• সিরি আ
  • " />

     

    কেমন হবে নতুন জুভেন্টাস?

    সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আয়াক্স থেকে ডাচ ডিফেন্ডার মাথিয়াস ডি লিটকে দলে নিয়েছে জুভেন্টাস। ‘ফ্রি ট্রান্সফার’-এ দলে আগেই এসেছেন অ্যারন রামসি এবং আদ্রিয়ান রাবিও। মরিজিও সারির অধীনে নিজেদের প্রথম মৌসুমের আগে দলবদলের বাজারে বেশ ব্যস্ত সময়ই কাটাচ্ছে ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। নিজস্ব দর্শন 'সারি বল'-এ দল সাজানোয় 'দার্শনিক' উপাধি পেয়েছেন সারি। ২০১৯-২০ মৌসুমের আগে তাই ইতালিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তুরিনের ওল্ড লেডিদের নিয়ে। কেমন হবে সারির জুভেন্টাস? 

    নাপোলি, চেলসির পর এবার জুভেন্টাসও পেতে যাচ্ছে ‘সারি বল’-এর স্বাদ। ক্যারিয়ারে নিজের এই দর্শন দিয়েই নজর কেড়েছেন সারি। টিকিটাকার সাথে কিছুটা মিল থাকলেও ‘সারি বল’-এর মূল শক্তি খুব সম্ভবত প্রেসিং। ইয়ুর্গেন ক্লপের লিভারপুল বা বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের ‘গেগেনপ্রেসিং’-এর সাথেও ‘সারি বল’-এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। আপাতদৃষ্টিতে ৪-৩-৩ ফর্মেশন মনে হলেও সারির জটিল দর্শনে সফল হতে গোলরক্ষক থেকে স্ট্রাইকার- সবারই পাসিং এবং প্রেসিং হতে হয় নিখুঁত। বল পায়ে ওয়েচেক শেজনি, জর্জিও কিয়েলিনি, ডি লিটদের থেকে তাই ধারাবাহিকতাই চাইবেন সারি। 

    পাসিংয়ের মত প্রেসিংয়ের দিকেও সমান মনযোগ দেওয়া ‘সারি বল’-এ প্রতি-আক্রমণে গোল করাকে যেন রুটিনই বানিয়ে ফেলেছিল নাপোলি। ২০১৭-১৮ মৌসুমে লিগে নাপোলির ২৪টি গোল এসেছিল প্রতি-আক্রমণে। হামসিক-মার্টেনসদের সাথে কাউন্টারে করা গোলের বেশিরভাগ অ্যাসিস্ট এসেছিল দুই ফুলব্যাক এলসি হুসাই (৬), ফাওজি গুলাম (৭)-এর পাস থেকেই। সারির অধীনে জুভেন্টাসের ফুলব্যাক পজিশনে হোয়াও ক্যান্সেলো এবং অ্যালেক্স সান্দ্রোকেই দেখা সম্ভাবনা বেশি। সাথে আক্রমণে আছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ফেদেরিকো বের্নার্দেস্কি, ডগলাস কস্তারা থাকায় আগামী মৌসুমে প্রতি-আক্রমণে করা গোলের দৌঁড়ে হয়তো শুরুর দিকেই থাকবে তুরিনের বুড়িরা।

     

     

    ‘সারি বল’-এর সবচেয়ে জটিল অংশ খুব সম্ভবত মাঝমাঠ। মজার ব্যাপার হল, ‘থ্রি ম্যান মিডফিল্ড’-এর জন্যও আলাদা ফর্মেশন আছে সারির। ১-১-১ ফর্মেশনে খেলে থাকেন সারির তিন মিডফিল্ডার। রক্ষণের ঠিক সামনে খেলা মিডফিল্ডারের দায়িত্ব থাকে ডিফেন্ডারদের রক্ষণে সাহায্য করার সাথে আক্রমণে ফরোয়ার্ডদের পাস যোগানো। চেলসি, নাপোলি- দুই ক্লাবেই এই কাজটি করেছেন জর্জিনিয়ো। জুভেন্টাসে ‘ডিপ লাইং মিডফিল্ডার’ হিসেবে সারির একাদশে এমরে চান বা আদ্রিয়ান রাবিওকে দেখা সম্ভাবনাই বেশি।

    ‘ডিপ লাইং মিডফিল্ডার’-এর সামনে একজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে খেলান সারি। নাপোলিতে এই রোলে ছিলেন পিওতর জিয়েলিনস্কি, চেলসিতে ছিলেন এন’গোলো কান্তে। জুভেন্টাসে এই পজিশনে হয়তো দেখা যাবে অ্যারন রামসি বা ব্লেইজ মাতুইদিকে। আর তিন ফরোয়ার্ডের ঠিক পেছনে খেলবেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। সারির একাদশে রোনালদোদের ঠিক পেছনে এই রোলে খেলার সম্ভাবনা বেশি মিরালেম পিয়ানিচেরই। মাঝমাঠ বা আক্রমণে সাধারণত গতিশীল ফুটবলারই বেশি পছন্দ সারির। সেজন্য হয়তো তার একাদশে পাউলো দিবালার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কম।

    আক্রমণে অবশ্য মাঝমাঠের মত এত মারপ্যাঁচ নেই সারির একাদশে। দুই প্রান্তে দুই উইঙ্গারের সাথে মাঝে একজন স্ট্রাইকার। জুভেন্টাসে যোগ দিয়েই রোনালদোর সাথে প্রথম সাক্ষাতে তাকে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর ইচ্ছা জানিয়েছিলেন সারি। সেক্ষেত্রে রোনালদোর সাথে দুই প্রান্তে হয়তো দেখা যাবে বের্নার্দেস্কি এবং কস্তাকে। নাপোলিতে সারির মূল স্ট্রাইকার ছিলেন গঞ্জালো হিগুয়াইন। সেজন্য ক্রস করার চেয়ে কাট করে ভেতরে ঢুকে পাস বাড়ানো বা শট করতেন ইনসিনিয়ে-মার্টেন্স। চেলসিতে মোরাতা-জিরু থাকায় ক্রসনির্ভর খেলাতেন সারি। ডানপ্রান্তে কাট করে শট বা পাস বাড়ানোতে দারুণ পারদর্শী কস্তা, স্ট্রাইকার হিসেবে আছেন রোনালদো। সেক্ষেত্রে আক্রমণে কোন ট্যাকটিক্স অনুসরণ করবেন সারি, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

    জুভেন্টাসে হিগুয়াইনের সাথে পুনর্মিলন হচ্ছে সারির, তবে তুরিনে থাকা নিয়ে সংশয় আছে তার। হিগুয়াইন বা মারিও মানজুকিচকে কীভাবে ব্যবহার করেন সারি, সে ব্যাপারে আছে প্রশ্ন। রোনালদোকে স্ট্রাইকার না খেলিয়ে উইঙ্গার হিসেবেও খেলাতে পারেন সারি। সেক্ষেত্রে হয়তো স্ট্রাইকার থাকবেন হিগুয়াইন বা মানজুকিচ। 

     

     

    আক্রমণের চেয়েও রক্ষণের সময় আরও জটিল হয়ে পড়ে ‘সারি বল’। গোছানো আক্রমণ এবং ক্রসনির্ভর খেলা প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখতে সারির ফর্মেশন হয়ে যায় দু’রকম। পাসিং ফুটবলে বিশ্বাসী প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকার সময় ৪-৩-৩ ভেঙ্গে ৪-৫-১ এ পরিণত হয় তার ফর্মেশন। তিন ফরোয়ার্ডের দুজন নেমে আসেন মাঝমাঠে, জুভেন্টাসে সেই কাজটা হয়তো করবেন বের্নার্দেস্কি এবং কস্তা। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের ৫ জনের প্রেসিংয়ে গোছানো আক্রমণ গড়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। প্রান্তবদল করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারে না প্রতিপক্ষ।

    আর ক্রসনির্ভর খেলা থামাতে ৪-৩-৩ ভেঙ্গে হয় ৪-৪-২ হয়ে যায় ‘সারি বল’। সেক্ষেত্রে একজন ফরোয়ার্ড নিচে নেমে বনে যান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। দুই ফুলব্যাকের সামনে দুই প্রান্তে আরও দুজন মিডফিল্ডার। তাই ডান বা বাঁ-প্রান্ত থেকে ক্রস করার জায়গা বের করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের জন্য। সামনে দুজন ফরোয়ার্ড থাকায় প্রেসিং করে বল কেড়ে নিতে পারলে প্রতি-আক্রমণে গোল পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় অনেকখানি।

    প্রতিপক্ষ যেমনই হোক, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই ইউরোপে নজর কেড়েছিলেন সারি। আক্রমণাত্মক ফুটবলকে নিউক্লিয়াস ধরে 'সারি বল' সাজিয়েছেন তিনি। শুনতে বেশ জটিল মনে হলেও এই ফর্মুলা খাটিয়েই নাপোলির বানিয়েছিলেন আক্রমণের দিক দিয়ে ইউরোপের অন্যতম আনন্দদায়ী দল, চেলসিতে এসে জিতেছেন নিজের প্রথম শিরোপা। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা নিতেই জুভেন্টাসে এসেছেন, বলেছেন নিজেই। সাফল্য এবং শিরোপার জন্য সম্ভাব্য সব রসদই আছে তার। এখন অপেক্ষা নেপলসের মত তুরিনেও নিজের সামর্থ্যের জানান দেওয়ার, অপেক্ষা ইতালির মত ইউরোপেও জুভেন্টাসের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করা।