• কোপা আমেরিকা
  • " />
    X

     

    কোপা আমেরিকা, রেফারিং, ভিএআর, বিতর্ক, মেসি, বিবিধ

    দুর্দান্ত এক ফুটবল ম্যাচ শেষ। জয়ী দলের প্রশংসা,  পরাজিত দলের ভুল-ত্রুটি বা হারের কারণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা। কখনও কখনও সেই গবেষণায় বাকি সব  ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠত রেফারির ম্যাচ বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত। সঠিক সিদ্ধান্ত, ভুল সিদ্ধান্ত। দিতেও পারতেন, না দিলেও পারতেন। কেন দিলেন। এমন রেফারি এমন ম্যাচে কেন? ঘুরে-ফিরে এই প্রশ্নগুলোই আওড়ানো হয়েছে এতোদিন। এতোদিন মানে, ফুটবলের আবিষ্কারের পর থেকেই।

    রেফারিরা সঠিক সিদ্ধান্ত দেন, ভুলও করেন। সেগুলোকে খেলার অংশ ধরে ধীরে ধীরে ভুল-ত্রুটি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলেছে বহুদিন ধরে। গোললাইন রেফারি বদলে একসময় রাখা হলো গোললাইন টেকনোলোজি। মাঠের রেফারিকে তো আর বাদ দেওয়া যায় না, তাই রেফারিদের সাহায্য করতে গত বিশ্বকাপে আনা হলো ভিডিও অ্যাসিসট্যান্ট রেফারি। ভিএআর নিয়ে শুরুতে  সন্দেহও ছিল যথেষ্ট। মোটা দাগে রাশিয়া বিশ্বকাপে ফুটবলের নতুন এই প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্য সফলই হয়েছে। সেবারও অবশ্য বিতর্ক তুলেছিল ভিএআর, ব্রাজিল সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপপর্বের ম্যাচ শেষে ফিফার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল প্রয়োগ বিধি নিয়ে জানতে চেয়ে, বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টাইন রেফারি নেস্তর পিতানা দেওয়া পেনাল্টি সিদ্ধান্ত- এসব নিয়ে বিতের্ক হয়ত হয়েছে সেসময়, এটুকু বিতর্ক হয়ত এড়ানোও যাবে না। আর সেগুলো সেভাবে বড় প্রভাব ফেলেনি ম্যাচে। তাই বিশ্বকাপের পর লা লিগা, সিরি আর মতো লিগের পর চ্যাম্পিয়নস লিগেও ব্যবহৃত হয়েছে ভিএআর। বিশ্বকাপে যতোখানি সফল ঠিক ততোখানি সফল অবশ্য চ্যাম্পিয়নস লিগে হয়নি, ভিএআর কিছুটা বিতর্ক ছড়িয়েছে সময়ে-সময়ে।

    ভিএআর জায়গা করে নিয়েছে ফুটবলে, তবে সমস্যা থেকে গেছে এর প্রয়োগ নিয়ে। আলোচনা বা বিতর্কও সেই প্রয়োগবিধি নিয়েই। প্রযুক্তির সহায়তা আছে, ভিডিও রিপ্লে দেখার সুযোগ আছে- রেফারিকে দেখভাল করার জন্যই থাকছে আরও একদল রেফারি। রেফারির তাই ছায়া আছে, এখন আর তিনি অতোটা অসহায় নন। এতোদিন তাই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি রেফারির ঘাড়ে দোষ চাপানো গেলেও এখন সেটার পেছনে নিমিষেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খুঁজে নিতে হচ্ছে!

    কোপা আমেরিকা খুব সম্ভবত ভিএআর যুগের সবচেয়ে নিম্ন বিন্দুটা দেখিয়ে দিয়ে গেল। ব্রাজিলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচশেষে  লিওনেল মেসির করা পক্ষপাততুষ্ট রেফারিংয়ের অভিযোগের ধরন বা প্রকরণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে রেফারি আর ভিএআরের গলদ তাতে এড়ানো যায় না।

    কোপা আমেরিকায় ভিএআরের শুরুটাই হয়েছিল বিতর্ক দিয়ে। প্রথম ম্যাচেই ভিএআরের সাহায্য দরকার হয়েছিল রেফারির। দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম মিনিটে সেটার সুফল পেয়েছে ব্রাজিল। কিন্তু মাঠের বাইরে থাকা টেলিভিশনে রিপ্লে দেখার সময় রেফারি ও ভিএআর রেফারির কথোপকথন টিভি ব্রডকাস্টে  শোনা গেল স্পষ্ট। সেটা ধোঁয়াশা তৈরি করলো একবার। পরে ওই প্রতিষ্ঠান জানালো এটা স্রেফ সম্প্রচারের সমস্যা কারণে হয়েছে, পরেরবার এমনটা আর হবে না। এরপর আর কোনো ম্যাচে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি বটে, যা ঘটেছে সেটা ওই প্রথম ম্যাচের গলদ ভুলিয়ে দিয়েছে পুরোপুরি।
     

    যে ম্যাচ নিয়ে এতো কথা সেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালেই ফেরত যাওয়া যাক।



    ঘটনা ১
    লিওনেল মেসি থ্রু পাস বাড়িয়েছিলেন ডিবক্সের ভেতর।  সার্জিও আগুয়েরো পাশ থেকে দৌঁড়ে ঢুকছিলেন। দানি আলভেজ পথ রোধ করে বেশ জোরে সোরেই ধাক্কা মেরেছিলেন আগুয়েরোকে। বল অবশ্য আগুয়েরো পর্যন্ত পৌঁছায়নি, তার আগেই থিয়াগো সিলভা বল ক্লিয়ার করেছিলেন। ঠিক ওই কাউন্টার অ্যাটাক থেকেই ব্রাজিল দ্বিতীয় গোলটি পেয়ে যায়।

    এখানে যা হয়েছে
    ভিএআর যদি আলভেজের করা সম্ভাব্য ফাউলটি ততক্ষনাত এড়িয়েও যায়, এরপরও ভিএআরের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গোল রিভিউ হয়। সেই গোলের বিল্ডআপে কোনো ফাউল ছিল কী না সেটাও দেখে নেওয়া হয়। ফাউল থাকলে মাঠে থাকা রেফারিকে ভিএআর কক্ষে থাকা রেফারি পরামর্শ দেন গোল বাতিল করার, বাঁ মাঠের পাশে থাকা টেলিভিশনে আরেকবার রিপ্লে দেখার। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার,ভিএআর কোনোভাবেই রেফারিকে সিদ্ধান্ত দিতে বা বদলাতে নির্দেশ দিতে পারবে না। ভিএআরের কাজ পরামর্শ দেওয়া। মাঠের মূল রেফারির হাতেই সব দায়ভার। অর্থাৎ নিয়ম অনুযায়ী আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য ওই পেনাল্টি ভিএআরের সাহায্যে রিভিউ হয়েই এসেছে।

    সংশয় যেখানে
    সেমিফাইনালের মতো বড় ম্যাচ। টিভি রিপ্লে দেখে দর্শকেরাই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছেন আগুয়েরো পেনাল্টিটা পেতে পারতেন। ডিফেন্ডারদের এর চেয়েও ঠুনকো চ্যালেঞ্জে পেনাল্টি পেতে দেখা যায়। সেখানে এরকম একটি চ্যানেঞ্জ রেফারি এড়িয়ে যান কীভাবে? আর এ ঘটনা কয়টি অ্যাঙ্গেল থেকে পরখ করা হয়েছে? তার কিছুই জানার উপায় নেই। সংশয় তৈরি হয়েছে এখানটাতেই।

    এরপর অবশ্য রেফারির পক্ষেও যুক্তি দাঁড় করানো যায়।  ভিএআর শুধুমাত্র তখনই রেফারিকে সিদ্ধান্ত বদলের পরামর্শ দেবে যখন তিনি ‘পরিস্কার ও শতভাগ ভুল’ করবেন। মেসির দেওয়া থ্রু পাসটি আগেই সিলভা ক্লিয়ার করেছিলেন সেটাও একটা যুক্তি হতে পারে পেনাল্টি না দেওয়ার ক্ষেত্রে। কিন্তু ভিএআর যখন আপনার হাতে তখন আর সে যুক্তি খাটে না ঠিক সেভাবে। ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো  সিদ্ধান্তগুলোর জন্যই তো ভিএআর আবিষ্কার।


    ঘটনা ২
    কর্নার ছিল আর্জেন্টিনার। আর্থার আর নিকোলাস অটামেন্ডি বক্সের ভেতর। আর্থারের বাহু দিয়ে মারা ধাক্কায় উলটে পড়েছিলেন অটামেন্ডি। আর্জেন্টিনা পেনাল্টির দাবি করেছিল, কিন্তু রেফারি এড়িয়ে গেছেন সেটা।

    এখানে যা হয়েছে
    বক্সের ভেতর চোখ ছিল না রেফারির। হয়ত তার দৃষ্টিতে এড়িয়ে গেছে ওই ঘটনা। ভিএআরও মনে করেছে এখানে ক্লিয়ার মিস্টেক নেই।

    সংশয় যেখানে
    বক্সের ভেতর দুইপক্ষের খেলোয়াড়দের গুঁতোগুতি বন্ধ করা গত বিশ্বকাপে ভিএআরের অন্যতম সেরা কৃতিত্ব ছিল। কনুই মারা, ধাক্কা মারা, পায়ে হালকা খোঁচা দেওয়া- ডিফেন্ডারদের এসব পুরনো কৌশল একরকম মাটি চাপা দিতে হয়েছে এরপর। ডিফেন্ডাররাও জানেন বক্সের ভেতর এসব করে পার পাবেন না তারা।

    এখানেও কোপা আমেরিকার ভিএআর এড়িয়ে গেছে এই ঘটনা। তাদের হাতে যথেষ্ট ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ছিল কী না সেটাও অজানা। বিশ্বকাপে ভিএআরের যে রূপ দেখা গিয়েছিল, কোপায় উলটে গেল তার চেহারা।


    ঘটনা ৩
    চিলি-আর্জেন্টিনা তৃতীয় স্থান নির্ধারনী ম্যাচ। চিলি অধিনায়ক গ্যারি মেডেল বাইলাইনের দিকে দৌঁড়াচ্ছিলেন, বল চলে যাচ্ছিল বাইরেই। পেছনে ছিলেন মেসি। প্রথমে মেসি কিছুটা পুশ করেছিলেন, মেডেলও পেছনে ফিরে ধাক্কা দিলেন মেসিকে। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক দাঁড়িয়েই ছিলেন, আর মেডেল তোপ ঝাড়ছিলেন তার ওপর। রেফারি এলেন, এসে দুইজনকেই লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দিলেন।

    এখানে যা হয়েছে
    ম্যাচের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রেফারি হারিয়েছেন নিজের নিয়ন্ত্রণ। নিজেও উত্তপ্ত হয়ে দুইজনকেই লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে, এরপরও ভিআর কেন সাহায্যে এলো না?

    সংশয় যা নিয়ে
    এটা মোটামুটি নিশ্চিত দুই খেলোয়াড়ের কেউই লাল কার্ড দেখার মতো অপরাধ করেননি। আর যদি করেও থাকেন, সেটা মেডেল হতে পারে। আর রেফারি হয়ত যে ছন্দে খেলা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন তাতে হয়ত কড়া হতে চেয়েছিলেন কিছুটা। তার চোখে অসদাচরণ মনে হতে পারে। সর্বোচ্চ হলুদ কার্ড দেখতে পারতেন মেসি। মেডেলের হলুদ কার্ড দেখাটা অবশ্য প্রাপ্যই মনে হয়েছে।

    কোনো খেলোয়াড়কে সরাসরি লাল কার্ড দেখানো হলে ভিএআরে সরাসরি রিভিউ হয়ে যায় সেই ঘটনা। মিলিইয়ে দেখা হয় রেফারির সিদ্ধান্ত সঠিক কী না। রেফারি নয় মাঠের পরিস্থিতিতে মেজাজ হারিয়েছেন। ভিএআর তো স্টেডিয়ামের ধারে কাছ থেকেও অপারেট করা হয় না। বাইরের এক শহরে এক কক্ষে বসে ভিএআর দল। সেখান থেকে কোনো পরামর্শ না আসাটা বিস্ময়কর শুধু নয়, হতাশারও।


    ঘটনা ৪
    পেরু ডিফেন্ডার জামব্রানোর সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে গিয়ে ফাইনাল ম্যাচের ৭০ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছেন গ্যাব্রিয়েল হেসুস।

    এখানে যা হয়েছে
    জামব্রানোর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরেই ঠোকাঠুকি চলছিল হেসুসের। প্রথমার্ধেও একবার হলুদ কার্ড দেখেছিলেন তিনি। রেফারির কাছে মনে হয়েছে যথেষ্ট সতর্ক হয়ে খেলছেন না হেসুস। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখাতে তাই দ্বিধা করেননি।

    সংশয় যা নিয়ে
    দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের ক্ষেত্রে ভিএআর সিদ্ধান্ত রিভিউ হওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু দুই হলুদ কার্ড মানেই লাল কার্ড। সেটা মানে একজন কমে যাওয়া। ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতোই অবস্থা। তাহলে কোন যুক্তিতে রিভিউয়ের পদ্ধতি থাকবে না এখানে? হেসুসের লাল কার্ড ব্রাজিলকে আর ভোগায়নি, তবে দশ নিয়ে ব্রাজিল যদি ম্যাচটা শেষ পর্যন্ত হেরে বসতে তাহলে এ ঘটনা হয়ত ছাপিয়ে যেত বাকি সবকিছুকে।

    এখানে অবশ্য ভিএআরের বর্তমান নিয়মের পক্ষেও যুক্তি আছে। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড রিভিউ করা হলে, প্রথম হলুদ কার্ডও রিভিউয়ের প্রয়োজন হবে। কিন্তু ভিএআরের লক্ষ্য খেলার স্বাভাবিক গতিতে বিঘ্ন না ঘটানো। দুইয়ের সাম্যাবস্থা প্রয়োজন তাই এক্ষেত্রে। ফুটবলের আইন প্রণেতা আইএফবি অবশ্য এই কাজে হাত দিয়েছে এরই মধ্যে।




    দিনশেষে রেফারি নিজেই সব সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সে অধিকার তার রয়েছে। ভিএআর যদি তাকে পরামর্শও দেয় রিপ্লে দেখার, সেটাও অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা তার রয়েছে। কিন্তু ওপরের এই চারটি ঘটনা রেফারি আর ভিএআরের সমন্বয়হীনতার এই চিত্রগুলো আসলে স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে, নতুন এই প্রযুক্তিতে এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি রেফারিরা। গত বিশ্বকাপের চিত্রটা আলাদা হওয়ারও যথেষ্ট কারণ আছে। সেবার প্রায় এক বছর ধরে রেফারিদের আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিল ফিফা। আর মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট হওয়ায় এখানে রেফারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন দক্ষিণ আমেরিকার রেফারিরাই। তাদের একটা বিরাট অংশই গত  বিশ্বকাপের  ম্যাচ অফিসিয়াল ছিলেন না। যে তিন ম্যাচের রেফারিদের কথা আলাদা করা বলা হয়েছে ওপরে, তারাও বিশ্বকাপে না থাকাদের দলেরই অন্তভভুর্ক্ত।  আর সংশয় আরও বাড়িয়েছে রেফারির অ্যাঙ্গেল থেকে টিভি রিপ্লে দর্শকদের জন্য সম্প্রচার না করায়। অথচ গত বিশ্বকাপ বা ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগেও দর্শকদের জন্য একই অ্যাঙ্গেল থেকে টিভি রিপ্লে দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। কোপা আমেরিকার ব্যবস্থাপনাকে তাই এই প্রশ্নগুলো তীরবিদ্ধ্ব করছে বারবারই।

    যদিও কোপা লিবার্তাদরেস ও কোপা সুদামেরিকানার কল্যাণে ভিএআর প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে। তবে রেফারিদের যে হাত তাতে পাকেনি তার নিদর্শন তো এই সংশয় সৃষ্টি করে দিয়ে যাওয়া ভুলগুলোই। অথচ ভিএআররের সংশয়ের হাত থেকেই মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রতি ম্যাচে সেটাই হয়ে যাচ্ছে নায়ক। প্রশিক্ষিত লোকের হাতে পড়লে ভিএআর তাই দিতে পারে বিশ্বকাপের মতো নির্ভেজাল এক টুর্নামেন্ট আর উলটোটা হতে পারে এবারের কোপা আমেরিকার মতো বিতর্কিত।


    আরও পড়ুনঃ ভিএআর কী? কখন ব্যবহার হয়?


    ভিএআর কোপা আমেরিকাকে বিতর্কিত করেছে যথেষ্ট ব্যবহার না হওয়ার কারণে। অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোর ফাইনালেও জার্মানি-স্পেনের ম্যাচেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে ভিএআর।  আর মেয়েদের বিশ্বকাপে ঘটেছে উলটোটা। এখানে ভিএআরের যথেচ্ছা ব্যবহার মোটামুটি বিরক্ত করে দিয়ে গেছে খেলোয়াড়, কোচ, ধারাভাষ্যকার, বিশ্লেষক, দর্শকদের।

    ফিফার নতুন কিছু নিয়মের প্রয়োগ শুরু হয়েছে জুন মাস থেকে। নতুন নিয়ম বাতিক সৃষ্টি করেছে অন্য আরেকটি বিষয়। পেনাল্টির সময় গোলরক্ষকদের পা গোললাইনে থাকার নিয়ম বহু পুরনো। যদিও এই নিয়ম কঠোরভাবে এতোদিন ফুটবলে পালন করা হত না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী অন্তত একটি পা গোললাইনে থাকতেই হবে গোলরক্ষকদের, নইলে হলুদ কার্ডের বিধান রাখা হয়েছে।  মেয়েদের বিশ্বকাপে গোলরক্ষকের এই লাইন ছেড়ে আসা না আসাও ভিএআরের সাহায্যে রিভিউ করা হয়েছে। কয়েক সেন্টিমিটারের দূরত্বেও তাই হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে গোলরক্ষকদের। সেটা বিরক্তি তুলে দিয়েছে আরও।

    ভিএআরের এমন প্রয়োগ খেলাটা আরও জটিল তুলছে বলে প্রিমিয়ার লিগ অবশ্য নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে আগেই। প্রথমবারের মতো নতুন মৌসুম থেকে সেখানে চালু হচ্ছে ভিএআর, এতোদিন এফএ কাপে থাকলেও বাকি লিগ গুলোর মতো প্রিমিয়ার লিগ ভিএআর নিচ্ছে খানিকটা দেরি করেই। তবে পেনাল্টির ক্ষেত্রে গোলরক্ষকের পজিশন জানতে রেফারির চোখের ওপরই ভরসা করবে তারা, আলাদা করে ভিএআরে রিভিউ হবে না- প্রিমিয়ার লিগ সেটাও নিশ্চিত করে দিয়েছে।  

    নতুন নিয়ম অনুযায়ী কোনো খেলোয়াড় গোলের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে হাত দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করলে বা ওই আক্রমণে সাহায্য করলে- সেটাও ভিএআর রিভিউয়ে গোল বাতিল হবে। ফ্রি পেয়ে যাবে প্রতিপক্ষ দল। এখানে অবশ্য রেফারিদের জন্য কাজ সহজ করে দেওয়া হয়েছে কিছুটা। ইচ্ছাকৃত আর অনিচ্ছাকৃত হ্যান্ডবলের গ্রে জোন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে ফুটবল। তবে পেনাল্টির ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে নিয়ম। বক্সের ভেতর ডিফেন্ড করার সময়ে শরীরের স্বাভাবিক আকৃতির বাইরে হাত থাকলে, আর সে হাতে বল লাগলে পেনাল্টি পেয়ে যাবে অন্যদল। এখানেও ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত হ্যান্ডবলের যুক্তি আর টিকবে না এখন থেকে।

    কিন্তু সেটা নিয়েও ঝামেলা আছে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের রেফারিদের মধ্যে। ফুটবলের নতুন নিয়ম নিয়ে যখন কথা চলছিল, সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর হয়ে বিশ্বকাপ খেলা সাবেক গোলরক্ষক শাকা হিসলপ। তার মতে, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ- দুই মহাদেশের রেফারিদের কাছে হ্যান্ডবলের সংজ্ঞাই নাকি কিছু ক্ষেত্রে দুইরকম। কোপার ফাইনালে থিয়াগো সিলভার বিপক্ষে ডাকা পেনাল্টির কথা এখনই ভুলে যাননি নিশ্চয়ই? ক্রস ঠেকাতে স্লাইড করেছিলেন সিলভা, মাটিতে স্বাভাবিকভাবে নেমে আসা হাতেই বল লেগেছিল তার। হিসলপ বলছেন ওই বৈঠকে উপস্থিত ইউরোপিয়ান রেফারিরা এ ধরনের ঘটনায় হ্যান্ডবল ডাকার পক্ষে নন। আর উলটোটা দক্ষিণ আমেরিকার রেফারিদের ক্ষেত্রে, তারা সবাই এক বাক্যে এই ঘটনাকে বলছেন পেনাল্টি। তাদের যুক্তি অনুযায়ী কাঁধের উচ্চতার ওপরে ওঠা হাতে বল যেভাবেই লাগুক, সেটা হ্যান্ডবল বলে গন্য হবে। আর ইউরোপিয়ানরা বলছেন, স্লাইড মারতে গেলে হাত এভাবেই নেমে আসবে। এখানে কিছু করার নেই! এসব ক্ষেত্রে নতুন মৌসুমে ভিএআরের আরেক প্রস্থ রঙ্গ দেখতে প্রস্তুত থাকতে পারেন।  

    এতোকিছুর পর অবশ্য কনকাকাফ অঞ্চলের কর্তারা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে পারেন। প্রায় একই সময়ে চলা কনকাকাফ গোল্ডকাপে এবার রাখা হয়নি ভিএআর। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাদের কাছে যথেষ্ট প্রশিক্ষিত রেফারি নেই। সেটা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকোতে। একই সময়ে চলা তিন টুর্নামেন্টে তাই সবচেয়ে বেশি বিতর্কমুক্ত হয়েছে এবার কনকাকাফ গোল্ডকাপই!

    ভিএআর বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য এমন যুক্তি হাস্যকর শোনাবে। ভিএআর ফুটবলে এসেছে থাকতেই। বুড়ো ফুটবলের আকছে ভিএআর এখনও হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলছে। এই প্রযুক্তি নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে এখনও এর  প্রয়োগবিধি নিশ্চিত করতে না পারায় কিছুটা হতাশ আপনি হতেই পারেন। মেসিই যেমন হতাশায় উদ্গিরণ ঘটিয়েছেন রাগের, এরপর এমন সব কথা বলেছেন যা কোনোদিন বলেননি, হয়ত আগামীতেও বলবেন না। মানুষের দোষ মানা যায়, কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করেও ভুল ভ্রান্তির সংশোধন না হওয়াটা হতাশারই। এমনটা চলতে থাকলে, মেসির দলে যোগ দেবেন হয়ত আরও অনেকেই। তার আগেই লাগামটা টেনে ধরতে পারবে তো ফিফা? নাকি ভারের ভারটা কি একটু বেশিই হয়ে গেল তাদের জন্য?