• দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলংকা সিরিজ
  • " />

     

    • দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলংকা সিরিজ

    পোর্ট এলিজাবেথে নোঙর ব্লুমফিল্ড আর চিলাও ইতিহাসের

    শ্রীলঙ্কা তখন বৃটিশ সিলন। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড সেখানে থামতো কোনও ক্রিকেট সফরে যাওয়ার আগে। স্থানীয় দলগুলির সঙ্গে তাদের ম্যাচগুলি ধরে পেছনে গেলে ১৮৮২ সালের দিকে প্রথম পাওয়া যায় এমন ম্যাচ।

    এরপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের ঘরোয়া কাঠামো। তারই এক স্তম্ভ ব্লুমফিল্ড ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিক ক্লাব। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ক্লাবটি শ্রীলঙ্কার অন্যতম পুরোনো, অনেক কিংবদন্তির আঁতুড়ঘরও। কুশাল মেন্ডিসের প্রথম শ্রেণির অভিষেক এ ক্লাবেই।

    মেন্ডিসদের ব্লুমফিল্ডের তুলনায় চিলাও মেরিয়ানস ক্রিকেট ক্লাব হাঁটুর বয়সী- প্রতিষ্ঠাসাল ১৯৭৫। ব্লুমফিল্ড শ্রীলঙ্কার প্রিমিয়ার ট্রফি জিতেছে ৮ বার, চিলাও একবার জিতেছে শুধু ওয়ানডে ট্রফি। চিলাও বরং পরিচিত তিনটি জিনিসের জন্য- কাঁকড়া, নারিকেল ও সোরিয়া ভাতৃদ্বয়। এই সোরিয়া ভাতৃদ্বয়ের আমন্ত্রণেই সিলনে একমাত্র সফরে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। সিলনের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধাও ছিলেন সোরিয়ারা।

    শ্রীলঙ্কার হয়ে অভিষেকের আগে চিলাওয়ে নিজের সেরা সময়টা কাটানো শুরু করেছেন ওশাদা ফার্নান্ডো।

    কুশাল ও ওশাদা, ব্লুমফিল্ড ও চিলাও এসে মিললো পোর্ট এলিজাবেথে। শ্রীলঙ্কা সেখানে ইতিহাসে ঢুকে গেল ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে।

    ****

    এই সফরের আগে শ্রীলঙ্কা দল থেকে বাদ পড়েছেন তাদের অধিনায়ক দীনেশ চান্ডিমাল। তাকে ঘরোয়া ক্রিকেটে পাঠানো হয়েছে নিজের ‘ফর্ম ফিরে পেতে’। দিমুথ করুনারত্নে গত দুই বছরে শ্রীলঙ্কাকে টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া পঞ্চম অধিনায়ক, অবশ্য করুনাত্নের নামের পরে ছিল ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দটা।

    শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে অদ্ভুতুড়ে কান্ড ঘটে সব।

    লাসিথ মালিঙ্গা অনেকদিন পর ওয়ানডে দলে ফিরে আবার হয়েছেন অধিনায়ক। দলের সেরা ক্রিকেটার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসকেও বাদ দেওয়া হয়েছিল ‘রান-আউট’-এ বাজে রেকর্ডের কারণে।

    ম্যাথিউসকে বাদ দিতে যার ভূমিকা মূখ্য ছিল, এ সফরের আগে সেই কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের নির্বাচকের দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার চাকরি এই যায় তো সেই যায়। এই সফরের মাঝেই নতুন বোর্ড প্রধান পেয়েছে তাদের ক্রিকেট বোর্ড, যে কমিটি আবার কিনা নতুন বোতলে ওই পুরোনো মদই। মাঝে বেশ কিছুদিন ক্রীড়া মন্ত্রণালয় চালিয়েছে বোর্ড, এ নির্বাচনে হেরে গেছেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ‘অবিসংবাদিত’ নায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সঙ্গে তার ভাইও।

     

     

    অস্ট্রেলিয়া সফরেই শ্রীলঙ্কা সুরাঙ্গা লাকমাল ছাড়া পায়নি তাদের বাকি দুই ফ্রন্টলাইন পেসারকে। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও ফিরতে পারেননি তারা। ম্যাথিউসও নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভাল করা বেশ কয়েকজনকে ডাকা হলো- এরাও ব্যর্থ হলে শ্রীলঙ্কা এরপর কার দিকে ভিড়তো, সেটা একটা রহস্য ছিল বটে।

    আইসিসি টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা দুইয়ে। শ্রীলঙ্কা ছয়ে। শ্রীলঙ্কা শেষ যেবার সিরিজ জিতেছে, সেটা এই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেই। তবে সেই শ্রীলঙ্কা আলাদা। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের কাছে তখনও হোয়াইটওয়াশ হয়নি তারা। তাদের ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা বোলার ছিলেন সেবার। দিলরুয়ান পেরেরা তখনও ওই হেরাথের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন। আর সাত সিরিজ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের ডেরায় অপরাজিত ছিল।

    মাঠে, মাঠের বাইরে, হয়তো আকাশে-বাতাসেও অনেক কিছুই বিপক্ষে ছিল শ্রীলঙ্কার। শ্রীলঙ্কা সেসব জয় করে ঢুকে পড়ল রুপকথায়।

    ****

    কুশাল মেন্ডিস শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট-সিস্টেমের রাজপুত্র। স্কুল ক্রিকেটের ‘সোনার ছেলে’। ২০ বছর বয়সে অভিষেকের আগে তার অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১৬টি প্রথম শ্রেণির ইনিংস। তবে তার আগেই হয়েছিলেন স্কুল-ক্রিকেটের সেরা 'গ্র্যাজুয়েট'। যুব বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কাকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, প্রথম শ্রেণিতে খেলেছিলেন ব্লুমফিল্ড ক্রিকেট ও অ্যাথলেটিকস ক্লাবের হয়ে। সনাথ জয়াসুরিয়া, কুমার ধর্মসেনা, রোশান মহানামা, ফারভিজ মাহরুফদের দল ব্লুমফিল্ড।

    মেন্ডিসের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ‘সিস্টেম’টা ‘ফেইল’ করেনি, নিজের দ্বিতীয় প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরিটাই ছিল শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে, পাল্লেকেলেতে। প্রথম টেস্টে তার ১৭৬ রান শুধু অস্ট্রেলিয়াকে ১৭ বছর পর হারাতে সহায়তা করেনি, ঘুরিয়ে দিয়েছিল সিরিজের মোড়ই- যে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।

    পোর্ট এলিজাবেথে শেষদিন মেন্ডিস শুরু করেছিলেন ১০ রানে অপরাজিত থেকে। ওয়েলিংটনে ম্যাথিউসের সঙ্গে ‘গ্রেট এসকেপ’-এ সঙ্গ দিয়েছিলেন মেন্ডিস, এরপর ৯ ইনিংসে শুধু একটি ফিফটি। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনশেষেও ম্যাচ ছিল সমতায়, ডারবান রুপকথা বিস্মৃত যেন তখন। ম্যাচ ঝুলছে সুতোয়, গড়বড় হয়ে যেতে পারে একটু এদিক ওদিক হলেই সবকিছু। ডারবানের জয় শুধু কুশল পেরেরার অতিমানবীয় ইনিংসে শ্রীলঙ্কার দারুণ জয়ে টিকে থাকবে তখন, আর সিরিজে ফিরে এসে দক্ষিণ আফ্রিকা টিকিয়ে রাখবে তাদের অপরাজিত থাকার রেকর্ডটা। সহজ কথায়- অনেক এগিয়েও থমকে যাবে শ্রীলঙ্কা।

    মেন্ডিস থামলেন না।

    মেন্ডিসকে এদিন সঙ্গ দিলেন ওশাদা ফার্নান্ডো। তিনি যেন হুট করে চলে এসেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে। তার হাবভাব এমন। আদতে ঘরোয়া ক্রিকেটে বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই এসেছেন তিনি। শ্রীলঙ্কার শেষ প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ছয়টি সেঞ্চুরির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ১১৮১ রানও ছিল ওশাদার, চিলাও মেরিয়ানস ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে।

    ওশাদা চিলাওয়ে আসার আগে খেলেছিলেন আরও চারটি ক্লাবে- কোল্টস, লঙ্কান, মুরস ও সিনহলিজ। চিলাওয়ে ওশাদার গড় এখন পর্যন্ত ৬৪.৪৫, আগের চার ক্লাব মিলিয়ে সর্বোচ্চ গড় মুরসের হয়ে, চিলাওয়ের প্রায় অর্ধেক।

    একসময় চিলাও বিখ্যাত ছিল মুক্তো উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে।

     

    চিলাওয়ের মুক্তোঝড়া হাসি/ক্রিকইনফো

    চিলাওয়ে এক মৌসুম খেলেছিলেন দিলরুয়ান পেরেরা। চিলাওয়ে খেলেছিলেন শামিন্দা এরাঙ্গা। পেরেরা আপাতত দৃশ্যপটে নেই। এরাঙ্গা রহস্যময় অসুখে ভুগে ডাবলিনের হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ২৪ ঘন্টা, ২০১৬ সালে। এরপর অ্যাকশন নিয়ে সমস্যা হয়েছে, সেটা মিটলেও আর খেলা হয়নি তার। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাউদাম্পটনে শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত জয়টা এসেছিল এরাঙ্গার বল থেকে, জেমস অ্যান্ডারসন তার বাউন্সারে ক্যাচ দিয়েছিলেন রঙ্গনা হেরাথের হাতে।

    চিলাও শামিন্দায় মুক্তো খুঁজেছিল, ক্ষণিকের জন্য ঝলক দেখিয়েছিলেন তিনি। ওশাদা চিলাওয়ে এসে রান পেয়েছিলেন। হয়তো ওশাদায় মুক্তো খুঁজে পেলো চিলাও।

    ****

    কুশাল মেন্ডিস ব্যাট তুললেন না ফিফটির পর। শুধু ডানহাতটা উঁচিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে তুলে কিছু একটা বলেন। ড্রেসিংরুমে হয়তো সেই বার্তাটা পৌঁছে যায় ঠিকঠাক। দিমুথ করুনারত্নে থাকেন নির্ভার। ইতিহাসের হাতছানি উজ্জ্বল হয়। শ্রীলঙ্কা এলিজাবেথের বন্দরে ফেলে ইতিহাসের নোঙর।

    কুশাল পেরেরাকে বিশ্ব ফার্নান্ডো ডারবানে বলেছিলেন, যে করেই হোক তিনি আগলে রাখবেন তার উইকেট। ওশাদা হয়তো কুশালকে তেমন কিছু বলেননি। বলার প্রয়োজন পড়েনি। ওশাদা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন হতে পারেন, তবে লাল বলটা তার অপরিচিত নয়। ডেল স্টেইন তার কাছে নতুন, কাগিসো রাবাদা তার কাছে রহস্যময়, ডুয়ান অলিভিয়ারের শর্ট বল তার কাছে একটু কঠিন হতে পারে- তবে তিনি খেলেছেন চিলাওয়ে। ফিফটি করে ব্যাটটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছেন অভিনন্দনের জবাব, পোর্ট এলিজাবেথে।

    প্রথম ইনিংসে অলিভিয়ারের লেংথ বলটা স্টাম্পে ডেকে এনেছিলেন ওশাদা। আর কুশাল দিয়েছিলেন খোঁচা। বিশ্ব ফার্নান্ডো আর কাসুন রাজিথা শ্রীলঙ্কাকে এগিয়ে নিলেও ব্যাটসম্যানরা পিছিয়ে এনেছিলেন তাদের।

    দ্বিতীয় ইনিংসে মেন্ডিস টললেন না। ওশাদা এদিন নড়লেন না উইকেট থেকে। ওদিকে থমকে গেল কলম্বো। রাস্তার কলা বিক্রেতা থেকে পুলিশ- সবার চোখ টেলিভিশন দোকানে। সবাই সেদিন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ। ক্রিকেট সেদিন সবার।

    কেশভ মহারাজের টসড-আপ ডেলিভারিটা ওশাদা খেললেন মিড-উইকেটে। একটা সিঙ্গেল।

    যে সিঙ্গেল চিলাও থেকে পোর্ট এলিজাবেথ হয়ে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে গেল ইতিহাসের দিকে। ওপাশে উল্লাসে মাতলেন কুশাল মেন্ডিস। ব্লুমফিল্ডে শ্রীলঙ্কার স্কুল ক্রিকেটের রাজপুত্র পরে পরলেন ম্যাচসেরার মুকুট।

    এর আগে ২১টি এশিয়ান দল এসে শুন্য হাতে ফিরেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। ২২তম দলটি হয়তো ছিল সবচেয়ে কম সম্ভাবনাময়, কে জানে হয়তো সম্ভাবনার হিসেবে ঋণাত্মকে গেলে সেদিকেরই। কুমার সাঙ্গাকারার ৫৭-এর ওপরের গড়টা এখানে নেমে আসতো ৩৬-এর নিচে। মাহেলা জয়াবর্ধরনে প্রায় ৫০ থেকে এখানে নামতেন প্রায় ২৮-এ। মেন্ডিস-ফার্নান্ডোদের ১৬৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আসা জয়ে এলো সাঙ্গা-জয়ার টুইট।

    ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া শ্রীলঙ্কায় থামতো। আফ্রিকান ইতিহাস শ্রীলঙ্কাকে বেঁধে দিল তাদের সঙ্গে। ব্লুমফিল্ড আর চিলাওয়ে ভর করে লঙ্কান ইতিহাস এসে নোঙর করলো পোর্ট এলিজাবেথে।