• " />

     

    সাফ ব্যর্থতায় মলিন বাকি সব অর্জন

    বরাবরের মতো অনেক স্বপ্ন দেখিয়েও আরো একটি হতাশার বছর কাটলো বাংলাদেশের ফুটবলে। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ আর বাংলার মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৪ এএফসি ফুটবলের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাদ দিলে আর তেমন কোনো সাফল্যই নেই ফুটবলে। বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টের সাফল্য পুরো বছরে একটি ফুটবলখেলুড়ে দেশের একমাত্র সাফল্য হওয়াটা অসম্মানজনকই বটে। সাফ ফুটবলে গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে না পারাটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবলের বেহাল দশাটা।

    অথচ বছরের শুরুটা হয়েছিলো অনেক আশা নিয়েই। শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ হেরে গেলেও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপকে বাফুফের সফল উদ্যোগই বলতে হবে। তবে এই সাফল্যের উল্টো পিঠেই আবার ছিল অনেকগুলো প্রশ্ন। ৬ দলের টুর্নামেন্টের ৩টিই ছিলো বয়সভিত্তিক দল। অনূর্ধ্ব-২২ মালয়েশিয়া দলের কাছে দেশের মাটিতে ফাইনালে হেরে যাওয়াটা কি লজ্জার না? অনূর্ধ্ব-২২ অথবা ২৩ দলের কাছ থেকে শেখারই বা কি থাকতে পারে বাংলাদেশের দলের?



     

    শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে না খেলার অনভিজ্ঞতার জাল থেকে অবশ্য মুক্তি মিলেছে এর কিছুদিন পরই। বছরের শুরুর দিকে র‍্যাংকিং-এ এগিয়ে থাকার সুবাদে বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ প্রাক বাছাই এর পরিবর্তে সরাসরি বাছাইপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন  করে বাংলাদেশ। সেখানে অস্ট্রেলিয়া ও জর্ডানের মতো দলের বিপক্ষেও খেলার সুযোগ পায় লাল-সবুজরা। অস্ট্রেলিয়ার  বিপক্ষে পার্থে ৫ আর ঢাকায় ৪ গোলে হারলেও তাই অর্জনের খাতাটা শুন্য নয়। জর্ডানের বিপক্ষে ভালো খেলেও বড় ব্যবধানেই হারতে হয়েছিলো। সহজ সব গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে হয়তো সে ম্যাচেই পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারতো বাংলাদেশ। উল্টো ৪-০ তে হেরে ঐ ম্যাচে হারের বলির পাঁঠা হন লোডভিক ডি ক্রুইফ। দ্বিতীয় দফায় কাজ করতে এসে ৬ মাসের মাথায় আবারো দেশে ফিরে যেতে হয়েছে এই ডাচ কোচকে।

     

    নতুন কোচ লোপেজের অধীনে তাজিকিস্থানের বিপক্ষে ৫ গোলের হারটা কালো একটা দাগ হয়েই থাকবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাই এর ইতিহাসে। লোপেজের বিদায়ের পর সাফ ফুটবলকে সামনে রেখে বাফুফে নিয়োগ দেয় দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্স ধারী কোচ মারুফুল হককে। প্রথম দুই ম্যাচ হেরেই নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের সাফ ভাগ্য। এরপর বিদায় জানান মারুফুল হক-ও। 
     




     

    সাফ শেষে একরকম টালমাটাল অবস্থা বাংলাদেশের ফুটবলে। কোচের পর ব্যর্থতার দায় নিয়ে অধিনায়ক মামুনুল সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। দলের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ম্যানেজারও। দলে ‘গ্রুপিং’ এর আভাসও পাওয়া গেছে মাঠের খেলায়।

     

    অথচ সাফ ফুটবলকে ঘিরেই বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতার চক্র আবর্তিত হয়। এমন এক টুর্নামেন্টেও চরম অপেশাদারিত্বের নজর রেখেছেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। একবার-দুইবার না, টানা তৃতীয়বার গ্রুপ পর্বের গেরো পেরোতে ব্যর্থ বাংলাদেশ। সব দেখে শুনে বাফুফেও নড়ে–চড়ে বসেছে। তবে কঠিন সত্য হচ্ছে এই দলের যে শ্রী, তাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনলেও তেমন কোন পরিবর্তন হয়তো আসবে না।

     

    একের পর এক হারতে থাকা বাংলাদেশের এই দলটির জয়ের ক্ষুধা ফিরিয়ে আনা কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। তার সাথে যোগ হয়েছে মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের অভাব। জাতীয় দলে খেলা অনেক খেলোয়াড়েরই শারীরিক বা মানসিক কোনো যোগ্যতাই নেই জাতীয় দলের খেলার। তবুও খেলছেন। গোল করার মতো স্ট্রাইকার নেই, ডিফেন্ডারদের চিরাচরিত একই রকম ভুলগুলো দেখতে দেখতেও অনেকে বিরক্ত। খেলা শুরুর আগ পর্যন্তও আগাগোড়া প্রস্তুত, মাঠে নামলেই হারিয়ে যাচ্ছে সব! তাহলে সমস্যাটা কোথায়? হঠাৎই কি উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলো বাংলাদেশ দল? আসছে নতুন বছর কি পারবে প্রশ্ন গুলোর সমাধান খুঁজতে?   
     

    এতো আঁধারের মাঝেও আলো ফুটিয়েছে বাংলাদেশের ১৬ না পেরোনো কিশোরেরা। বড়রা না পারলেও সিলেটের মাটিতে ভারতকে হারিয়ে ঠিকই সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ এর ট্রফিটা নিজেদের করে নিয়েছে সাদ, ফাহিম, নিপুরা। ভালো করেছে অনূর্ধ্ব-১৯ দলও। ফাইনালেও যাওয়া হয়নি। তবে সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পরার দোষ কেবল কপালের ওপরই চাপাতে পারে রোহিতরা। সঠিক পরিচর্যা পেলে হয়তো আগামী ৫ বছর পর আর প্রতিভার হাহাকার থাকবে না বাংলাদেশের ফুটবলে।




     

    ফুটবলে প্রতিভার খরাটা আগেই চোখে পড়েছিল বাফুফের। সমস্যা নিরসনে বিদেশী ফুটবলারদের নাগরিকত্ব দিয়ে দলে খেলানোর একটা কথাবার্তাও চলেছিলো বেশ কিছু দিন। নানান ঝামেলায় তা আর বাস্তবায়িত না হওয়ায়, এক অর্থে স্ট্রাইকার সংকটেই পড়ে জাতীয় দল। বাফুফের সামনে সমস্যা আছে আরো। ক্লাব কর্তৃপক্ষের সাথে দলবদলের সময় নিয়ে বিরোধটা স্পষ্ট। ক’দিন আগেই আরামবাগকে নিষিদ্ধও করা হয়েছে।

     

    মাঠে বাজে পারফরম্যান্সের সাথে বাংলাদেশের ফুটবলের অভিবাবক বাফুফে-কেও সময়ে সময়ে কিছুটা খাপছাড়া লেগেছে এ বছর। কোচ বদলানোর পুরোনো সংস্কৃতি তো সাথে ছিলই। তড়িঘড়ি করে ফাবিও লোপেজকে নিয়োগ দিয়ে আবার দু’মাসের মাথায় ছাঁটাই করাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সবচেয়ে বেশী। নতুন করে কোচ হিসেবে মারুফুল হক কে নিয়োগ দিয়ে সাফ জয়ের মিশনে পাঠালেও, স্বল্প সময়ে তেমন কিছুই করতে পারেননি কোচ। অন্য সব দল যেখানে পাঁচ-সাত বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ এ বছরও আটকে রইলো কোচ বদলানোর পুরোনো রীতিতে।  

    আন্তর্জাতিক ফুটবলে হতাশ করলেও, ঘরোয়া লীগে প্রাপ্তির খাতাটা প্রসারিত হয়েছে। প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের এএফসি কাপের বাছাইপর্বে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের পর্বে খেলার টিকেট পাওয়া বাংলাদেশের ফুটবলের জন্যই এক নতুন অর্জন। এ বছরই চট্টগ্রামে শুরু হওয়া শেখ কামাল ক্লাব কাপ ও বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন সংযোজন। সবমিলিয়ে তাই সারা বছরই কোন না কোন টুর্নামেন্টে ব্যস্ত ছিলেন ফুটবলারেরা। খেলার দাবিতে মাঠ থেকে রাস্তায় নামার দিন অন্তত শেষ হয়েছে। প্রিমিয়ার লীগকে পরের মৌসুম থেকে আরো আকর্ষণীয় করতে নতুন চুক্তিও হয়েছে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে।

    অন্যদিকে মেয়েদের ফুটবলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে অনূর্ধ্ব-১৪ এর কিশোরীরা। নেপালের ভূমিকম্পও হার মানাতে পারেনি তাদের! সেই ঘটনারও প্রায় ৮ মাস পর নেপালকে তাদের মাটিতে ফাইনালে হারিয়ে  এএফসির আঞ্চলিক ফুটবল টুর্নামেন্টের জয়ী হয়েছে ময়মনসিংহের মেয়েরা।   

    দর্শক খরার হাত থেকে কিছুটা বের হয়ে আসতে পেরেছে বাংলাদেশের ফুটবল। বছরের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু কাপে সব ম্যাচেই ভরা গ্যালারী দেখেছে সিলেট ও ঢাকা। অনূর্ধ্ব-১৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে বাংলাদেশের যে সাফল্য তাতে সিলেটের নিবেদিত প্রাণ দর্শকদেরও কিছু ভাগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতেও গড়ে ৮/১০ হাজার মানুষ হয়েছে। বিশেষ করে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে সাধারণ মানুষের অন্যরকম উন্মাদনা- দেশের ফুটবলে সুবাতাস ফিরিয়ে এনেছিলো অনেকটাই।   

    ছোট-ছোট এই অর্জনগুলো ফিফার র‍্যাংকিংয়ে নামতে নামতে ১৮২ তে গিয়ে ঠেকা একটি দেশের জন্য কমই বা কি ছিল! আসলে সাফের দুর্গতিই ম্লান করে দিয়েছে এই প্রাপ্তিগুলোও।

     

    সাফের ব্যর্থতা অনেকটাই ওলট-পালট করে দিয়েছে পুরো বছরের হিসেব নিকেশ। বছরশেষে তাই সাফল্য ব্যর্থতার নিক্তিতে ব্যর্থতার ভরই বেশী। ব্যর্থতাও যে অভিজ্ঞতা হয় সে উদাহরণও বিরল নয়। আগামী মাসেই আবারো শুরু হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কাপ। হাতে সময় অল্পই। ফুটবলের ‘শিরোপা’ অর্জনের অপেক্ষার বছরগুলো বেড়েই চলেছে।

     

    সাফ থেকে বাদ পড়ার পরও টিকেট জটিলতায় আরো দু’তিন দিন ত্রিবান্দামের হোটেলেই কাটবে মামুনুল, জামাল, হেমন্তদের। কোচ, ম্যানেজার চলে এসেছেন দেশে। অবসরের এই সময়টায় নিজেদেরকে সামলে নেয়াটাও কি শিখবে বাংলাদেশ দল?

     

    খেলোয়াড়দের আত্মোপলব্ধি? নতুন মুখের খোঁজ? নাকি বিদেশী কোচ? কিসে ফিরবে বাংলাদেশ ফুটবলের সুদিন? অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে পার হয়ে গেলো আরো একটি বছর।    
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন