• ফুটবল, অন্যান্য
  • " />

     

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৫: লেস্টার জলসায়

    “৪০ পয়েন্ট?”

    “হ্যাঁ ,৪০ পয়েন্ট। এই মুহূর্তে এটাই আমার দলের  প্রজেক্ট, টার্গেট পরিবর্তন করা যাবে না। এই মৌসুমের শুরুতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকা এবং সেই লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করার আগ পর্যন্ত আমি অন্যদিকে মাথা ঘামাচ্ছি না। আগে যে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি সেটাকে শক্ত করতে হবে, বাকি চিন্তা পরে। ভক্তরা স্বপ্ন দেখতেই পারে, অনেক বড় বড় স্বপ্ন। কিন্তু ম্যানেজার হিসেবে আমাকে বাস্তব চিন্তার মাঝে থাকতে হবে। কাজেই এখনও আমার লক্ষ্য ৪০ পয়েন্ট। কখন সেটা আসবে? এখন থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি যেকোন সময়ে...”

    কথাগুলো নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ক্লদিও রানিয়েরির একটি সাক্ষাৎকারের অংশ। ততক্ষণে প্রিমিয়ার লিগের ম্যানেজার, খেলোয়াড়, বিশ্লেষক এবং দর্শকেরা তাদের মনের গহীন কোণে একটু একটু করে কেবল হয়তো টের পাচ্ছে যে, লেস্টার সিটির জয়রথটা হয়তো ঝড়ে বকের গণহত্যাজাতীয় কিছু নয়, এবার ব্যাপারটা অন্যরকম হলেও হতে পারে। বর্তমানে (জানুয়ারির মাঝামাঝি) লেস্টার ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে লিগের দ্বিতীয় অবস্থান দখল করে আছে। শীর্ষে বসে থাকা আর্সেন ওয়েঙ্গারের গানারবাহিনীর পয়েন্ট সমান কিন্তু কেবল গোল ব্যবধানে এগিয়ে। সব সম্ভবের এই মৌসুমে প্রথম ২২ ম্যাচের মাঝে লেস্টারের মাত্র দুইটি পরাজয়, তাও আর্সেনাল ও লিভারপুলের কাছে। এখন একে আর তাই কাকতালীয় বা কেবল ভাগ্যের ব্যাপার বলে উড়িয়ে দেওয়ার আর উপায় নেই। রানিয়েরি এবং তাঁর বাহিনী বাকি সব ‘বড়’ দল এবং তাদের 'থিংক ট্যাংক'দের মনোযোগ আকর্ষণ করে তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে যথেষ্ট গোলযোগেরই সৃষ্টি করেছেন। কাজেই এই লেখকের মনে হয়েছে এই ‘ছোট’ দলটির রণকৌশলের সাথেও হাতেখড়ি হওয়ার প্রয়োজন আছে আমাদের পাঠকদের।

     

     

    ফারো দ্বীপপুঞ্জের কাছে হারার পর রানিয়েরি গ্রিস জাতীয় দলের কোচের চাকরি খোয়ালেন এবং তাঁর দরজায় টোকা দিল লেস্টারের মালিকগোষ্ঠী। এর পরে লেস্টারের যে অস্বাভাবিক উত্থান তার সাথে হয়তো কেবল হাল আমলের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদেরই কিছুটা তুলনা টানা যেতে পারে। যদিও সিমিওনের শিষ্যরা বার্সা-রিয়াল খচিত লা লিগা জিতে এবং ক্লাব ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়ে আরো সাড়া ফেলে দিয়েছিল - কিন্তু আমি এখানে অর্জন বা ট্রফিকেসের তুলনা করছি না। রানিয়েরি এবং সিমিওনে বর্তমান সময়ের খুব অল্প কিছু উঁচু লেভেলের ম্যানেজারদের দুইজন, যারা এখনো চিরাচরিত ৪-৪-২ ফর্মেশনে খেলতেই পছন্দ করেন, যেখানে বাকি বিশ্ব ৪-৪-২ থেকে দূরে সরে আরো আধুনিক ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে জাঁকিয়ে বসেছে বেশ আগেই। 

    রানিয়েরি এবং সিমিওনে দুইজনের রণকৌশলের মূল লক্ষ্য হল মাঝমাঠের বিপক্ষ দলের নড়াচড়ার জায়গা কমিয়ে দেওয়া, চারজন মিডফিল্ডার এবং দুইজন অ্যাটাকারের মাঝের শূন্যস্থানের পরিমাণ যথাসম্ভব কম রাখা। বলের দখল হারালে এই ছয়জনের সবাইকেই নিজের অর্ধে নিয়ে এসে তৃতীয় আরেকটি রক্ষণের লাইন তৈরী করে ফেলা যায় খুব সহজেই। আর এই ধরনের কৌশলের কারণে মাঝমাঠে শুন্যস্থানের পরিমাণ কমে যায় বিধায় বিপক্ষ দলের বলের দখল হারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায় অনেকগুণে।

    রানিয়েরি প্রথম লেস্টারে এসেই বলেছিলেন, আমি খুব একটা পরিবর্তন না করেই কিভাবে ইতালিয়ান কৌশলের একটা ছায়া তৈরী করা যায় সেটার দিকেই মূলত মাথা খাটাবো। ঐসময়ে সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, রানিয়েরি হয়ত তালা-চাবির খেলা বা ভদ্রভাষায় যাকে কাতেনাচ্চিও বলা হয়ে থাকে সেই কুখ্যাত ইতালিয়ান রক্ষণমুখী খেলার দিকেই হাঁটবেন। আর, ঐ রাস্তায় পাড়ি দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, কারণ একদিকে লেস্টার কোনোরকমে এর আগের মৌসুমে রেলিগেশনের ফাঁড়া কাটিয়েছে এবং খুব বড় স্বপ্ন দেখাবার মতো কোন তারকা বা খুব সম্ভাবনাময়ী তরুণ তুর্কীরও হদিশ ছিল না দলে। এরকম ক্ষেত্রে যেকোনো বড় লিগের অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলো মূলতঃ রক্ষণভাগের প্রতি জোর দিয়ে পাল্টা-আক্রমণে গোল দেওয়ার চেষ্টায় থাকে।


    আরো পড়ুনঃ

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৪ঃ একজন শূন্যসন্ধানী বা 'রমডয়টারের' গল্প


    কষ্টকল্পনা মনে হতে পারে কিন্তু লেস্টারের বর্তমান কৌশলের ছায়া দেখে মনে হয়, এটা আরিগো সাচ্চির বিখ্যাত এসি মিলানের ব্লু প্রিন্ট অনুসরণ করছে। সাচ্চি তৎকালীন কাতেনাচ্চিওর লিবেরো এবং রক্ষণের 'ম্যান মার্কিং'কে পাশ কাটিয়ে 'জোনাল মার্কিং' এবং ৪-৪-২ ফর্মেশনের সাথে বিশ্ব ফুটবলকে পরিচয় করিয়ে দিয়েই খ্যাতি এবং সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। ২০১১-’১২ মৌসুমে রানিয়েরি যখন ইন্টারের ম্যানেজার ছিলেন তখন তিনি গুরু সাচ্চির বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। সেবার রেলিগেশন জোনে ঘোরাফেরা করতে থাকা ইন্টার মিলানকে নিয়ে রানিয়েরি সিরি আ শেষ করেছিলেন ৪র্থ হয়ে।

     

    সাচ্চির এসি মিলানে তিনটি লাইনের মাঝে ব্যবধান ছিল খুবই ক

     

    সাচ্চির খেলার মূলমন্ত্র ছিল মাঝমাঠের শূন্যস্থান কমানো। তাঁর মিলান দলের রক্ষণ এবং আক্রমণের লাইনের মাঝে তফাৎ থাকতো গড়পড়তা ২৫ গজের মতন এবং গোটা ম্যাচ জুড়েই এই দূরত্বটা বজায় রাখবার চেষ্টা করা হতো। বলের দখল হারালে বর্তমানে লেস্টার সিটিও অনেকটা এরকম লাইন বজায় রাখবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। ফলস্বরূপ মাঝমাঠে একটা জটলা তৈরী হয় যেখানে সহজেই প্রতিপক্ষ বল হারায় বা হারাতে পারে।

     

    ফ্রন্ট এবং ব্যাক লাইনের ২৫ গজের ব্যবধান

     

    প্রতিপক্ষ যদি তাদের ব্যাক লাইন থেকে বল নিয়ে বিল্ড আপ শুরু করে তবে রিয়াদ মা’রেজ এবং মার্ক অলব্রাইটন মাঝমাঠের কেন্দ্রের দিকে সরে আসবেন যাতে প্রতিপক্ষ ওয়াইড চ্যানেল দিতে আক্রমণ করার ব্যাপারে উৎসাহ পায়। প্রতিপক্ষ ওয়াইড চ্যানেলে সরে আসা মাত্র ঐপাশের ফরোয়ার্ড এবং উইঙ্গার বলের দখল নেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে যাবেন, যাতে করে বলের দখলদারের কাছে ব্যাক পাস দেওয়া বা আরো লম্বা বল বাড়ানো ছাড়া আর কোন গতি না থাকে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, মানে লম্বা বল ছাড়লে লেস্টারের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা সহজেই আবার বলের দখল ফিরে পাবে। 

    আবার প্রতিপক্ষের কোন খেলোয়াড় যদি মাঝমাঠ থেকে চ্যানেল পরিবর্তন করতে চায় সেক্ষেত্রে লেস্টারের ফুল ব্যাকরা এগিয়ে এসে তাদেরকে বাধা দেবে বা ইন্টারসেপ্ট করার চেষ্টা করবে। মাঝে মাঝে প্রয়োজনে সেন্টার ব্যাকরাও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য মাঝমাঠের লাইন পর্যন্ত উঠে আসতে পারে। লেস্টারের রক্ষণ, মাঝমাঠ এবং আক্রমণের লাইনের মাঝে দূরত্ব এতটাই কম যে, কোনো সেন্টার ব্যাক মাঝমাঠের লাইন পর্যন্ত উঠে গেলেও সে আসলে তার নিজের রক্ষণের লাইন থেকে খুব একটা দূরে কখনোই থাকবে না। প্রথম দুইটি রক্ষণের লাইন ভেদ করে যদিও বা কোন প্রতিপক্ষ অ্যাটাকার বের হয়েও যায়, সেক্ষেত্রে কোনো সেন্টার ব্যাক শক্ত ট্যাকল করে তাকে থামাবে।


    আরো পড়ুনঃ

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-৩ঃ রেজিস্তাদের রাজত্বে


    কাজেই এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, লেস্টারের রক্ষণ যদি তাদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে, তবে এই তিন লেয়ারের রক্ষণব্যুহ ভেদ করার দুইটি উপায় আছে, মাথার ওপর দিয়ে লম্বা বল বা দ্রুত পাসিং এবং পাল্টা-আক্রমণ (কাউন্টার অ্যাটাক)। কিন্তু লেস্টারের ব্যাক লাইন অনেক উঁচুতে থাকায় তারা নিজেদের লাইন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সহজেই তারা প্রতিপক্ষকে অফসাইডের ফাঁদে ফেলে দিতে পারবে। রক্ষণে গেলে লেস্টারের একজন ফরোয়ার্ড (ভার্দি বা ওকাজাকি) মাঝমাঠের লাইন পর্যন্ত নেমে এসে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার কান্টে এবং ড্যানি ড্রিংকওয়াটারকে সহায়তা দেবেন।

    মাঝমাঠের কাজ মূলত প্রতিপক্ষের পাসকে ইন্টারসেপ্ট করা এবং ব্যাকলাইন পর্যন্ত যাওয়ার আগেই বলের দখল নিয়ে নেওয়া। আর কোনভাবে ব্যাক লাইন পর্যন্ত বল চলে গেলেও লেস্টারের ব্যাকের চারজনের প্রত্যেকেই ওয়ান-অন-ওয়ান অবস্থায় প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করার মানসিক প্রস্তুতি এবং শারীরিক দক্ষতা ধারণ করেন। লেস্টারের মূল রণকৌশলে ট্যাকলের ব্যাপারটা থাকলেও তাদের রক্ষণের মূল শক্তি ইন্টারসেপশন এবং প্রতিপক্ষের পাসিং লেইন বন্ধ করে দিয়ে তাদের ভুল করতে বাধ্য করা। এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগে সবচেয়ে বেশি ইন্টারসেপশন রেকর্ডও তাই রানিয়েরির বাহিনীর হাতেই। সেসাথে সবচেয়ে বেশি ব্লকড শট এবং ক্লিয়ারেন্সের রেকর্ডও। এই মৌসুমে রিয়াদ মা'রেজ এবং জেমি ভার্দি নজর কাড়লেও এই রক্ষণাত্মক রেকর্ডগুলোর আসল দাবীদার লেস্টারের মাঝমাঠের সেনানী - অলব্রাইটন, কান্টে, ড্রিংকওয়াটার এবং কিং-য়ের। বিশেষ করে অলব্রাইটনের অদম্য মনোভাব এবং কান্টের প্রতিপক্ষের খেলা পড়ে ফেলার ক্ষমতাই রানিয়েরির শিষ্যদের জয়রথকে সচল রেখেছে। 

     

    লেস্টারের রক্ষণের রেকর্ড এই মৌসুমে ঈর্ষণীয়

     

    শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রম লেস্টারের রক্ষণের মূল শক্তি

     

    বলের দখল ফিরে পাওয়ার পর লেস্টারের কাজ হল যথাসম্ভব দ্রুত এবং কম মানুষ নিয়ে প্রতি-আক্রমণে যাওয়া। ওয়াইড চ্যানেলে অলব্রাইটন বা ওভারল্যাপ করতে থাকা কোনো ফুলব্যাকের কাছে একটি ডায়াগনাল বল বাড়িয়ে দ্রুত প্রতিপক্ষের গোলমুখে এগোনো। এক্ষেত্রে রিয়াদ মা’রেজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কারণ তিনি প্রয়োজনে ওয়াইড চ্যানেলে সরে গিয়ে অ্যাটাকারদের বলের যোগান দিতে পারেন আবার চ্যানেল পরিবর্তন করে ভেতরে ঢুকে গোলে শট নেওয়ার মতো যথেষ্ট দক্ষতাও তিনি এবার বারেবারে প্রমাণ করে গিয়েছেন। যেহেতু লেস্টারের তিনটি লাইনের মাঝে দূরত্ব সবসময় কম থাকে, কাজেই একবার বলের দখল পেলে পাস দেওয়ার জন্য আশেপাশে কোনো না কোনো সহযোদ্ধাকে সবসময়ই পাওয়া যায়।

    আক্রমণের ক্ষেত্রে বল জেতার পর লেস্টারের স্বাভাবিক ৪-৪-২ ফর্মেশন হয়ে যায় ৪-২-৪ এবং তিনটি লাইনই একসাথে এগোনোর চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে তাদের আক্রমণের পুরোভাগে আছেন ভার্দি এবং রিয়াদ মা'রেজ। ২২ ম্যাচে ১৫ গোল করা ভার্দি থেকে খানিকটা পিছিয়ে আছেন ২১ ম্যাচে ১৩ বার গোলের সন্ধান পাওয়া মা'রেজ। যদিও তার ৩৮টি গোলের সুযোগ সৃষ্টি এবং ৭টি অ্যাসিস্টের কথা মেসুত ওজিলের এবারকার বিধ্বংসী ফর্মের কারণে হয়তো অনেকেরই দৃষ্টির অগোচর রয়ে গিয়েছে। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, যখন আপনার আক্রমণে মৌসুমের সেরা এবং ৪র্থ সেরা গোলশিকারী প্রায় প্রতিটি ম্যাচই খেলে যাচ্ছেন, তখন প্রতি আক্রমণে সাফল্যের শতকরা হার বেশি থাকাটাই কি স্বাভাবিক নয়?

     

    প্রয়োজনে উইং থেকে ভেতরে ঢুকে গোলে শট নেওয়া এখন রিয়াদ মা'রেজের জন্য নিত্তনৈমিত্তিক

     

    লেস্টারের দুর্দমনীয় প্রতি আক্রমণ

     

    তিনটি লাইন কাছাকাছি থাকার সুবিধা পাচ্ছে লেস্টার আক্রমণের সময়েও

     

    বলের দখল ধরে রাখা জাতীয় ‘গার্ডিওলা’ নীতিতে লেস্টার মোটেও বিশ্বাসী নয়। যেখানে তাদের নিকটতম ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর্সেনাল গড়ে প্রতি ম্যাচে ৫৫% সময় বল ধরে রাখে, সেখানে লেস্টার মাত্র ৪৪% সময় বলের দেখা পেয়েই খুশী। আরো অবাক করা ব্যাপার যে, লেস্টারের শুধু বলের দখল নয়, সঠিক পাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা লিগে শেষ তিনটি দলের একটি। এর কারণ হল, তাদের আক্রমণের পেছনে লোক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে কার্পণ্য। লেস্টার পাল্টা আক্রমণে বিশ্বাসী, কিন্তু অন্যান্য কাউন্টার-অ্যাটাকিং প্রিয় দলের মতো আক্রমণের সময়ে লেস্টারের তিন চারজন খেলোয়াড় উপরে উঠে গিয়েছে এরকমটা কদাচিৎই হয়। আক্রমণে কেবল দুই ফরোয়ার্ডের সাথে একজন ফুলব্যাক বা উইঙ্গার (মা’রেজ বা অলব্রাইটন) বা দুইজন উইঙ্গার সাপোর্টে থাকেন। আক্রমণে বল হারালে যাতে তারা দ্রুত আবার নিজেদের রক্ষণাত্মক গঠনে ফিরে আসতে পারে, এজন্যই আসলে এই কিপ্টেমি। যাহোক, এই কিপ্টেমির কারণেই কান্টে বা ড্রিংকওয়াটারের বাড়ানো বলগুলো হয়তো সবসময়ে জায়গামতো পৌঁছে না। কিন্তু প্রতিপক্ষের প্রতি-আক্রমণে গোল খেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় বহুগুণে। 

     

    বলের দখল রাখা এবং বলের আদানপ্রদানের সাফল্যের দিক থেকে লেস্টার সবার থেকে পিছিয়ে

     

    লেস্টারের রণকৌশল খুবই সোজাসাপ্টা এবং সাদামাটা। কিন্তু একটা সাদামাটা কৌশলও যদি ১১জন খেলোয়াড় শৃংখলার সাথে বজায় রাখতে পারে, তবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলক ছাড়া লেস্টারকে পরাজিত করাটা বেশ মুশকিলই বটে। এখন পর্যন্ত লেস্টারের সবচেয়ে বড় হার (২-৫) আর্সেনালের হাতে, এবং সেটার পেছনে আর্সেনালের চিলিয়ান উইঙ্গার অ্যালেক্সিস সানচেজের দুর্দমনীয় গতি এবং দক্ষতাই অনেকাংশে দায়ী। লেস্টারের সাফল্যের পেছনে রানিয়েরির সবচেয়ে বড় অবদান কিন্তু তাঁর রণকৌশল নয়। অলব্রাইটনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, রানিয়েরি আসলে নতুন কি করছেন। অলব্রাইটন জবাব দিয়েছেন, নতুন কিছুই নয়, হয়তো সেটাই সবচেয়ে ভাল হয়েছে।

    এমনকি রানিয়েরি লেস্টারের আগের ম্যানেজার নাইজেল পিয়ারসনের ব্যাকরুম স্টাফদের অনেককেই বহাল রেখেছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হল, সাদামাটা রণকৌশলের মাঝেই খেলোয়াড়দের মাঝে একতা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা আর খেলোয়াড়দের মাঝে একটা প্রেরণার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া যার কারণে পুরো ৯০ মিনিটই অলব্রাইটন মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দৌড়ে যেতে পারেন, ইনজুরিতে থাকা জেমি ভার্দিও পুরো ৯০ মিনিট ম্যাচ খেলেন এবং গোলও করেন। পরিশ্রম, শৃংখলা অধ্যবসায় এই মৌসুমে রানিয়েরির ছাত্রদের মূল চালিকাশক্তি - আর সেই সাথে অবশ্যই মা'রেজ এবং ভার্দির দুর্দান্ত ফর্ম।

    লেস্টার কি আসলেই পারবে? বা কতটুকু পারবে? এই প্রশ্ন এখনো সমালোচকেদের মুখে মুখে, কিন্তু রানিয়েরি শুরুতেই বলে দিয়েছেন তিনি অতটা উচ্চাভিলাষী নন। তাঁর ৪০ পয়েন্টের লক্ষ্য তিনি মৌসুমের মাঝামাঝিতেই অর্জন করে ফেলেছেন, আর বাকি যা পাওয়া যাবে সবটুকুই ফুটবলেশ্বরের কৃপা? না বাকিটুকু লেস্টারের ফক্সদের মনোবল এবং সহ্যশক্তির পরীক্ষাও? 


    আরো পড়ুনঃ

    ট্যাকটিকসে হাতেখড়ি-২ঃ গেগেনপ্রেসিং


     

     

    লেস্টার জলসায় ভার্দির পরিবেশনা!

     

    কিন্তু তাহলে কি সব বাজিকরের স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে লেস্টার এবার লিগের শিরোপা ছিনিয়ে নেবে? এটা বলাটা একটু মুশকিল। এখন পর্যন্ত লেস্টার মাত্র ১৭ জন খেলোয়াড়কে প্রথম একাদশে নামিয়েছে, যেখানে প্রিমিয়ার লিগে গড়ে এই সংখ্যাটা ২০ জনের কাছাকাছি। লিগের অন্যান্য মাঝারি বা ছোট দলগুলোর মতন লেস্টারের মূল স্কোয়াডের গভীরতা বেশি না। তাদের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, এই ১৭ জনের মাঝে কেউই চলতি মৌসুমে কোন দীর্ঘ ইনজুরিতে পড়েন নি। যদিও ব্যাপারটা পুরোপুরি ভাগ্য বলাটা ঠিক নয়, কারণ এর আগেও বলা হয়েছে বলের দখল ধরে রাখাটাকে লেস্টার প্রাধান্য দেয় না, এবং তিনটি খুব কাছাকাছি দূরত্বের রক্ষণাত্মক লাইন বজায় রাখবার কারণে বল জেতার জন্য দীর্ঘ সময় প্রেসিং করারও প্রয়োজন হয় না লেস্টারের। তাদের প্রেসিং শুরু হয় মূলত মাঝমাঠ বা তার একটু ওপর থেকে। যেমন একটা পরিসংখ্যান থেকে ব্যাপারটা আরো ভাল বোঝা যাবে। এই মৌসুমে লেস্টারের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা ২২% পাস খেলেছেন ফার্স্ট টাচে; যেখানে লিভারপুল, আর্সেনাল, স্পারস এবং বেশিরভাগ দলের রক্ষণের জন্য এই সংখ্যাটা ৩০% এর ওপর।

    ইতিহাসও লেস্টারের বিপক্ষে। ১৯৯৫ সালের পর থেকে লেস্টারের মতো ২০টি 'ছোট' দল মৌসুমের প্রথমার্ধে ৩০ বা তার বেশি পয়েন্ট কামিয়েছে। এক্ষেত্রে ছোট দল বলতে বোঝানো হচ্ছে, এক মৌসুম আগেও লিগের তলানিতে থাকা, বা প্রমোশন পেয়ে উঠে আসা দলগুলোকে। কিন্তু এই কুড়িটি দলের মাঝে ১৮টি দলই মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধে হোঁচট খেয়েছে এবং প্রথমার্ধের অর্জিত পয়েন্টের অর্ধেক বা তারও কম কামিয়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের কড়া শিডিউল, গা জোয়ারি খেলার কারনে ছোট স্কোয়াডের দলগুলোকে বেগ পেতে হবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু এখন পর্যন্ত যে লেস্টার লড়ে যাচ্ছে, এটাই যেকোনো আন্ডারডগ দলের জন্য প্রেরণা হওয়া উচিত। লেস্টার এখনো গড়ে প্রতি ম্যাচে ২ পয়েন্ট করে পকেটে পুরছে এবং এবারের লিগে সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ (৫৮) তৈরী করার রেকর্ডও এখন পর্যন্ত তাদের।

    ২০১৫-'১৬ মৌসুমের শুরুতে লেস্টারের শিরোপা জেতার পক্ষে বাজির দর ছিল ১৫০০-১; এই পাহাড়সম বাজির হারকে পরাজিত করে যদি এপ্রিলের শেষেও লেস্টার প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষে থাকতে পারে কিংবা পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে পারে, তাহলে হয়তো পরবর্তী মৌসুমগুলোতে আরো টাকাপয়সা আসবে লেস্টারে, চেলসির মতো লেস্টারও হয়তো হয়ে উঠবে একটি 'বড়' ক্লাব!