• ক্রিকেট

হেরাথ রোদ্দুর হয়েছিলেন

কলম্বোর সম্পথ ব্যাংকের হেডকোয়ার্টারে রঙ্গনা হেরাথকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। চব্বিশ দিন আগে শ্রীলঙ্কার হয়ে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি জিতে এসেছেন তাদের ব্যাংকেরই একজন হেরাথ। যিনি সেই ব্যাংকের কার্ড সেন্টারে কাজ করতেন, এখন গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ করেন, ব্যাংকের ক্রিকেট দলে খেলেন। কুরুনেগালা থেকে আসা হেরাথের জীবনটা শুধু কলম্বোর ব্যাংককেন্দ্রিক হয়ে যেতে পারতো। হেরাথ ব্যাংকের কৃত্রিম আলো আর ডেস্কের সারিতে হারিয়ে ফেলতে পারতেন নিজেকে।

হেরাথ হারিয়ে যাননি। হেরাথ রোদ্দুর হয়েছেন।

****

রাসেল আরনল্ডের ধারাভাষ্য কিছুটা জোর করে কোনও ভাল ছাত্রকে দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করানোর মতো। তার কথাবার্তায় আপনি প্রতিদিন আবেগে ভেসে যাবেন না। ধারাভাষ্যে আরনল্ড নতুন নন, ধারাভাষ্যে আরনল্ড আপনাকে প্রতিদিন মোহাবিষ্ট করে রাখবেন এমন সম্ভাবনা সবসময় বেশি না। 

সাবেক শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার রঙ্গনা হেরাথের কথার সারাংশ অনুবাদ করছিলেন গল টেস্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন হেরাথকে। আর আপনাকে দিচ্ছিলেন তার কথায় হারিয়ে যাওয়ার দুর্লভ মুহুর্ত। আরও দুজনের সঙ্গে অতিথি কুমার সাঙ্গাকারা, ডামি চেক হাতে দাঁড়িয়ে। মাঠের বাইরে ভীড়, সেখানে দাঁড়িয়ে সাঙ্গাকারার জীবন-জীবনের বন্ধু মাহেলা জয়াবর্ধনে। পাশে থিসারা পেরেরা। ফারভিজ মাহরুফ। অজন্তা মেন্ডিস। সচিত্র সেনানায়েকে। গলে তাদের আগমনের উপলক্ষ্য একজন - রঙ্গনা হেরাথ।

 

 

মাইক্রোফোন হাতে স্ত্রী আর দুই ছেলেকে পাশে নিয়ে হেরাথ বলে গেলেন সিংহলিজ ভাষায়। এ ভাষার জ্ঞান না থাকলে পরিচিত ঠেকবে শুধু ‘স্পন্সর’, ‘ইনডিভিজুয়াল অ্যাচিভমেন্ট’, ‘ক্রিকেট’ শব্দগুলো। হেরাথ কথা বলতে খুব তাড়াহুড়ো করেন না, তবে শেষ করতে চান খুব করে। অর্থ না বুঝতে পারা সেই কথাগুলো সঙ্গীতের সেই চিরন্তন ব্যাপারটা মনে করিয়ে দিতে পারে, যেখানে ভাষার চেয়ে ভাবটা বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেখানে কথার চেয়ে সুরটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আপনি একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাবেন, যেখানে একই সঙ্গে তৃপ্তি আর আক্ষেপের যুগল বসবাস। 

 

 

আরনল্ডের মাঝেও হয়তো সেটাই হচ্ছিল। হেরাথের অভিষেক টেস্টে খেলেছিলেন তিনি, আজ এতোদিন পর সাবেক সতীর্থর বিদায়ে হয়তো ফিরে যাচ্ছিলেন সেই দিনগুলিতে। তখন আরনল্ডের সঙ্গে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলেন আপনিও, যেটা প্রতিদিন হয় না।  

টুইটারে একটা অদ্ভুত তথ্য ঘোরাফেরা করছিল এর আগেই। ১৮৯৯ সালে টেস্ট অভিষেক হওয়া উইলফ্রেড রোডস লেস অ্যামিসের সঙ্গে খেলেছিলেন, যিনি প্রথম শ্রেণিতে খেলেছিলেন ব্রায়ান ক্লোজের সঙ্গে গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে। ক্লোজ ৫৫ পেরুনো বয়সে ১৯৮০ এর দিকে প্রথম শ্রেণিতে খেলেছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভার বিপক্ষে। ১৯৯৯ সালে হেরাথের অভিষেক টেস্টে সতীর্থ ছিলেন ডি সিলভা। 

এভাবে হয়তো অনেকের ক্ষেত্রেই অনেককিছু বের করা যায়। তবে হেরাথ অন্তত গত শতাব্দীর টাইম-ফ্রেমের সঙ্গে আপনার একটা যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারতেন সরাসরি। হেরাথ ছিলেন একধরনের টাইম-মেশিন। সেই ঝিরঝির টেলিভিশনে, টাই-পরা আম্পায়ার আর নিয়মিত হ্যাট মাথায় ব্যাটসম্যানদের যুগ থেকে উঠে এসেছিলেন হেরাথ। ছিলেন এই এতদিন পরও। 

সেই মেশিনটা থেমে গেল। গত শতাব্দীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করলো টেস্ট ক্রিকেট। সময়ের ওই ফ্রেমের কেউ এখন আর এই ফ্রেমে আটকা নেই। 

**** 

হেরাথ মুদিয়ানসেলাগে রঙ্গনা কিরথি বান্দারা হেরাথ। 

আরও অনেক শ্রীলঙ্কানের মতো তার নামটাও অনেক লম্বা। তবে তাকে বর্ণনা করতে এতো শব্দ একেবারে ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে না। তিনি পাড়ার দোকানে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া নিপাট ভদ্রলোকটার মতোই সাধারণ একজন। উচ্চতায় সংক্ষিপ্ত, গোলগাল। চুলে পাক ধরেছে। হাসিটাও সংক্ষিপ্ত, তবে তার হাসির জবাবটা মুচকি হাসিতে হলেও দিতে হবে আপনাকে। তার হাসিমাখা কথা শুনে আপনি নরম হয়ে যাবেন একটু হলেও। হেরাথ আপনার-আমার চারপাশে থাকা মানুষদের মতোই একজন। টি শার্ট, জিনস গায়ে ঘুরে বেড়ালে যাকে আলাদা করে নজরে পড়বে না আপনার। কোনোদিন কলম্বোর সম্পথ ব্যাংকে গেলে আর দশজন কর্মকর্তার মতোই লাগবে তাকে। 

হেরাথ ক্রিকেটে অসম্ভব মেধাবি কেউ নন। ক্যারিয়ারের প্রথম নয় বছরে চৌদ্দ টেস্ট খেলেছিলেন। ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত খেলেননি একটিও। ‘ইনসেপশন’ এর মতো করে স্বপ্ন-বাস্তবের এক ঘোরে থাকতে হতো তাকে, মাঝে মাঝে আটকে যেতেন উষর মরুর মতো ‘লিম্বো’-তে। ক্রিকেট না থাকলে ব্যাংকের চাকরিটাই অবলম্বন ছিল। হেরাথ ২০০০ সাল থেকে সম্পথ ব্যাংকে কাজ করছেন।

২০০৯ সালে হেরাথ খেলতে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যাফোর্ডশায়ারের এক লিগে। 

শ্রীলঙ্কা তখনও মুত্তিয়া মুরালিধরন নামের এক জাদুকরের সাম্রাজ্যে বাস করছে। যার জন্য বোলারদের ক্ষেত্রে আইন বদলেছিল, সেই মুরালিধরন। শ্রীলঙ্কা একটা বিশেষ দেশ, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে বিশেষ কিছু। সেবার জাদুকর চোট পেয়েছেন, শ্রীলঙ্কার একজন স্পিনার দরকার পাকিস্তানের বিপক্ষে। 

 

 

কুমার সাঙ্গাকারা তখন অধিনায়ক। কোচিং প্যানেলে চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। হাথুরুর সঙ্গে হেরাথের সম্পর্কটা সেই ক্লাব পর্যায় থেকে। হেরাথ তার অধিনায়কত্বে খেলেছিলেন। ইংল্যান্ডে বসে হেরাথ ফোনকল পেলেন সাঙ্গার, “রাঙ্গা, ফর্মের কী অবস্থা? পাকিস্তানের সঙ্গে টেস্টে খেলতে পারবে?” 

হেরাথের তখন কোনও ধারণা ছিল না, এতো স্বল্প সময়ের মাঝে ইংল্যান্ড থেকে কিভাবে পৌঁছাবেন দেশে। সাত-পাঁচ না ভেবে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলেন। বিমানবন্দরে যেতেই ঘন্টা পাঁচেক লেগেছিল, দীর্ঘ ফ্লাইটে কলম্বো পৌঁছানোর কথা নাহয় বাদই দিন। এরপর গল। হেরাথের সামনে আরেকটি টেস্ট, আরেকবার স্বপ্নদুয়ার খুললো তার সামনে। হেরাথ ক্লান্ত ছিলেন, জেটল্যাগ কাটেনি ঠিকঠাক। তবে হেরাথকে গলে ভাল করতে বাধ্য করেছিল সেই বাস্তবতাটা, ভাল না করলেই আরেকবার অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন যে তিনি। 

গলে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৫ রানে ৪ উইকেট নিলেন, জয়ের সুরটা ধরিয়ে দিলেন শ্রীলঙ্কার। হেরাথ আর কোথাও হারিয়ে যাননি। হেরাথ গলকে তার সাম্রাজ্য বানিয়েছিলেন। আর হেরাথ হয়ে উঠেছিলেন টাইম-মেশিন। বোলিং মেশিন। 

হেরাথের অ্যাকশন অতি-সাধারণ। বীজগণিতের মতো করে বাঁহাতি বোলারদের অ্যাকশনগুলোর মাঝে যদি ‘‘কমন” নেওয়া যেত, হেরাথ ব্রাকেটের বাইরে থাকতেন। খাটোমতো একজন একটু দ্রুত আসছেন, আলগাভাবে ধরে রাখা বলটা ফেলছেন পিচের অর্ধেকের পর। শেন ওয়ার্ন বা মুরালির কথা ভেবে লাভ নেই, হেরাথের বোলিং দেখে আপনার মনে হবে না কখনও, ‘করে ক্যাম্নে’! বরং এটা মনে হতে পারে, ‘আর কতো রে ভাই’! হেরাথের আন-অর্থোডোক্স একমাত্র ডেলিভারি ক্যারম বল। 

আর ক্রমাগত একই লাইন, একই লেংথ। একটু একটু করে সামনে ঝুঁকতে বাধ্য করছেন ব্যাটসম্যানকে, সামনের পা-টা প্রশস্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। আর তারপর সেই জায়গা, যেখানে পড়ে বলটা ঘুরবে একটু বেশি, ব্যাটের মাঝখান নাগাল পাবে না। এজড। ব্যাট নাগালই পাবে না। বোল্ড। 

 

 

মাঝে মাঝে আর্মার, মাঝে মাঝে টার্নের গতিপথ বদলে গিয়ে উলটো আসবে। আর মাঝে মাঝে বল ধরে রাখবে লাইন, টার্ন করতে গিয়েও করবে না। অথবা আচমকা পড়বে ফুললেংথে। এরপর প্যাডের সঙ্গে ‘ধপাস’ শব্দ। হেরাথের চিৎকার। আম্পায়ারের ওঠা আঙুল। ব্যাটসম্যান হলে আপনার মাঝে একটা অপরাধবোধ জেগে উঠবে, আপনার এটা খেলা উচিৎ ছিল। এটা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বল। 

 

 

অবশ্য মাঝে মাঝে হেরাথ এমন অবস্থা তৈরী করবেন, যেন প্রতি বলেই পাবেন উইকেট। ২০১৪ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে চট্টগ্রামে কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল বনে যাওয়া নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে যেমন। হেরাথ ৩.৩ ওভারে দিয়েছিলেন ৩ রান, উইকেট নিয়েছিলেন রানের চেয়ে ২টি বেশি। সাঙ্গাকারা-জয়াবর্ধনে ৪টা মেজর টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলে শিরোপাবঞ্চিত হয়েছিলেন এর আগে, হেরাথকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুরে জিতলেন তারা নিজেদের শেষ সুযোগে। আকস্মিক অধিনায়ক করা হয়েছিল লাসিথ মালিঙ্গাকে। প্রেজেন্টেশনে নাসের হুসেইন মালিঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হোয়াই ডিডনট দে মেক ইউ ক্যাপ্টেন আরলিয়ার!” নাসের এই প্রশ্নটাও করতে পারতেন, “আগে হেরাথকে খেলালে না কেন তোমরা!” 

নাসের সে প্রশ্ন করেননি। হেরাথও যে সবসময় সফল হয়েছেন, তাও নয়। হেরাথের এসব কৌশলের কিছুই কাজে আসেনি অনেক সেশনে। বল করে গেছেন, উইকেট মেলেনি। হেরাথ ম্যাচের মাঝেই ‘লিম্বো’তে চলে গেছেন। সাধারণ হেরাথ তখন আরও সাধারণ হয়ে হয়ে উঠেছেন। 


**** 


গলে যেমন হয়ে গেলেন। অতি-সাধারণ একজন। তিন উইকেট নিয়েছেন, তবে ইংল্যান্ডকে আটকাতে পারেননি। প্রেজেন্টেশনে দীনেশ চান্ডিমাল উলটো তার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন, কিংবদন্তির বিদায়টা তারা এভাবে দিতে চাননি। হেরাথও নিশ্চয়ই চাননি। 

তিনি হয়তো চেয়েছিলেন তার সেই গলের উত্থানগল্পের পুনরাবৃত্তি। হয়তো দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্রীলঙ্কার একমাত্র টেস্ট জয়ের মতো কিছু করতে। ইংল্যান্ডে প্রথমবার একাধিক ম্যাচের সিরিজ জয়ের মতো কিছুর সাক্ষী হতে। অথবা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭ বছরের জয়খরা কাটানোর মতো কিছু। ভারত-পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচজেতানো পারফরম্যান্সের মতো কিছু। 

সেসব হয়নি। শেষ ইনিংসে হেরাথ নিয়েছেন ২ উইকেট। 

ব্যাটিংয়ে শেষজন হিসেবে নেমে গলে বিয়ারের গ্লাস মুখে আটকে রেখে হাততালি দেওয়া বার্মি আর্মির এক সদস্য থেকে শুরু করে আম্পায়ার পর্যন্ত সবার দাঁড়ানো অভিবাদন পেয়েছেন। আর হয়েছেন রান-আউট। রিভার্স-সুইপ করেছিলেন, এই শটটা প্রিয় তার। যেমন প্রিয় সুইপ। প্রথম বলেই সুইপ করতে গিয়ে মিস করেছিলেন, আম্পায়ার দিয়েছিলেন আউট। হেরাথ রিভিউ নিয়েছিলেন হাসিমুখে। শেষ মুহুর্তে নেওয়া রিভিউয়ে হ্যাটট্রিক হয়েছিল তার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। টেস্টে শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক তার। 

ডাবলস নেওয়ার চেষ্টায় শেষ মুহুর্তে ডাইভও দিলেন। উঠে গ্লাভস খুলে গা ঝাড়লেন, আর্মগার্ড ঠিকঠাক করলেন। যেন ঠিকই আছে সব। আদতে ছিল না। ব্যাট লাইনটা পার হতে পারেনি। শ্রীলঙ্কাকে শেষবার পার করাতে পারা তো আরও দূরের কথা। নিজের সাম্রাজ্য গলে তিনি পরাজিত তখন।  

হাঁটুজোড়া হেরাথকে সমর্থন দিচ্ছে না প্রায় বছর দেড়েক ধরে, আছে পিঠেও সমস্যা। তার রান-আউট যেন অবসরের ব্যাপারটা অর্থবহ করে তুললো আরেকবার। 

জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠলো আউট। নিচে এক কোণে স্পন্সরের নাম- সম্পথ ব্যাংক। হেরাথ যে ব্যাংকে কাজ করেন। একটা জীবন সেই ব্যাংকেই কেটে যেতে পারতো তার। তিনি সেটা হতে দেননি। তিনি টেস্টের সেরা বাঁহাতি বোলার হয়েছেন। সাধারণ একজন হয়ে দেশের দ্বিতীয় অসাধারণ বোলার হয়েছেন। 

হেরাথ রোদ্দুর হয়েছিলেন।