক্ষণাত্মক ভঙ্গির হওয়ায় মাঝমাঠে শৈল্পিক ছোঁয়ার বেশ অভাব চেলসিতে। অ্যাটাকিং কোনো মিডফিল্ডার দলে না ভেড়ানোয় সে দায়িত্বটা পড়ছে সেস্ক ফ্যাব্রেগাস এবং রস বার্কলির কাঁধে। গত মৌসুমটা একেবারেই ভাল কাটেনি তাদের। অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদ থেকে মাতেও কোভাসিচকে দলে ভেড়ানোর জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ডারের গতি, ড্রিবলিং, ভিশনই হতে পারে সারির 'মিসিং পিস অফ দা পাজল'। আর মোরাতার সাথে তো আগেও খেলেছেন একসাথে, থাকছে না নতুনভাবে বোঝাপড়া গড়ার ঝক্কিও। কোভাসিচ চলে আসলে তখন হয়ত ফ্যাব্রেগাস-বার্কলি নন, মাঝমাঠে চেলসির মূল একাদশে হয়তো জায়গা করে নেবেন বিশ্বকাপে রানার্স-আপ হওয়া এই মিডফিল্ডার।

তবে সারির অধীনে প্রাক-মৌসুমে বেশ ভাল খেলেছেন ফ্যাব্রেগাস-বার্কলি। জর্জিনহো-কান্তে নিচে রক্ষণের দায়িত্বে থাকায় নিচে নামতে হবে না তাদের। সেক্ষেত্রে মাঝমাঠে কিছুটা হলেও ‘ফ্রি রোল’-এ খেলতে পারবেন দুজনই। আক্রমণভাগে বল যোগাতে তাই নিজেদের সেরাটাই দিতে হবে তাদের। অভিজ্ঞতা, মোরাতা-হ্যাজার্ডদের সাথে বোঝাপড়ার কারণে বার্কলির বদলে মূল একাদশে ফ্যাব্রেগাসের নামার সম্ভাবনাই বেশি তাই।

 

অপেক্ষাটা কেবল মোরাতার জন্যই

গত মৌসুমে তাকে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে রেকর্ড গড়ে তাকে দলে নিয়েছিল চেলসি। শুরুর দিকে বেশ ভালোই করছিলেন আলভারো মোরাতা। তবে পরে একেবারেই নিষ্প্রভ হয়ে পড়েন। সুযোগ পাননি স্পেনের বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও। মৌসুমের একটা সময় তো মূল একাদশে জায়গা হারান অলিভিয়ের জিরুর কাছে। 

জোড়া সন্তানের জন্মের পর চেলসির ‘অভিশপ্ত’ ৯ নম্বর জার্সির বদলে গায়ে জড়িয়েছেন ২৯ নম্বর জার্সি। লাভ হয়নি খুব একটা। কমিউনিটি শিল্ডের ম্যাচে তাকে পকেটবন্দি করে রেখেছিলেন স্টোনস-ওয়াকার। এতটাই নিষ্প্রভ ছিলেন, খোদ চেলসি সমর্থকেরাই ম্যাচে তাকে দুয়ো দিয়েছিলেন। কিন্তু সারির অধীনে স্ট্রাইকারদের ভাগ্য সবসময়ই ভাল। হিগুয়াইন, ইনসিনিয়ে, মার্টেন্সদের সবাই-ই গোল পেয়েছেন অনেক। সারির অধীনে তাই নিজেকে ফিরে পাওয়ার এক মিশনে নামবেন মোরাতা। তার বিকল্প হিসেবে থাকবেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অলিভিয়ের জিরু।

মোরাতা বা জিরুর চেয়েও আক্রমণভাগে দুজন ফরোয়ার্ডের ওপর বেশি নির্ভরশীল চেলসি। পুরো গ্রীষ্ম জুড়েই তাদের চেলসি ছাড়ার গুঞ্জন ছড়াচ্ছিল চারদিকে। তবে দলবদলের মাত্র সপ্তাহ দুয়েক বাকি থাকতেও তেমন কোনো বিড না আসায় হয়ত চেলসিতেই থেকে যাবেন এডেন হ্যাজার্ড এবং উইলিয়ান। সেক্ষেত্রে ইনজুরি বা বিশ্রামের কথা বাদ দিলে মূল একাদশেই খেলবেন দুজন। দীর্ঘদিন একসাথে খেলায় বোঝাপড়াটা দারুণ। ড্রিবলিং এবং চিতার মত ক্ষিপ্রগতির অধিকারী চেলসির দুই উইঙ্গারের ওপরই ভরসা করছেন সারি, বিশেষ করে যখন দুই স্ট্রাইকার মোরাতা এবং জিরু ফর্মে নেই তেমন। উইং দিয়ে ভেতরে ঢুকে মোরাতাকে পাস যোগানো বা নিজেরাই গোল করা- দু’দিক দিয়েই সমান পারদর্শী হ্যাজার্ড-উইলিয়ান। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফুটবলে ফেরত আসতে এই দু’জনের দিকেই তাকিয়ে থাকবে তারা। 

 

২০১৬-১৭ মৌসুমে ইপিএল জেতার ঠিক পরের মৌসুমেই চেলসির এমন ভরাডুবি আশা করেননি কেউই। তবে সেটা এখন অতীত। ইউরোপে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন সারি। তার অধীনেই নতুন করে শুরু করতে চাইছে চেলসি। সিরি আ-র সাম্প্রতিক ইতিহাসে জুভেন্টাসকে সবচেয়ে কড়া টক্কর দেওয়া সারিই ফেরাবেন চেলসির সুদিন- এমনটাই আশ্বাস রোমান আব্রামোভিচ এবং চেলসি সমর্থকদের।

 

প্রেডিকশনঃ ৩য় (সারির অধীনে ডিফেন্সের দিক দিয়ে বেশ দৃঢ়ই থাকবে চেলসি। সারির প্রিয় প্রেসিং ফুটবল খেলার জন্য কান্তে-জর্জিনহো জুটি খুব সম্ভবত ইপিএল-এর সেরা মিডফিল্ড জুটিতে পরিণত হবে। আর কন্তের অপেক্ষাকৃত ধীরগতির ফুটবলের বদলে চেলসি খেলবে গত মৌসুমে নাপোলির আক্রমণাত্মক গতিশীল ফুটবল, যার জন্য রীতিমত ‘টেইলর মেইড’ই বলা চলে হ্যাজার্ড-মোরাতা-উইলিয়ানরা। সারির আগের রেকর্ড বজায়ে থাকলে মোরাতাও ফিরবেন ফর্মে। সব মিলিয়ে ২০১৯-২০ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে চেলসির ফেরার সম্ভাবনাটাই প্রবল)।