• উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    • উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ

    চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল: ওয়ান্ডায় 'ওয়ান্ডার'-এর অপেক্ষায় টটেনহাম

    আবেগটা প্রকাশের চেয়ে চেপে যেতেই হয়তো বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন টটেনহাম হটস্পার ম্যানেজার মরিসিও পচেত্তিনো। কিন্তু মাঝে মাঝে এমনও দিন আসে, যখন গাম্ভীর্যের সেই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে সবটুকু নির্মল আবেগ, যেমনটা হয়েছিল আমস্টারডামে। ইয়োহান ক্রুইফ অ্যারেনার সবুজ গালিচায় মাথা ঠেকিয়ে শিশুদের মত কাঁদলেন তিনি। একে একে তাকে জড়িয়ে ধরলেন সবাই, সবার শেষে আসলেন লুকাস মউরা- সেদিনের মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের নায়ক, গত ২ বছরে পচেত্তিনোর কেনা একমাত্র ফুটবলার। আয়াক্সকে অভাবনীয় এক প্রত্যাবর্তনে বিদায় জানিয়ে প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে টটেনহাম। ৯০ মিনিটে ঘটে যাওয়া সে ম্যাচের সব কাহিনী নিয়ে সিনেমাও বানিয়ে ফেলা যাবে অনায়াসে।

    রোড টু ফাইনাল

    অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের স্টেডিয়াম ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোতে আজ লিভারপুলের বিপক্ষে ফাইনাল খেলবে টটেনহাম। অথচ মাস চারেক আগে ফাইনাল তো দূরে থাক, স্পার্সের গ্রুপপর্ব পেরুনো নিয়েই ছিল জোর সংশয়। বার্সেলোনা, ইন্টার মিলানের সাথে ‘গ্রুপ অফ ডেথ’-এ ছিল পচেত্তিনোর দল। প্রথম ৩ ম্যাচে সংগ্রহ মাত্র ১ পয়েন্ট। কিন্তু খাদের কিনারা থেকে স্পার্স ফিরল দারুণভাবে। টানা ২ জয়ের পর ন্যু ক্যাম্প থেকে অন্তত ড্র নিয়ে ফিরতে হত তাদের। মেসিদের বিপক্ষে সেই গোলোটাও করেছিলেন মউরা, যার হ্যাটট্রিকে রচিত হয়েছে স্পার্সের ফেরার মহাকাব্য। স্পার্সের নিজেদের চিনিয়েছে নকআউট পর্বে। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, ম্যানচেস্টার সিটি, আয়াক্স- ওয়ান্ডার পথটা মসৃণ ছিল না স্পার্সের, কিন্তু সাথে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। সেই জেদের জোরেই একের পর এক রূপকথার জন্ম দিয়ে ফাইনাল খেলবে তারা।

     

     

    কেন শিরোপা জিতবে স্পার্স?

    মানসিকতা। হিউঙ-মিন বা লুকাস মউরা জাদু দেখালেও চাপ সামলে মাথা ঠান্ডা রাখায় জুড়ি নেই পচেত্তিনোর দলের। সিটি বা আয়াক্সের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগ দুটি তাই প্রমাণ করে। সেজন্য আজ লিড নিলেও হয়তো স্বস্তির নিঃশ্বাস এক মুহূর্তের জন্যও ফেলতে পারবে না লিভারপুল। প্রতি-আক্রমণেও তারা দারুণ। লিভারপুলের দুই ফুলব্যাকের আক্রমণে উঠে আসার কারণে পাওয়া ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে পারেন সন-এরিকসেনরা। ভার্জিল ভ্যান ডাইক দারুণ ফর্মে থাকলেও রক্ষণে তার সঙ্গী যেই হোক, তাকেই হয়তো টার্গেট করে খেলবে স্পার্স। জোয়েল মাতিপ বা দেয়ান লভ্রেন যেই খেলুক, স্পার্সের ফরোয়ার্ডদের সামনে হয়তো অসহায় হয়ে পড়তে হতে পারে। মাঝমাঠে মুসা সিসোকোর গতিও ব্যবধান গড়ে দিতে পারে। জর্ডান হেন্ডারসন, ফাবিনহোদের কেউই তেমন গতিশীল না হওয়ায় সিসোকো ক্লিক করলে মাঝমাঠেড় দখলটাও হয়তো পেয়ে যেতে পারে স্পার্স।

    কেন শিরোপা হারবে স্পার্স?

    লিভারপুলের 'গেগেনপ্রেসিং' ফুটবল। প্রিমিয়ার লিগে দুই ম্যাচেই লিভারপুলের কাছে হেরেছে স্পার্স। ক্লপের প্রেসিং ফুটবলের সামনে রীতিমত অসহায়ই মনে হয়েছিল স্পার্সকে। ম্যাচের শুরু থেকেই লিভারপুল প্রেস করে খেলবে, সেটার বিপরীতে স্পার্স তেমন প্রতিরোধ গড়তে পারবে কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। ডানপ্রান্তে কিয়েরন ট্রিপিয়ের বনাম মোহামেদ সালাহ দ্বৈরথের উপরও নির্ভর করছে অনেক কিছু। মিশরের ফরোয়ার্ডকে প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে আটকাতে পারেননি ট্রিপিয়ের। সালাহ গোল না করলেও ডানপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে বেশ সাফল্য পেয়েছিল লিভারপুল। শেষ পর্যন্ত ক্লপের দর্শনই হয়তো হতে পারে পচেত্তিনোর ট্রাজেডির মূল কারণ।

     

     

     

    এক্স ফ্যাক্টর

    হ্যারি কেইন

    প্রতি মৌসুমে স্পার্স বললেই কেইনের নামটাই শোনা যেত সবার আগে। কিন্তু এবার ইনজুরির জন্য দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তারপরও ফাইনালের আগে অনুশীলনে সম্পূর্ণ ফিট কেইনকে পাওয়া অবশ্যই স্পার্সের জন্য বিশাল ‘প্লাস পয়েন্ট’। ফিরে আসা আহত বাঘের মত কেইনই হতে পারেন আজ স্পার্সের ‘এক্স ফ্যাক্টর’। এত জল্পনা-কল্পনা যাকে নিয়ে, সেই কেইনের উপরই নির্ভর করছে পচেত্তিনোর একাদশ বাছাইয়ের চিন্তাভাবনা। ইংলিশ স্ট্রাইকারের ফিটনেস নিয়ে সংশয় থাকলে শুরু থেকে না নামিয়ে হয়তো 'ইম্প্যাক্ট সাব' হিসেবেই তাকে ব্যবহার করতে পারেন পচেত্তিনো। 

     

    যাদের ওপর চোখ

    হুগো লরিস

    এতদূর আসার পেছনে গোলে অধিনায়ক হুগো লরিসের কৃতিত্ব অসামান্য। বিশ্বকাপ জেতার ১ বছরের মাথায় চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলবেন ফ্রেঞ্চ গোলরক্ষক। আয়াক্স এবং সিটির মাঠে দুর্দান্ত সব সেভে দলকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। আবার এই মৌসুমে কিছু ভুলও করেছেন তিনি। ফাইনালে তিনি কেমন করেন, সেটাও পার্থক্য হতে পারে ম্যাচে।

    মুসা সিসোকো

    এই মৌসুমে স্পার্সের হয়ে সবচেয়ে ভালভাবে হয়তো নিজেকে চিনিয়েছেন মুসা সিসোকো। মিডফিল্ডারদের ইনজুরির কারণে বাধ্য হয়ে তাকে ফরোয়ার্ড লাইন থেকে সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন পচেত্তিনো। কিন্তু সেই সিসোকো যেন খোলনলচে বদলে নিলেন নিজেকে। গতিশীল হওয়ায় মাঝমাঠে বাড়তি সুবিধাও পেয়েছেন তিনি। আর আক্রমণে হ্যারি কেইনের অভাবে হিউঙ-মিন সন তো রীতিমত অনন্য। ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেনের দারুণ ধারাবাহিকতা ছাপিয়ে তাই ফাইনালের অনেক কিছু নির্ভর করবে সন-সিসোকোর উপর।

    হিউঙ-মিন সন

    কেইনের অনুপস্থিতিতে আক্রমণে স্পার্সের মূল ভরসা ছিলেন তিনিই। সিটির বিপক্ষে ইতিহাদে শুরুতেই জোড়া গোল করেছিলেন। আয়াক্সের বিপক্ষে জাল খুঁজে না পেলেও ছিলেন স্বরূপে। ফাইনালে কেইন, এরিকসেনদের মত সনের গতিবিধির দিকেও সতর্ক থাকতে হবে ভ্যান ডাইকদের। সুযোগ পেলেই লিভারপুলের রক্ষণভাগকে বিপদে ফেলতে পারেন তিনি।

    ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন

    কেইন, সন স্পার্সের ভরসা হলে এরিকসেন পুরো দলের 'নিউক্লিয়াস'। 'ফ্রি রোল'-এ খেলায় পুরো মাঠ চষে বেড়ান। ছোট পাস বা সেটপিস- স্পার্সের আক্রমণে এরিকসেনের সরব উপস্থিতি যেন বাধ্যতামূলক। সুযোগসন্ধানী থ্রু পাসে লিভারপুলের রক্ষণ চিরে কেইনদের পাস যোগানোর ক্ষমতা আছে তার। আর সরাসরি ফ্রিকিকে বিশ্বের সেরাদের একজন তিনি। তার পারফরম্যান্সের উপর নির্ভর করছে স্পার্সের পুরো ম্যাচের পারফরম্যান্স।

     

    স্পার্সের ট্যাকটিক্সের টুকিটাকি

    দলকে ৪-৩-১-২ ফর্মেশনে খেলাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন পচেত্তিনো। খুব সম্ভবত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ম্যাচে অবশ্য দল এবং ফর্মেশন বাছাইয়ে চমকও রাখতে পারেন তিনি। ৪-৩-১-২ হলে রক্ষণে লরিসের সামনে কিয়েরন ট্রিপিয়ের, টবি অল্ডারওয়েরেল্ড, ইয়ান ভার্টনহেন এবং ড্যানি রোজ। মাঝমাঠে ভিক্টর ওয়ানইয়ামার সঙ্গী হবেন ড্যালে আলি এবং সিসোকো। আক্রমণে কেইন এবং সন জুটির ঠিক পেছনে ’ফ্রি রোল’-এ থাকবেন এরিকসেন। কিন্তু সেমিতে মউরার পারফরম্যান্সের কারণে হয়তো আলাদা ভাবেও ভাবতে পারেন পচেত্তিনো। আক্রমণাত্মক ৪-৩-৩ ফর্মেশন হলে একটু পিছিয়ে মাঝামঠে নেমে আসবেন এরিকসেন, জায়গা হারাবেন ওয়ানইয়ামা। দুই প্রান্তে সন এবং মউরার মাঝে থাকবেন কেইন।

     

     

    লিভারপুলের দুই ফুলব্যাক ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড এবং অ্যান্ডি রবার্টসন বারবার উপরে উঠে যাওয়ায় দুই উইং দিয়ে আক্রমণের সুযোগ পেতে পারে স্পার্স। পুরোটাই আসলে নির্ভর করছে কেইনের ওপর। অনুশীলনে অংশগ্রহণ বা নিজে সম্পূর্ণ ফিট হওয়ার কথা জানালেও ইংলিশ স্ট্রাইকার শুরু থেকে হয়তো থাকতে পারেন বেঞ্চেও। সেক্ষেত্রে ৪-৩-১-২ ফর্মেশনে এরিকসেনের সামনে থাকবেন সন-মউরা। অবশ্য কেইন না থাকলেও ৪-৩-৩ এর চিন্তা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না পুরোপুরি। সেক্ষেত্রে কেইনের জায়গায় আসবেন ফার্নান্দো ইয়োরেন্তে। অবশ্য ইয়োরেন্তে তেমন গতিশীল না হওয়ায় কেইনকে ছাড়াও ৪-৩-৩ এ স্পার্সের খেলার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও হয়তো কম।

    ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে শেষ যেবার ইউরোপিয়ান কাপ ঘরে তুলেছিল স্পার্স, তখনও জন্মই হয়নি বর্তমান স্কোয়াডের কারোই। চ্যাম্পিয়নস লিগ নামকরণের পর এবারই প্রথম সেমিতে খেলেছে স্পার্স, প্রথমবারেই করেছে বাজিমাত। ক্লাব ফুটবলে স্কোয়াডের কারোই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা তো দূরে থাক, ফাইনাল খেলারও অভিজ্ঞতা নেই। অভূতপূর্ব এক ঐতিহাসিক ম্যাচের আগে তাই স্পার্সের চাওয়া একটাই, ঠিক ৩ যুগ পর ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ফিরে পাওয়া। কাজটা সহজ হবে না মোটেও, ফাইনালে 'আন্ডারডগ' হিসেবেই নামবে তারা। কিন্তু যাদের পুরো যাত্রাটাই 'ফেভারিট'-এর তকমাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে রোমাঞ্চকর সব প্রত্যাবর্তনে ঘেরা, সেই স্পার্সের এসব কেতাবী হিসেবে ভড়কে যাবে না, সেটা হয়তো জানা আছে সবারই।